দুই পৃথিবী
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য
" দিদি রে, বিষ্টিইইইই!"
চমকে উঠে সামনের রাস্তায় তাকালেন সুশোভনবাবু। সেই ছেলেটা! রুগ্ন উদোম বুক জুড়ে পাঁজরের হাড় ফুটে বেরোচ্ছে। শতচ্ছিন্ন রঙচটা একখানা ঢলঢলে হাফপ্যান্ট পরনে। আত্মহারা হয়ে খানাখন্দে ভরা রাস্তাটা জুড়ে খালি পায়ে এলোপাথাড়ি দৌড়চ্ছে, লাফাচ্ছে, খেলছে।
দু এক মুহুর্ত মাত্র, তীরবেগে ছুটে ভাইয়ের পাশটিতে এসে উপস্থিত হল দিদিটি। মেয়েটিও রোগা, গলার কণ্ঠা উঁচনো। তবে মুখখানা বড় মায়াময়। ভাইটার মতোই। বুকের মধ্যেটায় হঠাৎই একটা চাপ অনুভব করলেন সুশোভনবাবু।
“ তুমি কি পাগল হলে?”, রাগে সারা মুখ লাল হয়ে উঠেছিল সমুর,” ওদের সঙ্গে আমার তুলনা? শোনো বাবা, পাড়ায় বাধ্য হয়ে দু ঘর বস্তির লোকের সঙ্গে থাকি বলেই ওরা আমাদের প্রতিবেশী হয়ে যায় না। আমার ছেলে বাথটাবেই খেলবে। ওদের সঙ্গে রাস্তার নোংরা জলে লাফাঝাঁপা করে বৃষ্টির আনন্দ পেতে হবে না। আফটার অল, ওর পৃথিবী আর ওই রাস্তার ছেলেপিলেদের পৃথিবী তো এক নয়!”
গ্রীলঘেরা নিরাপদ ব্যালকনির ধার ঘেঁষে বসানো লম্বাটে নীল হলুদ রাবারের দামী বাথটাবটার দিকে তাকালেন সুশোভনবাবু। বাথটাব ভরা পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত জলের মধ্যে হাত পা ছুঁড়ে ছুঁড়ে খেলছে তাঁর একমাত্র নাতি গোগোল। গ্রীলের ফাঁকফোঁকড় দিয়ে বর্ষার প্রথম বৃষ্টির ছাঁট কখনও ছিটকে এসে লাগছে ওর নিষ্পাপ চোখে মুখে। তাতেই খুশিতে খিলখিলিয়ে উঠছে ও!
একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে এল সুশোভনবাবুর। যাক! আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি নাহয় এভাবেই মিলিয়ে দিক দুই পৃথিবীকে!

No comments:
Post a Comment