Thursday, December 4, 2025


 

শীত এবং তৃতীয় পক্ষ

শাশ্বত বোস


শীত বলতে আমার কাছে এক আঁজলা বেদান্ত আঁতুরঘর, স্থাবর বিছানা, চেতনাহীন ঘনিষ্ঠতা অথবা অনেক দূরের শ্মশ্মানের জমাট বাঁধা ধোঁয়ার মাঝে, আটকা পরে থাকা একান্নবর্তী প্রসেনিয়াম। আমার ছোটমামার খুব ফুলের শখ ছিল। তাই শীতকালের শুরুতেই আমার মামাবাড়ির চিলেকোঠার ছাতটা দেখতাম দিব্যি দখল করে ফেলেছে, লাল নীল মশারি, একটা হলুদ মরচে ধরা হোল্ডার, ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন মাপের টব আর অনুবাদপ্রবণ ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা আর হলদে কমলা গ্যাঁদার দল। শীতের রূপ পাল্টানো প্যারাডক্সের পাশাপাশি এক অলৌকিক বহমান সুপ্তি যেন ঘিরে থাকতো ছাতটার পরিবর্তিত কল্পলোক জুড়ে! ছাতের অনেকটা জুড়ে বোঝাই করা থাকতো গুঁড়ো গুঁড়ো সূক্ষ্ম বালিকণা, এঁটেল মাটির সাথে ঝুরঝুরে হয়ে মিশে গিয়ে আগামী দিনে টবের দৈঘ্য প্রস্থ জুড়ে, এক অপার্থিব রহস্যকে ঘনিয়ে তুলবে এরা। গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে বিদেশী ফুলের বীজ বোনা হতো হলদেটে বালিকণার গর্ভে। রাস্তা থেকে যখনই দেখতাম সন্ধ্যের হিমের আমেজ গায়ে মেখে, ছাতের ঘরে বিশ ওয়াটের বাল্বটা জ্বলে উঠেছে, ঠিক তখনই মফস্বলের অন্ধকার গলির বাঁকে, শহরতলীর অজস্র জীবন ষড়যন্ত্রের, কত সহস্র হোঁচট-জখম-রক্তপাত ভুলে একটা বায়বীয় পারলৌকিক জগৎ, একটা নির্জনতার ফিসফাসে নিমগ্ন আপাত মোলায়েম জীবন যেন ডাকতো আমায়! যেন ঐখানেতে পরম স্নেহে বোনা হয়ে চলছে এক বিচিত্র জীবন! নিষ্ক্রিয় অভিব্যক্তির মতো অনেকখানি স্থূল আরাম হয়তো মাখামাখি করে থাকতো ভাবনাটাতে! হয়তো নতুন শীতের ভোরে পায়ের গোড়ায় নীরব অবহেলায়, নিতান্ত মোলায়েম মিথ্যের মত গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকা লেপ কম্বলের মামুলি আরামের থেকেও অনেক বেশী ছায়াঘন একটা আরাম! টিউশন থেকে ফিরে এসে পড়তে বসতে আর ইচ্ছে করতো না হয়তো! ব্যাগ ফেলে ছুট দিতাম সোজা তেতলার ছাতে। একটা রৌদ্রমুখর দিনের শেষে ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যেটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে তখন হীমশীতল কুয়াশাঘেরা অন্ধকারের দিকে! জীবনের বহুমুখী স্বরের মাঝে নিয়ম করে বেজে চলেছে এক সুর! অলীক জীবনের খাতায়, পরাবাস্তব লিপির দ্রাব্যতায়, পরিমিত অনুভবে যা খানিক সৌজন্যমূলক কবিতা লিখে রেখে যায়, তারপর মিশে যায়, ইট চাপা পড়ে থাকা অর্ধেক জীবনের খাঁজে! যেন শব্দের ভিড়ে প্রভাবিত কবির লেখা কোন কবিতা! একজন জন্মাবধি দুর্বল নবজাতককে যেমন ইনকিউবেটরে রেখে দেওয়া হয়, চোখ মেলার অপেক্ষায়! তারপর সব বিপদ কাটিয়ে ধীরে ধীরে সে চোখ মেলে একদিন! পুষ্ট হয়ে ওঠে তার সেই অর্ধেক হয়ে জন্মানো শরীরটি! ঠিক সেরকম কোন এক কুসুম কুসুম শিশিরমাখা ভোরে, গত দীপাবলীর রং মশালের নীল যখন মুখে গেছে, ঘুমন্ত খিদের গা থেকে ঝরে গেছে বারুদের গন্ধ, ঠিক তখন শীর্ণ দুটো হাত শূন্যে মেলে মাথা তুলতে চায়, প্যানজি-পিটুনিয়া-ক্যালেন্ডুলা-আজেলিয়ারা! সে অনুভব শুধু কাঞ্চনফুলের মতো সাদা, ঋতুপ্রবণ! শীত মানে তাই আমার কাছে কোন নিঃস্ব পরিধিতে প্রথম প্রাণের সঞ্চার! যেন হঠাৎ করেই চিঠি লিখতে চাওয়া কোন অনাথ শিশুকে!

শীত মানে সোনালী ধানক্ষেত আধখানা ন্যাড়া হয়ে আছে। আলু তুলে নেবার পর মাঠের ধারে ধুনি জ্বেলে মেঠো ইঁদুরের মাংস খাচ্ছে একপাল অসভ্য আদিবাসীর দল! কোন এক সময় এরা আমাদের প্রজা ছিল, তারপর ভাগচাষী! এখন এরা আমাকে হয়তো চিনতেও পারে না! অথচ জমি জঙ্গলের প্রাচীন হকদার হিসেবে ওদের আমরা চিরটাকালই সমীহ করে এসেছি! শীত মানে যেন গদ্য নির্ভরজীবনে বিপ্রতীপ চলনের কবিতা বোনা! হিম হিম অন্ধকারে বসে নষ্ট তারা খোসা দেখতে পাওয়া! শীতকাল মানে যেন আবার কোথাও গিয়ে মৃত্যু! যেখানে বেঁচে থাকাটাই একটা আশ্চর্য্য ঘটনা! এই হয়তো অনেক উৎসাহ নিয়ে বেঁচে আছি! পাতাঝরা কিছুটা শীতল বরফ যেন মুহূর্তে এসে সব কিছু ভেঙে চুরে চুরমার করে দিল! আসলে শুধু দেখে যাওয়া জীবনে মুহূর্ত নির্ভর আমাদের বেঁচে থাকা! বড় আশ্চর্য্য সে ভঙ্গিমা! যেন ঈশ্বরী চোখে গেঁথে যাওয়া চঞ্চল দৃশ্যের বিন্যাস থেকে হঠাৎই ফ্রিজ ফ্রেমে ফিরে আসা! যেন কোন এক দীর্ঘ্য রোগভোগের পর অনন্তের গা ঘেঁষে আমার ঠাকুমার চলে যাওয়া। বেঁচে থাকতে সারা শরীর জুড়ে তীব্র যন্ত্রনাময় বাত বেদনায় গোটা বিছানা জুড়ে যিনি শুধু গড়িয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে চোখ খুলে শুধু বলতেন, “আমার হাড় মুড়মুড়াইসে!” মৃত্যুটি হয়তো সংক্ষিপ্ত পর্ব ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তার পোস্ট স্ক্রিপ্ট হিসেবে জুড়ে যাওয়া শোককাল ছিল বড় অবিচ্ছেদ্য! শীত মানে আসলে স্থিরতা! একটা ঘটনাপ্রবণ জীবনের ভঙ্গুর আবর্তে বার কতক ঘুরপাক খেয়ে, মলিন স্মৃতির দোকান থেকে টুক করে ঘুরে, ফিরে আসা প্রাপ্তির জোয়ারে! বছর ঘুরে শীতকালে ফিরে এলে যেন বয়স হয়ে আসে! না ফুরোনো এই অনর্থক জীবনে সংযত প্রেম-সতর্ক হাসির অস্পষ্ট ইমেজারি তৈরী করে!

শীত মানে আসলে নিয়ন্ত্রিত ছয় ঋতু! যে চারাগাছ গত বর্ষায় বেগবতী হয়েছে, শরীরে যার ঠাসা হয়েছে বিজ্ঞাপিত মেদ, আত্মমন্থনের দোলায় আর্দ্র এখন যার অমলিন হৃদয়, পুঁতিগন্ধময় বর্জ্য উপেক্ষা করে শীতের উদ্বায়ী রোদের কাছে এখন সে স্বর্গীয় উত্তাপ খোঁজে! তার পরিণত চোখ জুড়ে শিশুকাল কৈশোর যৌবন টেনে এগিয়ে চলে অদ্ভুত সব স্বপ্নের এক ভ্রাম্যমান শর্টকাট! আমার কাছে স্মৃতির মানে শীত! শীত মানেই চেনা অচেনা নানা গন্ধ, হালকা হয়ে আসা বাতাস, নিবিড় ভাবে ঝিম মেরে যাওয়া এক নদী, এই কালান্তক শীতের মলাটে জমাট বাঁধা জনপদ জুড়ে যে বুনে দিয়েছে রবিশস্যের নির্বিবাদী বুনিয়াদ। শীত মানে নিঝুম হয়ে যাওয়া শব্দের দল। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত উপমার আড়ালে মুখ লুকোনো ক্যাসুয়াল কথাবার্তার রিফ্লেক্স! শীতকাল মানে পরিপাটি হয়ে বিয়েবাড়ি যাওয়া। খেয়েদেয়ে বাড়ি ফেরার পথে নবদম্পতির আশু বিচ্ছেদের দিনক্ষণ প্রেডিক্ট করা। ‘এখনকার বিয়েতে স্টেবিলিটি কাহা!’ মার্কা নির্বিষ আস্ফালন! এই একটু আগে অনুষ্ঠানবাড়িতে অনেকদিন বাদে দেখা হওয়া ব্যক্তি, “কেমন আছেন!” জানতে চাইলাম যার কাছে, দেশকাল-চাকরি-ব্যবসা-অর্থনীতি-মন্দা-অগ্নিমূল্য বাজার-সোনা রুপোর দর-জিনিসপত্রের দাম এসব নিয়ে গালভরা বাতেল্লা ঝাড়লাম যার কাছে, মুখ সরলেই মাথার মধ্যে স্পষ্ট রজঃমূলক প্রবৃত্তি এনে তার ভাবী নষ্ট দিনকালের পাটিগণিত কষি মনে মনে! মগজের গভীরে গিজগিজে পাঞ্চলাইনের ব্যাকড্রপে, জড়ো হওয়া এইসব এলেবেলে কনভার্সেশন, প্রত্যুত্তরের আশা রাখে না কখনোই! শুধু আশা থেকে যায় সাময়িক মনোযোগ আকর্ষণের! শোভাবাজার কিংবা হাতিবাগানের চুন সুরকি খসে পড়া পোড়ো বাড়ির ছাতে, তখন কৌতূহলহীন কাকটা অব্যর্থ নিশানার মতো ভেজা ভেজা রোদটুকু বেয়ে ছুটে এসে ফেটে গড়িয়ে পড়ে। নির্জনতা ও আধ্যাত্মিকতা মেশানো নির্ভেজাল কল্পনাশক্তির দুর্বলতম স্থানটুকু জুড়ে ততক্ষণে রোদ ফোদ সব হাওয়া! ততক্ষণে আর জি কর রোডের সার্সি জানলা ঘোরানো সিঁড়ি বসানো স্টাফ কোয়ার্টারের, দোতলার বেরিয়ে আসা ছাদের, ভেঙে আসা পাঁচিলে ঠেস দিয়ে, তখন পিসতুতো বোনের গালে হঠাৎ করে চুমু এঁকে দেয় আপন মামাতো ভাই! যৌবন বীজপত্র থেকে বেরিয়ে এসে সোনালী রঙের বিকেলে এসে দাঁড়ানো কিশোরীটি বাড়িয়ে দেয় ঠোঁট! শীতকাল তখন উদোম উৎকণ্ঠাদের বুকে করে জীবনের সবথেকে বিষন্ন সত্যকে চিনতে পেরে উর্বরতার কথা বলে! আহিরীটোলা ঘাটে ফিরতি স্টিমার এসে ভেরে। মৌলালি দরগায় আজান লাগে। পদ্মপুকুর বস্তি, পার্ক সার্কাস অঞ্চল থেকে ভেসে আসা ঝলসানো মাংসের গন্ধ, গ্রাম বাংলার নিরন্ন উনুনের ভাপে সিদ্ধ হওয়া পিঠে পুলির গন্ধ, নোনাপুকুরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম ডিপোয় টং টং করতে করতে ঢুকে যাওয়া শেষ ট্রামটার গন্ধ, এংলো পাড়ার লাল বাড়িটার গায়ে ক্রিস্টমাসের জিঙ্গল বেল হয়ে ঝুলে থাকা পর্ক সসেজ, মোমো আর চিকেন চাউমিনের গন্ধ, বহড়ুর রস ব্যবসায়ীর হাতে জাল খেতে খেতে শুকিয়ে আসা খেঁজুর রসের গন্ধ সব মিলে মিশে একাকাকার হয়ে যায়। শলাকার গোপন পাঁজরে ধ্বস নামে! সার্কাসের বামন জোকারটির চোখে তখন বুদ্বুদের ইশারা! শীতকালের শেষে, গেল শীতের স্মৃতিই বেশী করে ফিরে ফিরে আসে।



 

স্নেহের উত্তাপ

কবিতা বণিক

আলমারির নীচে রাখা লেপটা চোখে পড়ল। বেশ অনেক বছর আমরা কম্বলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে সে এতদিন নির্জীবের মতই পড়েছিল। আলমারির পাল্লা খুলে মাটিতে বসে পড়েছিলাম গোছাব বলে। সে যেন তার মায়াময় দুহাত বাড়িয়ে দিল। কি সোহাগ! কতদিন এই সোহাগ পেতেই ভুলে গেছি। অজান্তেই সারা শরীর জুড়ে যেন ফিরে পেলাম কত হারিয়ে যাওয়া স্নেহস্পর্শ, বর্ণ, কত না প্রাণভরা আশীর্বাদ যা আমার অঙ্গে অঙ্গে শীতের মিঠে সোনালী রোদ্দুরের মোহময়ী স্পর্শের মত নরম, কোমল ও দিব‍্যভাবে ভরপুর। সে কত বছর আগের কথা! আজও এমনই নরম স্নেহময়ী হয়েই সে আছে। মা-বাবার স্নেহাশীর্বাদ যেন আজও সেই বহন করছে। আঃ কি সুখ। কি আনন্দ! আজ সত‍্যই মনে হল শীত এসেছে আমারই জন‍্য। হ‍্যাঁ আমারই জন‍্য। কেমন করে মাঝের কয়েকটা বছর তার খেয়াল রাখিনি। লেপের গায়ে হাত বুলিয়ে মনে হয় যা আছে তা তো আছে। আরও পাই …. তবুও শান্তি তবুও আনন্দ। প্রথম যৌবনের আনন্দের সোনার কুচিগুলো মনের মণিকোঠায় চিক চিক করে উঠল। যদিও সব কালের অতল তলে হারিয়ে গেছে। মনকে বলি, কিছুই কি নেই বাকি? আছে! স্মৃতির সরণী বেয়ে কতদূর হাঁটলাম সময়টা হিসেব করিনি। ফিরে এলাম প্রতিবেশীর শঙ্খধ্বনিতে, সেই মনের আঙিনায় ধূসর হয়ে যাওয়া যুগ হতে। জানলায় দেখি জ‍্যোৎস্নার চাঁদের নরম আলোয় স্বর্গীয় সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। মনটা বলছে ভালোবাসার এই আশীর্বাদ মায়াভরা জ‍্যোৎস্নার মতো বাবার স্নেহ লেগে থাক আমার গায়ে পিঠে। মায়ের খোঁপার চাঁপা ফুলের গন্ধের সাথে স্নেহচুম্বন থাক মিশে। এ শুধু লেপ নয় পুরো সংসারটাকে তাদের স্নেহাশীর্বাদের ওমে জড়িয়ে রাখার নাম। তাদের ওমের এই স্পর্শ আমাকে ছোটবেলার শেখানো কথাগুলো মনে করিয়ে দিল। “ক্ষমা করো”“ভালোবাসো” সেই কথাগুলোর অনুরণন শুনতে পেলাম। বাবা বলেছিলেন – “ মানুষ নিয়েই তো ঘর সংসার। সবাইকে আপন করে কাছে টেনে নেওয়াই একটা সুন্দর জীবন। এই রকম সব সংসার নিয়েই সমাজ।” সেদিন অত কথা হয়ত ঠিক বুঝিনি। আজ এই লেপের ওমে মনে হচ্ছে আমরা সবাই ঢুকেছি এই লেপের ওমের ভিতর। আঃ কি তৃপ্তি! কি শান্তি! আমরা সবাই সবার।
     
চাঁদের মধ‍্যে মনে হচ্ছে ওই তো মা-বাবা হাসছেন। জ‍্যোৎস্নার আলোয় ঘর ভরে উঠেছে। লাইট জ্বালা হয়নি। লেপটাকে জড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। নিজের মনে গাইতে লাগলাম—
আছে দুঃখ, আছে মৃত‍্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।
তবু প্রাণ নিত‍্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।।


 

আদুরেমনা শীত ও নস্টালজিয়া খেজুর গাছ

বটু কৃষ্ণ হালদার

কালের নিয়মে এই ভারতবর্ষে ঋতুচক্রের আবহে পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ঋতু গুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হলো আদুরে মেনা শীত। সোনালী আলোর পরশ রেখার ডানায় ভর করে হেমন্তের কাঁধে ভর করে শীতের আগমন হয়। শীত মানে মায়ের হাতে নিখুত বুননে নকশী কাঁথার স্পর্শ। বিছানা ছেড়ে উঠি উঠি করতে কখন যে সূর্য আপন কক্ষ পথ ঘুরে মাঝ বরাবর উঁকি দেয় তা বুঝতেই পারিনা। নব কিশলয়ের কল্লোলের কোল হতে টপটপ করে ঝরে পড়ে শিশির বিন্দু। কচি ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু রাঙা চরণ ছুঁয়ে আলপনা এঁকে যায়।

সাদা কাশফুল যেমন জানান দেয় শরৎকাল এসেছে, ঘরের মেয়ে উমা আসবে বাপের বাড়ি, ঠিক তেমনই সোনালী পাকা ধানের খেত গাঁদা, ডালিয়া,সূর্যমুখী,গোলাপের রঙ্গিন পাখনার উপর ভর করে আদুরেমনা শীতের আগমন ঘটে। শীত মানে নলেন গুড়।"খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধ নন্দ", গানটি বেশ জনপ্রিয়। ঠিক তেমনি নলেন গুড় বাংলার মানুষের কাছে অতি প্রিয় এক প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। চারিদিকে ঘন কুয়াশার প্রাচীর, তারই মাঝে খেজুর গাছে ঝুলে থাকে রসের হাড়ি।গ্রামের মানুষরা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহায়,সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতে থাকে।দূর হতে ভেসে আসে তার মিষ্টি সুগন্ধ।

শীতকাল আসতেই মনে পড়ে যায় পিঠে পুলি পায়েস এর কথা। শীতকাল মানেই খেজুর-গাছের-রস ও নলেন গুড়। বারবার শহুরে মানুষ এই খেজুর-গাছের-রস বা নলেন গুড়ের টানে গ্রামে ফিরে গেছেন।নলেন গুড় বা খেজুর গাছ থেকে রস তৈরির কিছু পদ্ধতি আছে। তার জন্য কয়েকটি উপকরণ দরকার হয় তা হল হেঁসোদা, বালি,হেঁসোদা শান দেবার জায়গা(যা কাঠ দিয়ে তৈরি হয়), মাটির ভাঁড় বা কলসি, বাঁশের তৈরি নলি,কাছি( পাটের তৈরি দড়ি)। শীত শুরু হওয়ার আগেই মানুষজন তাদের খেজুর গাpছ গুলো তে কেটে পরিস্কার করে(গাছের একপাশ)। তারপর বেশ কিছুদিন সেই জায়গা শুকোতে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সে শুকনো জায়গায় নতুন করে কেটে নলি পুঁতে দেওয়া হয়।গাছের থেকে রস মাটির ভাঁড় ভরে ওঠে। বিকালে গাছ কাটা হয় আর পরের দিন সকালে সেইবার গাছ থেকে নামিয়ে এনে রস উনানে জাল দিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করা হয়। যেখানে রস জ্বাল দেয়া হয় সেখান থেকে দারুন সুগন্ধ ওঠে। সেই গন্ধে চারিদিক মম করে।আসল খেজুরের গুড় দিয়ে মোয়া,পাটালি আরো অনেক কিছু তৈরি হয়।

এই শীত কৃষক পরিবারে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। মা লক্ষ্মীর আশীষ সোনালী ফসল মাঠ থেকে ঘরে ফেরার পালা। তবে কথায় আছে কারো" পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ"। শীতের সুখকর অনুভূতি মাঝেও দুঃখের বার্তা বয়ে আসে হতদরিদ্র পরিবার গুলির মাঝে।কলকাতার ফুটপাতবাসী সহ এমন বহু পরিবার আছে যাদের কাছে লেপ-কম্বলের সুখকর বিছানা শুধু স্বপ্ন। যাদের হাড় হিম করা রাত কাটে পাতলা কাপড় গায়ে দিয়ে, নয় তো  খড় কুটো গাছের ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, তারই পাশে বসে বসে কেটে যায় অগণিত কত রাত। অপেক্ষা করে সূর্যের প্রখর উষ্ণতার জন্য, সূর্য তাদের কাছে এক সুখের জগত। শীতের বিদায়ের অপেক্ষায় মগ্ন থাকে, এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়।


 

শীত

প্রতিভা পাল     

         শীতের বিষণ্ণতা ছুঁয়ে ছুঁয়ে কারা যেন আজও হেমন্ত রঙে প্রকৃতি আঁকে। আনমনে তাকিয়ে থাকি উদাস। জানি না কেন। সকাল, দুপুর, রাত, কত পল, কত প্রহর ! ব্যালকনির রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অলীক ভাবনাগুলো উড়ে উড়ে মায়াময় কবিতা হয় সহসা। পাখির ডাকে সম্বিত ফেরে সূর্য আলোর। ভোর আঁকার তাগিদ দেখে তীব্র হয় রোদের উচ্ছাস। কুয়াশা বাষ্প হলে যেটুকু বুদ্বুদ জমিয়ে রাখে চিলেকোঠা, তা দিয়েই শ্যাওলা সাজে কার্ণিশে। 

         শীতের বাগানে পসরা সাজিয়েছে যত ফুল, তারা সত্যিই রঙিন। পরিচর্যা, শুশ্রূষা, আর্দ্রতা - কত কিছু প্রয়োজন এই রঙিন সুস্থতার ! শুকিয়ে যাওয়া নদী জানে পলির উর্বরতা উপত্যকায় সীমাবদ্ধ। জলের খোঁজ, বৃষ্টির অপেক্ষা পর্যন্ত শুধু। 


         ছাদ উঠোনে রোদের তাকে শুকোতে দেওয়া আচারের বয়াম। উলকাঁটার ঘর গোনা সময়ের হিসেব-- শৈশব জমিয়ে রাখি এমন কত টুকরো অতীতে। বোরোলিনের নরম প্রলেপে শীতের শব্দ বুনি ঠোঁট ফাটা বিবর্ণ বিকেলের সূঁচ-সুতোয়। না পাওয়া সব পেতে চাই না আর। সরিয়ে রাখি। সযতনে। অনভ্যাসে। অনায়াস। নিস্তব্ধ রাতে পশমী উষ্ণতা মনকে বলে- কঠিন হতে হবে। আরও। পরাজিত হোক নিদারুণ শীত। তপস্যা একজীবনের…..


 

শীত জন্ম!

পার্থ সারথী নন্দী 

সে সব ঢের আগের কথা! শীত তখনো সুদূরের রূপকথা হয়ে যায়নি,কার্তিক শেষ থেকে অঘ্রাণ শুরুর মধ্যেই সদ্য ডানা মেলত প্রখর উত্তুরে হাওয়া! ছোট্ট বেলার বরফ বুড়োর গল্প তো জানাইছিল রাশিয়ান রূপকথার কল্যাণে! সেই বরফ বুড়োই  আমাদের ডুয়ার্সের মাঠ , নদী,প্রান্তর কে নির্ঘাত একটু ছুঁয়ে দিত! বরফ সাদা কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে আমাদের এই ছোট গঞ্জ গুলিতে একটা হিমেল বাতাস নেমে এসে কনকনে শীতের পূর্বাভাস দিত সকালে বিকেলে! ঠামা জানাতেন শীতবুড়ির মনোগত অভিপ্রায়,' পোলাগো সাথে পারি আর না পারি/ বুড়ো বুড়ির ভাঙবো জারিজুরি!' প্রাক গ্লোবাল ওয়ার্মিং জগতে আমাদের শীত যাপনের সেই জমিয়ে শুরু !

জমিয়ে শীত বলতেই কতগুলো চেনা নাম,অনুষঙ্গ বারেবারে চেতনে অবচেতনে ভেসে আসে! উকিলকাকু ! বাবার বয়েসী মানুষটির হরবখত কাঁধে বহু পুরোনো, ছেঁড়া শাল জড়ানো থাকতো! মানুষটা আসলেই তখন হাতে ঝুলোনো নধর লাউ কিংবা কাগজে জড়ানো কিছু লাফা কিংবা পালং শাক! উকিল কাকু জন্ম কুঁড়ে! নয়মাসে  ছয় মাসে হয়ত আসবেন! সারাদিন আমাদের বাড়িতে জন খাটবেন, কিন্তু মজুরিটা কোনো বড় বিষয় নয় ওর কাছে! দুবেলা অনেক দিন গরম ভাত জোটেনি ! লবণ দিয়ে আজন্ম এক থালা খেয়ে বেঁচে থাকা হত দরিদ্র মানুষটির কাছে ধোঁয়া ওঠা ফেনা ভাত, একটু ঘি, আলুসেদ্ধ অমৃতবৎ! তবে কাজে উকিল কাকু একেবারেই নবডঙ্কা ! সারাদিনে শুধু হয়ত সুপুরীর খোল গুলো একপাশে সরিয়ে রাখলো কিংবা গোয়াল টা ঝাঁট দিতেই সূর্য পাটে বসতে চলল! উকিলের কুখ্যাত আলসেমি নিয়ে মা ঠাকুমা দের অভিযোগ প্রচুর!দু চারজন মুনিশ, যারা গায়েগতরে খাটতে পারে,একবেলায় সব সুপুরি পেড়ে দিতে পারে,নারকেল গাছের গোড়া কুপিয়ে খোল দিয়ে,জঞ্জাল উঠোন সাফ সুতরো করে দিতে পারে চক্ষের নিমিষে , যেমন সর্দার কিংবা বলা( বলরাম), তেমন কর্ম তৎপর লোক এই ধান ঝাড়াই,মাড়াই এর ভরা মরশুমে আর পাবেন কোথায়! অগত্যা উকিলেই ভরসা করতে হয়! আকর্ণ  বিস্তৃত হাসি দিয়ে সেই মানুষটি আমাদের দাওয়াতে আবার এসে বসে! আগের সব মান অভিমান ভুলে গিয়ে! তাঁর প্রতি ওঠা অভিযোগ এক মুহূর্তে নস্যাৎ করে দিয়ে! ' কাকু তুমি এত ঢিলেমি কর কেনো? সর্দার কত তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে ফেলে,দেখতে পাও না?' রিনরিনে গলায় প্রশ্ন করতেই উকিলের এক গাল হাসি! ' বাপই, মোর সাত জনমে কেউ গতর খাটায় খায় নাই! ওই সর্দার মোর ঘরত আগে জন খাটিছে! আর এলায় মোর কপাল খান !' উকিল কাকুর শব্দহীন হাসিতে কান্নার রেনু ঝরে পড়ত, হয়ত!শুনতে পেতাম না ওই বয়সে! তবে আমাদের সাথে শীতের মতোই ওর নিবিড় সম্পর্ক! ঠামা বলতেন,উকিল কাকু বাবার ছোটকালের বন্ধু! ছাড়ান কাটান অসম্ভব! ওই পুরাতন ভৃত্যের মতোই রুক্ষ , রিক্ত দিনের মতোই ফাটা ,নগ্ন পায়ে ধুলো, হাঁটুর উপর নোংরা সাবেকি ধুতি নিয়ে প্রতিবার শীতের ঠিক শুরুতেই উকিল কাকুর আগমন ! হয়ত এরপর আবার তারও শীত ঘুম চলবে দীর্ঘকাল!

সত্যি মাঝে মাঝে মনে হয় সেই সব শীত দিন যেন বহু জন্ম আগের!কালীপুজোর বাজির কড়া গন্ধের আধিপত্য সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া বাতাসে সূর্যের সেই প্রখরতা অনেকটাই উধাও! কার্তিক গড়াতে তখন লেপ, কাঁথা,কম্বল আলমারি বা সিন্দুক থেকে বের হয়ে গেছে! কালীপুজো পেরোতেই হয়ত ঝপ করে দুদিনের অকাল বর্ষণ! ব্যস দুয়ারে ডুয়ার্সের সেই বিখ্যাত শীত! অবশ্য ততদিনে মা ঠাকুমার বিছানায় রোদে বেশ করে সাঁতলানো লেপ ,কম্বল গুছিয়ে রাখা! শুধু পাটভাঙ্গা শাড়ির মত শরীরে ওম ছড়াবার অপেক্ষায়!বাতাস জুড়ে গুড়ি গুড়ি হিম প্রতাপ! সকালের সেই প্রবল প্রতাপশালী  জ্বলজ্বল করা রোদের কড়া চোখ এখন কুয়াশায় বেশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে! সকালে উঠলে এখন পায়ে মোজা,আর গায়ে সোয়েটার, গলায় জড়াতে হচ্ছে মাফলার! অনেকের মাথায় চড়ছে টুপি বা মাঙ্কি ক্যাপ! উঠোনে কিংবা টিনের চালে পাতলা কাপড় মেলে দিয়ে ঠামা  মুসুর কিংবা কলাই ডালের  বড়ি নিয়মিত শুকোতে দিচ্ছে! আমাদের উপর দায়িত্ব বর্তেছে  কাকের দলের উপর নজর রাখা! তাঁরা সব তক্কে তক্কে আছে! একটু অন্যমনস্ক হলেই, ঝপাৎ! ব্যস অত কষ্ট করে ডাল ফেটিয়ে  বড়ি গুলির দফা রফা! রোয়া ওঠা রোদের  মায়া জড়ানো উষ্ণতায  শুকচ্ছে আচার- জলপাই কিংবা তেঁতুলের! জিভ দিয়ে জল গড়ালেও কিচ্ছু করবার জো টি নেই! ভালো করে শুকিয়ে গেলে আঠালো, রসালো, ঝাল ঝাল টক টক  সে যে কি স্বর্গীয় মিশ্রণ হয়ে দাঁড়াবে,ভাবতেই হাত নিশপিশ করে, জিভ লকলক করে ওঠে! হায়! আমাদেরকেই ( উজ্জ্বল,আমি কিংবা দাদা) লাঠি হাতে দাড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ত্রস্ত চোখে! এত কষ্ট করে আচার রক্ষা করবার পর যখন সেগুলো বোয়ামজাত হবে,তখন কি আর সেগুলোকে বাগানো যাবে! মানে সেগুলো তো তখন নাগালের বাইরে মিটসেফের বেশ উঁচু তাকে চালান হয়ে যাবে! 

আমার ছোটবেলায় শীতদুপুরের একটা ভীষণ প্রিয় অভ্যেস ছিল ( এখনো আছে) লুকিয়ে রান্নাঘরে অভিযান! মা তখন স্কুলে,দেবী পিসি হয়ত কল পাড়ে বাসন মাজছে! এদিকে মিটসেফে ঢাকা দেওয়া আমার ভীষণ প্রিয় জ্বাল দিয়ে যাওয়া পায়েস কিংবা  গত কাল সন্ধ্যার সুজি! যখন ছোট জানালার ফাঁক দিয়ে আলো আঁধারির খুনসুটি চলছে ঠান্ডা মেঝেয়,আমি পা টিপে টিপে মিট সেফ খুলতেই চমক! কোনটা ছেড়ে কোনটা খাই! কাকিমা গত রাত্রে গোটা কতক পাটি সাপটা দিয়ে গেছেন, ক্ষীরের! আমাদের বাড়িতে চিরকাল নারকেল পুর দিয়ে পাটি সাপটা হয়! কিন্তু আমার বরাবর ঘন জ্বাল দিয়ে তোলা ক্ষীরের পুর দিয়ে পাটি সাপটা বড্ড পছন্দের! মা বাড়ি ফিরলে উত্তম মধ্যম হবে জেনেও দুটো পাটিসাপটা বেমালুম মুখে চালান করে দেই! তারপর নজরে সুজি! সকালে গরম সুজির থেকেও এখন ঠান্ডা হয়ে যাবার পর এই বিকেলে তাঁর ওপর বেশ ভরাট একখানা সরের পুরু স্তর পড়ে  গেছে! চামচ দিয়ে তুললে আমার জিভ দিয়ে রীতিমত জল গড়ায়!  একটা জামবাটি ভর্তি পায়েস রয়েছে,কিন্তু সেটা চিনির ! আমার গুড়ের পায়েস অনেক বেশি পছন্দের! মা ফিরবার সময় ঢাকেশ্বরী থেকে আমার জন্য দুটো বলেন গুড়ের সন্দেশ আনবে জানি! আমার গুড়ের পায়েসের প্রতি হ্যাংলাপনা কাকিমার (উজ্জ্বলের মা ) বিলক্ষণ জানা আছে! হয়ত এই বিকেল গড়ালেই আমার ডাক পড়বে! কাকিমা পরিপাটি করে আসন পেতে পেটুক আমাকে পাটি সাপটা দেবেন,বাটিতে গুড়ের পায়েস! আমি জাস্ট ঠিক করে উঠতে পারি না, কোনটা আগে মুখে তুলবো! দুটোই ফাটাফাটি!সে সময় শীত বিকেলে আঁধার আমাদের পেছনের কাঁঠাল, আম বাগানে সাপটে নেমে এসেছে! কাকিমার বারান্দায় আসর জমে গেছে! সোনার মা, নান্টুর মা , বাপীর মা,কখনও অভির মা! সঙ্গে টলোমলো পায়ে সদ্য হাঁটতে শেখা অভি কিংবা তাতন! আরেকটু পরেই টিভি খুলেই  বাংলা নেটওয়ার্কে সিরিয়াল কিংবা চিত্রহার! কিংবা অভির আধো আধো গলায় উচ্চারিত ' গব্বর ' ( খবর )! কাকিমার হাত তখন উলকাটায় দ্রুত ঘুরছে! উজ্জ্বলের জন্য বুনতে বসা সোয়েটারের পুট মেলাচ্ছেন! তাতন কিংবা অভির কচি গলায় এলোমেলো আবৃত্তি! সম্পর্কের উষ্ণতা! সেই আধো সন্ধ্যায় শীত জন্মে সম্পর্কের বুনন বড্ড গাঢ়!

হিমাঙ্কের গল্প তখনো আমাদের অজানা! সকালে লেপ থেকে মুখ সরাতে টের পেতাম না বেলা চড়ছে কিনা! জানালা দিয়ে মুখ বাড়াতে দেখি আশেপাশে কোত্থাও যেনো কিছু নেই, প্রায় পুরোটা যেন সাদা চাদরে ঢেকে গিয়েছে! বাড়ি, মাঠ,রাস্তা, নয়ানজুলি কুয়াশায় সব জড়াজড়ি করে অদৃশ্য হয়ে গেছে! বারবার চোখ কচলেও কই কিছুই তো চোখে পড়ে না! ঠিক বাড়ির সামনে অত বড় পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থাকা  বট পাকুড়ের গাছ,সেটাও যেন উধাও! আজ তবে কিসের স্কুল? মা কে অবিশ্যি কথাটা বলতে সাহসে কুলোয় না! মাস্টার মশাই এই কুয়াশা ঠেলে নিশ্চয়ই আসবেন না! কিশোর রবির নীলমণি মাস্টার যেমন, আমারও তেমনি পুটনদার আসা না আসা নিয়ে মনে আশা নিরাশার দ্বন্দ্ব চলে!  আজ কি আর সূর্যের মুখ আদৌ দেখা যাবে? কত বেলা হলো? ঘড়িতে চোখ যেতেই চমকাই! প্রায় সাড়ে আটটা! আকাশের মুখ দেখে কিছুতেই ভোর ছ টা র বেশি বলা যাচ্ছে না! আমি গুটিসুটি উঠোনে দাঁড়াতেই  নাকে একটা সুবাস ঝাপটা মারে! পাশের বাড়ির নারুকাকুদের সবেধন নীলমণি খেজুর গাছে রস বুড়ো এই ভোরে চড়ে বসেছে! গত কাল ঝুলিয়ে রাখা রসের হাঁড়ি নামিয়েছে, ম ম করছে চারিদিক! সোনা,নান্টু সবাই চলে এসেছে গ্লাস হাতে! আমিও আর দেরি করি কেন? এক ছুটে ঝাপসা ওই এক চিলতে খোলা জমিতে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে রসের হাঁড়ির দিকে তৃষ্ণার্ত নয়নে তাকিয়ে থাকি! একে একে গ্লাস ভরে ওঠে টাটকা খেজুর রসে! যেমন সুবাস,তেমনি স্বাদ! আর তেমনি ঠান্ডা! অমৃতের স্বাদ পাই মনে হয়! না খেলে কি আফসোস ! আর একটু দেরিতে উঠলেই মিস করে যেতাম!

যেন অন্য জন্মের কুয়াশার গল্প মনে হয় আজকাল! হেমন্তের শেষ বেলায় হাওয়ায় সেই ফিসফিসিয়ে মিলিয়ে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়ায় কোথায়? ভোরের একটা উত্তুরে মৃদু চাপড় আলতো স্বরে জানাত,আসন্ন শীতের আগমনী ! ব্যস, কার্তিক মাসেই কম্বল, কাঁথা, আলোয়ান, মাফলার সমস্ত উঠোনে বা রোয়াকে উষ্ণ রোদে তাতিয়ে নেওয়া ! আর কদিন পর যে কুয়াশা পড়ে যাবে চরাচরে, দিগন্ত জুড়ে! মন কেমন উথাল দিয়ে ওঠে! বাজারে নতুন সবজি, আলু সুন্দরী নতুন নতুন রূপে! তখন বর্ধমানের সেই বিখ্যাত চন্দ্রমুখী আলুর রমরমা বাজার! সেদ্ধ হলে তুলতুলে মাখনের মত গলে যাচ্ছে! বেগুন এরপরই খুব সস্তা হয়ে যাবে! শীতালি  বেগুন!ভাজা হলে ঠিকঠাক, উপরের আস্তরণটা আলগা  হয়ে যাচ্ছে; ভেতরের অংশ এত এতটাই নরম , সেগুলো মুখে দিতে না দিতেই গলে যাচ্ছে গলায়! বেগুন তো না বিনয়ের অবতার! টোস্কা দেওয়ানীর বাগানের নিজে হাতে তোলা বেগুন! পোকা তাড়াতে তখন হুঁকোর  জল ছিটিয়ে দিত দেওয়ানী! সাদা সিম, পুরোট বাঁধা কপি, ধবধবে ফুলকপি , টমেটো সমস্ত নিয়ে জমাট ধূপগুড়ি মোড়ের বাজার! সবজি আসবে বড় ডোবা থেকে টাটকা গেরস্থের লাউ, গুয়াবরনগর থেকে দেশী ছোট আলুর বস্তা, রাইচাঙ্গা থেকে নতুন আলু কিংবা ওলকপি! বড় পাইকার তখনও মোড়ের বাজারে পা ফেলেনি!  বাজারে ঘুরতে মন না চাইলে রাজাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ইতিউতি এগোলেই মরা মুজনাই নদীর ওপারে নৃপেণ মিত্র কলোনী! সেখানে দেবু, লিটনদের বাড়িতে নতুন কোপানো জমিতে পালং, লাল শাক ফনফন করে বেড়ে উঠেছে! খেতে শুয়ে থাকা টাটকা মটর শুটির তাজা সুবাস ! যতদূর তাকাই হরিদ্রা বর্ণে ক্ষেত আলো হয়ে আছে সরিষার ফুলে! ইচ্ছে করলেই মুঠোয় উঠে আসবে মটর শুটি কিংবা  সরিষার ফুল! তবু দক্ষিনে মুজনাই থেকে হু হু বাতাস বাউল মনটাকে কেমন  শেকড় শুদ্ধু নাড়িয়ে দেয় শীত মুখী শুরুর বিকেলগুলোয়! রাংতা মোড়া রোদ চাড় হীন আলস্যে ঝিমিয়ে থাকে শৈশব থেকে দেখা বুড়ো শিমুল গাছের গায়ে! রোদ মরে  আসছে! কিছুক্ষণ পর গাছের মগডালে উড়ে আসবে রাজ্যের শকুন! ওদের গেরস্থালির সময় রাতে! শীত জন্মের আরো একটি দিন ফুরোবে নিছক অবহেলায়! এখানে সারি বাঁধা পুরোনো খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে নতুন নদীর একটু আভাস মেলে! আমায় শীতের বেলা শেষের এই বিস্তৃত নদীচর বড্ড টানে! এক পাশে কুলঝোপ, অগোছালো মরে যাওয়া কাশবন, চরের মাঝে মাঝে কাদায় পা গেঁথে যাচ্ছে! জল শুকিয়ে সরে গেলেও নিদর্শনরেখে গেছে!নদীর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে বড্ড লোভ হয় কোন পূর্ণিমা জ্যোস্না ফিনফিনে চাঁদের আলোয়নদীর চিকচিকে বালুচরেবেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে যেতে! সেই অবেলায় মনে হত হয়ত শীত জন্মের কোনো এক লগ্নে আমার সে সুযোগ আসতেও পারে! যাই হোক এখন দ্রুত আলোমরে যাচ্ছে!আমার পাতলা শার্টে ঠাণ্ডার প্রকোপ সইছে না! ঝুপ করে অন্ধকার ঢেকে দেবে চরাচর! ধুলো মাখা পথে পা বাড়িয়ে দেবুদের বাড়িকে পেছনে রেখে, ফেরার পথ ধরি! রবিশস্যের গন্ধে ম ম করা ক্ষেত পড়ে থাকে পেছনে, ঔদাসীন্য মাখা! শীত জন্মের ধরন বড় বেখাপ্পা! আবাহন থাকেনা, বিসর্জনও না! শুধু দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া থাকে, থাকে রিক্ততা, আর চাপা দীর্ঘশ্বাস!


 

শীত হোক সকলের

মনোমিতা চক্রবর্তী


শীত আসে স্বমহিমায়। শীত আসে রৌদ্রের মৃদু তাপে, শিউলি ঝরা আঙিনায়, শিশির ভেজা ঘাসে, খেজুর রসের হাঁড়িতে, নলেন গুড়ের গন্ধে, পিঠে পুলির উৎসবে, গরম কাপড়ের উষ্ণতায়, আড্ডায়, গ্রাম বাংলার যাত্রাপালার বিনিদ্র রাতে, সরষে ফুলের হলুদ ক্ষেতে আর মৌমাছির  গুঞ্জনে।

হেমন্তের সোনালি ডানায় ভর করেই আসে রূপের রাণী শীত। শীত মানেই - কুয়াশার চাদরে ঢাকা চারপাশ , হিমেল বাতাসে কাঁপতে থাকা শীতার্ত মানুষজন, তেল মেখে গরম জলে স্নান, পল্লী গ্রামে সন্ধ্যায় আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা উপভোগ , দুপুরের কাঁচা রোদে বসে পছন্দের গল্পের বই সঙ্গে কুলের আচার।

শীত মানেই মনে একটা ছুটির মেজাজ। শীত মানেই পরিবার বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানো , সকলে মিলে  পিকনিকে মেতে ওঠা।শীত  মানেই ভ্রমণ,  মেলা ও বিভিন্ন রকম আনন্দোৎসব।
 
পৌষ ও মাঘ এই দুই মাস শীতকাল হলেও অগ্রহায়ণ মাস থেকেই মূলত শীতকালের সূচনা। শীতের আগমনে গাছপালা, নদী নালা সবেতেই একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শীতে প্রকৃতির রূপ রুক্ষ ও শান্ত হয়ে যায় । বেশ কিছু গাছের পাতা ঝরে পড়ে এবং চারিপাশে সবুজের পরিমাণ অনেকটা কমে যায়। এই সময় দিন ছোট রাত বড় হয়ে যায়। সূর্য অনেক দেরিতে ওঠে। শীতে সূর্যের আলোতে তেমন তেজও থাকে না।

সারা রাত ধরে গাছের পাতায় শিশির জমে। সেই শিশির, ভোর রাতে ঘরের চালে বৃষ্টির মত টিপটিপ করে পড়তে থাকে। এই সময় ধান ক্ষেতে, শাক সবজির ক্ষেতে যে শিশির বিন্দু জমে থাকে তার ওপর সকালের সূর্যের নরম সোনালি আলো পড়তেই  কেমন মুক্তোর মত ঝলমল করে ওঠে ।

শীত মানেই বাহারি গরম পোশাকের সমাহার। শীত মানেই মা ,মাসি, পিসিদের নিজ হাতে তৈরি করা নানা রঙের উলের সোয়েটার, মাফলার। শীত মানেই ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। শীত মানেই টুপি, মোজা, মাফলার ,সোয়েটার , কোট, জ্যাকেটে শীত উপভোগ করা। 

সচ্ছল মানুষের জীবনে শীত আশীর্বাদ হলেও দরিদ্র মানুষের জন্য শীতকাল বড় কষ্টের । যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কিংবা ফুটপাতে বসবাস করেন তাদের কষ্টের সীমা থাকে না এসময়। ছেঁড়া কাঁথা, ছেঁড়া কম্বল গায়ে দিয়ে তাঁরা শীত নিবারণ করার চেষ্টা করেন। দিনের সূর্যের কিরণ আর রাতে  খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুনের উষ্ণতাই একমাত্র বাঁচার উপায় তাঁদের। মানুষ ছাড়াও গৃহপালিত পশু পাখি এবং বনের পশু পাখিরাও তীব্র শীতে ভীষণ কষ্ট পায়।

 সমাজের সচ্ছল ও বিত্তবান মানুষেরা যদি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং যথাসম্ভব ভাবে তাদের গরম পোশাক দিয়ে পাশে থাকার চেষ্টা করেন তবেই শীত সকলের জন্যই আরামের ও অনন্য আনন্দের ঋতুতে পরিণত হবে। আর তখনই শীতের সৌন্দর্য আমাদের জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবে।


 

শীত 

মহঃ সানোয়ার 


শীত আমার কাছে এক অদ্ভুত অনুভূতির নাম। বছরের অন্য ঋতুগুলোর ভিড়ে শীত আসে যেন এক নিঃশব্দ অতিথির মতো—চুপচাপ, অথচ তার উপস্থিতি টের না পেয়ে থাকা যায় না। সকালের শিশিরভেজা ঘাস, কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা, আর দূর থেকে ভেসে আসা লাউডস্পিকারের গলায় ভোরের প্রার্থনা—সব মিলে শীতের এক আলাদা গন্ধ, আলাদা আবহ।

ভোরবেলা জানালা খুললেই দেখা যায় চারপাশে ধূসর কুয়াশা, যেন প্রকৃতি এক বিশাল চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। তখন ঘরের ভেতরের কম্বলের উষ্ণতা ছেড়ে বাইরে বেরোনো এক রকম সাহসের কাজ। অথচ সেই সাহসের প্রতিদান মেলে এক অনন্য শান্তিতে—সূর্যের প্রথম কোমল রশ্মি যখন মুখে লাগে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা কত সুন্দর!

শীতের সকালে এক কাপ গরম চা যেন স্বর্গীয় স্বাদ এনে দেয়। নরম আলুর চপ, খেজুর গুড়ের পায়েস, অথবা ধোঁয়া ওঠা মুড়ি-চা—সবই শীতের স্বাদকে আরও গভীর করে তোলে।

তবে শীত শুধু খাবারের আনন্দ নয়, বরং অনুভূতির ঋতুও বটে। শীতের সন্ধ্যায় বন্ধুরা একত্রে আগুন পোহায়, কেউ কেউ গল্প করে, কেউ গান গায়। সেই আগুনের উষ্ণতায় যেমন শরীর গরম হয়, তেমনি মনে জাগে এক গভীর বন্ধন। শীত মানুষকে কাছে টানে—হাতের মুঠোয় হাত রেখে হেঁটে যাওয়া রাস্তার ধারে, কিংবা পরিবারের সবাই মিলে এক কম্বলের নিচে বসে গল্প শোনা—এসব মুহূর্তেই যেন জীবনের আসল উষ্ণতা খুঁজে পাওয়া যায়।

তবু শীতের এক অন্য রূপও আছে, যা আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। শীত শহরের প্রান্তে থাকা গরিব মানুষদের কাছে যতটা রোমান্টিক নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। ফাটা কম্বল, খালি পা, আর রাতের হিমেল হাওয়া তাদের জীবনে নিয়ে আসে অসহনীয় কষ্ট। তাই শীতের আনন্দের পাশাপাশি আমি সবসময় ভাবি—এই উষ্ণতা কি সবাই ভাগ পায়? যদি না পায়, তবে আমাদের উচিৎ কিছুটা উষ্ণতা তাদের দিকেও বাড়িয়ে দেওয়া।

শীত আমার কাছে তাই শুধুমাত্র ঠান্ডা নয়, এক মিশ্র অনুভূতি। এটি একদিকে আরাম, অন্যদিকে সহানুভূতির শিক্ষা। যখন দেখি গাছের পাতা ঝরে পড়ছে, প্রকৃতি নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন বুঝি—এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই নতুন জীবনের প্রস্তুতি লুকিয়ে আছে। শীতের পরেই তো আসে বসন্ত, ফুলের হাসি আর পাখির গান নিয়ে।

তাই শীত আমার মনে এক নরম, গভীর, মানবিক অনুভূতির দাগ রেখে যায়। এটি শেখায় উষ্ণতার মূল্য, সম্পর্কের মাধুর্য, এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করার সৌন্দর্য। শীত আসে, কেটে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি থেকে যায়—হৃদয়ের এক কোণে, নিঃশব্দ অথচ চিরন্তন উষ্ণতায়।


 

 শীতের চিঠি

 মিত্রা তোমাকে

   চিত্রা পাল 


মিত্রা,

তোমার চিঠি পেয়েছি। তুমি হঠাত্‌ এমন চিঠি লিখবে, লিখে আবার আগের দিনের মতো ডাকে পাঠাবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। কেননা এখন সবাই চলভাষ নির্ভর। চিঠি ব্যাপারটাই অতীতের,স্বপ্নের।তবু স্বপ্ন কখনও কখনও সত্যি হয়,তেমন করে এ স্বপ্নও সত্যি হলো বোধ হয়।তুমি লিখেছো, পশ্চিমের মরু অঞ্চল থেকে সদ্য কোলকাতায় এসেছো। জানতে চেয়েছো, এই শীতে এখানে কেমন আছি। সত্যি কথা বলতে গেলে বলতে হয় এই শীতে আমি ভালোই আছি আর ভালোই থাকি।এই তো সবে দুর্গাপুজো গেলো। কালীপুজোর আলোর রোশনাই শেষ হলো। এবার শীত আসার পালা। আমাদের এই উত্তরবঙ্গে কালীপুজোর পরে গোপাষ্টমির অনুষ্ঠানের পরেই যেন ঝপ করে শীত এসে পড়ে,মেল ট্রেনের স্টেশনের মতো।  এদিকে দিনের বেলাও খুব ছোট হয়ে যায়। শহর ছাড়িয়ে একটু গ্রামের দিকে গেলেই দেখা যাবে, বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে পাকা ধানের গাদা। যাদের ধান কোটার ছাম আছে, তারা ছামে ধান কুটে কিছুটা চাল বানায়। তবে এখন আর কেউ ওভাবে চাল কোটে না,  সবাই মেশিনেই চাল করে আনে। সর্ষে ক্ষেত ফুলে ফুলে আলোয় ঝলমল। শীতের সকালে   আকাশ  খবর দিলো,আজ তোমাদের একটা ভালো উপহার দেবো, উত্তর দিকে সকালে দেখো, পেয়ে যাবে।কিন্তু উপহার আসে না। হঠাত্‌ একদিন তাকিয়ে দেখি, চা বাগান ছাড়িয়ে ওই উত্তর সীমানা জুড়ে সপারিষদ হিমালয় বিরাজমান, সঙ্গে রাজাধিরাজ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কি অপরূপ শোভা তার কি বিচিত্র  সাজ, ক্ষণে ক্ষণে বদলায় তার রঙের  বাহার। এমন উপহার পেয়ে আমরা বিস্মিত, আনন্দিত তো বটেই।ক্রমে ক্রমে শীত বাড়তে থাকে, তার সঙ্গে সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে পোশাকের। মাথা থেকে পা অব্দি  এমন মোড়া যে মানুষ চেনা দায়। তার মধ্যে একদিন খবর পাওয়া গেলো, যে দার্জিলিং এ তুষার পাত শুরু হয়েছে। আমরা চললাম দার্জিলিং এ তুষারপাত উপভোগ করতে। এমন শীতে সকালে উঠতেই ইচ্ছা করে না। তবু কাঁচের জানলার ওপারে যখন ঝুর ঝুর করে বরফ পড়ে চারদিক আচ্ছন্ন করে ফেললো সে এক দেখার দৃশ্য। সমস্ত তুষারের আচ্ছাদনে ঢাকা।এই শীত যে কতখানি,তোমরা দক্ষিণে বসে ভাবতেই পারবে না। রাস্তায় বরফ, জল একেবারে ঠান্ডা বরফ।বরফের রাস্তা পেরিয়ে এলাম টাইগার হিল পাহাড়ে। সূর্যের আলো এতো ঠান্ডা কখনো পাইনি। তুষারশুভ্র বরফের চূড়া লাল, পরে সোনালী হয়ে রজত শুভ্র হয়ে যাওয়ায় এক অপার্থিব পরিবেশ। আবার স্তূপিকৃত বরফের ওপর দিয়ে ফেরা এক অনন্য অনুভূতি। এসব আমাদের উত্তরের শীতেরই একেবারে নিজস্ব। একবার শীতে চলে এসো।শীত পাবে, তবে বরফ পাবে কিনা তা আবহাওয়াই বলতে পারবে। শুভেচ্ছা সহ-       



 

শীতের আমেজ 

শুভেন্দু নন্দী 

প্রকৃতি বিভিন্ন রং, রূপ, স্বাদ, রস নিয়ে আসেন এই বিরাট ধরণীতলে।  গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরত, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত -এই ঋতুগুলোর বিভিন্ন সময়ে আগমনের কারণে কখনও রুদ্র রূপ, কখনও শীত বা ঠান্ডার মেজাজ, কখনও প্রবল ঝড় বৃষ্টি, নিম্ন চাপ, হিমেল আবহাওয়া, আবার হালকা ঠান্ডা ও গরমের মিশ্র অনুভূতি দারুনভাবে প্রকট হয়ে পড়ে। সূর্যের বেশ কিছুটা সময় দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে, আবার উত্তর গোলার্ধর দিকে ধাবমানের ব্যাপারটা ঘটে। ফলে তাপমাত্রার পারদ দারুনভাবে উপরে ও নীচে ওঠানামা করে থাকে। সমতল শহরে ও শৈল শহরে উষ্ণতার ভীষণ হেরফের লক্ষ্য করা যায়।। শরত কালের স্নিগ্ধ শান্ত রূপ, আকাশে ভেসে বেড়ানো শ্বেতশুভ্র পেঁজা তুলোর মত মেঘ, সোনালী রৌদ্র -বাসী হলুদের মতো মিঠে, চারিদিকে হাওয়ায় দোদুল্যমান কাশ ফুলের সৌন্দর্য, শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো, হেমন্তে শিশির ভেজা শিউলি ফুলের সুবাস আর বসন্তের রক্ত রাঙা শিমুল ও পলাশের মাঝে দোলের আবির ও রংএ মনে হিল্লোল জাগানো। তবে এর মাঝে শীত ঋতুর আগমন যেন অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। সকালে মেঘ রৌদ্রের লুকোচুরি খেলা, কুয়াশা, আবার কখনোও মেঘলা আকাশ, ঠান্ডার আমেজ, তাপমাত্রার পারদ নিম্ন মুখী হওয়া, হালকা রোদে গা মেখে নেওয়া, আবার শৈত্য প্রবাহে শীতকে জব্দ করার রকমারি শীতবস্ত্র তো হাতের কাছেই আছে, বাক্স বন্দী, আলমারি বন্দী হয়ে। কম্বল, লেপ গায়ে নিয়ে গরম উপভোগ করার একটা আলাদা মজা আছে। ঘন্টায় ঘন্টায় চা -কফি। খেজুরের রস, নলেন গুড়ের সন্দেশ কিংবা সিজনাল ফল কমলালেবু খেতে খেতে গরম উপভোগ করা। কোট -প্যান্ট,সোয়েটার, জ্যাকেট,পুলভার, আলোয়ান, বাঁদরী টুপি, মাফলার, স্ল্যাক্স, নাইলন ও পশমি হাত -পা মোজা,শাল, কটন ও পশমি কম্বল- ভাদ্র মাসের সূর্যের গন গনে তাপে সেগুলো বের করে আবার নতুন করে সূর্যের তাপ দগ্ধ করা হয়, যাতে ভেতরের ভ্যাপসা গন্ধ দুরীভূত হয়।ঠান্ডা যত বাড়ে, দেহের ওজনও তত বৃদ্ধি পায়। উচ্চ মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, ধনীদের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে। এগুলো কিন্তু নিঃস্ব ও প্রান্তিক গোষ্ঠীভুক্ত দের সামর্থ্যর এক্কেবারে বাইরে। কাগজ, খড়কুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে বাধ্য হয়। সহৃদয় সংস্থা থেকে যদিও এই সব নিরন্ন, নিঃস্ব, গরিব দুঃখীদের শীতকালীন মরসুমে কম্বল ইত্যাদি প্রদানের ব্যবস্থা থাকে, তবু সেটা যেন লটারীতে টাকা পাওয়ার মতো ব্যাপার। পৌষে কনকনে ঠান্ডা। তার মধ্যে বাঙালী দের ঘরে ঘরে পৌষ-পার্বন আর পিঠে, পুলি জম্পেশ করে খাওয়ার মধ্যে বিরাট আনন্দ।  আর এই ঠান্ডায় ঘরে কিংবা বাইরে বনভোজনের মতো আড্ডায় মেতে ওঠা, ফরেস্টে ও খোলা মাঠে রান্না বান্না আর পড়ন্ত বিকেলে মিঠে বাসি হলুদের মতো রোদে বন্ধুবান্ধব্দের নিয়ে বসে খাওয়া ও শীত নিবারণের তৃপ্তির আমেজ অন্য মাত্রা বহন করে।


 

এলো যে শীতের বেলা

অনিতা নাগ 

দুর্গাপূজো হয়ে গেলেই বাতাসে কেমন এক বিষন্নতার সুর বাজে। ঝুপ করে সন্ধ্যে হয়ে যায়। ঘরে ঘরে শাঁখ বেজে উঠে। সকালের শিউলি তলা তেমন করে আর ফুলে ভরে উঠে না৷ বাতাসে এক শুষ্কতা। গায়ের চামড়ায় টান ধরে। তারজন্য অবশ্য বাহারী সব লোশন, ক্রিমের ব্যবস্থা আছে। মুঠোফোনে নাম লিখে সার্চ বোতাম টিপলেই হলো। শীতের বেলায় কেমন এক বিষণ্নতা গা মাখামাখি করে থাকে। ফলের ঝুরিতে রাখা কমলালেবু গুলো শুকিয়ে যায়। খাওয়া হয় না। মনে পড়ে যায় ছাদে মাদুর পেতে মিঠে রোদ গায়ে মেখে কমলালবু খাওয়ার কথা। শীত মানেই উজ্জ্বলতা, নানান রঙের বাহার। গুড়, মোয়া, সরুচাকলী! সকালের স্কুল সেরে ফিরে হাত মুখ ধোয়া হলে মা লাল টমেটো মাথার কাঁটা দিয়ে উপরটা ফুটো ফুটো করে নুন চিনি ছড়িয়ে দিতেন। ছাদের রোদে ঘুরে ঘুরে সেই টমেটো খাওয়ার কি যে মজা ছিলো! কতো সহজ উপায়ে ভিটামিন সি খাওয়ানো হতো ভাবলে অবাক লাগে। বাবা সাইকেলে বাজার করে আসতেন। কত্তো তরকারী! মা গজগজ করতেন। একসাথে তিনরকম কপি, পালং শাক, মূলো, বীট, গাজর! এতো বাজার রাখবো কোথায়! তখন তো ফ্রীজ ছিলো না। বেতের ঝুরিতে সব সাজিয়ে রাখতেন। মা। বীট, গাজর, আলু সেদ্ধ করে বাবা স্যালড বানাতেন। খুব অপছন্দের খাওয়া। তবু মা’র বকুনির ভয়ে খেতে হতো। মা বাজারের থলে উপুর করলেই সবুজ, লাল, কমলা, কতো যে রঙের বাহার। খুব ভালো লাগতো। মা’ র যে কতো কষ্ট হতো এখন বুঝি। শীতকালে আরেকটা আকর্ষণ ছিলো সকালে আধ সেদ্ধ ডিম খেতে পাওয়ার আনন্দ। ঠাকুমা মুরগির ডিম ঢুকতে দিতেন না। শীতকাল একটা কলাই এর বাটি আলাদা করে রাখা থাকতো রান্না ঘরের কোণায়। মা জল গরম করে ঢেলে দিতেন কলাই এর বাটিতে রাখা ডিমের উপর। কিছুক্ষণ পর সেই ডিম ফাটিয়ে নুন মরিচ দিয়ে খেতাম। সে’ স্বাদ আজো ভুলিনি। আজ আর মুরগীর ডিমের বাছবিচার নেই। একার সংসারে নিয়ম নিজের মতোই চলে। কিন্তু আজ আর অমন করে ডিম খাবার ইচ্ছেই করে না। মনে মনে সেই স্বাদ আগলে রেখেছি। মা একা হাতে উনুনের আঁচে সকলের জন্য রান্না করতেন, সব গুছিয়ে রাখতেন। রান্নার কাজ সেরে খাওয়ার পাট মিটিয়ে যে সময়টুকু পেতেন তখন বসতেন উল কাঁটা নিয়ে। ছোটবেলায় আমরা কেনা সোয়েটার পরিনি কখনো। মা বানাতেন। আমাদের পাড়ায় সাহিত্যিক বিমল মিত্র থাকতেন। তার স্ত্রীর কাছে মা নতুন ডিজাইন তুলতে যেতেন। সেই নতুন ডিজাইন দিয়ে নতুন সোয়েটার বানাতেন। মা’ র কাছ থেকেই আমার উল বোনা শেখা। নানান রঙের উলে ডিজাইন দিয়ে সোয়েটার বানাতে আমারও খুব ভালো লাগে। তবে আজকাল আর হাতে বোনা সোয়েটারের চল তেমন নেই।নিত্য নতুন বাহারী সোয়েটারের মেলা দোকানে, অনলাইনে। সোয়েটারের জায়গায় এসেছে রকমারী জ্যাকেট। তখন সে'সব ছিলো না।আমি নাতির জন্য বানাই। সে বড় আনন্দ করে পড়ে। শীত মানে ছাদে গাছ ভর্তি ফুল। বাবার ছিলো ফুলের শখ। নানান রঙের গাদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া আলো করে থাকতো। ছাদে মাদুর পেতে লেপ কম্বল রোদে দেওয়া হতো। সেই গরম লেপে গড়াগড়ি খেতাম। এখন তো ভারী লেপ গায়ে দিতে পারিনা। বাহারী কম্বল, জয়পুরী হাল্কা রজাই। কতো বাহার সে’ সব জিনিষের। শুধু শীতটা অধরা হয়ে গেছে। কলকাতায় ক'দিনই বা শীত পড়ে! একটা পাতলা চাদরেই হয়ে যায়। বাইরে বেরুলে বাহারী স্টোল জড়িয়ে নিলেই হলো। এখনছোট ব্যালকনিতে টবে যেটুকু গাছ হয়, তাতেই আমার সখের পিটুনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া গাদা। রঙটাকে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা। দু'জনের সংসারে ক'টা আর তরকারী লাগে! তারপর খাওয়ায় নানান বাধানিষেধ। তবু কড়াইশুঁটি, পিয়াজকলি, ধনেপাতার সবুজ রঙে কেমন জাদু আছে, আছে টমেটো। এপন ূবশ্য সারাবছর টমেটো পাওয়া যায়। শীতকাল মানেই ইতুপূজো, নতুন গুড়, পাটালী, নবান্ন, কড়াইশুঁটির পিঠে, কচুরী, ডালডার গন্ধ। এমন কতো যে স্মৃতি। অগ্রহায়ন মাসের রববার ইতুপূজা হয়। আজও পালন করি। ইতুকে নবান্ন দেওয়া হয়। নতুন গুড়, নতুন চাল, নতুন তরকারী, নতুন গুড়। ন’ রকম নতুন জিনিষ দিয়ে কাঁচা দুধে নবান্ন ইতু মা’ কে নিবেদন করা হতো। সেই নবান্ন প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ। এইসময় বাংলায় নতুন ফষল, নতুন ধাণের সময়। সব পূজো, সব উৎসবের সাথে সামাজিক যোগসূত্র থাকে। আবহমান কাল ধরে সেই ঐতিহ্যের ধারা এগিয়ে চলেছে। যতোই পরিবর্তন আসুক, স্রিগি, জোম্যাটো থেকে যতোই লোভনীয় খাবার আসুক, পিঠে পাটিসাপটা, পায়েস আজও জনপ্রিয়। রান্নাঘরের উনুনে লোহার চাটুতে বেগুনের বোঁটা দিয়ে তেল মাখিয়ে ঠাকুমা সরুচাকলী বানাতেন। সাথে ঝোলা খেজুর গুড়। সপ’ স্বাদের ভাগ হবে না। ছেলে মেয়ে বাইরে থাকে,দোকলার সংসারে পিঠে পায়েস বানালেও তেমন হৈহৈ করে খাওয়ার কেউ নেই। তবু ঐতিহ্য আগলে রাখা। পৌষ মাসে লক্ষীপূজো হতো। নতুন ধান উঠলে লক্ষির ধান পাল্টানো হতো। ঠাকুরমশায় দাদু আসতেন পূজো করতে। মাটির লক্ষীর হাঁড়ি থেকে কুনকে, কাঠের প্যাঁচা, রূপোর গাছকৌটো বার করে কাঠের জলচৌকিতে আলপনা দিয়ে লাল বেনারসী পড়িয়ে লক্ষিকে সাজাতেন মা। চৌকাঠে চালের গুঁড়োর আলপনা, সিঁড়িতে লক্ষীর পা। পিতলের হাঁড়িতে আতপ চাল ফোটার গন্ধ! এমন কতো স্মৃতি শীতকালকে ছুঁয়ে আছে। গত কয়েকবছর শীতে কলকাতার বাইরে কাটছে। শীতকে তাই তেমন করে ধরতে পারি না। তবু শীত জড়িয়ে থাকে। শীতের ওম্ আগলে রাখি। আগলে রাখি স্মৃতিতে পরম সোহাগে।


 


শীত

চিরঞ্জিত মন্ডল 

শীত আসে বাতাসের নিশ্বাসে ভেসে, ধুলোর ওপর নীলচে আলো ছড়িয়ে। মনে হয়, রাতের নিস্তব্ধতার গহীন থেকে কেউ একজন আলতো করে পৃথিবীর কোল ঘেঁষে হেঁটে গেছে, রেখে গেছে ঠান্ডার স্বচ্ছ অক্ষর। ভোরবেলা জানলার কাচে জমে ওঠা শিশির যেন প্রকৃতির লেখা অচেনা কবিতাখানি, যাকে বুঝতে হলে হৃদয়ের ভেতর একটু নীরবতা রাখতে হয়।

শীতের সকাল অন্যরকম। কুয়াশা ঝুলে থাকে মাটির খুব কাছাকাছি—একটা অর্ধস্বপ্নের মতো। দূর থেকে ভেসে আসে গ্রামের মুরগির ডাকার কর্কশ সুর, কিন্তু সেই সুরও কুয়াশার তুলোর ভেতর মিশে নরম হয়ে যায়। পথঘাট, গাছের ডাল, মানুষের মুখ—সব যেন সাদা ধোঁয়ার চাদরে একাকার। কাকের কালো ডানায় শীতরঙা আলো পড়লে মনে হয় পুরোনো কোনো জলরঙের ছবির ওপর ধুলোবালি জমে আছে। শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখলে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে ধাতব ঠান্ডা; অথচ এই ঠান্ডাতেই আছে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা, যেন শীত প্রকৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে নিঃশব্দ তুলি চালিয়ে।

দুপুরের রোদ শীতের সবচেয়ে কোমল মুখ। রোদ যেন আলো নয়, আদিম কোনো উষ্ণতার ফিসফিস। বারান্দায় বসে ধূসর আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় সূর্য হাত বাড়িয়ে মানুষের কাঁধে হাত রাখছে। মাটিতে শুকোতে দেওয়া ধানের গাদায় রোদের নরম কমলা আভা পড়ে যেন দিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো উৎসব ফুটে ওঠে। শিম, মুলা, ফুলকপির সব্জিবাজারে এই রোদের গন্ধ মিশে থাকে—খসখসে, অথচ জীবন্ত।






শীতের বিকেল নরম রঙে আঁকা। কীর্তনখোলের দূরাগত শব্দ ভেসে আসে, মাঠে ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি, আর আকাশে ঘুড়ির ধাতব রঙ—সব মিলিয়ে এই সময়টা ঠিক যেন কোনো পুরোনো গল্পের পাতা। বিকেলের আলোয় নদীর জলে ঝিলিক ওঠে—মাঝেমাঝে মনে হয়, নদীর বুকে যেন শীতের অক্ষর ভেসে থাকে। পাখিরা যখন দল বেঁধে বাসায় ফেরে, তাদের ডানার সুরে শীতের অন্তিম আলোটা নরম হয়ে আসে।

রাত ঘনিয়ে এলে শীতের আসল মুখ উন্মোচিত হয়। আকাশের তারাগুলো কাছে নেমে এসে ঝরঝর করে ঝিকমিক করে। দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসে পিঠে-পুলির গন্ধ, আলো-আঁধারের মধ্যে ওঠে ধোঁয়া। কম্বলের তলা থেকে পৃথিবীর শব্দগুলি দূরবর্তী মনে হয়, যেন সমস্ত কলরোল শীত চুরি করে নিয়ে গেছে। তবু এই গভীর নীরবতার মধ্যেও আছে অদ্ভুত এক আরাম, এক অনুচ্চারিত উষ্ণতা। শীতের রাত যেন ঘুমন্ত পৃথিবীর নিঃশ্বাস।

কিন্তু শীত শুধু কবিতা নয়। কঠোর ওঠানামার সিঁড়ি বেয়ে সে পৌঁছে যায় পথশিশুর জীর্ণ চাদরের ভাঁজে, খড়কুটো আগুনের তাপে উষ্ণ হতে চাওয়া অতিশ্রমিকের হাতে। শীতের কামড় যে কতটা তীক্ষ্ণ হতে পারে, তা জানে সেই মানুষরা, যাদের কাছে শীতের রূপ মানেই সংগ্রামের প্রতিদিনের অভিধান। শীতের সৌন্দর্য যেমন সম্পূর্ণ, তার এই কঠোরতাও তেমনই সত্য।

তবু শীতের আলতো ছোঁয়ায় মানুষ একটু থামে, একটু ভেবে ওঠে। হৃদয়ের গোপন অঙ্গনে জমে থাকা ধুলোবালি ঝরঝর করে নেমে যায়। প্রকৃতি যখন কুয়াশার পাতায় তার নিঃশব্দ কবিতা লেখে, মানুষ তখন তার নিজের ভেতরের চুপ করে থাকা আলোটা খুঁজে পায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শীত হয়ে ওঠে শুধু ঋতু নয়—একটি অনুভূতি, একটি স্মৃতি, একটি অব্যক্ত সৌন্দর্য, যা হৃদয়ে রয়ে যায় নিঃশব্দ কাব্যের মতো।