।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ।।
কাব্যগ্রন্থ: বাঁক / অভিজিৎ সেন
দীর্ঘদিন থেকেই কবিতা লিখছেন কোচবিহারের অভিজিৎ সেন। সম্প্রতি তাঁর নবম কাব্যগ্রন্থ `বাঁক` পাঠ করবার সুযোগ হল। মোট ৪৪টি কবিতা মলাটবন্দী হয়েছে নবদিগন্ত পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থটিতে। ঋত্বিকা বল্লভের প্রচ্ছদ কাব্যগ্রন্থের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানানসই হয়েছে।
অভিজিৎ সেন তাঁর কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন `আবহমান সময় এবং নদীকে`। ইংরেজিতে একটি কথা আছে `time and tide wait for none`, সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই কাব্যগ্রন্থের মূল সুর এটিই। অধিকাংশ কবিতাতেই কবি সময়ের হাত ধরেছেন। বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে সময়কে স্পর্শ করার এই প্রচেষ্টা তাঁকে এই কাব্যগ্রন্থে অনন্য করে তুলেছে। `তোমার দেখানো পথে আমি হেঁটে যাবো/ আমার দেখানো পথে হেঁটে যাবে ভবিষ্যৎ....` জাতীয় উচ্চারণের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কবি প্রবাহমান সময়কে নদীর সঙ্গে তুলনা না করে দুজনকেই সমার্থক করেছেন। কেননা নদীর দেখানো পথেই আমরা হেঁটে যাই আর আমাদের অনুসরণ করে পরবর্তী প্রজন্ম। সেই অর্থে আমাদের এই পরিভ্রমণের শুরু কিন্তু নদীর থেকেই, যে আদি অনন্তকাল থেকে একইভাবে বয়ে চলেছে। সময়ের সঙ্গে নদীর মিল এখানেই।
নদী ও সময়ের অনুষঙ্গেই এসেছে কবির মৃত্যু চেতনা। কিন্তু এই মৃত্যু কেবল জাগতিক। কেননা কবি জানেন `কাল উদাসীন হলেও ইতিহাস লিখে নেয় কালস্রোতে কথা`। সেই কথার পিঠেই তাই তিনি অনায়াসে বলে ওঠেন, `অসহায় অনাকাঙ্খিত দুঃসহ ঘূর্ণনে / অস্থির পৃথিবী স্থির হয়/ কোন শিশু হেসে দিলে!` এই বোধ আসলে চিরন্তন। মৃত্যু যত মহান হোক না কেন, সভ্যতার সময় যাত্রায় শেষ পর্যন্ত সে কিন্তু হেরেই যায়। সেজন্যই `নিশুতি রাত নিস্তব্ধতার আঙুলে পথ ছুঁয়ে দিলে/ আলোকিত পথেরা মুখোশ খুলে ডুকরে কেঁদে ওঠে!` এভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কবি অভিজিৎ সেনের সময়ের দর্শন। আর সেই দর্শনে শেষ পর্যন্ত জিতে যায় মনুষ্য জীবন ও তার সংগ্রামী যাপন।
বেশ কিছু কবিতায় তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে কবি বর্তমান সময়কে ধরে রেখেছেন। কবির সময় যাত্রায় সেটা অবশ্য নতুন নয়। কেননা নিজস্ব সময় ও কালেই আবদ্ধ থাকেন একজন কবি। কিন্তু তাঁর অবলোকন তাঁকে ভবিষ্যৎ দেখায়। তার ওপরে ভর করে তিনি ফুটিয়ে তোলেন এমন এক বাস্তবতা যা আপাতভাবে অদেখা হলেও, বাস্তব সেটাই। তাই কবি যখন বলেন, `শোনো,আমি যাব না কখনো/ শহুরে ক্লান্তির শরিক আমিও/ লোভীদের চেয়ে পলাতকের চেয়ে/ বেঁচে থাকবার অধিকার দায়/ ঢের ঢের বেশি আমার...`, তখন কথাগুলি যেন আর ঠিক তাঁর নিজের থাকে না। মনে হয়, আমার কথাগুলিই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কবির মধ্যে। যেমন, `নিজের আড়ালে নিজেকে পেয়েছি খুঁজে/ দিনের আলোর মতো ভাঙাচোরা মুখ ওঠে ভেসে/ ফল্গুধারার মতো ভেতরে যেতে যেতে/ নিজেকে নিজে খুঁজে পেলাম অজস্র মুখোশের স্তুপে` কিংবা `না, তোমায় ক্লান্তি দেব না- গোলাপ দেবো/ বেছে বেছে কাঁটার বুকে লিখে দেবো ভালোবাসা`।
কবির মননে মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য যে ভীষণভাবে প্রোথিত তা কিন্তু বলে দেয় তাঁর `মা তোমাকে`, `বিদ্যাসাগর বীর`, `একটি শহরের আত্মকথা`, `দাঁড়া সোজা হয়ে দাঁড়া` ইত্যাদি সৃষ্টিতে। যে কবিতার শিরোনাম থেকে কাব্যগ্রন্থের নাম সেই `বাঁক` কবিতার কিছু উচ্চারণ কবির নিজস্ব ভাবনার জগতকে এমনভাবে প্রকাশ করে যে, বিস্মিত হতে হয়- `বাঁকের মুখেতে বসো, বাঁক হয়ে যায় নিজস্ব চেতনায়`। সত্যিই তাই। চেতনায় যদি বাঁক না আসে, তবে শেষ পর্যন্ত উত্তরণ হয় না। আর উত্তরণহীন জীবনের সঙ্গে শেষ অবধি পার্থক্য থাকে না মৃত মানুষের। ফলে সময় ও প্রবাহ স্থবির হয়ে যায়। কিন্তু কবি অভিজিৎ সেন তো সময়ের কবি। ফলে, সময় ও নদীর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলে ফেলেন এক অমোঘ সত্য- `আমি ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকি হাতে পায়ে মনে/ আদিগন্তে যাচ্ছি মিশে/ অনুরণন পা রাখে আর এক অধ্যায়....`
আলোচক: শৌভিক রায়

No comments:
Post a Comment