স্বাধীনতার রং
দেবব্রত দত্ত
পনেরোই আগস্টের সকালটা অন্যসব দিনের মতো ছিল না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উঠোনে তখন থেকেই ব্যস্ততা। বাঁশের খুঁটিতে তেরঙ্গা বাঁধা হচ্ছে, মাইক থেকে ভেসে আসছে— “ও আমার দেশের মাটি…”। সবাই উৎসবের পোশাকে এলেও, বারো বছরের তিথির চোখে ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা।
তিথির বাবা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। গত বছর সীমান্তে গোলাগুলির সময় তিনি শহিদ হন। তারপর থেকে স্বাধীনতা দিবস মানেই তিথির কাছে শুধু পতাকা নয়, বাবার মুখ, বাবার কণ্ঠ, বাবার হাতের উষ্ণতা।
স্কুলে পতাকা উত্তোলনের আগে প্রধান শিক্ষক বললেন, “আজকের দিনটা শুধু আনন্দের নয়, ত্যাগের দিনও। যাঁরা দেশের জন্য নিজেদের সবকিছু দিয়েছেন, তাদের প্রতিও আমাদের কৃতজ্ঞতা।”
এই কথা শুনে তিথি ধীরে ধীরে মঞ্চের সামনে এগিয়ে গেল। ছোট্ট হাতে ছিল বাবার ছবি। সেটি বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, “বাবা, তুমি বলেছিলে পতাকা কখনও মাটিতে পড়তে দিও না। আমি তোমার কথা রাখব।”
ঠিক তখনই জাতীয় পতাকা আকাশে উঠল। হাওয়ায় তেরঙ্গা উড়তে লাগল। তিথির মনে হলো, ওই পতাকার প্রতিটি রঙে বাবার হাসি মিশে আছে। তার চোখ বেয়ে জল নামল, কিন্তু সে কাঁদল না। মাথা উঁচু করে স্যালুট জানাল।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মা চুপচাপ চোখ মুছলেন। সেই মুহূর্তে তিথি আর শুধু এক শহিদের মেয়ে নয়— সে স্বাধীন দেশের এক ছোট্ট, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। যে শিখে গেছে, স্বাধীনতা শুধু পাওয়া নয়, হৃদয়ে বয়ে নিয়ে চলার নাম।

No comments:
Post a Comment