ইমিগ্রেশনের ওপারে
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
ফুন্টশোলিং ইমিগ্রেশন সেন্টারের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক মেয়ের ওপর। গাঢ় নীল কিরা পরা, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি। একবার চোখাচোখি হতেই মেয়েটি মৃদু হাসল। সেই হাসি অর্ণবের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে রইল। ভুটানে ঢোকার পরও সে মেয়েটিকে ভুলতে পারল না। কিন্তু ভাগ্য যেন অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। সন্ধ্যায় হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অর্ণব অবাক হয়ে দেখল— পাশের বাড়ির উঠোনে সেই মেয়েটি! মেয়েটিও তাকে দেখে হাত নাড়ল।
পরদিন কথা হল। তার নাম পেমা। তারপর একসঙ্গে কফি, পাহাড়ি রাস্তা, প্রার্থনা-পতাকার নিচে হাঁটা।
কয়েকদিনের মধ্যেই অর্ণব বুঝল— সে প্রেমে পড়েছে।
আর এক সন্ধ্যায় পেমা বলল,
— "আমিও তোমাকে ভালোবাসি।"
অর্ণবের মনে হল, পৃথিবীর সব পাহাড় যেন হঠাৎ ফুলে ঢেকে গেছে।
কিন্তু শেষ রাতে পেমা তাকে নিয়ে গেল পাহাড়ের মাথায় এক পুরোনো মঠের কাছে।
সেখানে একটি পাথরের ফলক।
ফলকে খোদাই করা—
"পেমা দর্জি (১৯৯৮–২০২২)"
অর্ণবের বুক কেঁপে উঠল।
— "এটা...?"
পেমা হাসল।
— "এটাই আমার কবর।"
অর্ণব স্তব্ধ।
পেমা আকাশের দিকে তাকাল।
— "চার বছর আগে পাহাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলাম। তারপর থেকে মাঝে মাঝে ইমিগ্রেশন সেন্টারে যাই।"
— "কেন?"
— "কারণ আমি জীবনে কাউকে ভালোবাসতে পারিনি।"
ঠান্ডা বাতাসে প্রার্থনা-পতাকাগুলো কাঁপছিল।
পেমা অর্ণবের হাত ধরল।
— "তুমি প্রথম মানুষ, যে আমাকে দেখেছ।"
তারপর ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো কুয়াশার মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠতে লাগল।
অর্ণব মরিয়া হয়ে তাকে আঁকড়ে ধরতে গেল। পারল না।
পেমা মিলিয়ে যাওয়ার আগে শুধু বলল—
— "সব প্রেম একসঙ্গে থাকার জন্য জন্মায় না। কিছু প্রেম জন্মায় মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য।"
পরদিন সকালে অর্ণব ভারতে ফিরে এল। ইমিগ্রেশন অফিসার তার পাসপোর্ট ফেরত দিতে দিতে বললেন,
— "মজার ব্যাপার জানেন? গত চার বছরে অন্তত সাতজন পর্যটক একই মেয়ের খোঁজ করেছেন।"
অর্ণব কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "তারপর?"
অফিসার হেসে বললেন,
— "কেউ তাকে আর খুঁজে পায়নি।"
অর্ণব কিছু বলল না।
কারণ তার শার্টের পকেটে তখনও রাখা ছিল পেমার দেওয়া ছোট্ট নীল প্রার্থনা- পতাকা—
যেটা অসম্ভব হলে থাকার কথা নয়।

No comments:
Post a Comment