বর্ষা মেঘে ভেসে ভেসে/ যাই ছুটে মেঘ-পাহাড় দেশে
গৌতমেন্দু নন্দী
"মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর
মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়
ব্যাকুল হলে দিস্তা......."
চারচাকা "আই-টেন" গাড়িটি খাপরাইল মোড় থেকে মিরিকের দিকের রাস্তায় চলতে চলতে শিমুল বাড়ি এসে মিরিকের রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে রোহিনী র দিকে বাঁক নিতেই দূর পাহাড়ের নিসর্গতায় মুগ্ধ হয়ে গুনগুন করে গেয়ে ফেললাম উপরোক্ত চারটি লাইন। এমন মেঘলা দিনে পাহাড়ি পথে কুয়াশাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চলতে আমাদের ডুয়ার্স বাসীদের এর থেকে প্রাসঙ্গিক কথা ও সুরে সমৃদ্ধ গান আর কী হতে পারে!
কয়েক বছর আগেও পাহাড়ের কোলে অযত্নে পড়ে থাকা ছোট্ট জনপদ রোহিনী হয়ে কার্শিয়াং , দার্জিলিং যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই জনপদ রোহিনী আজ কার্শিয়াং-দার্জিলিং যাওয়ার সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয় পথের মাঝে এক জনপ্রিয় পাহাড়ি জনপদ। বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন হোমস্টে, হোটেল ও রেস্তোরাঁ নিয়ে দিন দিন জমজমাট হয়ে ওঠা এই রোহিনী এখন কার্সিয়াং, দার্জিলিং পর্যটকদের কাছে রাত্রি যাপনেরও ঠিকানা হয়ে উঠছে। রোহিনী লেক এবং রোহিনী ঝোরা (ওয়াটার ফলস্) ইতিমধ্যেই বেশ পর্যটক প্রিয় হয়ে উঠেছে।
বর্ষায় পূর্ণরূপে ও সশব্দ গর্জনে পাহাড়ের মাথা থেকে আছড়ে পড়ছে রোহিনীর এই জলপ্রপাত। চড়াই পথের পাশে নজরকাড়া এই দৃশ্যকে পাশে রেখে পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পথ ধরে যখন কার্শিয়াং ঢুকছি তখন বাঁদিকে পাহাড়ের কোলে শহরের নাগরিক চিত্র প্রায় পুরোটাই ভাসমান মেঘের আড়ালে। কার্শিয়াং ঢুকতেই দৃশ্যমান সেই বহু দেখা উঁচু টাওয়ারটির প্রায় পুরোটাই ভাসমান মেঘের আগ্রাসনে। শীর্ষ দেশের কিছুটা অংশের সাথে মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতেই কার্শিয়াং স্টেশনের কাছে চলে এলাম। স্টেশনের ব্যস্ততাকে পাশে রেখে একটু এগিয়েই দার্জিলিংএর দিকের হিলকার্ট রোড ছেড়ে ডানদিকে পাহাড়ি চড়াইপথ ধরলাম। বৃষ্টি, যানজট আর সংকীর্ণ পথের প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়েই আমার গাড়ির চালক শান্ত স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সাবধানে উঠতে লাগল ডাউহিল পাহাড়ের দিকে। শহর ছেড়ে নির্জনতার দিকেও বাইক, স্কুটার আর চার চাকার তীব্র যানজটে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাপথ বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! আর সময়ের সাথে সাথেই নগরায়নের কোপে উধাও দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। কংক্রিটের জংগল এই পথেও দেখতে পাব ভাবিনি। কার্সিয়াং থেকে প্রায় দশ-বারো কিঃমিঃ এই খাড়া পথের অর্ধেকের বেশি পথ অতিক্রম করার পর অবশেষে সেই কাঙ্খিত প্রকৃতির সন্ধান পেলাম। কংক্রিটের জংগল উধাও হয়ে দুই পাশে আবির্ভূত হতে লাগলো ফার,পাইনের প্রত্যাশিত সবুজ প্রকৃতি! মাঝে মাঝে ঝুলন্ত মেঘের দল এসে কেড়ে নিচ্ছে সেই সবুজতা। তখন মনে হচ্ছে যেন এক মায়াবী সবুঝ-ধুসরের জগতে প্রবেশ করছি। যত এগোচ্ছি ততই পাইন-ফার আর দোদুল্যমান মেঘের খুনসুটি যেন বাড়তে লাগল আর গ্রাস করতে লাগল এক সবুজ নৈঃশব্দ্য। ঝিরঝির বৃষ্টি, নির্জন-নিস্তব্ধতার মধ্যে চারপাশের পাইনের জংগল এক মায়াবী রহস্যময় হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম এইজন্যই কি ডাউহিল "হন্টেড প্লেস"?! এই গা ছমছমে ভৌতিক পরিবেশের জন্যই কি এই পাহাড়ি এলাকা নিয়ে এতো প্রচলিত গল্প!
কার্শিয়াং থেকে প্রায় ২০০০ ফুট এই উচ্চতায় একসময় নাকি স্থানীয় ভাষায় "ডাও" নামে কোন পাখির ডাকে জায়গাটি মুখরিত থাকত। সেই "ডাও"থেকেই নাকি এই জায়গার নাম "ডাওহিল" বা "ডাউহিল"। মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশার এই রহস্যাবৃত পরিবেশের মধ্যেই দেখলাম এখানকার বিখ্যাত সরকারী স্কুল---ডাউহিল উচ্চবিদ্যালয়। শিল্প-স্থাপত্যে দৃষ্টিনন্দন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মেয়েদের জন্য। এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও এর কাছেই ছেলেদের জন্য তৈরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান "ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাইস্কুল"-এ বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যার নেপথ্যে ও সেই মনগড়া ভৌতিক গল্প। এই অপপ্রচার কারীদের রুখতেই নাকি এখন এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
রহস্যময় এই পাহাড়ি পরিবেশের আলোছায়া পথ ধরে টিকিট কেটে ঢুকে গেলাম পাইন জঙ্গলের আরণ্যক গভীরতায়। ঘন পাইনের অরণ্য পথ ধরে মাথার উপর ঝুলন্ত মেঘদের নিয়ে প্রায় পুরোটাই চড়াই পথে দুই কিলোমিটার অরণ্য পথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছোলাম আরও গভীর নিবিড়তায় এক পার্কে। প্রায় জনশূন্য সেই উদ্যানেও দেখলাম "সেল্ফি জোন" নীল রংয়ের বড় বড় অক্ষর ব্লকে লেখা সেই চিরপরিচিত শব্দবন্ধ --" I LOVE DOWHILL.."--আজকাল প্রায় সমস্ত পর্যটন স্থলেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী,---এই "ভালোবাসা"র চিহ্নটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। গা ছমছমে আবহের মধ্যেও এই সেল্ফি জোন দেখে কিছুটা " জনপদের আলো " যেন খুঁজে পেলাম।
পাইন ফরেস্টের ঘন অরণ্যে দিনের বেলাতেও কুয়াশাময় অকাল সান্ধ্য নির্জনতায় স্বাভাবিক ভাবেই অরণ্য পথ হয়ে যায় "ডেথ রোড" বা মৃত্যু উপত্যকা।খুব অনায়াসেই তৈরি হয়ে যায় গা ছমছমে "স্কন্ধ কাটা" ভূতের গল্প বা "রক্ত চোখ"এর ভীতি প্রদর্শন ! "ডাউহিল" বা "মর্গান হাউস" এর "টি আর পি" এতে বাড়ে বৈ কমে না। পাইন,ফার, দেবদারু ঘেরা এক অসাধারণ বিস্তীর্ণ পাহাড়ি সবুজ পরিসরের নির্জনতার বিজ্ঞাপন থেকে কেন এগিয়ে থাকবে ভয়,সংস্কার যুক্ত মিথ্যে ভৌতিক গল্পের কাল্পনিক "মিথ"?! সত্যিই ভাবতে হয়!
ফেরার পথে এলাম বর্তমানে কার্শিয়াংএর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্ট ---" হনুমান টপ"এ।
২০২১-এ এখানে নয়াবস্তি এলাকায় চা বাগানের মধ্যে হনুমান জয়ন্তী তে জি. টি. এ . দ্বারা নির্মিত হয় ৪০ ফুট উঁচু বিশাল হনুমানের মূর্তি। এই মূর্তি ঘিরেই এই উচ্চতায় এই ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে পুরো কার্শিয়াং এর "প্যানারোমিক ভিউ" অনবদ্য! চারপাশে বিস্তীর্ণ চা বাগান যেন প্রাকৃতিক "গ্যালারি"। পেছনে প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা কার্শিয়াংএর রংবেরং এর সারি সারি অসংখ্য ঘরবাড়ির অনবদ্য ল্যান্ডস্কেপ। মাঝে মাঝে সেই ক্যানভাস ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে ভাসমান মেঘ। বাগানের বুক চিরে মসৃন পিচ রাস্তা যেন উপর থেকে নিচে এঁকে বেঁকে নেমে যাওয়া কোন বিশাল পাহাড়ি পাইথন। যার মাথার উপর দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে উড়ে যাচ্ছে বর্ষা মেঘের দল। অসাধারণ এই প্রাকৃতিক কোলাজকে সঙ্গে নিয়ে সেই পথ ধরেই নেমে এলাম কার্শিয়াং-এর সমতলে। ততক্ষণে মেঘমুক্ত আকাশে বেলা শেষের আলোয় আবার উদ্ভাসিত সেই চিরচেনা কার্শিয়াং নাগরিক চিত্রের ব্যাকড্রপ চিত্রাভাস।







No comments:
Post a Comment