Tuesday, August 4, 2026


 




স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীন মনীষা

দেবযানী চক্রবর্তী


আজ স্বাধীনতা দিবস l ভোর ছটায় উঠে পড়েছে মালিনী। স্কুলে যেতে হবেl সকাল আটটার মধ্যে পৌঁছাতে হবেl  হেডমাস্টার মশায়  ফ্ল্যাগ তুলবেনl  স্টুডেন্টরা ড্রিল করবে বিভিন্ন দেশাত্ববোধক গানের তালে তালেl মেয়েরা সুস্মিতা ম্যাডামের কাছে প্রায় এক মাস ধরে নাচের প্রশিক্ষণ নিয়েছে টিফিন পিরিয়ডে l  মালিনী দুটো ছাত্রকে বক্তব্য তৈরি বলার জন্য গাইড করেছে l   মোটামুটিভাবে ওরা তৈরি l  কিন্তু আজ  যেন  আকাশের মুখ ভার l  আকাশের গায়ে  কোন ছোট বাচ্চা মনে হচ্ছে  যেন ছবি  আঁকতে আঁকতে  দোয়াত ভর্তি কালো ধূসর কালি ছিটিয়ে দিয়েছেl  সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে মালিনী পৌঁছে গেল স্কুলে l  আজ  সাদা ধবধবে   সোনালী জরির তাঁতের শাড়ি পড়েছে l  শাশুড়ি মায়ের শাড়ি l  আজ প্রায় সব দিদিমনি সাদা শাড়ি পড়ে এসেছেন l  তাই পড়া হয় অবশ্য ১৫ই আগস্ট ২৩ শে জানুয়ারি আর ২৬ শে জানুয়ারিতে l 

অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল ঘড়ি ধরে সময় মিলিয়েl   স্কুলের খোলা মাঠে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে l   প্রত্যেকের গায়ে আজ সাদা ইউনিফর্ম , হাতে সাদা সবুজ গেরুয়া রং মিলিয়ে ব্যান্ড পরা l  এত সুন্দর লাগছে বাচ্চাদের দেখতে !  একে তো ভোরবেলা সবাই এসেছে l  ঘুম থেকে ওঠার রেশ ওদের চোখে মুখেl  মনে হচ্ছিল সমস্ত মাঠ জুড়ে যেন সাদা বেলি টগর ফুল ফুটে আছেl  অনুষ্ঠান চলছেl মেয়েরা গান করছে -- "  এই দেশ এই দেশ আমার এই দেশ " l ঠিক তখনই কানের কাছে একটা মিষ্টি  রিন রিনে গলায় " ম্যাডাম " ডাকটা শুনতে পেল। মুখ তুলে তাকাতেই দেখল মনীষা, প্রাক্তন ছাত্রী l  দুবছর আগেই ক্লাস টুয়েলভ পাস করেছিল l


মনীষার  চেহারায় যেন এক  ইউরোপিয়ান মেয়ের ভারতীয় সংস্করণl গায়ের রঙে গোলাপি আভা, মুখমন্ডল ছোট কিন্তু চোখ মুখের কাঠামোতে অসম্ভব তীক্ষ্ণতাl কোমর ছাপিয়ে চুল দুই বেনিতে আবদ্ধ l  ছিপ ছিঁপে লম্বা শরীরের মধ্যে চোখ দুটিতে এক অজানা করুন বিষন্নতা l পরে মালিনী শুনেছিল ওর বাবা ওর  /  বছর বয়সেই ওকে আর ওর মাকে ছেড়ে দ্বিতীয় বিবাহ করেছে l  মনীষার মা সিঙ্গেল প্যারেন্ট হয়েই ওকে মানুষ করছেনl  সকালে এক বাড়িতে রান্না করে তারপর চলে যান এক চা পাতার গোডাউনে l সেখানে চা পাতা প্যাকেটে ভরার কাজ করেন যত প্যাকেটে চা  ভরতে পারবেন তত টাকা পাবেনl  যখন যখন টাকার খুব প্রয়োজন হয় মনীষাও চলে যায় মায়ের সাথে চা পাতার প্যাকেট ভরার কাজ করতে l  মাধ্যমিক পাস করবার পরই ওর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে যাচ্ছিলl  পরবর্তীতে মালিনী আর পরিতোষ স্যার  বই পত্র,  ইউনিফর্ম, এডমিশন ফ্রি এই সমস্ত কিছু দিয়ে ওর ইলেভেন টুয়েলভের পড়াশোনা  চালিয়ে যেতে সাহায্য করেl  পরিতোষ স্যার তো বাড়িতে ওকে প্রায় টিউশন পড়ানোর মতো করে ইতিহাস  , রাষ্ট্রবিজ্ঞান ,  এডুকশন বিষয়  গুলি পড়িয়ে দিয়েছিলেন l  এরপর এলো ওর মূল সংগ্রামী সময়  l মোটামুটি রেজাল্ট করে মনিষা টুয়েলভ পাস করে গেলl এইবার ওর মা গোঁ ধরে বসলেন মনীষার বিয়ে  দেবেন টুয়েলভ পাস মানে অনেক পাস করে ফেলেছে মেয়ে l 


 মনীষার মাকে  স্কুলে  ডেকে পাঠিয়ে আলাদা করে  ওকে না পড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করল  মালিনী l ওর মা বললেন কলেজে ওকে পড়ানোর ভর্তি করার মত আর্থিক  সামর্থ তার নেই l তাছাড়া এত বড় মেয়েকে একলা বাড়িতে রাখতেও ভয় পাচ্ছেন l  সুতরাং সহজ-সরল সমাধান  ---  শুভ বিবাহl  মনে মনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লো মালিনী কারণ মনীষা অত্যন্ত  শান্ত , ভদ্র, মার্জিত,  সাত  চড়ে রা  না কাটা মেয়ে l  তাছাড়া ওর আর্ট এন্ড ক্রাফট এর হাতটাও অসাধারণ l স্কুল-এ   বছরে দুবার দেয়াল পত্রিকা বের হয়| আর ওই পত্রিকার অলংকরণ ,  সাজ সজ্জায় মনীষা  অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের গাইড করে ,  অপূর্ব ছবি আঁকে  মেয়েটিl    হেন একটা গুণী মেয়ে কার হাতে গিয়ে যে পড়বে !  ভাবতে ভাবতে মালিনি শিউরে ওঠেl  ফুল শুধু সুন্দর হলেই তো হয় না  তাকে যথাযথ ভাবে ধারণ করবার জন্য ফুলদানিটারও তো শক্তপোক্ত সুন্দর হওয়া দরকার। 


 এবার আবারো শুরু হল মনীষার মায়ের মগজ সাফাই অভিযানl মালিনী আর পরিতোষ স্যার ওর মাকে আশ্বস্ত করলেন মনীষার  কলেজে  ভর্তি আর বইপত্রের জন্য চিন্তা না করতে l  মনীষা   বলল যে পলিটেকনিক কলেজে  চান্স পেলে  ভর্তি হলে কেমন হয় !  চিন্তাভাবনাটা খারাপ নয় কারণ শিলিগুড়ি একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল শহর ,এখানে যদি টেকনিক্যাল ডিগ্রি  থাকে তবে চাকরি পেতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় l মালিনী ওকে চেষ্টা করতে বলল l  এক মাস পর মনীষা এসেছিল মালিনীর কাছ l   পলিটেকনিক কলেজে চান্স পেয়ে গেছে l   খুব খুশি লাগছিল সেদিন ওকে দেখতে l  পরবর্তীতে মাঝে মাঝে কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি ছুটি হলে স্কুলে এসে মালিনীর সঙ্গে দেখা করে যেতl  শার্ট প্যান্ট টাই পরা পলিটেকনিক কলেজের ইউনিফর্মে ঝকঝকে মনীষাকে দেখতে  ওর কি ভালোই যে লাগতো!   তারপর মনীষার স্কুলে আসাটা কমে যেতে লাগলো l 


মালিনী মাঝে মাঝে মনীষার কথা ভাবতো, আসলে স্কুলে পড়াকালীন মনীষা যেন ওর ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠেছিল |দোতলা ক্লাস থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে জল খেতে এসে   ওর কাজ ছিল টিচার্স রুমে একবার উঁকি মারাl মালিনীর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই একটা মৃদু হাসি হেসে আস্তে করে চলে যেত l  যাইহোক মালিনীর তখন মনে হতো  , "  বেধো না আমায় ফুলমালা ডোরে " --  কারণ একদিন এই গোটা স্কুলটার সঙ্গেই যে ওর বন্ধন ছিন্ন  করে চলে যেতে হবে। 


 তারপর দীর্ঘ সময় পর এই স্বাধীনতা দিবসের দিন মনীষা দেখা করতে এসেছে ওর ম্যামের সঙ্গে, মালিনী কৃত্রিম বকা দেবার ভঙ্গিতে বলে উঠল এতদিন আসেনি কেন ওর সঙ্গে দেখা করতে? মনীষা একটু অপ্রস্তুত হয়ে , একটু ইতস্তত করে বলে উঠল যে এখন এক ফটোগ্রাফি কোম্পানিতে পার্ট টাইম জব করছে  l  কলেজে ওর স্পেশালাইজেশন ড্রোন ক্যামেরা বিষয় নিয়ে  আর ওর  সহৃদয় স্যার এক চেনা জানা  কোম্পানিতে ওর এই চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন l  কলেজে ক্লাস শেষ হলে মনীষা চলে যায় ওই অফিসে l  ওখানে কাজ 'রে মনীষা একটি ড্রোন ক্যামেরাও কিনে ফেলেছে l  ব্যাংকে একাউন্ট তো আগেই ছিল,  এখন একটু আধটু সঞ্চয় শুরু করেছে l  মাকেও সংসারের খরচ দেযl  এক নিঃশ্বাসে বলে গেল মেয়েটা ওর বর্তমান জীবনের ইতিবৃত্ত l  মালিনী কি বলবে বুঝতে পারছে না l  যেন স্বাধীনতা দিবসে   এক দুর্বল মেয়ের সবল  , স্বাধীন হয়ে ওঠার গল্প সামনের টাঙ্গানো প্রজেক্টরের স্ক্রিনে এক লাইভ হাই রেজোলিউশনে টুকরো টুকরো ছবিতে ডিসপ্লে হচ্ছে।


মালিনী আর থাকতে পারল না  l দিদিমণি -- ছাত্রীর মধ্যে কার হাইফেনটা মুছে দিয়ে মনীষাকে জড়িয়ে ধরলl    নিজেও আজকের মালিনী হয়ে উঠতে অনেক সংগ্রাম করেছে। ডুয়ার্সের এক প্রত্যন্ত  মফস্বল  থেকে কখনো ডেলি প্যাসেঞ্জারী, আবার কখনো মেসে, হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা শেষ করে  আজ চাকরি করছে l  মনীষার মধ্যে যেন নিজের সংগ্রামের একটা ছায়া দেখতে পায় l

প্রোগ্রাম শেষের পথেl  মনীষাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করল মালিনী l  সফলতা অনেক সময়  পদস্খলনে   স্ফুলিঙ্গের কাজ করেl  যথার্থ অভিভাবকের মতো ওর এই প্রিয় ছাত্রীটিকে সাবধান করতে  ভুললো নাl প্রত্যেকবার স্বাধীনতা দিবস স্কুলে কাটিয়ে যখন বাড়ি ফিরে তখন ওর মধ্যে এক অদ্ভুত বিপরীতমুখী দুই অনুভূতির যেন ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়, একদিকে শহীদদের  আত্মত্যাগের প্রতি ওর শ্রদ্ধা,  কষ্ট আর অন্যদিকে এক স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার আনন্দ l   মনীষার সংগ্রাম অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আজ এক মধুময় অনুরণনের যেন সৃষ্টি করেছে   ওর মধ্যে।  মালিনীর আজকের বাড়ি ফেরা  --  এক পরিতৃপ্ত মেন্টরের বাড়ি ফেরা যে পূর্ণ উদ্যমে আগামীতে আবারো কোন মনীষাকে আকাশ প্রদীপ জ্বালাতে সাহায্য করবে।




No comments:

Post a Comment