দেশ
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য
“ উঃ, আবার সেই জগঝম্প নাচাগানা শুরু করল? দিনটার কোনও মূল্যই বোঝে না!”, অসহ্য বিরক্তিতে সতেজে গর্জে উঠলেন নমিতাদেবী।
বহুকালের প্রিয় বান্ধবীর ক্রোধান্বিত প্রতিক্রিয়ায় সামান্য হাসলেন রমলা মিত্র। তাঁর এই দোতলা বাড়িটির গা ঘেঁষে ডানদিকে পর পর তিন ঘর গেঁয়ো হিন্দুস্থানীর বাস। ঠিক পেছনেই দু’ঘর বাঙালি। দিন আনি দিন খাই সংসার। একই রকমের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণেই হয়তো সম্পূর্ণ পৃথক সংস্কৃতির এই দুটি জাতের মধ্যে আজ আর কোনও ব্যবহারগত পার্থক্য নেই। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসের কদিন আগে থেকে একসাথে রাস্তায় বসে রঙিন কাগজের শিকলি আর জাতীয় পতাকা তৈরি করে ওই পাঁচ ঘরের বাচ্চা বুড়ো মিলে। তারপর রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে। যৎসামান্য যা কামায় তাই দিয়ে দিনের দিন ভোর থেকে বক্স ভাড়া করে কানফাটানো শব্দে চড়াদাগের ভোজপুরী গান বাজিয়ে রাস্তার ওপরেই মহানন্দে নাচানাচি করে। এই শব্দ ও দৃশ্য দূষণ তাঁর কাছেও দুঃসহ। তবু ওদের কিছু বলেন না রমলাদেবী। সত্যি বলতে কী, এও তো এক ভারতবর্ষই!
“ কেন, ওরা ওদের মতো করে বোঝে তো!”, স্মিত হেসে উত্তর দেন রমলাদেবী,” এ ভারতবর্ষ কি শুধুই তোর আর আমার? স্বামীজীর কথাগুলো ভুলে গেলি?”
নমিতাদেবী চোখ কুঁচকে বান্ধবীর মুখের দিকে তাকান। আঃ! কেন যে অপ্রিয় কথাগুলো ঠিক সময়মতো ধরিয়ে দেয় রমু!
“ মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই!”
“ঠিক!”, উজ্জ্বল হাসির ঝিলিক ঠিকরে ওঠে রমলাদেবীর দু’চোখের তারায়, "এই গোটাটা নিয়েই তো আমাদের দেশ, তাই না! স্বাধীন দেশ। স্বতন্ত্র দেশ। আমার দেশ।”

No comments:
Post a Comment