Thursday, July 2, 2026


 

ঘুমের  ঘোরে

  চিত্রা পাল 


অনেকবার ডাকছে ওকে,দিদা ও দিদা ওঠো অনেক বেলা হয়ে গেলো উঠবে না,চা খাবেতো।বাসন্তী শুনতে পাচ্ছে,সাড়াও দিচ্ছে, কিন্তু এদিকে চাঁপা শুনতে পাচ্ছে না। ও শুনছে কেমন একটা ঘড় ঘড় শব্দ। অন্য কেউ হলে ভয় পেয়ে যেতো, কিন্তু না, চাঁপা ভয় পায়নি, সেই জন্যে বারবার ও ডেকে চলেছে। বেশ কয়েকবার ডাকার পরে বাসন্তী চোখ মেললো। চোখ মেলে চাঁপাকে দেখে একবার ফিক করে হেসেও ফেললো।চাঁপা বুঝতে পারলো সে হাসিটা সজ্ঞানে নয়, এখনও ঘুম লেপ্টে আছে চোখে মুখে,ঘুমের ঘোরে। 

এইবার চাঁপাএকটু জোর গলায় বলে, কি শুয়ে আছো এখনও, ওঠো দেকি। এবার আড়মোড়া ভেঙ্গে তাড়াতাড়ি উঠে বসতে যায় বাসন্তী।চাঁপা বলে, দাঁড়াও, তড়বড় করবে না,পড়ে গেলে আর এক ঝঞ্ঝাট হবে। তুই ছাড়্‌তো, বলে নিজেই উঠে বসে। চাঁপা ওকে রেখে চা করতে যায়।

প্রতিদিন সকালে চাঁপার সঙ্গে বাসন্তীর কিছু খিটিমিটি হয়,আর হবেও। কেননা চাঁপা ওনার সব কাজ করে দিতে যায়,আর উনি এখনও নিজের সব কাজ করে নেবার মত শক্তপোক্ত বলে নিজেই নিজের কাজ করে নিতে চান, আর সেটাই জারি রাখেন আর সে নিয়েই চাঁপার সঙ্গে মাঝে মাঝে তর্কাতর্কি লেগে যায়। আবার ভাব হয়ে যেতেও বিলম্ব হয় না। 

চা খেতে খেতে ওনার খবরের কাগজ পড়ার স্বভাব, তখন আবার চাঁপাকে চাই,কেননা এমন শ্রোতা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কত যে খবর পড়ে যান উনি, আর বলেন,দ্যাখ ,কি কপাল, অমন লাদাখের মতো দুর্গম জায়গায়  হেলিকপ্টার পড়ে গেলেও কেমন তিনজন মিলিটারি বেঁচে গেল, সবই কপাল।  চাঁপা বলে কি করে বাঁচলো বলতো? বাসন্তী বলে ওই কপাল।  পড়ে গিয়ে আবার দরজা খুলে বেরিয়েও এলো, এই দ্যাখ না ছবিও দিয়েছে। চাঁপা ছবি দেখে বলে হ্যাঁ, তাইতো। আসলে চাঁপা একটু লেখাপড়া জানে,ওই ক্লাস সেভেন এইট অব্দি পড়েছে। বাংলা খবরের কাগজ ভালই পড়ে,ইংরেজি অক্ষরগুলোও চেনে জানে। ও খবরটা পড়ে, উনি যখন অন্য কিছু পড়েন বা নিজের কাজে চলে যান।  

বাসন্তীর একমাত্র ছেলে চাকরি করে দিল্লীতে। বিয়ের পরে ছেলে দিল্লীবাসী তো হবেই, তাতে বাসন্তীর ও কিছু মনে হয়নি।বরং ওরা নিজেরা সংসার পেতে ভালই আছে, এদিকে এনারাও কত্তাগিন্নী ভালই ছিলেন। নাতি হলো মনের সাধ পুরিয়ে আমোদ আহ্লাদ করেছেন, নাতির সঙ্গে খেলাধুলো সবই হয়েছে। কিন্তু বাদ সাধলো ওনার কত্তার চলে যাওয়াটা। কাজকর্ম সেরে দিল্লী ফিরে যাবার সময়ে ছেলে মাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলো। কিন্তু দিল্লী গিয়ে ওনার মন টেঁকে না। ব্যাপারটা হল, উনি এ বাড়ি ছেড়ে যেতে চাননি মোটেই। ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন, ছেলে বলে, তোমাকে এখানে একা রেখে আমি কি করে ওখানে থাকবো? অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক হল যে উনি এখন যাচ্ছেন, পরে যখন মন হবে তখন চলে আসবেন এখানে। 

একমাস যেতে না যেতেই ওনার হল মন উচাটন।কিছুতেই ওখানে থাকতে ওনার মন চাইছে না। এক তো হিন্দিভাষী অঞ্চল, বাইরে যান, পার্কে যান, বসে থাকেন কিছুক্ষণ তারপরে ঘরে ফিরে আসেন।কিন্তু সেখানেও নিজের চেনা ঘরের পরিবেশ নেই।কি যেন অভাব মনে হয়। এবার উনি ঠিককরলেন,নিজের বাড়িতেই ফিরে আসবেন। অনেক খুঁজে পেতে চাঁপাকে পাওয়া গেলো,সারাদিন থাকবে,ওনার যা দরকার সব করে দেবে।চাঁপা যখন আছে, তখন রান্নাটা দুজনে মিলেই করবেন,সেটা যেন বজায় থাকে।তাহলে রান্নার মাসি বাদ দিতে হয়।  অনেক চিন্তা ভাবনা করে ছেলে রাজি হয়।ঠিক আছে, এভাবেই চলুক।  এবার ওফিরে  যাবে দিল্লীতে।  বেরোবার জন্যে তৈরি হতে ছেলেকে বললেন, গলার কবচটা  পরে নিবি। 

এটার একটা কাহিনী আছে। একবার ছেলে খুব অসুস্থ হয়। দীর্ঘদিন ভুগেছিলো। ডাক্তার ট্রিট্মেন্ট সবই চলছিলো,কিন্তু কিছুতেই ভাল হচ্ছিল না।তখন ওনার দিদি ওনাকে নিয়ে মন্দিরে এক সাধুর কাছে নিয়ে যায়। দিদি বলেছিলো যে ট্রিট্মেন্ট যেমন হচ্ছে হোক,তুই একবার বাবার কাছে চল, উনি কিন্তু একেবারে ধন্বন্তরী। মনে ভাবলেন, গিয়েই দেখা যাক,এখনও ছেলেটা সেরে উঠছে না।এই ভেবে ওই সাধুর কাছে গেলেন।  দিদি সব বলেই রেখেছিলেন,এখন বাসন্তীর মুখে আবার সব শুনে উনি একটা কবচ দিয়ে বললেন, এই টা যেন সব সময় ওর শরীরে থাকে,তাহলে বিপদ থেকে দূরে থাকবে। আরও ভালো লাগলো যে উনি কোন দান দক্ষিণা গ্রহণ করেননি। বলেছিলেন, এক বছর পরে এসে মায়ের পায়ে প্রণাম জানিয়ে যাবেন। সত্যি বলতে কি ওর বাবা চলে যাবার পরে উনি ছেলেকে নিয়ে মনে মনে আতঙ্কে থাকতেন,এই কবচ তাঁর মনে সাহস জুগিয়ে ছিলো।ছেলেও ওনার সামনে অন্তত পরে থাকতো অবহেলা করতো না।

সেবার ও মায়ের কথামত পরেওছিলো,কিন্তু কখনযে ওটা ওর গলা থেকে খুলে পড়ে যায় ও সেটা টের পায়নি।সেটাস্টেশনে আসার সময়ে টোটোতেই পড়েছে না,দিল্লিতে আসার সময়ে গাড়িতে পড়েছে টের পায়নি। কিন্তু এখন ওটা ওর কাছে নেই।তাও ও আগে বলেনি। ওর মা যখন জিজ্ঞেস করে,হ্যাঁরে, কবচটা ঠিক আছে তো? তখন বলে, মা ওটা নাহারিয়ে ফেলেছি। সে কি রে?কোথায় হারালিরে বাবা? বলে, খুব সম্ভব, টোটোতে, নাহলে এখানকার ট্যাক্সিতে। 

তারপর থেকে ছেলের একটা না একটা ধাক্কা আঘাত লেগেই আছে।একবার ছুরিতে বেশ খানিকটা আঙুল কেটে গেল, এতোটাই যে সেলাই দিতে হল। একবার মাথায় এমন ধাক্কা খেলো যে কপাল ফুলে আলু। একবার তো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে এমন গড়িয়ে পড়লো, কোন ক্রমে পাশের রেলিং ধরে  রক্ষে পেয়েছিলো, না হলে গড়াতে গড়াতে কি যে হতো বলা যাচ্ছে না। যখনই শোনে তখনই মনে হয়,  ওই কবচ হারানোর কথা।বাসন্তী এত কবচ তাবিজ কোনদিন বিশ্বাস করেনি। বরং কেউ মানলে বলতো,ও সব মনের দুর্বলতা। কিন্তু ছেলের ব্যাপারে ও নিজেই এখন বড় বেশি দুর্বল,তাই মনে করছে  কবচ ছিলো ওর রক্ষা কবচ। সেটা হারিয়েই এমন সব দুর্ঘটনায় পড়ছে, না হলে পরপর এত ঘা খাবে ক্যানো। সেই থেকে ওনার একটা কাজও বেড়েছে, যত কপালজোরে বেঁচে যাওয়া, হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার খবরই খবরের কাগজে নিয়মিত খুঁজে খুঁজে পড়েন।আর মনের কোনে কোথায় যেন আশা রাখেন হয়তো ওটা ফিরেও পাবেন।   

আজ সকালে কিন্তু পরিষ্কার  দেখেছিলেন,একজন টোটোওলা কবচটা ওর টোটোতে পেয়েছে,সে অনেককে বলেছে,যার হয় যেন সে ওর কাছ থেকেনিয়ে যায়। কেননা,ও নিজে এসব খুব মানে,তাই ওর মনে হয়েছএসব জিনিস যার যার তার তারভালো।খুঁজে খুঁজে এবাড়িতে এসে্ছে,কেননা ওরমনে হয়েছে, হ্যাঁ বেশ কদিন আগে এ বাড়ি থেকেই তো দুপরে ভাড়া নিয়েগিয়েছে,তাই। কবচটা বাসন্তীকে দেখাতেই চিনতে পারে, এটা সেই কবচ। তাই দ্বিরুক্তি না করে বলে, হ্যাঁ এটা আমার ছেলের। এটাদিয়ে আমার খুব উপকার করলে। তুমি বস বাবা, একটু মিষ্টিমুখ করে যাও। এই বলে মিষ্টি আনতে ভেতরে  যাচ্ছেন এমন সময় চাঁপাটা ডাকলো যে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো।

  চাঁপা যখন বলছে,ও দিদা ওঠো, তখন উনি প্লেটে মিষ্টি সাজাচ্ছেন,গ্লাসে জল ভরছেন,আর বলছেন, আসছি আমি, একটু বসো।  আর ভাবছেন, কে বলে, হারিয়ে গেলে জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না,এই তো পাওয়া গেলো। এবার ছেলেটাকে জোর করে বলতে হবে, এটা তুই খুলবি না গলা থেকে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি, মা এর আদেশ, ব্যাস। 

এখন ভাবছেন, কত্ কি তো সম্ভব হয়,ঘুমের মধ্যে দেখা এই ভাবনাটা কি সম্ভব হবে না। আজ কাগজ পড়তে পড়তে সারাদিন এটাই মাথায় ঘুরতে থাকে, আর ভা বতে থাকেন যদি হয়।      

No comments:

Post a Comment