Thursday, February 6, 2020





ডিটেনশান  

        মৌসুমী চৌধুরী 

         অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকায় নাম ছিল না আমাদের বেলামাসীর।
বেলারানী কর। আমাদের বাড়ির বহু দিনের রাঁধুনি। পাড়ার ডাকসাইটে ঝগড়ুটে। প্রথমে বিষয়টাকে মোটেও পাত্তা দেন নি তিনি। খচর খচর করে পান চিবোতে চিবোতে, রান্নায় ফোঁড়ন দিতে দিতে আপন মনেই বকবক করতেন,
   ---"অতই সস্তা রে! আমারে বিদেশী ঠাওরানো? আমারে চিনস না তো। আমি হইলাম গিয়া ত্রিপুরার কুমারঘাটের হরিমোহন সূত্রধর আর মঞ্জু সূত্রধরের মাইয়া। কাঠের মিস্তিরি হিসাবে আমার বাবার নাম আছিলো।"
      বেলামাসীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অসমের গোয়ালপাড়ার মুদী দোকানী হরিশঙ্কর করের।  কিন্তু তাঁর স্বামী অকালে মারা যান। তারপর বহু কষ্টে বাড়ি-বড়ি রান্না করে, বাসন মেজে, কাপড় কেচে ছেলেকে বড় করে তোলেন তিনি। যাইহোক, পাড়ার মুরুব্বীদের পরামর্শে ফরেনার্স ট্রাইবুন্যালে ১২০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্ব দাবী করে আবেদন জানালেন বেলা মাসী। 
              কিন্তু আচমকাই ২০১৭ সালে বেলা মাসীর  নামে ট্রাইবুন্যালের লোটিশ আসে। তাতে লেখা বেলারানী কর, স্বামীর নাম হরিমোহন কর। কিন্তু বেলারানী তো হরিমোহন করের স্ত্রী নন। এটা জানানোর পরই মাসীর রেহাই পাবার কথা ছিল । অথচ ট্রাইবুন্যাল তাঁকে বিদেশি ঘোষণা করে ডিটেনশান ক্যাম্পে পাঠালেন। কারণ বেশ গুরুতর। বেলামাসীর বাবার ১৯৭১ সালের জমির দলিলে দেখা যাচ্ছে বাবার নাম হরিহর সূত্রধর। কিন্তু আধার কার্ডে বাবার নাম হরিমোহন সূত্রধর, এটা দেখে ট্রাইবুন্যাল বাবা-মেয়ের সম্পর্ক মানতে চান নি।
                 ক্যাম্পে ঢোকার সময় ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাঁউ মাউ করে কেঁদে ফেলছিলেন আমাদের জাঁদরেল, মুখরা বেলামাসী। তারপর মাসীকে ভারতীয় প্রমাণ করার জন্য দু'বছর ধরে বহু লড়াই চালায় তাঁর ছেলে টুবলু। হাই- কোর্টের দারস্থ হয় সে। হাইকোর্টের বিচারপতি মামলাটিকে ফের খতিয়ে দেখতে ট্রাইবুন্যালেই ফেরত পাঠান। নির্দেশ দেন, ট্রাইবুন্যাল যেন বেলামাসীর মা-মেয়ের সম্পর্কটাকে খতিয়ে দেখে।
           বেলামাসীর মা, আমাদের মঞ্জু দিদা। মেয়ের বদলে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে রাঁধতে আসতেন। ট্রাইবুন্যালে দাঁড়িয়ে তিনি স্বীকোরক্তি দিলেন বেলারানী কর তাঁরই মেয়ে।তাঁর মেয়ের বাবার নাম মৃত হরিমোহন সূত্রধর।  তারপরই ট্রাইবুন্যাল বেলামাসীকে ভারতীয় বলে মেনে নিয়ে ডিটেনশান ক্যাম্প থেকে মুক্তির নির্দেশ দেন। সরকারী নথিতে হরিমোহন সূত্রধর, হরিশঙ্কর কর, হরিহর সূত্রধর ইত্যাদি নাম-বিভ্রাটের ফাঁসে ততদিনে কেটে গিয়েছিল দু'বছর। 
       তারপরে  মঞ্জু দিদা আর টুবলু ডিটেনশান ক্যাম্প থেকে মাসীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিল। কিন্তু সেই খচর খচর করে পান চিবুনি, ঝগড়ুটে বেলা মাসী তাঁদের মুখের দিকে কেমন যেন  ফ্যাল ফ্যালে দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। যেন এক পাথরের মূর্তি! ভারতীয় বলে প্রমাণিত হয়ে যেন অনেক বদলে গিয়েছেন আমাদের ঝগড়ুটে বেলা মাসী। ডিটেনশন ক্যাম্পের ডাক্তার জানিয়ে দিলেন মাসীর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তার চিকিৎসাও চলছিল। 


             পাড়ার নিন্দুকেরা বলাবলি করতে লাগল, আসলে পরনিন্দা  আর ঝগড়া  করতে না পেরেই বুড়িটার মাথার ব্যামো হয়েছে।



মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬







কুহেলিকা
স্বাগতম দে

বান্ধবীর বোনের জন্মদিন থেকে বাড়ি ফিরছি । মানিকতলা বাসস্টান্ডে চাটার্ড বাসটা থেকে নেমেছি সবে । ঘড়িতে সময় দেখলাম - কাঁটায় কাঁটায় পৌনে  এগারোটা । রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলোও ঝাঁপ ফেলে দিয়েছে । নির্জন চারিদিক । মাঝে মাঝে দু' একটা প্রাইভেট গাড়ি ছুটে যাচ্ছে । পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম একটু । নাহ্, যা ভেবেছি ঠিক তাই । না রিকশা স্ট্যান্ডে কোনো রিকশা আছে , না টোটো স্ট্যান্ডে কোনো টোটো ।
শুনশান রাস্তা । রিকশা বা টোটোর জন্য আর কোনো অপেক্ষা করব না । হাঁটাই লাগাব যখন ভাবছি তখন হঠাৎ করে কোথা থেকে যেন একটা রিকশা সামনে এসে দাঁড়াল । 
"বাবু যাবেন ?" , জিজ্ঞেস করল রিকশাওয়ালা ।
আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম, এহেনাবস্থা । 
জিজ্ঞাসা করলাম, "ব্রাহ্মণ পাড়া যাবে ?"
"যাব বাবু । বসুন ।", বলল রিকশাওয়ালা ।
আমিও সত্তর উঠে পড়লাম রিকশায় । "ভাগ্যিস তুমি এলে, নইলে এতটা রাস্তা আমাকে হেঁটেই যেতে হত ।"

"চন্দ্রভিলায় একজনকে নামিয়েই ফিরছিলাম । আপনাকে দেখে এসে দাঁড়ালাম ।"
"ভালোই করেছ , নাও চলো ।"
রিকশাচালক প্যাডেলে চাপ দেয় ।
পৌষ মাস চলছে । গত ক'দিন ধরে সন্ধ্যে থেকে কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেছে এই দক্ষিণবঙ্গের হালিশহর নামের একটি মফসসল শহর । আজও তার ব্যতিক্রম নেই । ঘন কুহেলিকায় চতুর্দিক সাদায় সাদা হয়ে গেছে । তেমনি কনকনে ঠান্ডাও বইছে বাইরে । আমি ভালো করে গায়ে চাদরটা জড়িয়ে নিই ।

বাসস্ট্যান্ডকে বাঁ-পাশে রেখে নতুনপট্টির রাস্তা ধরল রিকশাওয়ালা । রিকশা চলেছে অতি মন্থর গতিতে । আর একটু এগোতেই বুঝতে পারলাম । রিকশা টানতে কষ্ট হচ্ছে চালকের । অতি কষ্টে যেন প্যাডেলে চাপ দিচ্ছে । আর অস্ফুট একটা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে লোকটার গলা থেকে ।
" কী হল, শরীর খারাপ লাগছে ?" , জিজ্ঞাসা করলাম আমি ।
"কিচ্ছু না বাবু" , অতি ধীর গতিতে প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে অস্ফুট স্বরে বলল লোকটা । রিকশা চলতে থাকে  ওইভাবেই, অতি মন্থর গতিতেই ।

মানিকতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে মোটামুটি বারো মিনিট লাগে আমার বাড়ি যেতে । কিন্তু সেই বারো মিনিটের রাস্তা কুড়ি মিনিট পার করে রিকশা এসে দাঁড়াল আমার বাড়ির সামনে । বিরক্তমুখে রিকশা থেকে নেমে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে রিকশাওয়ালার দিকে ভালো করে তাকালাম ।
শীর্ণ চেহারার মানুষটার মুখে-চোখে অসুস্থতার ছাপ ।
ভাড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলি, "তোমার কি শরীর খারাপ নাকি ?" 
"না বাবু, তেমন কিছু নয়, একটু জ্বর জ্বর মতন হয়েছে ।"
হঠাৎ কি মনে হল জানি না , লোকটার কপালে হাত দিতেই সচকিতে উঠলাম । 
"তোমার গায়ে তো ভালো জ্বর, এই নিয়ে রিকশা চালাচ্ছ , তাও শীতের রাতে , কীভাবে ? "

এবার আমার চোখে চোখ রেখে লোকটা বলল , "আমার একটা মাত্তর মেয়ে বাবু । নাম - বিতাসা ।"
আমি বললাম, "বিতাসা কি ?"
"বিতাসা মাঝি, ছয়ের কেলাস থেকে এবারে পেথ্থোম হয়ে সাতের কেলাসে উঠেছে বাবু । আজই রেজাল বেরিয়েছে । বাবু, না মেয়েটাকে খাওয়াতে পারি, না মেয়েটাকে ভালো কিছু দিতে পারি । যদিও ও কোনোদিন কিচ্ছুটি চায় না মুখ ফুটে । ও খুব বোঝে ওর বাপের কষ্ট ।" 
,বলে দু'চোখের জল মোছে রিকশাওয়ালা ।
আমিও ওর কাঁধে হাত রাখি । নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে রিকশাওয়ালা,  "পোতি বছর ওর সব বন্ধুরা কোথায় কোথায় বেড়াতে যায় । মেয়ে গল্প শোনে ওদের কাছে, ও-ও তো ছোটো, ওরও মন চায় যেতে । 
তাই এবার আমি ঠিক করেছি বাবু , সামনের শুক্কুর বার তো বড়োদিন , সেদিন ওকে বেড়াতে নিয়ে যাব কলকেতে । আমার তো অতো খেমতা নেই দূরে নিয়ে গে পাহাড়, সাগর দেখানোর । তাই বাবু ঠিক করেছি , কলকেতেয় নিয়ে গে শুক্কুর , শনি আর রোববার ঘুরিয়ে সব দেখাব ওকে - চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, কালীঘাট, ভিকটোরী, হাওড়া ব্রিজ, আর কী সব আছে দেখাব । শুনেছি বড়োদিনের সময় নাকি কলকেতেয় খুব জাঁক হয় । তা বাবু এসবের জন্য তো টাকা চাই । মাঝে তো আর দু'দিন বাকি বাবু । জ্বরেরে কষ্ট একটু আছে বটে বাবু কিন্তু মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে আমি এর চেয়েও হাজার গুণ কষ্ট সহ্য করতে রাজি ।"

টানা কথাগুলো বলতেই হাঁপাচ্ছিল লোকটা । একটু থেমে , "না, বাবু যাই ।"
বলতে বলতেই লোকটা রিকশায় চড়ে বসল এবং আলতো করে প্যাডেলে চাপ দিল ।
"যদি আর কোনো লোক দেখতে পাই" - বলতে বলতে শীতের রাতে ঘন কুহেলিকার মধ্যে যেন হারিয়ে গেল লোকটা ।



মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬







বসন্ত এসে গেছে

                               অমৃতা মৌয়ার


তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ক‍্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাল শ্রবণা। কিভাবে দেখতে দেখতে যে একটা মাস পার  হয়ে গেল। আজ ফেব্রুয়ারির ১লা তারিখ। এই মাসে ক‍্যালেন্ডারের গায়ে এই একটাই লাল কালি। মানে ছুটির দিন আর কি। সরস্বতী পূজো। যদিও এই লাল কালির ছুটিকে অভীর অফিস কিংবা মেয়ে রিদ্ধির স্কুল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেনা। তারা কর্ণাটকা স্টেট আর নিজস্বী ছুটি নিয়েই চলে। তবু প্রতিবার নতুন বছর পরার আগে থেকেই শ্রবণা বারবার বাড়িতে বলে রাখে দাদার অফিসের নতুন ক‍্যালেন্ডার যেন ওর জন‍্য রাখা হয়। আর দাদাও ঠিক নিয়মমত নতুন ক‍্যালেন্ডার ডায়েরি ছোটবোনকে কুরিয়ার করে দেয়। রিদ্ধি হেসে বলে,
-"কমন মা,সবার মোবাইলেই এখন ক‍্যালেন্ডার আছে। তবুও তুমি কেন যে এই ক‍্যালেন্ডার নিয়ে এত অবসেসড্ থাকো।"
কিছু বলেনা শ্রবণা। উত্তরে একটু হাসে শুধু। কি করে বোঝাবে সে মেয়েকে প্রত‍্যেক মাসের পাতা ওল্টালে যে নতুন ছবি আসে,পাতার গায়ে হাত বোলালে যে ছুটির দিনগুলো লেগে থাকে তার মধ‍্যে যে এক অকারন ভাললাগা জড়িয়ে আছে। বেশ কিছুদিন থেকেই মনের মধ‍্যে একটা ইচ্ছে গুনগুন করছিল শ্রবণার। সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে কথাটা বলেই ফেলল সে,
-"অভী তোমার মনে আছে...সরস্বতী পূজোর দিন তুমি আমাকে প্রোপোজ করেছিলে।"
অভী তখন মোবাইল নামক আস্ত দুনিয়াটাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। শ্রবণার কথা ওর কানে গেলও কিনা ঠিক বোঝা গেলনা। সে আবার বলল,
-"এই অভী,এবার সরস্বতী পূজোয় বাড়ি যাবে?"
এবার হাতে ধরা মোবাইল থেকে চোখটা সরিয়ে শ্রবণাকে এক ঝলক দেখল অভী। তারপর বিছনায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে বলল,
-"ক্ষেপেছ,সামনেই তোমার মেয়ের পরীক্ষা। ও এইসময় কোথাও যেতে রাজি হবে বলে তোমার মনে হয়।
-"আর যদি সে রাজি হয়..তবে যাবে,বলোনা।"
-"অফিসে ছুটি পাওয়াটাও তো চাপ ডার্লিং। প্রোজেক্টের অলরেডি প্রচুর চাপ আছে জানোতো।"
এবার বেশ একটু অভিমানী সুরেই বলে ফেলল ,
-"সে তোমার অফিস,রিদ্ধির এক্সাম এসব তো সারাবছরই লেগে থাকবে। সরস্বতী পূজোটাতো বছরে এই একবারই আসবে বলো। আর এই বছর দিনটাও পড়ে‌ছে সোমবার। জাস্ট দু'টো দিন ছুটি ম‍্যানেজ করলেই আমরা সরস্বতী পূজোটা বাড়িতে কাটাতে পারি। তাছাড়া রিদ্ধিও তো কখন দেখেনি সরস্বতী পূজো মানে যে আমাদের ওখানে একটা...একটা উৎসব। এ্যই চলোনা গো এবার...কি যাবে?"
একটা লম্বা হাই তুলে পাশ ফিরতে ফিরতে অভী  বলল,
-"আগে দেখ তোমার মেয়েকে ম‍্যানেজ করতে পার কিনা।
আই ডোন্ট থিংক শি উড বি রেডি টু গো।"
সেইতো...ঠিক কি বলবে শ্রবণা মেয়েকে। আর ক'টা সপ্তাহ বাদেই ওর ক্লাস সেভেনের পরীক্ষা। কোথায় মা হয়ে মেয়েকে বলবে আরও মাথা গুঁজে পড়তে,তা নয় উলটো বলবে দুদিন ছুটি নিয়ে সরস্বতী পূজো দেখতে যেতে। এসব শুনে মেয়েই বা কি ভাববে। সত‍্যিইতো এসব ছেলেমানুষীর কি কোন মানে হয়!
রিদ্ধি আর ওর বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির বাকি কাজ সেরে ব‍্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় শ্রবণা। এইদিকটাতে সুইমিংপুল প্লেগ্রাউন্ড থাকার জন‍্য সামনে অনেকটা খোলা আকাশ দেখা যায়। কাছেই কোন গাছ থেকে অনবরত একটা কোকিল ডেকে চলেছে। আশ্চর্য ব‍্যাপার যে আগে যখন একটা ছোট্ট শহরে থাকত সে সেখানে কখন কোকিলের এই ডাক শুনতে পেতনা। কিন্তু এই বিশাল মহানগরীতে কী সুন্দর কোকিল ডেকে যায় অবিরাম। তবু কেন জানি সেই বসন্তকালটাকে এখানে কোথাও খুঁজে পায়না শ্রবণা। কিন্তু এই সময় তার নিজের শহরের আকাশে বাতাসে রাস্তার মোড়ে স্কুলের করিডরে সব জায়গায় বসন্তকাল কেমন লেপ্টে থাকে। এখনও মনে আছে সরস্বতী পূজোর দিনকতক আগে থেকে স্কুলে তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। পূজোর দায়িত্ব,আলপনা কম্পিটিশন,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর তার সাথে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুদের সবচেয়ে জরুরি আলোচনা কে কোন শাড়ি পড়বে,কেমন সাজ হবে,কোথায় কোথায় যাওয়া হবে‌। এদিকে বাড়ি ফিরে শ্রবণা আলমারি থেকে মায়ের একটার পর একটা শাড়ি বের করে হুলুস্থূল কান্ড ঘটাত। মা বলত সরস্বতী পূজোর দিন হলুদ রঙের শাড়ি পড়তে হয়রে মেয়ে। কিন্তু সেবার শ্রবণা একটা নীল রঙের জামদানী পড়েছিল। সাথে টেরাকোটার ম‍্যাচিং গলার কানের আর একটা ছোট্ট টিপ। আর সেবারই তো অভী ওর বন্ধুদের সাথে এসেছিল ওদের স্কুলে। ওরা সব সেম ব‍্যাচ। পায়েল আর অলি অলরেডি অভীদের দুই বন্ধু সুমন আর শুভ্রর সাথে প্রেম করছে তখন। শ্রবণা আর অভীর তখনও চোখে চোখে কথা,অসম্ভব ভাললাগা। সবার সাথে যেতে যেতে শ্রবণা আর অভী একটু পিছিয়ে পড়েছিল। কিছুটা ইচ্ছে করেই।পাশে হাঁটতে হাঁটতে অভী আলতো করে  ছুঁয়েছিল শ্রবণার একটা আঙ্গুল। ওর নাম ধরে ডেকেছিল একবার। শ্রবণা মুখ তুলে তাকাতেই খুব ধীরে কাছে এসে বলেছিল,'ভালবাসি'। আর সাথে সাথে শ্রবণা শুনতে পেয়েছিল ওর বুকের ধুকপুকুনিটা হঠাৎ ভীষণ বেড়ে গিয়েছে। চারিদিক থেকে এক অদ্ভুত ভাললাগা ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বুকের ভিতরে কেউ যেন তানপুরায় সুর তুলে বেহাগ বাজিয়ে চলেছে অনবরত। এরপর কয়েক বছর দু'জনে চুটিয়ে প্রেম করে তারপর বিয়ে করে সেটেল্ড হয় ব‍্যাঙ্গালোরে। দিব‍্যি সুখে সংসার করছে দু'জনে। উইকেন্ডে শপিং,ডিনার,বছরে দু'বার ট‍্যুর। এখনও অভী যখন তখন জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দেয় শ্রবণাকে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বারবার বলতে থাকে আই লাভ ইউ। কিন্তু এখন আর নিজের বুকের ওই ধুকপুকুনিটা কেন শুনতে পাইনা শ্রবণা। আর তো সেই ভীষণ ভাললাগা লজ্জায় ওর ফর্সা মুখটা লাল হয়ে ওঠেনা। কিন্তু এখনো কী ভীষণ ভালবাসে সে অভীকে। আচমকা মোবাইলের শব্দে ঘোর কাটল শ্রবণার। দেখল স্ক্রীনে অভীর নাম ভেসে উঠছে। কলটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এল অভীর স্বর,
-"চেক ইওর মেল। আমার এখন একটা মিটিং আছে।উইল টক টু ইউ লেটার।"
ফোনটা কেটে অলস হাতে নেট অন করে মেলটা চেক করতেই একটা আনন্দের শিহরণ খেলে গেল সারা শরীরে।অভী ওদের তিনজনের ফ্লাইটের টিকিট পাঠিয়েছে... আগামী ১০ই ফেব্রুয়ারীর। আচ্ছা তার দু'দিন বাদেই তো সরস্বতী পূজো তাইনা!


সারা বাড়ি জুড়ে এখন সাজসাজ রব চলছে। বাড়ির সরস্বতী পূজো খুব সক্কাল সক্কাল সারা হয়েগিয়েছে। দোতালার ঘরে এখন ছোড়দির মেয়ে মিমি আর দাদার ছোটমেয়ে তুলির সাথে রিদ্ধি সাজগোজে ব‍্যস্ত। মিমি আর রিদ্ধি একই বয়সী। তুলি ওদের একবছরের ছোট। কিন্তু তিনটেই হয়েছে একে অপরের ন‍্যেওটা। ওরা সব বন্ধুরা মিলেই আজ বেরনোর প্ল‍্যান। রিদ্ধিও যাবে ওদের সাথেই। শ্রবণা মেয়ের জন‍্য কাঁচা হলুদ আর সবুজে একটা বুটিকের শাড়ি কিনেছে।সাথে মানানসই অর্নামেন্টস্। রেডি হয়ে তিন স‌রস্বতী আরও একঝাঁক সরস্বতীর সাথে হৈহৈ করে বেড়িয়ে পড়তেই ব‍্যালকনিতে এসে দাঁড়াল শ্রবণা। চারিদিক কেমন ঝলমল করছে মিঠে হলুদ আলোতে। শ্রবণা জোরে জোরে শ্বাস টেনে বুকে ভরে নিল বসন্তের মিষ্টি গন্ধ। একদল মেয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল রাস্তা দিয়ে। মেয়েদের রংবেরংয়ের সাজের দিকে তাকিয়ে শ্রবণা দেখতে পাচ্ছে ওর স্কুলের মাঠ,একঝাঁক তরুণীর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পরা। আর ওই ভিড়ের মধ‍্যে ওইযে শ্রবণা.. ওদেরই মাঝে চোখে মুখে একরাশ খুশি নিয়ে। এসবের মধ‍্যেই অভী যে কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি সে। চমক ভাঙ্গল অভীর ডাকে।
-"কি বেরোবেনা..ঝটপট তৈরি হয়ে নাও।
-"বেরোব!!! কোথায়?"
-"কেন সরস্বতী পূজো দেখতে..উহু কি ভেবেছেন ম‍্যাডাম..সব প্ল‍্যান সেট।শালাবাবুর গাড়ি প্রিবুকড্।
-"কিন্তু কোথায় যাব আমরা?
-"কেন.. আমাদের পুরোনো স্কুল,সেই মিশন,সুদীপ স‍্যারের বাড়ি।"
-"বয়স কত হল আন্দাজ আছে আপনার।তোমার মেয়ে এই বয়সে পূজো দেখতে বেরিয়েছে।"
-"তাতে কি হয়েছে। ওদেরতো বললাম আমাদের দেখলে বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে একটু আড়াল হয়ে যাস। চল চল লেটস্ গেট রেডি। আমার জন‍্যে একটা পান্জাবি বের করে দাওতো। আর হ‍্যাঁ শোনো তুমি একটা নীল রঙের শাড়ি পরো আজ,ঠিক সেইবারের মতো।"
-"অভী..তোমার মনে আছে?"
এবার শ্রবণার হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল অভী। শ্রবণার আঙ্গুলের ফাঁকে নিজের আঙ্গুল জড়িয়ে সরে এল আরেকটু কাছে। কানের খুব কাছে এসে বলল,'ভালবাসি।' ওইতো...ওইতো নিজের ভেতরের ধুকপুকুনিটা আবার শুনতে পাচ্ছে শ্রবণা। সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে কী দারুণ এক আনন্দ। ওই যে শুনতে পাচ্ছে...কোথায় যেন কে গেয়ে উঠল-
"বাতাসে বহিছে প্রেম,নয়নে লাগিল নেশা,কারা যে ডাকিল পিছে বসন্ত এসে গেছে।"


মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬





মাঘ উৎসব
         শম্পা সামন্ত

     পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু, শীতের ছোঁয়ায় প্রকৃতিও গা ভাসিয়েছে। সকাল বেলা শিশিরে ভেজা ঘাস কেন জান হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাদের স্পর্শে গা শিউরে ওঠে।ঘাসের মাথায় বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা তার ওপর কুয়াশাকে উপেক্ষা করে সূয্যি মামার মৃদু আলো। কি অপরূপ সৌন্দর্য মন যেন এক লহমায় উৎফুল্লতা পায়। ভোর বেলায় পারার মোড়ে রবীন খুড়োর হাতে করা চা'য়ে চুমুক না দিলে সকালটা শুরুই হয়না। এদিকে মাধব কাকা খেজুর গাছ কেটে টাটকা রস নিয়ে ফিরেছে। দৌড়ে গিয়ে ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে রসের আস্বাদন আজও মনে পড়ে। আবার গঙ্গা সাগর মেলায় যাওয়ার ঢল পড়েছে পাড়ায় পাড়ায় পাড়ার বয়স্ক দাদু ঠাকুমাদের কাছে গঙ্গা সাগর মেলার গল্প শোনার অভিজ্ঞতা বেশ মজার। আর বাড়িতে বাড়িতে পিঠে পুলির উৎসব,মা লক্ষ্মীর পদ চিহ্ন চালের গুঁড়ি দিয়ে অঙ্কনের কি অপূর্ব মাহাত্ম্য। চারিদিকে আল্পনা,সারা বাড়ি যেন মন ভালো করা আনন্দে মেতে উঠেছে। এই সবকিছুর মধ্যে প্রকৃতিও কেমন যেন আনমনা। কখনও গরম কখনও ঠান্ডা আবার কখনও রোদের সঙ্গে আড়ি দিয়ে সারাদিন মুখ ভার। আর সবচেয়ে বড় মজার ব্যাপার হল মেলা।পল্লী গ্রাম গুলিও এসময় নানা মেলার আনন্দে মেতে উঠেছে। 


মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬







জ্ঞানের সাগর ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় ও তাঁর অমর সৃষ্টি "বর্ণপরিচয়"


বটু কৃষ্ণ হালদার

উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার এর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়।সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অগাধ পান্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনে বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃতি ছাড়া বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল তাঁর।তিনি প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে আরো যুক্তি বহ ও অপর বোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম রূপকার ছিলেন।তার অপার পান্ডিত্যের জন্য বাংলা গদ্য সাহিত্যের প্রথম শিল্পী বলে উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ডক্টরঅমিতকুমার বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, "বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় এর পূর্বেও ছাপা অক্ষরে এই জাতীয় কিছু কিছু পুস্তিকা বাজারে চলতো"।ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে রাধাকান্ত দেব রচিত "বাংলা শিক্ষা গ্রন্থ", এবং স্কুল বুক সোসাইটি হতে প্রকাশিত "বর্ণমালা প্রথম ভাগ" ও"বর্ণমালা দ্বিতীয় ভাগ" মদনমোহন তর্কালঙ্কার রচিত শিশু শিক্ষা গ্রন্থ গুলির নাম করেছেন।তবে এই পুস্তিকা গুলি তেমন কোনো বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক রচিত একটি বাংলা বর্ণ শিক্ষার প্রাইমারি বা প্রাথমিক পুস্তক হল "বর্ণপরিচয়"। যা বাংলা সাহিত্যের আকর বা অমূল্য সম্পদ হিসেবে উঠে আসে।এই বর্ণপরিচয় এর দুটি ভাগ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৫ সালে।দুই পয়সা মূল্যের ক্ষীণকায় পুস্তিকা প্রকাশ বাংলা শিক্ষা জগতের ছিল এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।এই পুস্তিকায় বিদ্যাসাগর মহাশয় বাংলা বর্ণমালাকে সংস্কৃত ভাষায় অযৌক্তিক শাসনের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করেন এবং যুক্তি ও বাস্তববোধের প্রয়োগে এই বর্ণমালার সংস্কার সাধনের প্রবৃত্ত হন।এই অমূল্য সম্পদ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মৃত্যুর এত বছর পরেও জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। ডক্টর বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন শোনা যায় প্যারীচরণ সরকার এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় একদা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন ইংরেজি ও বাংলা বর্ণ শিক্ষার প্রাথমিক পুস্তিকা রচনা করবেন। তদানুসারে প্যারীচরণ "first book of reading"এবং বিদ্যাসাগর মহাশয় "বর্ণপরিচয়" প্রথম ভাগ প্রকাশ করেন।বিহারীলাল সরকারের রচনা থেকে জানা যায় মফস্বলে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সময়"পালকীতে বসেই পথেই বর্ণপরিচয় এর পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়।১৮৫৫ সালে বর্ণপরিচয়"প্রথম ভাগ"এবং সেই বছরের জুন মাসে "দ্বিতীয় ভাগ" প্রকাশ পায়। বিহারীলাল আরো বলেছেন বর্ণপরিচয় প্রথম প্রকাশ ফলপ্রসূ হয়নি। হতাশ হয়ে পড়েন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়। কিন্তু জনসমাজের চাহিদা অনুসারে দিনে দিনে শিক্ষা জগতের মূল আকর  হয়ে দাঁড়ায় বই দুটি।প্যারীচরণ এর ইংরেজি গ্রন্থখানি ও বাঙ্গালী সমাজের দীর্ঘকালের আদরের বস্তু ছিল।তবে বর্তমানে আধুনিকীকরণের যুগে গ্রন্থটি শিক্ষা মূল্য অবশিষ্ট নেই।তবে বিদ্যাসাগর মহাশয় গ্রন্থটি আজও বাঙালি সমাজের শিশুদের বাংলা শিক্ষার প্রথম সহায়ক হিসেবে রয়ে গেছে।এরপর আবারও প্রায় ১২৫ বছরের উর্ধ্বে কেবল স্বরবর্ণ মালা থেকে"৯"(লি) ও ব্যঞ্জন বর্ণমালা থেকে "অন্তস্থ ব"বাদ গিয়েছে। হলে বলা যায় আধুনিক বর্ণমালার মূল রূপকার ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়।তার বর্ণপরিচয় শিশুদের উপযোগী সহজবোধ্য ও সংক্ষিপ্ত বাক্য দিয়ে পাঠ রচনা করা হয়েছে।এর মধ্যে রয়েছে সহজবোধ্য বাক্যের ছোট ছোট প্রাঞ্জল গদ্য রচনা শৈলী।এ বিষয়টির মধ্যে দিয়ে শিশুরা দুর্বোধ্য শব্দ মুখস্থ করার পরিবর্তে সহজলভ্য শব্দ শিখছে ও স্বাচ্ছন্দ্য বাংলা গদ্য রচনার সঙ্গে পরিচিত হয়।এভাবে সহজ সাবলীল ও আধুনিক বাংলা গদ্যের পথ প্রশস্ত করে ছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয় শিক্ষিত বাঙ্গালীদের জন্য। ইতিপূর্বে যতিচিহ্নের বিষয়ে সচেতনতা ও প্রয়োগের নৈপুণ্য দেখা যায়নি।বিদ্যাসাগর মহাশয় এর এসব সাবলীল স্বাচ্ছন্দ্যবোধ যতিচিহ্নের ব্যবহার লক্ষণীয়। বর্ণপরিচয় এর ১৯ সংখ্যা থেকে উদাহরণ টানা যায়"গোপাল যখন পড়িতে যায়,পথে খেলা করে না, সকলের আগে পাঠশালায় যায়,পাঠশালায় গিয়া আপনার জায়গায় বসিয়া বই খুলিয়া পড়তে থাকে,যখন গুরুমহাশয় নতুন পড়া দেন,মন দিয়া শুনে"। যতি চিহ্নের বিষয়ে তাঁর বিশেষ সচেতনতা কথা ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে মন্তব্য করেছেন"তাহার সংস্কারকামী মনের বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায় তাহার বিরাম চিহ্নের প্রয়োগের ক্রম বাহুল্য দেখিয়া"।


মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬







অনন্য শান্তিনিকেতন অন্য শান্তিনিকেতন
                                      
কুমকুম ঘোষ
    

ছাতিমতলার দক্ষিণ গেটের উপরে লেখা আছে --"তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি"; বেলাশেষের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে পুরো চত্বর টা; শীতের হাওয়ায় কাঁপন লেগে কিছু পাতা ঝরে পড়েছে এই হেরিটেজ প্রাঙ্গণের পথের ধুলায়। মনে হয় যেন কবির সেই গানের প্রতিরূপ অনুরণিত হচ্ছে  -- "আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন"।

১৮৬৩ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই পৌষ এখানেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তিনিকেতন আশ্রম। রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে ষোল আনার বিনিময়ে ২০ বিঘা জমি পাট্টা নেন মহর্ষি। ব্রাহ্মসমাজের নানান মানুষ যাতে নিভৃতে নির্জনে ধ্যান করতে পারেন তার জন্য ই প্রতিষ্ঠা করলেন এই আশ্রমস্হল, যাকে সার্বিক ও সার্থক রূপে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত করলেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কনিষ্ঠ পুত্র। শান্তিনিকেতন তাই সবসময় বাঙালীর জীবনে এক অনন্য আবাসভূমি হয়ে রয়েছে।

কবির হাতে গড়া শান্তিনিকেতন ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন গৃহ( মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নির্মিত,১৮৬৪সাল), উপাসনা গৃহ( কাঁচঘর) ছাড়িয়ে পাঠভবন,কলাভবন, শিক্ষা সদন,গৌর প্রাঙ্গন,আম্রকুঞ্জ ছাড়িয়ে এখন আরও অনেকটাই বিস্তৃত। দেশ-বিদেশের ছাত্র-ছাত্রী মুখরিত শান্তিনিকেতন তাই দেশীয় ভাবনায় বিশ্বকে আহ্বান করে চলে।  প্রাচ্যের সাথে প্রতীচ্যের মিলনের বার্তা অনুভূত হয় এখানকার হাওয়ায় হাওয়ায়। প্রাণের সাথে প্রাণের মিলন যেন শান্তিনিকেতনের কোণে কোণে বিরাজ করে। এখানেই তার অনন্যতা। 

উত্তরায়ণ তো এককথায়  বিস্ময়কর এক স্হান।কত ঘটনার সাক্ষী এখানকার এক একটি গৃহ।  আর কি অপূর্ব তার নামকরণ : উদয়ন (কবি ব্যবহৃত ঘরটি তেমনি সজ্জিত), কোনার্ক, শ্যামলী (মাটির বাড়ী),উদিচী, পুনশ্চ।  প্রখ্যাত ভাষ্কর রামকিঙ্কর বেইজ এর অনবদ্য ভাষ্কর্য গুলি খোলা আকাশের নীচে উদাত্ত আহ্বানে জানান দিচ্ছে প্রাণময় এক জীবনপ্রবাহের চলমান চিত্ররূপ হিসেবে।  প্রবেশদ্বার-এর বামদিকে ই বিচিত্রা ভবন যেটি এখন মিউজিয়াম। এখানেই ছিল কবিগুরুর নোবেল পদকটি (কোন অর্বাচীন সেটি গলিয়ে ফেলেছে ভাবতেই ব্যথায় ভরে ওঠে মনটা)। দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ২০০১ সালে।এখন আছে নোবেল প্রাপ্তির মানপত্রটি। উৎসুক দর্শক দেখতে পাবেন গীতাঞ্জলির ১টাকার সংস্করণ।

"এ মণিহার আমায় নাহি সাজে"... নোবেল প্রাপ্তির পর কবির অনুভূতি ছিল ঠিক এমনই।  শান্তিনিকেতন সহ সমগ্র দেশ যখন এই নোবেল প্রাপ্তির আনন্দে উৎফুল্ল তখন কবি শুধুমাত্র "আশ্রমের কল্যাণচিন্তায় তদ্গত প্রাণ"।  প্রমথনাথ বিশী লিখছেন---- নোবেল প্রাইজ লাভের সংবাদ বহন করিয়া বোলপুরে যখন টেলিগ্রাম আসে তখন রবীন্দ্রনাথ নেপালবাবু প্রভৃতি আরো দু- একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কাছেই কোথাও বেড়াইতে গিয়েছিলেন--সেখানে টেলিগ্রামখানা পাঠাইয়া দেওয়া হয়। তিনি নীরবে টেলিগ্রামখানা পড়িয়া নেপালবাবুর হাতে দিয়া বলিলেন "নিন নেপালবাবু আপনার ড্রেন তৈরী করবার টাকা।" তখন আশ্রমের টাকার টানাটানি চলিতেছিল। একটা পাকা নর্দমা অর্ধখনিত অবস্হায় পড়িয়াছিল।---------এই শান্তিনিকেতন তাই সবসময় বাঙালীর জীবনে এক "অনন্য" স্হান দখল করে আছে।

এই অনন্য শান্তিনিকেতনের পাশেই সময়ের সাথে সাথে বয়ে চলে আর এক শান্তিনিকেতন। সে এক অন্য শান্তিনিকেতন। সেখানে উদাসী হাওয়ার পথে পথে কুসুম ঝরে না।চিৎকৃত আধুনিকতা তার নখ- দন্ত নিয়ে গিলে খায় ভুবনডাঙার একলা আকাশ। প্রকৃতি নিধন করে লালমাটির রাস্তায় পুরু পিচের আস্তরণে আর রাঙামাটির পথ দেখা যায়না প্রান্তিক স্টেশন থেকে খোয়াই পর্যন্ত। আবার সেই অন্য শান্তিনিকেতনে( আশ্রম প্রাঙ্গণে র বাইরে যার অবস্হান) আছে শীর্ণ জলহীনপ্রায়  "কোপাই নদী"-- যাকে দেখে কবি একদা লিখেছিলেন "আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে"; (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁকের উপকথাও এই নদীকে কেন্দ্র করেই লেখা), আবার এই অন্য শান্তিনিকেতনেই  আছে "খোয়াই বনের অন্য হাট" বা "শনিবারের হাট"  ; যা এখন প্রতিদিন বসে।  (প্রায় দুই দশক আগে কলাভবনের প্রাক্তনী শ্যামলী খাস্তগীর গ্রামীণ শিল্পী দের শিল্প কীর্তি সকলের সামনে তুলে ধরার এই অনবদ্য প্রয়াসের সূচনা করেছিলেন), আছে আদিবাসী গ্রাম "বনের পুকুর" : যেখানে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সিনেমা " আগন্তুক"-এর শুটিং হয়েছিল। আছে "আমার কুটীর"-এর মত সমবায়িকা নির্ভর স্বাধীন অর্থনীতির উন্মেষ ,যা রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করেছে, আছে শ্রীনিকেতনের কৃষিকেন্দ্রীক ভাবনা ও শিক্ষা।

জোড়াসাঁকোর সরুগলি থেকে জীবন ও যাপনকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমকেন্দ্রীক প্রকৃতির মাঝখানে। মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ভেদাভেদ। চেয়েছিলেন পূর্ণ প্রাণের সন্ধান।"তাসের ঘরের" রাজপুত্রের মতো সব বাঁধ ভেঙে অন্য ও অনন্যকে মিলিয়ে দেওয়ার ডাক তিনিই দিয়ে গেছেন "পৌষ মেলা"য়, "বসন্তোৎসব" এর পলাশ- শিমূলের রঙে বা প্রকৃতির সাধনায় সূচনা করেছেন "বর্ষামঙ্গল", '"হলকর্ষন" প্রভৃতি অনুষ্ঠান। এই অন্য শান্তিনিকেতনও তাই  সমস্ত ক্ষুদ্রতা সমস্ত সীমাবদ্ধতা পরিহার করে "বৃহৎ বা ভূমা" র কাছেই আত্মসমর্পণ করে চিরকালের জন্য স্হায়ী হয়ে গেছে। মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার অন্য রূপ কবির হতে গড়া অনন্য শান্তিনিকেতনের উদার প্রাঙ্গণে।



মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬





খাসিয়াদের জীবন ও সমাজচিত্র
শেখ একেএম জাকারিয়া

খাসিয়া  জনসমাজ বাংলাদেশে ও ভারতে বসবাসরত একটি মাতৃতান্ত্রিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।বাংলাদেশের সিলেট বিভাগে, ভারতের আসামে ও মেঘালয় রাজ্যে এ জনগোষ্ঠী বাস করে। সিলেটের খাসিয়ারা সিনতেং (Synteng) গোত্রভুক্ত জাতি। এরা মূলত চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে।  ভাত ও মাছ এদের প্রধান খাদ্য। এদের মধ্যে কাঁচা সুপারি ও পান খাওয়ার প্রচলন খুব বেশি। খাসিয়াদের উৎপাদিত পান বাংলাদেশে খুবই লোকপ্রিয়। এরা মঙ্গো-লয়েড বংশজাত। প্রায় পাঁচশ বছরেরও বেশি আগে খাসিয়ারা ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশে আসে। আর এরা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। খাসিয়াদের  বাংলাদেশে আগমনের সময় বা কাল  জানা থাকলেও  তিব্বত থেকে আসামে আগমনের  সময় আমাদের  অজ্ঞেয়। এদের গায়ের রং পীতবর্ণবিশিষ্ট, নাক-মুখ থ্যাবড়া, মুখের ভিতরের যে অংশে দাঁতের পাটি সংলগ্ন থাকে  সে অংশ অর্থাৎ থুতনি উঁচু, চোখ কৃষ্ণবর্ণ ও ছোটো টানা এবং ক্ষুদ্র দেহবিশিষ্ট। সুদূর অতীতে এ উপজাতি যাযাবর ছিল। এদের সে আত্মভাব বর্তমানকালেও পরিলক্ষিত হয়। খাসিয়াদের ভাষায় গ্রামকে পুঞ্জি বলা হয়। জীবিকার তাগিদে দলবলসহ স্থান ত্যাগ করে এরা নতুন পুঞ্জি গঠন করে। খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন সবসময়  নিরুপদ্রবে থাকতে ভালোবাসে অর্থাৎ এরা খুবই শান্তিপ্রিয়। বাংলাদেশে খাসিয়াদের আদি বসতি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব  সীমান্তে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে যা সমতল ভূমি বা হাওরাঞ্চল থেকে ৯/১০ মিটার উচুঁতে অবস্থিত।  অতীতে এ অঞ্চলের কয়েকটি পরগনা দখল করে কোনও এক খাসিয়া সর্দার একটি রাজ্যও স্থাপন করেন।অবশ্য পরবর্তীতে  তিনি এখান থেকে বিতাড়িত হোন। এ সময়ে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫০টি খাসিয়া পরিবার বসবাস করছে। এরা সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর,দোয়ারাবাজার, ছাতক ও সদর উপজেলার সীমান্ত এলাকায়  ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। খাসিয়া অঞ্চলে সিন্টেং, গারো ও লালং উপজাতিরও বসতি আছে। তবে তারা সংখ্যালঘু, খাসিয়াদের চোখে হেয়, যদিও তারা (গারো ছাড়া) খাসিয়া বংশজাত। স্বয়ং খাসিয়াদের মাঝেও একের বেশি গোত্র আছে। যেমন খোংতা, পলং, সুরং ইত্যাদি। বর্তমানে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সীমান্তে ৫টি, মৌলভীবাজার জেলায় ৬১টি এবং সিলেট জেলায় ৭টি খাসিয়া পুঞ্জি রয়েছে।

খাসিয়ারা  বর্ণজ্ঞানহীন। তাদের  ভাষা অলিখিত। কিংবদন্তি আছে এক সময়ে তাদের লিখিত ধর্মশাস্ত্র ছিল, ঝড়বৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাপূর্ণ সময়ে তা নষ্ট হয়ে যায়। এরা দ্বিভাষী, খাসিয়া  ভাষা ও সামান্য বিকৃত উচ্চারণে বাংলায় অনর্গল কথা বলতে করতে পারে। এক সময়ে খাসিয়া ভাষা বাংলা অক্ষরে লেখা হতো। বাইবেলের কিছু অংশ প্রথম খাসিয়া ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা অক্ষরে লেখা হয়েছিল। শিক্ষিত খাসিয়ারা  আজও বাংলা অক্ষরে খাসিয়া ভাষায় চিঠিসহ অন্যান্য ধর্মীয় প্রয়োজনীয় তথ্যাদি কাগজে লিখে রাখে। বর্তমানে সীমান্তের ওপারে ভারতে খাসিয়া ভাষা রোমান হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে খাসিয়া ভাষার কোনও সর্বজনীন রূপ নেই। দু'দেশে খাসিয়াদের  অধিকাংশই সীমান্ত অঞ্চলে বাস করে। সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর এবং জোয়াই ও জৈন্তাপুরের মাঝখানে অনেক খাসিয়া পুঞ্জি বা বসতি রয়েছে। কুলাউড়ার চা বাগানে বহু খাসিয়া চাকুরি করে। বাংলাদেশে খাসিয়া জনসংখ্যার ঠিক হিসাব এখনও জানা  যায়নি । ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ১২ হাজার ৩০০ জন খাসিয়া আছে। কিন্তু ‘বাংলাদেশ খাসিয়া সমিতি’ তাদের সংখ্যা ৩০ হাজার বলে দাবি করে।  উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুসারে ভারত ও বাংলাদেশে খাসিয়াদের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১৩,৬১,১০০ জন। উল্লেখ করার মতো জনসংখ্যার অঞ্চলসমূহের মধ্যে  ভারতের মেঘালয়ে ১২,৫০,০০০ জন, আসামে ২৯,০০০ জন। তাছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মিজোরাম, মহারাষ্ট্র, ত্রিপুরা, তামিলনাড়ু, অরুণাচল প্রদেশ, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ৩,১০০ জন। অপরদিকে  বাংলাদেশে আছে ২৯,০০০ জন। খাসিয়াদের জন্মহার অনেক বেশি।খাসিয়া পুঞ্জিতে রয়েছে নিজস্ব নিয়ম-কানুন।  এদের পুঞ্জি প্রধানকে সিয়েম বলা হয়। মেঘালয়ে কিছু পুঞ্জি প্রধানের বিচার-ক্ষমতা আছে। বাংলাদেশেও পুঞ্জি প্রধানগণই নিজেদের আচারবিচার করেন। এদের মন্ত্রী বলা হয়।  খাসিয়া সমাজ ব্যবস্থায় কোনও পুরুষ সম্পত্তির মালিক হয় না। এরা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পরিচালিত। বর্তমানে নূনাধিক সকলেই অবগত খাসিয়া সমাজে নারীতন্ত্র বিদ্যমান অর্থাৎ নারীরাই খাসিয়া সমাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। খাসিয়াদের বিশ্বাস, নারীর হাত ধরেই মানব সভ্যতার সূচনা। আর সেজন্যেই খাসিয়ারা নিজ সমাজে জন্মলগ্ন থেকে  অদ্যাপি মাতৃতন্ত্র ধরে রেখেছে। প্রাপ্তবয়স্ক নারীপুরুষ বিয়ের পিড়িতে বসা খাসিয়া সমাজে মহাপূণ্যের কাজ। তাদের ধারণা এটি সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ এবং বিয়ে না করা মহাপাপ, অন্যথায় অভিশপ্ত হতে হয়। খাসিয়াদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন বেশ সমৃদ্ধিশালী। খাসিয়া ভাষায় রচিত গানগুলো মানব হৃদয়কে আলোড়িত করে। বিয়েসহ এদের অন্যান্য অনুষ্ঠান বেশ সরগরম ও উপভোগ্য। বিয়ে ছাড়াও নানারকম সাংবাৎসরিক উৎসবে ওরা দলবদ্ধভাবে নৃত্যগীত করে। জন্ম-মৃত্যুর অনুষ্ঠানাদিও এভাবেই পালন করে। তাদের নাচ-গান অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। খাসিয়া সমাজে নারীরা পছন্দমতো অন্য গোত্রের পুরুষ বিয়ে করতে পারে,সামাজিক রীতি অনুযায়ী স্বামীকে পুরো জীবন স্ত্রীর বাড়িতে কাটাতে হয়। বিয়ের ব্যাপারে নারীরাই  মুখ্য ভূমিকা পালন করে। নিজের পছন্দের পুরুষকে তারা বাড়িতে নেমন্তন্ন করে, আবার ক্ষেত্রবিশেষে   একসঙ্গেও কিছুদিন কাটায়। পরবর্তীতে নিজেদের অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ করে। বিয়ের দিনে বরযাত্রীরা বরকে সাদা ধুতি, চাদর, পাগড়ি পরিয়ে কনের বাড়িতে যাত্রা করে। যাওয়ার সময় মাতৃসমা নারীরা বরকে আশীর্বাদ করে। কনেপক্ষ বরযাত্রীদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। খাসিয়া ধর্মগুরুর মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে বিবাহকর্ম সম্পন্ন হয় এবং নবদম্পতিকে ‘ধনে-জনে অদৈন্য’ প্রার্থনা করে, তারপর উত্তম স্বাদবিশিষ্ট ভোজনপর্ব শুরু হয় এবং বরকে বিয়ে বাড়িতে রেখে রাতের মধ্যভাগে বরযাত্রী বিদায় নেয়। বিবাহকর্ম সম্পন্ন হওয়ার পর কন্যার মাতৃগৃহের পাশেই সদ্যবিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর  জন্য  ঘাসপাতা ইত্যাদিতে ছাওয়া  ছোট কাঁচা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। যদি তা সম্ভব না হয় মাতৃগৃহেই তাদের বাস করতে হয়। কোনও কোনও পুঞ্জিতে গৃহ বানিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে কনিষ্ঠা কন্যার জন্য আলাদা কোনও ঘর নির্মাণ করা হয় না। কারণ সে মাতৃগৃহ ও সমুদয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী।  সংসারের খরচাপাতিসহ টাকা পয়সার লেনদেন হয় স্ত্রীর হাত দিয়ে।

খাসিয়া সমাজে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে চাষাবাদ ও ঘরকন্নার সকল কাজ চলে। এদের মধ্যে বিরুদ্ধমত কমই দেখা যায়। পুরুষরা নারীদের সাথে  বিশেষত স্বামীরা স্ত্রীদের সাথে সবসময়ই  সম্মান বা শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করে থাকে। স্ত্রীর অকাল মৃত্যু হলে তার সন্তানগণ মাতৃনামেই পরিচিত হয়। স্ত্রী মারা যাবার পর স্বামীরা অর্থাৎ সন্তানগণের  পিতা অন্যত্র বিয়ে করে চলে যেতে পারে। এসময় তাদের সন্তানগণ মায়ের একেবারে ছোট বোনের দ্বারা লালিতপালিত হয়। এর কারণ পারিবারিকভাবে সমুদয় সম্পত্তির মালিক থাকে পরিবারের অনুজা কন্যা। অন্য মেয়েরাও ভাগ পায়, পরিমাণে কম। কিন্তু কনিষ্ঠা কন্যা ছাড়া তাদের সম্পত্তি বিক্রয় করার অধিকার নেই। পারিবারিক পুজো বা উপাসনা ও অনুষ্ঠানাদির কর্তব্য-ভার ছোট কন্যার ওপর অর্পিত। একবারই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া খাসিয়া সমাজের রীতি। তবে স্বামীর যৌন অক্ষমতা, স্বামী পছন্দ না হওয়া কিংবা শুধুমাত্র যৌন মিলনের জন্যও স্ত্রীরা একাধিক বিবাহ করতে পারে। পুরুষদের বহু বিবাহ খাসিয়া সমাজে নেই বললেই চলে । তবে স্ত্রীর সন্তান না হলে, স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে।  বিভিন্ন পুঞ্জিতে তাদের বিবাহ রীতি ও মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় কিছু বিভিন্নতা আছে। উল্লেখ্য, খাসিয়াদের  বিয়ে ভিন্ন গোত্রে হওয়া বাধ্যতামূলক ।  নিজ গোত্রে বিয়ে খাসিয়া সমাজে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কোনো যুবক-যুবতি নিজ গোত্রে বিয়ে করে তাদেরকে মারাত্মক শাস্তি  দেওয়া হয়। যুবক যুবতি দুজনকেই গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়,  সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, মৃত্যুর পর তাদের ধর্মরীতি অনুসারে সৎকার পর্যন্ত করা হয় না। ধর্মের দিক থেকে খাসিয়াদের ধর্ম অতি অনাধুনিক, কিন্তু কালে কালে তা বিবর্তিত। প্রচলিত আচার ও কুসংস্কারদ্বারা আচ্ছন্ন বিশ্বাসই এদের  ধর্ম। খাসিয়াদের  মধ্যে এ সময়ে হিন্দু, মুসলমান ও খ্রিস্টধর্মের প্রভাব লক্ষণীয়। বর্তমানে এরা প্রেসবিটারিয়ান, ইউনিটারিয়ান, রোমান ক্যাথলিক, শাইভিশম অথবা সর্বপ্রাণবাদী আদিবাসী।  খাসিয়া সম্প্রদায়ের পরিবর্তনটা মূলত তাদের ধর্মেই বেশি ঘটেছে। আনুমানিক ২০০  বছরের কাছাকাছি  সময়ে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকরা খাসিয়াদের মধ্যে ধর্মপ্রচার শুরু করেছিল। বর্তমানে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ খাসিয়াই খ্রিষ্টান। প্রায় প্রতিটি পুঞ্জিতেই গির্জা রয়েছে। প্রতি রোববারে খাসিয়ারা গির্জায় প্রার্থনা এবং পুঞ্জির নানাবিধ  বিষয় নিয়ে কিছু সময় আলোচনা করে। খ্রিষ্টান যাজকগণ অনেক সময় পুঞ্জির আচারবিচারেরও দায়িত্ব পালন করেন। খাসিয়ারা শুরু থেকেই একেশ্বরবাদী। তাদের বিশ্বাস, ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টির পর পৃথিবীতে একজোড়া অর্থাৎ একজন নর ও একজন নারী সৃষ্টি করেন। তারপর, মহাজগতের বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য  দেব-দেবী সৃষ্টি করেন। অধুনা, কিছু খাসিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার ফলে খাসিয়াদের সমাজ ও অর্থনীতি বিষয়ক কাঠামোই বদলে গেছে। খ্রিষ্টান খাসিয়ারা প্রোটেস্টান্ট। এরা মৃতদেহ দাহ করে কিন্তু অস্থিগুলো কবর দেয়। মৃতদেহ সৎকারের সময় খাসিয়া ধর্মগুরু প্রার্থনামন্ত্র পাঠ করে, যার বাংলা ভাষান্তর, ‘বিদায়, বিদায়, বিধাতার রাজ্যে গিয়ে তুমি পান খাবে’। বর্তমানে এদের ধর্মীয় সুখদুঃখবোধ জীর্ণসংস্কার, পোশাকপরিচ্ছদ ও আচরণবিধিতে আধুনিক ছাপ পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয়দিক ছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতে চাষাবাদের ক্ষেত্রে খাসিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এদের অনেকেই প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক। বর্গাদার এদের জমিতে বাগ-বাগিচা তৈরি ও চাষাবাদের কাজ করে। বর্গাদার ঠিকমতো চাষাবাদ করছে কী-না, তা তদারকির জন্য বেতনভুক কর্মচারী আছে। ধর্মীয় ও সামাজিক আনন্দনুষ্ঠানাদি পুঞ্জির প্রধান অর্থাৎ মন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে উদযাপিত হয়। স্বজাতি প্রেম এদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত। খাসিয়ারা এককালে পার্বত্য জাতি ছিল।  জমিওয়ালা স্বল্পসংখ্যক লোকই  জুমচাষ ও বাগবাগিচা করে। এদের অনেকেরই  জমিজমা নেই। খাসিয়ারা বহুকাল পূর্ব থেকেই থেকে কলা, আনারস, কমলা, তেজপাতা, গোলমরিচ, পান ইত্যাদি উৎপাদনে অভ্যস্ত। অতীতে এরা খুবই আক্রমণাত্মক ছিল। মুঘল শাসন আমলের পূর্ব থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত পার্বত্য খাসিয়ারা নিম্নাঞ্চল আক্রমণ করে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড চালাত। প্রাচীন গ্রন্থাদি পাঠে জানা যায়, খাসিয়ারা  ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে কোনও এক সামন্ত রাজার রাজধানী সুনামগঞ্জের লাউড় পুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে মুঘলরা খাসিয়াদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সীমান্ত পরগনাগুলোতে সৈন্য মোতায়েন করে। ইংরেজদেরকেও তাই করতে হয়। সীমান্তে অবস্থিত পাহাড়গুলো চুনাপাথরের ধনভাণ্ডার। চুনাপাথরের ব্যবসা নিয়ে ১৭৭৪ থেকে ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় ওইসব পাহাড় ছিল খাসিয়া সর্দারদের অধীনে। ১৭৮৭ সালে খাসিয়ারা সুনামগঞ্জর পাঁচটি পরগনা আক্রমণ করে প্রায় ৩০০ লোক হত্যা করে। বিষাক্ত তীর, ধনুক, বর্শা ইত্যাদি তাদের  যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র।। খাসিয়াদের দমন করতে ইংরেজদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। স্থানীয় জমিদারের সঙ্গেও প্রায় সময়ই খাসিয়াদের সংঘর্ষ বাঁধত। কৃষিকাজ কিংবা চা বাগানের কাজ ছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত এলাকার এপার-ওপারে এরা অবাধে পান, কমলা, মাছ, চাল ইত্যাদির ব্যবসা করে। খাসিয়াদের সীমান্ত ব্যবসা সুদূর অতীত থেকে শুরু এবং আজও তা অব্যাহত। এপার-ওপার সীমান্ত ব্যবসা বা বেচাকেনার জন্য খাসিয়াদের নির্দিষ্ট বাজার রয়েছে। খাসিয়া নারীরা সেসব বাজারে মালামাল আনা নেয়া ও বেচাকেনা করে। নারীরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য পাহাড় থেকে লোকাল হাটে বা বাজারে নেমে আসে। খাসিয়াদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হচ্ছে শিরে চূড়াবাঁধা পাগড়ি পরিধান করা। আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার পরও তাদের মধ্যে এখনও স্বকীয়  ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। ভূমির উৎপাদনশক্তি বৃদ্ধির জন্য তারা বিভিন্ন নামে  সারাবছরই ব্রত পালন করে। তাছাড়া ফসল বপনের সময় খিয়াখাং ব্রত পালন করে। অন্যান্য ব্রত হচ্ছে খিয়া পিস্থল, পিরদোং স্ট্রোং, খিয়া ক্লাম ইত্যাদি।  প্রাচীন গ্রন্থাদি পাঠে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে আর্যরা এ দেশে কর্তৃত্ব স্থাপন করলে তারা আদিবাসীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে এ আদিবাসীরাই আর্য নয় এমন জাতি বা অনার্য বলে পরিচিতি লাভ করে। আর্য-অনার্য যুদ্ধে অনার্যরা পরাজিত হয়ে  বনজঙ্গলে আশ্রয় নেয় এবং পরে সে সব  ঝোপঝাড়পূর্ণ স্থান বা গহীন বনজঙ্গলেই  বসবাস শুরু করে। ফলে তারা  শিক্ষাদীক্ষা ও আধুনিক জীবনব্যবস্থা থেকে দূরে থাকে। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার প্রভাবে খাসিয়া সমাজে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এসেছে। সে সঙ্গে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাও পর্যায়ক্ৰমে শিথিল হয়ে এসেছে।




মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬






সম্পাদকের কথা 

শীত শেষ হতে চলেছে। তবে তা প্রকৃতির। কিন্তু চারদিকের তাকালে মনে হয় যে, আমাদের মনের শীত দিনদিন বেড়েই চলেছে যেন। ইতিমধ্যে গণতন্ত্র সূচকে দেশ দশ ধাপ নীচে নেমে গেছে। বহু ক্ষেত্রে বিপন্ন হচ্ছে ব্যক্তি-স্বাধীনতা। দেগে দেওয়ার ঘৃণ্য রাজনীতি থেকে শুরু করে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর সাজাকে বাস্তবায়িত না করার কুনাট্য পর্যন্ত দেখতে হচ্ছে। আর এসবের মধ্যেই বেকারত্ব, ছাঁটাই, মুদ্রাস্ফীতি, বিলগ্নিকরণের মতো একটির পর একটি অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ঘটে চলেছে। এক শ্রেণির হাতে জমছে অঢেল পয়সা আর গরীব আরও গরীব হচ্ছে। 
তাই আসন্ন বসন্ত কোনো মধুমাস আনছে না আমাদের জীবনে। বরং বাড়ছে উদ্বেগ আগামীর কথা ভেবে।আমাদের মতো সাধারণেরা শুধু একটি জিনিস প্রত্যাশা করে- মানসিক শান্তি ও সুস্থ বেঁচে থাকা। রাষ্ট্র যদি সেটা দিতে না পারে, তবে তার দায় রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন তাদের ওপর বর্তায়। কেননা রাষ্ট্র একটি ধারণা মাত্র।   


মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬

রেজিস্ট্রেশন নাম্বার- S0008775 OF 2019-2020
ঠিকানা- হসপিটাল রোড, কোচবিহার, ৭৩৬১০১
প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪২৬




Sunday, February 2, 2020



























রোদে ভরা সকালে

বাণী প্রসাদ নাগ


মাঘের এক রোদে ভরা সকালে
গোলাপী আলোয়ান গায়ে স্টেশনে
দাঁড়িয়েছিলে তুমি ঝাপসা চোখে
মনে হয় ব্যথাটা মনের মাঝখানে। 
                      
সিগন্যাল পেয়ে বাঁধ ভাঙা গতিতে
বাধাহীন ট্রেনটা ছুটে গেল ধোঁয়া ছেড়ে
তুমি কি জানতে আমি বসে সেই ট্রেনে!
হয়তো এসেছিলে মনের ভুলে সেখানে। 
                      
ফেলে আসা এক যুগ আগের কথা
আমরা সে সময় কলেজে দুজনে
কী গভীর ভালোবাসা জন্মেছিল মনে
আজ তুমি কোথায় আমি কোনখানে
                     
সিঁথিতে সিঁদুর পড়েছিলে গোধূলি বেলায়
তুমি চাইলেও দুজনে পারিনি এক হতে 
তোমার বাবা চান নি আমি কারবারী বলে
তবু আজও জড়িয়ে তোমার মনে।























নাড়ির-টান

মাম্পি রায়


  সিজারিয়ান  অপারেশন  করে মা কেউ সখে হয় না, বেবী কোনোভাবে তার মুভমেন্ট বদল করলে,বা বেবী কোনোভাবে নর্মাল নিলে যদি মায়ের সমস্যা হয় তাহলে অবশ্যই সিজার অপারেশন করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
যারা নর্মাল ডেলিভারি করে মা হয় তারাই নাকি খুব কষ্ট করে মা হয়,তারাই বুঝে নাড়ির টান,আর যাদের সিজারিয়ান বাচ্চা জন্মায় তাদের কি কোনো কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়না?
 আমার যে সব বান্ধবী রা নর্মাল ডেলিভারিতে মা হয়েছে তারা গর্বের সাথে বলে "আমি যে কি কষ্ট করে মা হলাম,সে কি মুখের কথা!তুই কি বুঝবি তোর তো পেটে কেটেছে তাও অবশ করে তুই কি বুঝবি মা হতে গেলে কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়".. 
আমার নিজের অভজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সিজারে বাচ্চা জন্ম  মনে, বাচ্চা জন্মের পর থেকে একটা মায়ের মৃত্যুর আগ পযর্ন্ত প্রতিবন্ধি হয়ে বেঁচে থাকা।

আরে যাদের নর্মালে বেবী হয় তাদের নাড়ি ছেড়া হয়, আর যাদের সিজার হয় তাদের হয়তো নাড়ি ছেড়া হয়না কিন্তু, নাড়ি কাটা হয়। কিন্তু, বাচ্চার প্রতি মায়ের টান, নাড়ির টান সমান ভাবেই থাকে।

নর্মালে যারা মা হয় তারা বলে, আরে, সিজারে কিসের কষ্ট শুধু পেট কাটে!!! আচ্ছা, তারা কি জানে আদৌ! সিজারের সময় পেটের নীচের ৭টা পর্দা কেটে বেবীটাকে পৃথিবীর আলো দেখানো হয়।তারা তো এটাও জানেনা সিজার করার আগে হবু মায়েদের এ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয় যার জন্য বোঝা যায়না পেট কাটার যন্ত্রণা টা। সিজারের দিন ভোর রাত থেকে সিজার অপারেশন হওয়ার পর মোট ২ দিন না খাইয়ে রাখা হয় মা কে, বেবী ডেলিভারি হওয়ার পর ৩ দিনের মাথায় শুধু মাত্র মুসুর ডাল আর মুড়ি ছাড়া ৪ দিন কিছুই খেতে দেওয়া হয় না, এদিকে ৩ ঘন্টার ভিতর ৩টা করে  স্ল্যালাইন টানানো হয়। হ্যাঁ, পেট কাটার যন্ত্রণা টা মাত্র আধ ঘন্টার জন্য টের পাওয়া যায় না,কিন্তু মোটা সিরিন্জের ইনজেকশন টা জখন পিঠ ভাঁজ করে মেরুদন্ডে দেওয়া হয় মনে হয় যেন ঝনঝন করে  ওঠে সারা শরীর, পায়ের তলায় যেন বিদ্যুৎ এর শক লাগে, কিছু বোঝার আগেই কোমড়ের নীচ থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে গেল,চোখের সামনে ঝাপসা দেখা শুরু হল,বুঝতে পারছি কিন্তু বলতে পারছিনা ঠিক কি হতে চলেছে।এক হাতে চ্যানেল করা স্যালাইনের বোতল, আর এক হাতে  বি,পি মেশিন,লাগানো।

মেরুদন্ডে সেই ইনজেকশন এর জন্য সারাজীবন অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়,কখন পা অবস হয়ে থাকে, আবার কখনো বসা থেকে উঠা যায়না,,,,,কাপড় কাচা যায়না,,,,ভারী কিছু উঠানো যায়না তবুও আমরা সব কিছু করি এবং করার চেষ্টা করি। করতেও হবে কারণ আমরা মা ।
তারা হয়ত এটাও জানেনা, যখন অবসের সময়টা চলে যায় , ও,টির ওই ঠান্ডা ঘর থেকে মা কে নিয়ে আসা হয় সারা শরীর  কেঁপে কেঁপে ওঠে, কি বিকট একটা কনকনে শীত লাগে, গলা কাটা মুরগীর মতো ছটফট করতে থাকি,ক্যাবিনে নিয়ে আসা হয় সারা শরীর ঢেকে দেওয়া হয় ৪/৫ টা কম্বল দিয়ে,তাও কাপুনি যায়না,শেষে রুম হিটার লাগলো হয় ঠান্ডা কাটাতে।
আপনজন ছেড়ে পোস্ট অপারেটিভ রুমে থাকতে হয় ৫ দিন, ২৪ ঘন্টায় ২৪ টা  স্যালাইন, নানান ইনজেকশন চলে ব্যাথা কমানোর, আর ইনজেকশন কাটা জায়গায় কী যে কষ্ট বলার মতো না,,,, তার সাথে খিচুনি, হাতে ক্যানোলাই স্যালাইন চলছে,,, ওদিকে ক্যাথেতার লাগানো নিথর শরীর থরথর কাঁপছে,,, মাথাটাও ভারী হয়ে আছে তবুও শত কষ্ট উপেক্ষা করে বাচ্চাকে বেস্ট ফিডিং করানো হয়।তারপর ও বাচ্চার প্রতি সিজারিয়ান মায়েদের টান নেই, বলা যায় কী ?
এর পরেও যদি শুনতে হয় পেট কেটে বাচ্চা হলে কীসের কষ্ট?

যদি শুনতে হয় সিজারিয়ান মায়েদের কোনো কষ্ট নেই সত্যি শুনতে খারাপ লাগে। মা তো মা ই হয়, সিজারিয়ান হোক বা নর্মাল। কষ্ট দুজনই ভোগ করে।