Sunday, February 1, 2026


 

মিরজাফর

উৎপলেন্দু পাল  


আপনার ঘরে ক'জন মিরজাফর, খোঁজ রাখেন জাঁহাপনা? 
পৃথিবীর বাতাসে এখন সন্দেহের পোড়া গন্ধ  
মুখ ও মুখোশ মিশে আছে একসাথে বেমালুম  
পোষা কুকুরও কখন 'ঘেউ' করে ওঠে বোঝা দায় 
সতর্কতার কোনও বিশেষ চরম বিন্দু নেই আজকাল  
সাজানো পুতুলগুলোর ভেতরেও মিরজাফরের খোঁজ করুন। 

আপনার ভেতরেও ক'জন মিরজাফর, জানেন কি জাঁহাপনা? 
ধমনীর রক্তস্রোতেও মিশে থাকে বেইমানির বিষ 
মুখের প্রসাধন সরে গেলে দেখা দেয় রক্তমুখ ক্ষত 
বেইমানির রক্তবীজ কখন যে রক্তে মেশে কে জানে 
চিরুণিতল্লাসীর ফাঁক গলে ঢুকে যায় কে কখন কে জানে 
একবার নিজের অন্দরেও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন নিয়োগ করুন। 



 

পথের পথিক
কেতকী বসু



যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত বলে ধরে নেওয়া কথা গুলো
চোখের সামনেই কেমন যেনো ফাঁকা আর অলস মনে হয়
দুর্দিনের ঘরে ব্যথা হয়
পড়ে থাকা রাস্তায় রাশি রাশি ধুলো
ইঁট,পাথরের  কংক্রিটে মিশে গিয়ে
পথ হারালে
বেনামি পরিচয়ে  নতুন করে ভাব হয়

 রাস্তার গতিপথ মাপা হয় দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে

আড়ম্বরের চমকে পিচ্ ঢালা হলে রাস্তার
নূন্যতম হিসেব বদলে যায়
বহু সমাগম আর নতুনের সূচনায় পথ তখন
আপন খেয়ালে বুকে নিয়ে বেড়ায় জমানো আনন্দ
দরকারি সমস্ত কাজ খুঁজে নিয়ে হিসাব মেটায়
সরকারি দপ্তরে
তারপর যথেষ্ট নাম নিয়ে তর্ক চলতে থাকলে
মিথ্যা হয় অজুহাত আর সমস্ত পরিকল্পনা
সন্ধ্যার আলো জ্বলে উঠলে রাস্তার উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়
মনে পড়ে অন্ধকার পথের সমস্ত অন্ধ কথা গুলো।


 

শ্রমণের পাঠ

অমিত আভা 


কতটা নত হলে
                         অহং ছাড়ে হাত—
এই প্রশ্নেই শুরু,
                        এই প্রশ্নেই শেষ।

বুদ্ধ সামনে,
                  পেছনে ব্রাহ্মণের ছায়া—
পা এগোয়, সংস্কার টানে।

প্রতিদিন বুকের ভেতর
                      একটুখানি আসে আলো,
নাম নেই, অবতারও নেই।

আলো চলে গেলে
                          আমি আবার যাযাবর—
কাঁধে অনেক প্রশ্ন,
                গায়ে রহস্যের পুরোনো চাদর।



 

সমুদ্র জীবন 
প্রতিভা পাল

অনন্ত সমুদ্র। অগাধ জলরাশি। অযুত ঢেউ।

         পার ভাঙা ঢেউগুলো বারবার গড়ে ওঠে অতল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নতুন রূপে। সমুদ্র কি খবর রাখে সেসব ভাঙা-গড়ার?
         পথ ভোলা নাবিক দিক হারিয়ে ভেসে চলে শুধু। একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। অন্য দিক। ধৈর্যর পরীক্ষা যেন কোনও। নোঙর বাঁধে হয়তো কোনও দ্বীপে। সে কি ফিরে পায় তার গন্তব্য কখনও? 

         জন্মান্তর-বিস্মৃত জন্ম বেখেয়ালি সেই ঢেউয়ের মতো। পথ ভোলা নাবিকের মতো। ভেসে চলা খড়কুটোর মতো। যার উৎস, গন্তব্য নামহীন। তবু এগিয়ে চলা কেবল নিজের খোঁজে। আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। সমর্পণ প্রয়োজন সমুদ্রর মতো গহীন জীবনের কাছে। অতল ছুঁয়ে আলো হওয়া প্রয়োজন। তবেই এগিয়ে চলা। তবেই গন্তব্য ছোঁয়া। 

         সমুদ্র খবর রাখে না। ঢেউ জানে ভাঙনের ব্যথা। নাবিক জানে পথ হারানোর অসহায়তা। জীবন জানে শুধু প্রবাহ.....


 

মা

নবনীতা (সরকার)


অজস্র মেয়ে জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মা নামে
ঈশ্বর এসে দাঁড়ায় শিয়রে
প্রশান্তির নিবিড় ছায়া মেখে নেমে আসে
এক টুকরো স্বর্গ ।

শতাধিক নদী জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
মৃত্যু থেমে যায় দুয়ারে
মুছে যায় বিরহ, অনাদর আর..
বেদনার গভীর কালো দাগ ।

অনেক অনেক বৃক্ষ জন্ম পেরিয়ে
উঠে আসে মা
বিশ্বাসের বাসা বোনে পাখি
চোখে ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন
বুকে প্রত্যয় ,থেমে যায় ঝড়

অজস্র মানবী জন্ম পেরিয়ে
থেকে যায় মায়েদের সর্বংসহা ,
অপরাজেয় অস্তিত্ব
আতঙ্কের আগুন ছাই চাপা পড়ে
ভাতের মিষ্টি গন্ধে
আলো হয়ে ওঠে 
কতগুলি চোখ,ঘর আর...
এক টুকরো সরল পৃথিবী ।


 

মানুষ পোড়া গন্ধ 

প্রাণেশ পাল 

পূবের হাওয়ায় মানুষ পোড়া গন্ধ 
হিমেল বাতাসে ধর্মীয় দীর্ঘশ্বাস 
আমাদের চেতনা ভারী হয়ে আসছে....

মানুষ পুড়ছে নাকি উগ্র ধর্মান্ধতা
পুড়ে যাওয়া ধর্মে খুঁজে ফিরি
আমাদের বিবেক, মনুষ্যত্ব, সংস্কৃতি....

আগুনের লেলিহান শিখা
লেখা থাকে না ধর্মের নাম
শুধুই পুড়ে যায় আমাদের অস্তিত্ব....


 

তমোহন হিয়াজ্যোতি

সম্রাট দাস 


পৃথিবী গভীর-ক্লান্ত! ব্যাপক ব্যস্ত! অস্থির!
খাদ্য-সংগ্রহরত পিঁপড়েটি যেমন ব্যস্ত!
উদ্দেশ্যহীন অথচ উদ্দেশ্যযুক্ত ব্যস্ততার অলীক মাথাব্যথা!
ভাবহীন জড়বাদী বৃথা কবিতা রচনা, 
অথবা ভাবনাহীন জড়তাগ্রস্ত নিষ্ফল সংগীত সাধনায়
ব্যস্ত কত শত প্রাণ!
চঞ্চল হৃদয়ে সুমিষ্ট রসপূর্ণ ফলের ছিবড়ে খাওয়ার ব্যস্ততা!
তামসিক ব্যস্ততা! 

এহেন ব্যস্ততা মাঝে কতিপয়ের হৃদয়ে নিভৃতে 
ঈশ্বর এসে অভয় দিয়ে যায়;
অমৃত রেখে যায় বুকের ভেতর! 
তারা শিউলি অথবা গার্ডেনিয়ার দৈব সুগন্ধ আস্বাদন করে 
সকরুণ-অমিয়-প্রফুল্লহৃদয় দিয়ে;
ব্যস্ততাতেও তৃপ্ত থাকে ব্যস্ত রবির মতো। 
তখন নির্গুণ কাব্য সাধনা অথবা সংগীত আরাধনায় মেতে ওঠে প্রাণ। 
তখন নিজেকে মনে হয় অনাবিল সূর্যকিরণ 
অথবা অমলিন সাগরকল্লোল।
তখন তমোহন হিয়াজ্যোতি এসে ঈশ্বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়!


 

নরকভোগের পরে 

রাজু রায় 


এতসব উন্মাদনা এতসব বোধ বিরোধ
এতসব লালসা এতসব ঘৃণা
একদিন আগুনে আহুতি পাবে
তবে শেষ কি এখানেই
না এরপরেও বাকি থাকে কিছু
শুঁয়োপোকার প্রজাপতি তে বিবর্তনের মতো
পড়ে থাকে কী সুন্দর ,রঙিন মুক্ত গোটাজীবন
পঙ্কিল কদর্যময় জীবনের খোলস চিরে
ফুটবে কী সোনালী পদ্ম
যদি তা না হয় এরপরেও শতগুণে আবার ফিরে পাই নরক ভোগ
ক্ষুদার জ্বালায় পিতার বুক চিরে শুষে খাই রক্ত
তাড়নার বেগে আপন ভগিনীর স্তন যোনি ছিঁড়ে কামড়ে
শান্ত করি নিজপশুত্ব
তবে কী সার দেহের, কী সার চেতনার
দেহহীন চেতনাহীন আমি যেন মিশে থাকি বাইজীর ঘুঙুরের শব্দে বা বধূর সিঁথির অক্ষয় সিঁদুরে।


 

দেশদ্রোহী

শংকর হালদার 


ভদ্রতার সমাবেশ...
ভাষণে বর্বর শব্দ...
হাতে হাতে ওড়ায় দামাল মেঘ 
চোখে চোখে জন্মনেয় লোভীর ষড়যন্ত্র 
সমাজে কম্পজ্বর...

শিরায় শিরায় মৃত্যুর হুমকি
তীব্রনখে আলাপ জমায় ছিন্নস্বপ্ন 
ক্ষুরপায়ে ওড়ায় মিহিন সাদা ধূলো।

বিধির হয়ে ভাগ্য লেখে,
পিপাসায় আঁকে ক্ষতচিহ্ন...
দারুণ বিষণ্ণতায়...

হতাশার ঢেউ তোলে,
স্বজাতির পরিচয় ভোলে কোন মহিমায়?
যার জন্ম ও মৃত্যুর পরিচয় ভারতবাসী।

ওরা নিশান ওড়ায়...
ওদের ছায়া দেখা যায়...
ছায়ায় লেখে আপন নাম...
নামে আশ্রয় খোঁজে আপামরজনতা।

স্বাধীনতার গায়ে আঁকে কলঙ্ক
মৃত্যুর মিছিলে বদলায় রং 
শোকের ছায়ায় কঙ্কাবতীর গল্প...


 

ফেব্রুয়ারি তোমাকে...
আকাশলীনা ঢোল 

তোমাকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে আজ,
অনেককিছু জানাতে ইচ্ছে করছে,
কী জানাব? অভিবাদন? শ্রদ্ধা?
না প্রতিবাদ?
নাকি বরণ করে নেব নতুন বসন্তের 
পলাশ রাঙা ভোরে?
তুমি তো প্রণয়ের মাস, তোমার 
বুকে মাঝেমাঝেই জেগে ওঠে 
গোলাপ - টিউলিপের সৌন্দর্য, সবুজের 
সমারোহ, রঙের উৎসব।
আবার মাঝেমাঝে শুনতে পাই গুলির আওয়াজ -
ফাঁসির মঞ্চের আর্তনাদ কিংবা 
ভাষার লড়াইয়ে সামিল হওয়া বীর 
সন্তানদলের শোণিতের ভেতর থেকে 
উঠে আসা প্রতিবাদী স্লোগানও 
শুনতে পাই মাঝেমাঝে -
প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে তোমাকে তাই,
তুমি কে? তুমি কি পলাশের মাস?
নাকি বিপ্লবের?
তোমার সুকোমল সকালে বেকার প্রেমিকার 
বুকে জেগে ওঠে আগুন,
সন্তানহারা মায়ের চোখের শিশির জমাট 
বেঁধে বরফ হয়ে যায়,
তবু বনে বনে জেগে ওঠে কিশলয়,
পুঞ্জিত নীরবতা ভাঙতে তাকিয়ে থাকে 
শিমূল-পলাশ-মহুয়ার রক্তচক্ষু,
মন কেমনিয়া বিকেল নিয়ে আসে 
ফাল্গুনী হাওয়া -
মনে ধাঁধা লেগে যায়,
ফেব্রুয়ারি! তুমি কে? তুমি কার?
কীই বা বলার আছে তোমাকে? 


 

একটি  অভিমানোত্তর  সংবর্ধনার খসড়া 

আসিফ আলতাফ



আপনাকে সংবর্ধনা দেয়া হবে
অভিমানোত্তর সংবর্ধনা;

এনেছি কাঁচা হলুদ রোদ;
চুলের জন্য কিছু বুনো বাতাস  এনে রাখা হয়েছে
আপনার কেশরাশির উড়বার ইচ্ছে হলে তারা তা পূরণ করবে;

আঙুলের ডগায় জমা রেখেছি মৌন শিশিরের উত্তাপ
আপনাকে চাঙা রাখার জন্য
মূলত এসবের আয়োজন;

সংবর্ধনা হবে অথচ উত্তরীয় হবেনা  তা কি হয় বলুন;

মন খারাপ করবেন না
তারও ব্যবস্থ আছে,
একটি চড়ূইয়ের কাছ থেকে আমি মন ভালো রাখার উত্তরীয়
উইল করে নিয়েছি
ওটাই হবে আপনার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শ্রেষ্ঠ চমক;

থাকবে আরো অনেক কিছুই
বলতে চাই না
বললে আর সারপ্রাইজ থাকলো কোথায়;

একটু ধৈর্য তো ধরতেই হবে
মাত্র একটা কালোজাম–রাত পার হলেই দেয়া হবে
এই  সংবর্ধনা;

আপনাকে এখন গণিত চর্চা বাদ দিয়ে সাহিত্য চর্চায়
মনোযোগী হবার পরামর্শ দিচ্ছি
কেননা অংক কষার জন্য এখন উপযুক্ত সময় নয়।




 

আফসোস

 মহঃ সা নো য়া র



আমাকে ছেড়ে গিয়ে তুমি যদি সুখী না হও,
তবে তোমার জন্য আমার আফসোস হবে।
কারণ ভালোবাসা ছিল নিঃশর্ত,
বিনিময়ে কিছু চাওয়ার সাহস আমার কখনো ছিল না।
আমি চেয়েছিলাম তোমার হাসি,
তা যদি আমার অনুপস্থিতিতেও না ফোটে—
তবে বুঝবো,
তুমি শুধু আমাকে নয়, নিজেকেও হারালে।
যে পথ তুমি বেছে নিলে মুক্তির নামে,
সেই পথে যদি শান্তি না মেলে,
আমার চোখ ভিজবে না অভিমানে—
ভিজবে শুধুই নীরব দুঃখে।
কারণ কাউকে ছেড়ে যাওয়া সহজ,
কিন্তু সুখকে বয়ে নেওয়া কঠিন।
আমাকে হারিয়ে যদি তুমি সুখী না হও,
তবে সত্যিই—
তোমার জন্য আমার আফসোস হবে।


 

স্মৃতি

মন্দিরা ঘোষ 


স্মৃতি যেন শ্বেত কুঞ্ঝটিকা মতো 
স্বচ্ছ তবুও যেন স্বপ্নের মতো আবছা 
সুন্দর মুহূর্তগুলোকে
 যেন ভালোবেসে আগলে রাখে স্মৃতি.

সময় বদলে যায় 
তবুও বদলায় না স্মৃতি 
স্মৃতি থেকে যায় চিরকাল মনের চোরাকুঠুরিতে
 সদা জাগরণ রূপে 
হয়তো সময়ের সাথে সাথে 
আবছা আলোয় ভরে ওঠে
 কিন্তু মন থেকে তা মুছে যায় কি কখনো?


 

স্বপ্নের চোখ খোলা 
বিজয় বর্মন 

অভাবের তাড়নায় স্বভাব নষ্ট,
জলের অভাবে জীবন,
সারা পৃথিবীটা ধূসর হলে,
দেখতে লাগে কেমন।
শোষন করেছে শোষকের দল,
পরে রয়েছে শুধু কঙ্কাল,
নদী নালা তো ফুঁ দিলেই শেষ,
সাগর হয়েছে বেসামাল।

কথারা হয়েছে চুপ,
কত কায়দা কানুন, সব যেন ফাঁদ,
একে অপরের দিকে শত শত মুখ,
নির্বাক কাটিয়ে দিচ্ছি ,দিন আর রাত।
শীর্ণকায় জোটের শরিক আমিও,
আমার স্বপ্নের চোখে জল,
এভাবেই ঝাপসা আর ধূসর পৃথিবীতে, 
জরিপ করি, ভাগ্যের ফল।

দোহাই বলে একটা শব্দ আছে সবারই তো,
যার যার ব্যক্তিগত,
নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করি আর কি,
ফারাক টা তো অনেক,শোষক আর শোষিত।
সমস্ত পৃথিবীর ভর মাথার ওপর,
বেশি বুঝি, না কি অন্য কিছু,
সংসার আর জগৎ সংসারে,
স্বপ্নেরা সব,দল বেঁধে আছে মাথা নিচু।



 

খবর

মাথুর দাস


ধন্দে পড়ি খবর দেখে,

সন্দ-জাগা মন

ক্যামনে বুঝি কোনটি খবর

কোনটি বিজ্ঞাপন !


কোন খবরটি টাকায় কেনা

কোন খবরটি চাঁচা,

চাপা খবর মাপা খবর

কাঁপায় বুকের খাঁচা ।


খবর যদি হয় ধারাবাহিক

তার আর সারবত্তা নাই,

গল্পে ঠাসা সে-ই সিরিয়াল

দেখে নাটকের মজা-ই পাই ।


 

রাত জাগা পাখি
মজনু মিয়া 

ওগো রাত জাগা পাখি তুমি জান নাকি
অঝোরে কেন গো আমার ঝরে দুই আঁখি।। 

কি বিরহ শোক বুঝে দুই চোখ 
হৃদয় কেন পুড়ে আমার 
ভাঙে পাঁজর বুক
কার বিরহ মলিনতা কারে বা ডাকি।।

কি দহন জ্বালা সয়ে যে একেলা
যন্ত্রণার পাহাড় বুকে ধরে 
গাঁথ শোকের মালা
আঁচল তলে লুকিয়ে যে জল রাখ ঢাকি।।


 

শ্রাবস্তীর কারুকার্য
মলয় চক্রবর্তী

সহস্র পথের ধুলো জমে আছে আমার জুতোর তলায়,
শত নদীর নাম মুছে গেছে পুরোনো খাতায়।
রাজত্ব ভেঙেছে, সভা মুলতুবি, যুদ্ধের ঢাক স্তব্ধ—
তবু পথ জানে, অপেক্ষাই মানুষের দীর্ঘতম অধ্যায়।
অন্ধকার কখনো শুধু শূন্য নয়, সে এক নিভৃত পাঠাগার,
যেখানে হারিয়ে যাওয়া কথারা ফিরে পায় উচ্চারণ।
আমি ক্লান্ত, অথচ ক্লান্তি শেষ কথা নয়—
শেষ বাক্য লেখা হয় শান্ত চোখের যত্নে।
তোমার হাসি কোনো দেশের মানচিত্র নয়,
তবু তুমিই আমার পথের রাজধানী।
দিগন্ত পুড়ে গেলে যখন নামগুলো ছাই,
তখন ভোরের আলোয় স্পষ্ট শুধু শ্রাবস্তীর কারুকার্য।
অপরিমেয় হাঁটার পর যদি কিছু বাকি থাকে,
তাহলে তা—দু’দণ্ড শান্তি, আর তুমি।


 

স্মৃতির আনাগোনা
মনোমিতা চক্রবর্তী

যখন আমি একলা থাকি 
চোখ বুঁঝলেই দেখি 
আমায় ঘিরে ভিড় করেছে 
অনেক অনেক স্মৃতি ।

ধুলো মাখা বারান্দাতে
আলতো রোদের ছোঁয়ায়
ছেলেবেলা নেচে বেড়ায়
ঘরের কোনায় কোনায়

কত প্রিয় মুখেরা আজ
জড়িয়ে আছে আমায় 
ন্যাপথলিনের আলমারি 
আর ছেঁড়া চিঠির পাতায় ।

একলা থেকেও, নইতো একা
জগত  স্মৃতি  ঘেরা 
আমায় ঘিরে থাকে সদাই
 আপন মানুষেরা।


 

অপূর্ণতার নাম প্রেম

চিরঞ্জিত মন্ডল


তুমি চলে যাওয়ার পর
ঘরটা আর ঘর থাকে না,
জানালার ধারে বসে থাকা আলো
আমাকে কিছুই বলতে পারে না।

তোমার ব্যবহৃত কাপটায়
এখনো ঠোঁটের উষ্ণতা খুঁজি,
জানি—এ এক অসম্ভব অভ্যাস,
তবু অভ্যাসগুলোই তো প্রেম।

রাস্তায় হাঁটলে
তোমার ছায়ার মতো কেউ একজন
হঠাৎ সামনে পড়ে যায়,
হৃদয় তখন এক মুহূর্তে
ভুল করে বাঁচতে চায়।

তুমি আর আমি—
এই দুই শব্দের মাঝে
এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস,
কিছু না বলা কথা
আর অপেক্ষার কাঁটা।

তবু বলি,
যদি কোনোদিন ফিরে তাকাও—
আমাকে খুঁজো না,
আমার বিরহেই
আমি তোমাকে আজও ভালোবাসি।


 

প্রাণের স্পন্দন 

প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী 


নবারুণের দীপ্তিময়তায়,
  শীতের রঙিন ব্যঞ্জনা, 
   সিক্ত প্রাণের স্পন্দন; 
নতুন ছন্দের জীয়নকাঠিতে, 
 উদ্যমী আবেগের নিঃশ্বাসে,
 সৌন্দর্য বিভূষিত এক চিত্রপট,
                   চিরন্তন প্রবহমানতা- 
                 নানাবিধ বর্ণের ঝঙ্কারে ।।


 

যখন গান গাই

অঙ্কুর মহন্ত


এখন হাতে কিছু নেই তোমার কাঁদা শেষ হলেই আমার পালা,
কতদিন ধরে কাঁদিনা জানো
যখন গান গাই
বুকের ভেতরটা সারিঞ্জা হয়ে যায়।

সারিঞ্জা আসলে আমারই ভেতর বৃদ্ধ কঙ্কাল
তোমাকে মালা বানাতে বানাতে যোগিনী করে তুলি,
এতো জল কবে শেষ হবে!
জলে জল মিশলেই তো কান্না
কতদিন ধরে কাঁদিনা জানো

গানের মতো ফাফর শব্দ উপড়ে আসছে জিভ দিয়ে 
আমার সুর তোমার সুর ফুঁপিয়ে উঠে অশ্রুবাড়ির ভেতর।
সাদা পৃষ্ঠার মতো আর অল্প সহ্য করো
আজ যে আবার জ্বলে গেলাম
এ কান্না আমি কাঁদবো কখন।

Monday, January 12, 2026


 

লহো প্রণাম 

মিত্রা রায় চৌধুরী

চারিদিকে অবক্ষয়ের ছবি। ধনী-দরিদ্র শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে মানবিকতা শৌর্য্য, ধৈর্য সহিষ্ণুতা হারিয়ে ফেলেছে। এখনো মানুষ জাত পাতের ঘেরাটোপে বন্দি। আমরা ভুলেই গেছি স্বামীজীর আত্মত্যাগের কথা। ভারতের ঘরে ঘরে আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন স্বামীজি ,। সেই কাজ করতে গিয়ে   পদব্রজে ভারত ভ্রমণ করে তিনি ভারত তথা ভারতবাসীকে জেনেছেন। নিরন্ন মূর্খ দরিদ্র ভারতবাসী র সামগ্রিক উন্নতিকল্পে নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে,   নিজের জীবনই শক্তিকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন।

                                   আমরা তারই উত্তর সুরি রা তাকে নিরাশ করেছি। দিকভ্রষ্ট যুবসমাজ। আমরা তার আদর্শকে সত্যি কি অন্তরের স্থান দিয়েছি? তার জন্মদিন আসলে আমরা তার ছবিকে ফুলমালা দিয়ে সাজাই স্মরণসভা করি এতেই আমাদের দায় শেষ। 

 এই স্মরণ কি সত্যিই স্মরণ।! আত্মতুষ্টির নীরব আয়োজন।নিজেদেরকে বিবেকের সামনে দাঁড় করাই না। বিবেকানন্দ মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেছিলেন আমরা সেটা দেখতে ভয় পাই তাই নীরব থেকে সব অন্যায়ের সাথে আপোষ করে নেই।

                                  ভারতবর্ষের যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সংবেদনশীলতা কমেছে তাই আমরা লজ্জা পাই না। ক্ষুধার্ত অসুস্থ মানুষ দেখলে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। তাদের আমরা বোঝা বলে ভাবতে শিখেছি। যেশক্তিকে স্বামীজি ধারণ করতে বলেছিলেন সে শক্তি আমরা আত্মস্থ করেছি ঠিকই কিন্তু তা হয়ে গেছে দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ।   

            স্বামীজি কি তো একবার নয় বারবার বলেছিলেন ভারতবাসীর মঙ্গল সাধনের নিমিত্ত আমি বারংবার মনুষ্য জন্ম লাভ করতে রাজি আছি। স্বামীজি এই সামাজিক চূড়ান্ত অবক্ষয়ের সময়ে তোমাকে আমাদের খুব প্রয়োজন। 

                                   লহ প্রণাম 

           মধ্য গগনে সূর্য সম  দীপ্তমান

           সুঠাম দেহ বলিষ্ঠ গড়ন

           মানবপ্রেমী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক 

            সপ্ত ঋষির এক ঋষি।

           গুরুর একান্ত আহবানে 

          ধরাধামে পদার্পণ।

       তার নির্দেশ মতো চলা শুরু 

          চলতে চলতে সব জঞ্জাল অপসারণ 

        মানব কল্যানে  কৃচ্ছ সাধন।

       নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে

       নিরন্ন মূর্খ দরিদ্র ভাই বোনেদের

        মা নসিক জাগরনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

        গেরুয়া বসনধারী দীপ্ত ভঙ্গিতে প্রকট 

         সকলেরই আদর্শ স্বরপ,

 ক্ষন জন্মা পুরুষ শ্রেষ্ঠ বীর সন্তান 

          তোমাকে জানাই মন

              ভুলুন্ঠিত প্রণাম।

                                          


 

বিবেকানন্দ
 স্ব প ন  গা য়ে ন


সূর্যের আলোয় চড়ে আসছে এক মহাপুরুষ 
হৃদয়ের ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখি সেই ছবি 
আঁধারে পেরিয়ে যায় এক আলোকবর্ষ।

কন্যাকুমারীকার মাটি আজও কথা বলে বিবেকের 
জাতি ধর্মের উর্ধে উঠে বলেছেন জীবনের রূপকথা
কোনো মানুষ ছোটো নয় -
সপ্তর্ষিমন্ডলের মতো উজ্বল মহামানব।

অপমান অসম্মান হেনস্থার জবাব দিতেন অনায়াসে 
অলৌকিক অন্ধকারে তিনি কখনোই ডুবে যাননি 
শরণাগত যুগপুরুষের আর এক নাম বিবেকানন্দ।

Thursday, January 8, 2026


 

পৌষালী

আরাত্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার উত্তর খোলা জানলা,
পৌষের এই অন্তরঙ্গ দুপুরবেলা—
রোদের পিঠে আলসেমি মেখে
স্মৃতিদের সব লুকোচুরি খেলা।
পৌষের আকাশ বড্ড উদাস,
জানালা জুড়ে রোদের মায়া।
নির্জন এই মনের কোণে 
পড়ছে তোমার চেনা ছায়া।

(ছবি- শৌভিক রায়) 

Tuesday, January 6, 2026


 

তুবড়ি

মনীশ সরকার

প্রথম পর্ব:

সময় টা ২০০৩ সাল। খুব একটা খারাপও যেমন নয়, তেমন খুব যে ভালো কিছু হচ্ছে তাও না। পশ্চিমবঙ্গে এখন উৎসবের মরশুম। আসলে উৎসব তো প্রত্যেক বছরই হয়, কিন্তু এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো আতশবাজি। শুধু শ্রাদ্ধ শান্তি ছাড়া বাকি সব কাজে এই আতশবাজি আমাদের বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু বাজি বললে তো শুধু শব্দ বা আলোর রোশনাই দেখলে হবে না, তার উৎস কোথায় সেটাও জানতে হয়। আতশবাজি প্রায় পুরো ভারত তথা আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক জায়গায় তৈরি হয়, কিন্তু হারাল নামে জায়গা টি বাংলার মানুষ দের জন্য খুবই চেনা একটা স্থান। হারাল হচ্ছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চাম্পাহাটি তে অবস্থিত এবং এই জায়গাটি আতশবাজির জন্য সমস্ত বাংলায় পরিচিত। এখানে ছোট বড় মাঝারি সকল প্রকার মানুষ বাজি বানাতে পটু। আর এই বাজির যখন কথা হচ্ছে তার মধ্যে তুবড়ি র কথাও বলতে হয়। তুবড়ি আমি আমার মামা-কে দেখেছি কী ভাবে বানাতে হয়, কিন্তু সেটা যে অতীব নিম্ন মানের হয় সেটা তার অগ্নি সংযোগের পর বোঝা যায়। তবে আমি বলছি তুবড়ি রাজা অলোক স্যামুয়েল মণ্ডলের কথা। তুবড়ি রাজা এই কারণে বলা, যে ওর বানানো তুবড়ি যেমন গুনে ভালো তেমনি তার শক্তি। অর্থাৎ আতশবাজির কম্পিটিশনে এ এস মণ্ডলের বাজির তুলনা হয় না। এই পর্যন্ত কোনোটাতে তে প্রথম কোনোটাতে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে তবে ফিরেছে। তবে অলোক যে শুধুই বাজি বানায় তা নয়, বছরের বাকি দিনগুলো ভ্যান রিক্সা চালিয়ে তার পরিবার চালায়। তার পরিবারে আছে একজন স্ত্রী, দু ছেলে আর একটা মেয়ে। প্রথম ছেলের বয়স খুব বেশি হলে সাত হবে, বাকি দুটো যমজ বলে দুজনেরই পাঁচ বছর হয়েছে। পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় না থাকলেও বেশ কাটছে এই পাঁচটা মানুষের জীবন। বড়ো ছেলেকে সবে গ্রামের সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে। তাই পড়াশোনার সাথে ওর খাওয়ার ব্যাপারটা ওখানেই হয়ে যায়।মানে ইস্কুলে মিড ডে মিল এর ব্যবস্থার জন্য একজনের পেট আপাতত ঠিক ভাবে চলছে, বাকি চারজন তাই বেশ সুখেই কাটাচ্ছে। অলোকের বাড়ি আসলে ঠিক বাড়ি বলা চলে না। কারণ জায়গাটা দখলের, তার ওপর ঝুপড়ি বাড়ির কটা টালি আর বাঁশের বেরা দিয়ে প্লাস্টিকে মোরা একটা ঘর। ঘরে আছে বাচ্চা দের ঘুমনোর জন্য একটা চকি আর চাটাই , মা বাবা দুজনেই নিচে মাটিতে আরেকটা চাটাই পেতে ঘুমোয়। তাও তিন বেলার ভাত ডাল হয়ে যায়। সরকারি সাহায্য বলতে রেশনের ব্যাবস্থা টা এখনও হয়ে ওঠেনি বলে একটু অসুবিধা তো আছেই। তার জন্য অবশ্য অলোক কাছের গির্জার ফাদার কে বলেছে, সেটাও বোধয় হয়ে যাবে। যাই হোক অলকের পরিবার মোটামুটি খেয়ে পরে ঠিকঠাক চলছে।

দ্বিতীয় পর্ব:

পঞ্চায়েত অফিসে এখন খুব তোড়জোড় শুরু হয়েছে, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান আজ সকাল বেলা আসবে বলে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। সেখানে গ্রামের বাচ্চাদের থেকে সম্বর্ধনা প্রদান, আঁকার প্রতিযোগিতা, আর একটু গ্রাম উন্নয়নের ব্যপারে বক্তৃতা হবে। দিনের যা অনুষ্ঠান হওয়ার তা বেশ ভালো ভাবেই হলো। কিন্তু আসল অনুষ্ঠান তো হবে দুই দিন পরে রাতে। পঞ্চায়েত প্রধানের আগমনের খুশিতে বাজি প্রদর্শনী হবে ওই দিন। সেখানে হারালের তাবর সব বাজির পসরা নিয়ে হাজির হবে এক এক জন মহারতি। সেখানেই ডাক পেল অলোক এস মন্ডল, সেখানে তার তুবড়ি দেখাতে হবে। অলোক শুনে খুব খুশি হলো। যে এতবড় মানুষের সামনে তার পটুতা দেখাতে হবে। তাই সে তার সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে বেশ কটা তুবড়ি বানালো এবং ওইদিন তার তুবড়ি র আলো যখন চারিদিকে ছড়ালো গ্রামের সকল মানুষ অলোকের নামে হাত তালি দিল, শুধু তাই নয় পঞ্চায়েত প্রধান নিজে গিয়ে অলোকের হাত ধরে পাঁচটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে বলল, আমার ছেলের বিয়েতে তোমাকেই তুবড়ি বানিয়ে জ্বালাতে হবে। তারপর অলোক স্যামুয়েল মন্ডল কে দেখে কে। বাড়িতে সেদিন রাতের বেলা ডাল ভাতের শেষে একটু মিষ্টি খেলো সকলে। অলোকের বউ অবশ্য আবদার করলো, "এবার কিন্তু কালী পুজোয় ময়দানে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, আর আমরা ওইদিন মোগলাই পরোটা খাবো, রাতে কিন্তু আর রান্না করবো না আমি।" হঠাৎ চারিদিকে তার নাম হয়ে গেলো। বাড়ির অনুষ্ঠান হোক আর পুজোর আতশবাজি প্রতিযোগিতা হোক এ এস মণ্ডলের তুবড়ি চাই চাই। বেশ ভালই অলোকের দিন কাটছে। অলোক এখন আর লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে না, ও এখন প্লিট করা প্যান্ট আর পুরো হাতা জামা পরে। এখন আর অলোক ভ্যান রিক্সাও চালায় না। কারণ ও জানে যে ওটা না চালালেও ওর পরিবারের কোন অসুবিধা হবে না। ধীরে ধীরে পুরনো টালির চাল টিনের চাল হলো, বাঁশের বেড়া থেকে মাটির দেওয়াল হলো এবং নিজের জন্য একটা ছোট্ট বাজি তৈরির ঘর ঠিক রান্না ঘরের পিছনে তৈরি করলো। কি নেই সেখানে , ছোট থেকে বড় হাড়ি, বারুদ, কাঠ কয়লা, ফসফরাস, লোহার কুচি, ও আরো কত কিছু।এখন প্রায় দিন ওকে বিভিন্ন লোকের অর্ডার এর তুবড়ি বানাতে হয়। আয় উপার্জন বেশ ভালই হচ্ছে। অলোকের বউ পাড়ায় খুব মেজাজে ঘোরে, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, " অলোক কে বেশি দেখা যায় না তো আর পাড়ায়, কোথায় থাকে সে এখন, মাথা উচু করে বলে অনেক কাজ পড়েছে ওর , খুব ব্যস্ত ।"এদিকে পরিবারের সুখী দিন যেনো বউ বাচ্চা র চেহারাতে ফুঁটে উঠছে। অলোক এখন হাড়ালের তুবড়ি রাজা।

তৃতীয় পর্ব:

এখন বছরটা ২০০৫ , বড়ো ছেলের বয়স নয়। ইস্কুলে মায়ের সাথে এখনও তাকে যেতে হয়, কারণ মিড ডে মিল টা যে ঠিকভাবে পাচ্ছে সেটা দেখতে হবে । বাড়িতে আরো যে দুটো বাচ্চা রয়েছে তারা যে আজ কি খাবে সেটা অলোকের বউ জানে না। এদিকে অলোকের ছোট ছেলের আবার দিন দিন পেট টা বড় হয়ে গেছে, মনে হয় ওর ক্রীমি ধরা পড়েছে, কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। গত ছয় মাস যে কিভাবে ওদের কেটেছে সেটা কেবল অলোকের পরিবার জানে। গির্জা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য এসেছিল , কিন্তু সেটা বেশি দিন চলেনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যেটুকু করা যায় সেই টুকু নিয়ে চলছে অলোকের পরিবার। বাড়ির এত চাপ যে বাকি ছেলে মেয়ে দুটো কে ইস্কুলে দিতে হবে সেটা আর অলোকের বউয়ের মাথায় নেই। এইভাবে আর চলতে পারেনা, অলোকের বউ মনে মনে চিন্তা করে আর চোখের জল ফেলে। একদিন তো ঠিক করেই ফেলেছিল পালিয়ে যাই, কিন্তু বাচ্চা গুলোর মুখ দেখে আর কিছু করতে পারেনি। গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বাচ্চা গুলোর মুখ দেখলেও যেনো এখন পাগলের মত লাগে অলোকের বউয়ের। কি করবে? একা বউ টা যে নিজের বাপের বাড়িতে কত আদরে বড়ো হয়েছে, সে এখন লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। রাস্তায় বেরোলে কতরকম লোক, আর কতরকমের চাউনি । দিনের বেলা চলতে ভয় লাগে যেখানে, সেখানে কত রাতে ফিরতে হয় অলোকের বউকে। একবার তো ট্রেন স্টেশন থেকে ফিরতে গিয়ে একদল মাতাল দের সামনে এসে ভেবেই নিয়েছিল যে এটাই বোধয় শেষ রাত। টহলদারি পুলিশ ঠিক সময় চলে এসেছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু মান টা আর থাকলো কোথায়। ওই রাতের পুলিশ এখন অলোকের বউয়ের রোজগারের নতুন পন্থা। সেদিনের পর থেকে প্রায় রোজই অলোকের বউয়ের কাছে আসে সুখেন ঘরোই। সুখেন রেল পুলিশের একজন কনস্টেবল, মাইনে ভালই। তাই জুলিয়েট ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছে, নাহলে নিজে খাবে কি আর বাচ্চা দের খাওয়াবে কি আর। কি করবে মেয়ে টা, সবকিছুই তো ছিল হাতের মুঠোয় , হঠাৎ যে কি হয়ে গেলো, সব শেষ। ২০০৪ এর জৈষ্ঠ্য মাসে এক গাদা তুবড়ির অর্ডার নিয়ে অলোক খুব ব্যস্ত ভাবে মশলা তৈরি করেছিল। সকাল তখন এগারোটা হবে, প্রচন্ড জোড়ে একটা আওয়াজ হলো, ভাগ্য খুব ভালো ছিল বাচ্চা বউ তখন মামা বাড়ি বেড়াতে গেছে। বাড়ির যেই অংশটা তে অলোকের তুবড়ি কারখানা করছিল আর তার লাগোয়া ঘরের রান্নার জায়গাটা বারুদের মশলায় জ্বলছে। অলোক কে চেনার উপায় ছিল না। দলা পাকিয়ে একটা মাংসের পুটলির মত হয়ে গেছিলো। বাপের বাড়ি থেকে পরের দিন এসে শুধু অন্তিম যাত্রায় চাদরে মোড়া একটা হারির মত জিনিস দেখেছিল অলোকের বউ। পুলিশ এসেছিল , রিপোর্ট লিখেছিলো, বাজি বানাতে গিয়ে অসাবধানতার জন্য মৃত্যু। মানুষ টা যেনো নিজের সাথে ওর তৈরি করা সংসারটা ও নিয়ে চলে গেলো। জুলিয়েট সারাদিন কেঁদে ছিল, অ্যালেক্স ব্যাপারটা বুঝে কেমন যেনো গুম মেরে গেছিলো, মিসবা আর মেরী কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের কোলে বসে এমনি কান্নাকাটি করছিল। পাড়ার লোকজন কটা পাটকাঠির বেরা দিয়ে ঘরের ভেঙে যাওয়া জায়গাটা ঢেকে দিয়েছে, আর পঞ্চায়েত থেকে ত্রাণের তাবু দিয়ে ছাওনি করে দিয়েছে অলোকের পুড়ে যাওয়া ঘর টাকে। অলোক কে কবর দিয়ে এসে আর রাতে জুলিয়েট কিছু খায়নি, শুধু দুই ছেলে আর মেয়ে কে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ছিল। বাড়ির পুড়ে যাওয়া জায়গাটা দেখে জুলিয়েট কেমন যেনো হয়ে গেলো , আবার সেদিন যেনো ও অলোক কে দেখতে পেলো, ও দেখতে পেলো অলোক গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে বলে উঠলো , " কি গো ওরা ঘুমালো, তাহলে আমায় এবার খেতে দাও, খুব খাটনি গেলো আজ, কাল আবার ত্রিশ টা তুবড়ি তৈরি করতে হবে, সব মিলিয়ে দেড়শো টা তুবড়ি ঘোষ বাবুর বাড়িতে দিতে হবে" , দূরে ট্রেনের সাইরেনের আওয়াজে যেনো ঘোর কাটলো, রান্না ঘরের দিকটা খুব অন্ধকার, ঘন কালো জমাট অন্ধকারটা জুলিয়েট কে যেনো গিলে খেতে আসছে, জুলিয়েট দৌড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো, মাথায় ঘাম আর চোখের জল একসাথেই গড়িয়ে জুলিয়েটের ঠোঁটে এসে পড়েছে, আজ মনে হয় অমাবস্যা, তাই মনে হয় খুব ঘন অন্ধকার। কে বলবে দেখে কাল পর্যন্ত যে বাড়িতে আনন্দের ফুলঝুরি দেখা যেত, সেখানে কেবল এখন ছাই পড়ে আছে দুঃখের।

চতুর্থ পর্ব:

চায়ের দোকানে বাসন মেজে দিনে পঞ্চাশ টাকা আয় হয়ে যায় মিসবা মন্ডল এর। কচি হাতে বারে বারে জল লেগে ক্ষয়ে যাওয়া আঙ্গুল গুলো এক সময় পেন পেন্সিল যে ধরত টা বোঝা যায়না। মিসবা অনেক কষ্ট করে একটা কাজ জুটিয়েছে, চায়ের দোকানে, রোজ পঞ্চাশ টাকা আয় এখন তার। বাড়ির দুই ভাই বোন আর নিজের পেট চালানোর ভার এখন ওই ছোট্ট কাধে চেপেছে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো ঠিকই, কিন্তু এখন মিসবা নিজেকে নিজেই শিখিয়ে পড়িয়ে গোটা একটা পুরুষ তৈরী করে ফেলেছে। মিসবা নাম টা দিয়েছিল গ্রামের একমাত্র ফাদার জ্যেরোম আলফ্রেড রয়। হারালের গির্জায় হাতে গোনা কয়েকজন খ্রিস্ট ধর্মের লোক থাকে। তারা নিজেদের মধ্যেই থাকতে ভালো বাসে, খুব বেশি সাতে পাঁচে থাকে না। তাই বাইরের থেকে সেরকম ভাবে বিপদে পড়লে সাহায্য খুব একটা আশেও না। একমাত্র যদি গির্জার ট্রাস্ট থেকে কিছু পাওয়া যায়, সেটাই অনেক। এখানে অনেকে খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল শুধু মাত্র একটা আয়ের সুযোগের জন্য। অনেকেই জন্মগত হিন্দু হয়েও খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল। অলোক মন্ডল তাদের মধ্যেই একজন। কিন্তু শর্ত একটাই প্রতি রবিবার গির্জায় আসতেই হবে, আর যিশু খ্রিষ্টের নাম ছড়াতে হবে। দুটোর কোনোটাতেই অবশ্য খুব একটা গায়ে লাগায়নি অলোক, তবে যখন বিয়ের সময় হয়েছিল তখন ফাদার নিজে অলোক কে বলেছিলেন , এবার থেকে বউ কে নিয়ে আসতে ভুলনা যেনো। বিয়ের পর ভোলেনি অলোক, কারণ বউ ছিল জন্মগত খ্রিষ্ট ধর্মের। বউয়ের জন্য এই নিয়মের মধ্যে আসতেই হয়। গির্জার ট্রাস্ট থেকে অলোক কে একটা ভ্যান রিক্সা দিয়েছিল, কিন্তু পুরনো হাতের কাজ কোনোদিন বন্ধ করেনি। বিয়ের সুন্দর একবছর কাটার পর প্রথম সন্তান এলো যেনো দেব দূতের মত। অলোক ভালো বেশে নাম দিয়ে ছিল দুলাল, কিন্তু বাধা পড়লো মায়ের কাছে, যাইহোক ছয় মাস বাদে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য গির্জায় গিয়ে ফাদার মাথায় হাত দিয়ে মিসবা নাম টা দেয়। বড় ছেলের যখন পাঁচ বছর তখন যমজ সন্তান দিয়ে ঘরে এসেছিল অলোকের বউ জুলিয়েট মন্ডল। পরের সন্তানদের নাম অবশ্য অলোক করেছিল, ছেলের নাম দেয় অ্যালেক্স আর মেয়ের নাম দেয় মেরী। খুব ভালো নাম দিয়েছো, ফাদার বলেছিলেন অলোক কে। মিসবা প্রথম প্রথম একটু হিংসা করতো বটে তবে পড়ে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল তার দুই ভাই বোন কে। এখন মিসবার এগারো বছর , ইস্কুল কবে যে শেষ করেছে সেটা আর এখন মনে করতে চায়না। ওর ওপর এখন এই দুই ভাইবোন এবং নিজের পেট চালানোর ভার পড়েছে। মা দুই বছর আগে কার সাথে চলে গেছে এক রাতে। পাড়ায় লোকেরা কয়েক দিন খোঁজ করেছিল, কয়েক জন খাবারও দিয়ে গেছিলো, কিন্তু ওই কয়েক দিন , বাকি টা আর ঠিক হয়ে ওঠে নি। গির্জার ফাদার মিসবার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বুঝিয়ে ছিল যে এখানে থেকে আর কি হবে, চলো আশ্রমে থাকবে তোমরা। দুই একদিনের জন্য থেকেও ছিল, কিন্তু একদিন রাতে ফাদার মিসবাকে নিজের ঘরে ডেকে মিথ্যা ধর্মের অনেক কথা বোঝাতে গিয়ে মিসবাকে নির্যাতন করতে গেছিলো, কিন্তু মিসবা হাতের কাছে একটা কলম পেয়ে ফাদার এর পায়ে গেঁথে ওই রাতেই ভাই আর বোন কে নিয়ে নিজের পুড়ে যাওয়া ঘরে পালিয়ে চলে এসেছিল। মায়ের কথা আর এখন ওর বেশি মনে আসে না, কোথায় গেছে কি করছে কিছুই জানেনা মিসবা। কিছু দিন না খেতে পেয়ে কষ্ট হচ্ছিল তবে এখন ও বাড়ির কর্তা, তাই চোখের জল শুকিয়ে মনকে লোহা করে ফেলেছে। এই এগারো বছর বয়সে ছেলেটা যেনো পৃথিবীর সব জ্বালা সহ্য করে নিয়েছে। খেতে না পেয়ে ভেবে ছিল চুরি করবে, কিন্তু পারেনি, বাবা ওকে বলেছিল, " জীবনে যতই কষ্ট হোক তোমার , হারামের সুখ কখনো নিওনা সোনা।" তাই পাড়ায় চায়ের দোকানে কাজ করে ইনকাম করে। ওর খুব ইচ্ছা যে ভাই বোন কে ইস্কুলে দেওয়ার, নিজের শেষ হয়ে যাওয়া ইচ্ছাটা যেনো মিসবা ওদের মধ্যে থেকে দেখতে চায়। কিন্তু কি করে ইস্কুলে ভর্তি করবে জানেই না এগারো বছরের ছেলেটা। পঞ্চায়েত থেকে একবার কে যেনো একজন এসে বলেছিল যে সরকারি হোম এ যেতে হবে, কিন্তু তার পরে আর কথা এগোয়নি। রাতে যখন ছেড়া তাবুর চাল থেকে হাওয়াই রকেটের আলো দেখতে পায় তখন খুব রাগ হয় মিসবার, ও যেনো ওই আতশবাজি টাকে আর দেখতে পারেনা, কারণ ও মনে করে ওই আতশবাজি টা ওর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ছোট্ট অ্যালেক্স চোখ কচলাতে কচলাতে দাদা কে জিজ্ঞাসা করে ছিল, " আচ্ছা দাদা আমরা কাল কি খাবো রে, জানিস তো আমার খুব ইচ্ছা করছে এখন গরম ভাত আর ছোট মাছের ঝোল খাবো ঠিক মা করে দিত না সেই রকম"। মিসবা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ছিল আজ ঘুমিয়ে পর কাল আমি তোদের খাওয়াবো। পরের দিন অনেক সকালে উঠতে হবে ওকে, চায়ের দোকানে সকাল বেলা খুব চাপ থাকে। সকালে উঠে বাড়িতে তিনজন জল মুড়ি বাতাসা খেয়ে, আর আগের দিনের পান্তা ভাত হাড়ি তে রেখে চলে যায় মিসবা। কাজ করতে করতে হঠাৎ কে একজন এসে বললো , তুমি এখানে কাজ করছ কেনো, তোমার মা বাবা নেই, তারা কি তোমায় এই কাজ করতে বলেছে। এত প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে যায় মিসবা, কি বলবে বুঝতে না পেরে চায়ের দোকানের মালিক কে ডেকে নিয়ে আসে ও। অনেক ক্ষন পর মালিক এসে মিসবা কে ডেকে বললো, যা তোর ভালো দিন এসে গেছে। একটা এন জি ও থেকে একজন এসেছে, তোকে আর তোর ভাই বোন কে বলেছে কাল তোর বাড়ি গিয়ে ওদের হোম এ নিয়ে যাবে, ওখানে অনেক বন্ধু পাবি তুই, ভালো খেতে আর পড়তে পারবি, তোর ভাই বোন টাও ভালো ভাবে থাকবে, আজ তোর ছুটি, হাতে একশো টাকা দিয়ে চায়ের দোকানের মালিক বললো ওকে। বিকাল বেলা তিন জনের জন্য রাতের খাবার কিনে মিসবা ঘরে ফিরে দুই ভাইবোন কে বললো সব কথা। মিসবা বললো আজ এই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়, কাল আমরা হোম এ চলে যাবো। ছোট্ট অ্যালেক্স বললো, দাদা, হোম টা কিরে? আমাদের নতুন বাড়ি!




 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ।।
ছাই ও ছায়ার পরবর্তী: উদয় সাহা
আলোচক: মানিক সাহা
কুচবিহারের একজন গুণী শব্দ শিল্পী। কখনো সে শব্দ ধ্বনী আবার কখনো সেই শব্দ অক্ষরে আবৃত। মুজনাই সাহিত্য সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে কাব্য পুস্তিকা 'ছাই ও ছায়ার পরবর্তী'। সম্ভবতঃ বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ধরনের কবিতা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই কাব্য পুস্তিকা। কবিতা কখনো রাতের আকারে চলমান আর কখনো পাখির মতো পদ্য ছন্দে হাওয়ায় উড্ডীন। আনন্দ হয় যখন দেখি কবিতা কবির আঙ্গুল থেকে বেড়িয়ে আসে - "আলেকজান্ডারের মতন তীব্র গতিতে ছুটে আসছে বাতাস/ কবিদের খাতা ভরে উঠছে মরশুমি কবিতায়" (মরশুমি)।
অসাধারণ সব পংক্তি রচনা করেছে উদয়। একজন কবিই তো বলতে পারেন - "সব মৃত্যুই মেঘের কাছে মিসড কল দিয়ে যায়" (সবাই ঘুমোলে)। কিংবা "পুকুর নদী সাগর যে মুগ্ধরেখায় একসাথে বসবাস করে তার নাম জলপ্রহর। তোমার বুক কিংবা চোখ সেই প্রহর মাখানো শ্রাবণ বেলা। " (ধূলির সরগমে আঁকা/ দুই)
উদয়ের কবিতায় মৃত্যু, বিষন্নতা, ঘুম বারবার ফিরে এসেছে। কবির মধ্যে কাজ করেছে অতীতচারীতা ও মায়াময়কাতরতা। রোমান্টিক পেলবতার খানিক স্পর্শ পাওয়া যায় বৈকী! তবু শেষ পর্যন্ত তিনি আধুনিকতাকেই অবলম্বন করেছেন। তিনি লিখতে পারেন- "নদী তো ঘুমের ভেতরেও চলে, অবিরাম। মৃত্যুর পরোয়ানার উল্টো পিঠে পরপারের আলোর বিজ্ঞাপন। জলের দাগ মনের দেওয়ালে সাবলীল ওয়ালপেপার।" (ছাই ও ছায়ার পরবর্তী / দুই)
একই কবিতার এক নং অংশে তিনি লিখেছেন - "কারা যেন শেষকৃত্য সেরে বাড়ি ফিরে গামছা থেকে ধুয়ে ফেলছে শবগন্ধ সব"। আমরা প্রায় সকলেই বিগতকালের কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে চলতে শিখি। যা কিছু বর্জনীয় তাকে ফেলে দিয়ে, গ্রহণযোগ্য যা কিছু, তাকে অবলম্বন করে আমরা সূর্যের দিকে হেঁটে যাই।