বনসাই
কবিতা বণিক
বনসাই হল মানুষের এমন এক শিল্পকলা যা এক শিল্পী তাঁর বুদ্ধি, সাধনা, ধৈর্যের মাধ্যমে বিরাট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরেন। মুগ্ধ হতে হয় এমন যত্নে লালিত শিল্পকলা দেখে। প্রকৃতির ক্ষুদ্র রূপ।
বনসাই একটি জাপানি শিল্পকলা। বন অর্থে অগভীর পাত্র, সাই অর্থ গাছ। খুব বড় গাছকে অগভীর পাত্রে বসিয়ে যত্ন করে বামন আকৃতি করে পুষ্ট করে তোলার নাম বনসাই। এই প্রক্রিয়ায় মহীরুহকেও ছোট্ট করে রাখা যায়। তার গুণমান বজায় রেখে। সব ধরনের পূর্ণাঙ্গ গাছকে বনসাই করা যায়। এর ফলও সাধারণ ফলের মতই হয়। কারণ জিনগত ভাবে এটি একটি সাধারণ গাছ। জাপানে এই শিল্পের উৎপত্তি হলেও সারা পৃথিবীতেই এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ফ্ল্যাটেও বনসাই রাখা যেমন সম্ভব, তেমনি বনসাই এর বড়বড় পার্কও আছে। যেখানে মানুষ সৌন্দর্য উপভোগের সাথে সংরক্ষণ, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিনোদন এরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বনসাই হাজার বছরও বাঁচে। বনসাই করা প্যানোরমা ছবিও পার্ক গুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। প্যানোরমা ছবি যা হল একটা ট্রের মধ্যে প্রকৃতির চারিদিকের একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য তুলে ধরা। যেমন বনের আবহ তৈরি করতে একই প্রজাতির অনেক ছোট চারা নির্বাচন করা হয়। বিভিন্ন উচ্চতার ও বিভিন্ন ব্যাসের কান্ডের গাছ ব্যবহার করলে দৃশ্যটি জীবন্ত মনে হয়। চারাগুলোকে অসমান ভাবে আঁকাবাঁকা দূরত্বে বসানো হয়। মাঝে মাঝে ছোট গাছ, ঝোপঝাড় বা ফার্ন জাতীয় গাছ ব্যবহার করা হয়। শ্যওলা দিয়ে মাটিতে সবুজ আস্তরণ তুলে ধরা হয়। পাহাড়ি রূপ দিতে গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাথর বসানো হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ন্যাশনাল আরবোরেটাম। ২৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে ৪০,০০০ এর বেশি বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ এখানে রয়েছে। আমার দেখা ভারতবর্ষের ব্যাঙ্গালোরের লাল বাগেও বনসাই পার্ক আছে।
বনসাই করার কিছু পদ্ধতি আছে। প্রথমত শক্ত কাণ্ড যুক্ত গাছ নির্বাচন করতে হবে। আমাদের দেশের বট, পাকুড়, কাঠ গোলাপ, ডালিম ইত্যাদি। গাছের বৃদ্ধি রোধ করতে অগভীর ও ছড়ানো টব কিংবা ট্রে নিতে হবে। জল নিষ্কাশনের জন্য অবশ্যই কয়েকটা ছিদ্র করতে হবে। যাতে জল সহজেই নিষ্কাশন হয়। বনসাই এর জন্য মাটি তৈরি করা হয় দোঁ-আঁশ মাটির সাথে কিছু বলি ও জৈব সার মিশিয়ে। নিচের ছিদ্র গুলোতে আ্যলুমিনিয়াম বা তামার তার পেঁচিয়ে গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে রাখে। কিছুদিন বৃদ্ধির পর ডালপালায় ঐ রকম তার পেঁচিয়ে উপযুক্ত আকৃতি দিতে হয়। খেয়াল রাখতে হবে যেন গাছের গায়ে ক্ষত না হয়। ডালটি পছন্দ মতো আকার নিলে কয়েক মাস পর তারটি খুলে ফেলতে হয়। এবং অবাঞ্ছিত ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়। বনসাই অতিরিক্ত রোদ বা জল কোনটাই সহ্য করতে পারে না। তবে আলো বাতাস পূর্ণ স্হানে রাখতে হবে। একবছর বাদে টবের মাটি পরিবর্তন জরুরি। বনসাই এর মূল, কাণ্ড মসৃণ ও দাগ মুক্ত হয়। গাছটি যেন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ঠিকমতো বহন করতে পারে। বনসাই পরিচর্যার জন্য নির্ধারিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার প্রয়োজন। খাদ্য হিসেবে তরল সার, জৈব সার যেমন শুকনো গোবর, ভার্মিকম্পোষ্ট, হাড়ের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়।
ব্যাঙ্গালোরের লাল বাগে বনসাই পার্কে প্রচুর বনসাই এর সাথে কিছু প্যাগোডা, অদ্ভুত আকৃতির বেশ বড় পাথর, ছোট ছোট পশু-পাখির মডেল রেখে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষ ধরনের বনসাই যেমন জুনিপার মাউন্টেন স্কেপ। অর্থাৎ ফরেষ্ট স্টাইল বনসাই একটি শৈলী যেখানে অগভীর পাত্রে একাধিক জুনিপার গাছ একসঙ্গে এমন ভাবে সাজানো হয় যাতে একটি প্রাকৃতিক পাহাড় বা বনভূমির দৃশ্য ফুটে ওঠে । এই শৈলীটির আকর্ষণীয় গঠন এবং নান্দনিক রূপের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। রকি মাউন্টেইনের রুক্ষ প্রাকৃতিক দৃশ্য বা পাহাড়ি পরিবেশে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে ওঠা জুনিপার গাছের দৃশ্যকে বোঝায়। রকি মাউন্টেনের জুনিপার , উত্তর আমেরিকার একটি চির সবুজ উদ্ভিদ। যা চরম ঠান্ডা ও খরা সহ্য করতে পারে। রবার থর্ন বনসাই। জনপ্রিয় ইনডোর বনসাই। চকচকে পুরু পাতা ও সামান্য যত্নে টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে এটি গৃহসজ্জার উপযোগী। টবে ছোট আকৃতি বজায় রাখার জন্য এর বৃদ্ধি এবং পাতার আকারকে ছোট রাখতে নিয়মিত ছেঁটে রাখতে হয় ৬/৭ টি কচিপাতা রেখে। পরোক্ষ আলোয় এ গাছ ভালো থাকে।
ফিকাস মাইক্রোকারপা হলো অত্যন্ত জনপ্রিয় সহজে রক্ষণাবেক্ষণ যোগ্য একটি ইনডোর বনসাই। এটি এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলের স্হানীয় গাছ। এই গাছের সুন্দর গড়ন ও মজবুত কাণ্ডের কারণে, বনসাই শিল্পে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই গাছের শিকড় ও কান্ড খুব তাড়াতাড়ি মোটা হয়। সে কারণেই বনসাই শিল্পে চাহিদা ও বেশি। পাতা গাঢ় সবুজ , চকচকে ডিম্বাকৃতি। ফলে খুব সুন্দর হয়। এটিকে চাইনিজ বেনিয়ান, মালয়েশিয়ান বেনিয়ান বা ইন্ডিয়ান লরেল ফিগ নামেও পরিচিত। মালয়ান বেনিয়ান নামেও পরিচিত। আসলে বট গাছেরই একটা প্রজাতি। প্রচুর বনসাই আছে ব্যাঙ্গালোরের লালবাগে। তারই কিছু ছবি দেওয়া হল।
বনসাই এর কথায় রবি ঠাকুর কে মনে পরে, জোনাকির সাথে চাঁদ, সূর্যের তুলনা চলেনা। কিন্তু আনন্দ! জোনাকির যে নিজের সাথে সবাই কে নিয়ে সে আনন্দ—
“ তুমি নও তো সূর্য, নও তো চন্দ্র, তাই বলে কি কম আনন্দ।
তুমি আপন জীবন পূর্ণ করে আপন আলো জ্বেলেছ।….
তুমি ছোট হয়ে নও গো ছোট, জগতে যেথায় যত আলো সবায় আপন করে ফেলেছ।।”


No comments:
Post a Comment