Sunday, December 6, 2020


 





রহস্য

     অন্বেষিকা দাস


সন্ধ্যে নামতেই সারাদিনের ক্লান্তি চলে যায় বহু দূরে।

মনে আসে আবেগ,

 চনমনা হয় প্রতিটা কোষ।

উদ্দীপনা চরমে যখন মনের বাঁধ বড়ই ঠুনকো।

যদি একবার লক স্ক্রিনের আলো জ্বলে,তবুও তুমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকবে?

কত আলোক রোশনাইয়ে

অজানা রহস্যের মুখোমুখি তুমি।

কবিতার প্লট খুঁজতে গিয়ে এক অবাক পৃথিবী হাতছানি দিবে পাহাড়ের গায়ে বা সোনালী আলোক রোশনাইয়ের মলাটে।

পরিচিতি হবে তোমার এক অনুসন্ধানী তথ্যমিত্রের সাথে।



 






বাজপাখি 

বিজন মজুমদার 


মা -পাখি অনেক কষ্ট করে

আপন সন্তানের জন্য

অনেকটা খাবার জমিয়ে ছিল ঘরে ,

যাতে অসময়ের ডাক

সামাল দেওয়া যায় !


বেশ হাসিতে আনন্দে চলছিল

পাখিদের সংসার !


হঠাত্ একদিন এক বাজপাখি এসে

হুকুম করল জারি :

কোন খাবার জমা রাখা যাবে না

নিজের কাছে ,

সব রেখে দিতে হবে

বাজপাখির ডেরায় !


আকাশ ভেঙে পড়ল

মা -পাখির উপর !

সংসারের কাজ ফেলে জমানো খাবার

বাজপাখির ডেরায় রেখে আসা ,

আবার একটু একটু করে

বাজপাখির ডেরা থেকে

খাবার চেয়ে নিয়ে এসে

ছানার মুখে তুলে দেওয়া !


এ বাজপাখির চোখে চোখ রেখে

কথা বলবে যে পাখি ,

কোথায় ,কোথায় সে ?




 






নবান্ন

      টিটু সরকার


তোমায় হেমন্তের মেঘে ভেজাবো বলে; প্রখর তাপে নিংড়ে দিয়েছি জলীয় বাষ্প।

পেজা তুলোর মতো মেঘকে, করতে চেয়েছি ঘন কালো;

তোমায় একটু ভেজাবো বলে।


ধানের রোয়া লাগানোর সময়, যেভাবে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়েছিল; সে কি আনন্দ আমার! খুব ভিজেছিলাম আমি।

এক নিমেষে শেষ করে দিয়েছি সব কাজ; পরম আনন্দে। 

তোমায় চিৎকার করে বলেছিলাম, চলো দুজনে একসাথে ভিজবো। 

তুমি " যা! পরে ভিজবো " বলে ছুট্টে পালিয়ে গিয়েছিলে। কতদিন বৃষ্টি হলো, বন্যা হলো, তুমি ভিজলে না। ধান নষ্ট হলো।


তারপর প্রখর রোদ।


সেই থেকে আমি আকাশ দেখছি; 

আর মেঘ নেই, ধান নেই।


তোমায় হেমন্তের মেঘে ভেজাবো বলে; প্রখর তাপে নিংড়ে দিয়েছি জলীয় বাষ্প।

কাঠ ফাটা রোদ্দুরে, গায়ের ঘাম দান করেছি, হেমন্তের মেঘকে। 

সেই যে বড়ো বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের কাজে গিয়েছিলাম; সেখানে সূর্যকে শুষে নিতে দিয়েছি কতো জল। জল খাইনি আমি একটুও।


তোমায় হেমন্তের মেঘে ভেজাবো বলে।



 





হেমন্তকাল ও ওরা তিনজন 

শ্রাবণী সেন

ঝকঝকে আকাশে রাশি রাশি নক্ষত্রের মেলা

ছাতিমগন্ধ ভরা হিমেল রাত, কতো রাত এখন?

মধ্যরাতের পাহাড়ি আকাশের নিচে তিন যুবক!

ওরা তারা খোঁজে, ওরা অসীমের হাত ধরে।


কোজাগরী রাত! তিন যুবক এসেছে সমুদ্রতীরে

খোলা আকাশের নিচে, সামনে অশান্ত সাগর

রূপোলি আলোয় রূপকথা বুনছে অবিরাম 

ওরা জ্যোৎস্না মেখেছে সারা গায়ে, চন্দনের মত।


অন্ধকারভেদী সূর্য উঠেছেন, জবাকুসুমসঙ্কাশ! 

তিনজন আজ এসেছে আমন ধানের ক্ষেতে 

পাকা ধানে সোনালি রোদের অপূর্ব মাখামাখি  

অগ্রহায়ণী বাতাসে নবান্নের সূচনা শুনেছে ওরা! 


 





ঘুষ


মাথুর দাস



ধুস্ !


হ্যাংলার মত হাত পেতে পেতে


আর কত নিবি ঘুষ ?



ঘুষ দিতে নিতে দাম বেড়ে যায়,


ভেজাল বাড়ায়


ব্যবসা-মক্ষীচুষ্ ।


নেই প্রতিকার জীবন-বিকার,


ধিকিধিকি জ্বলে


না-দেখা আগুন,


তুঁষ ।



অন্ধকার দিয়ে সব আলো কেনা


ভালো নেই তবু কালো টাকা সোনা,


স্বার্থ-জীবন ব্যর্থ কোথাও,


ফুস্ !


 





নবান্ন 

চুমকি দাস


হেমন্তের ছোট ছোট দিনে-

অনেক ছোট বড় স্বপ্ন সাজতে শুরু করেছে

                       এক উজ্বল দিবসের ।


এ ছোট ছোট দিনেই

হালকা কুয়াশা ঘেরা বিকেলে শীতল হাওয়া যেন

                      মনটাকে নিয়ে যায় কোন স্বপ্ন মদিরায়।


ঘরে ঘরে সোনার ঝলক

নতুন ভাতের ঘ্রাণে-

                উৎসব হবে গো- নবান্ন উৎসব।


 






সোসাল ডিসট্যানসিং 

নবনীতা


দূরত্ব ?

সে তো তৈরি হয়েছে সেই কবে থেকেই ৷ বহুকাল হল সরে এসেছি , সরিয়ে দিয়েছি সেই সব কিছুকেই যা বিষাদে বিক্ষত করে তোলে যাপন ৷ 

এই সরে আসার ভালো - মন্দ জানা নেই ৷ এই সরে আসায় হারানো - প্রাপ্তির হিসেব করিনি কখনও ৷ এই সরে আসা শুধু আমার ভেতরকার এক নতুন আমি কে জন্ম দিয়েছে ৷ যে আমি সবার মধ্যে থেকেও আলাদা থাকতে পারে,নিজেকে গুটিয়ে রাখতে জানে ৷ 

তবে প্রসঙ্গ এখানে শুধু আমি নই ...একটা সমাজ ৷ যে সমাজ এক অণুজীবের দাপটে দীর্ঘকাল স্পর্শ বিমুখ ৷ একটা সমগ্র জাতি দাঁতে দাঁত চেপে হজম করছে যাবতীয় স্বাস্থ্যবিধি ...দরজায় খিল এঁটে চার দেওয়ালের ভেতর বসে থাকা এই আস্ত সমাজের চিত্রটি বোধহয় ভাবনাতীত ছিল ৷


তবে বরাবরই কিছু খারাপের নীচে ফসিলের মতো চাপা পড়তে থাকে কিছু ভালো ৷ শুধু তার খোঁজ পাওয়া সকলের সাধ্য নয় ৷ সুতরাং অসমাপ্ত রয়ে যায় কিছু রঙিন ক্যানভাস ৷ আর সভ্য সমাজ ব্যস্ত হয়ে পড়ে খামতির দীর্ঘ তালিকা প্রস্তুতে ৷ হা-হুতাশ জমতে থাকে , না পাওয়ার বৃত্তটিকে ঘিরে ৷ 

তবে এরই মাঝে আমার মতো বেহিসেবী , ছন্নছাড়াদের মনের দেওয়াল বেয়ে চুঁইয়ে পড়ে আদিম রঙিন সব ইচ্ছেগুলো ৷ না না ... সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ ভাঙার কোনো তাড়না জাগে না জীবনের প্রান্তিকে দাঁড়িয়ে ৷ এখন শুধু শব্দেরা চুপি চুপি ডানা মেলে দেয় আর অভিমানেরা কোথাও মিশে থাকে তার আশেপাশে ৷ হাসিকান্নার বারোমাস্যায় চলতে থাকা এই খড়িকাটা জীবন আরো কিছুটা অক্সিজেন শুষে নিতে পারে ঐ শব্দগুচ্ছের থেকে ৷ 

অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো চেনা চেনা মুখগুলোকে মেপে চলে আমাদের অনভ্যস্ত চোখ ৷ সামাজিক দূরত্বের বিধি মেনে চলতে গিয়ে অজান্তেই নৈকট্য গড়ে ওঠে আপামর ভার্চুয়াল বন্ধুদের সাথে ৷ কোথাও একটু স্বস্তি , কোথাও খানিক আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এই হেমন্তের শেষ বিকেলগুলিতে ৷ মনের ক্ষুন্নিবৃত্তি চলতে থাকে এভাবেই বুঝি ৷ যে যেভাবে পারে ঠিক খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার রসদটুকু ৷ সারি সারি চৌখুপিতে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যায় সাংসারিক চিৎকার ৷ আর সেই চৌখুপির ড্রইংরুমগুলোতে ইদানিংকালের সন্ধ্যেগুলো হয়ে ওঠে সিরিয়ালময় ৷

আকাশের নির্বিকার নক্ষত্রমালা আর নিকেল জ্যোৎস্না নিঃশব্দে হাসে .... দূর থেকে ৷ ঐ দূরত্ব মেটানোর অপেক্ষায় চলতে থাকে মানব সভ্যতার চিরকালীন এই যাপন ৷৷ 

                                                



 






মৃত শহর

নন্দিতা কার্জী


আরশিতে বার খানেক তোমার ঝলক পেতে

নিম্নগামী নাবতে দেবোনা বলেও ফের নেবেছিল...

ওই নরম শিশুমনটাকে বারে বারে জন্ম দিই আমার ভাঙা হৃদয়টাতে ৷


ফের থামলে ?


থামো এবার তোমার মৃত শহরটাতে ৷

আমার আমিটাকে এবার গুটিয়ে নেবো

জমলে শীতে ৷ জল গলনও হয় ভরা গ্রীষ্মের তাপে ;


বরফ ঢাকা চাদরে প্রচন্ড অভিযোগ

তাইতো নাকের উপর বয়ে যায় ঠান্ডা হিমেল স্রোত ৷


তুমি আর তোমার মৃত শহরটাতে ৷

কুয়াশা ঢাকা নাকি মেকি ধোঁয়ার আস্তরণ ?

জল ছলাৎ আমার হৃদয় ভাঙা গর্ভটাতে ৷


আরশিতে মুখ ফের দেখি স্বচ্ছ-স্ফটিক নাকি কালির ছোপ ?


আমার দেখা তোমার মৃত শহরটাতে ৷

নষ্ট নাটক...

নষ্ট ফুল, নষ্ট হওয়া যত অভিমান পুষিয়ে নেবো

তোমার ধুলো হীন মৃত শহরটাতে ৷




 






                   পুরনো প্রেম নতুন কষ্ট

                         কিশোর পণ্ডিত


 স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ডাক পিয়ন এসে একটি চিঠি দিল । একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই ভাবলাম বাড়ি গিয়ে পড়ব । রাতের খাবার খেয়ে চিঠিটা পড়তে বসলাম। । চিঠি পড়ে চমকে উঠলাম । বিন্দু লিখেছে ভারত থেকে । ২৮ বছর পর বিন্দু ! ওর দেওয়া বিরাট নামেই আমাকে সম্বোধন করেছে।সে লিখেছে সে নাকি আমার সম্পর্কে সব জানে । আমি শিক্ষকতা করি , আমার স্ত্রীর নাম দীপা , আমার এক মেয়ের নাম দিগন্তিকা । দ্বিতীয় সিজারে আমার এক মেয়ে মারা গেছে । এবার দীপার তৃতীয় সিজার । কিন্তু ওর সম্পর্কে কিছুই লিখেনি । 

বিন্দু আর আমি ক্লাস সিক্স থেকেই এক সঙ্গে পড়ে আসছিলাম । এইট থেকে ওর চোখে চেয়ে থাকতে ভালাে লাগে । লক্ষ্য করলাম ওর ভাবটাও আমারি মতন ।, ক্লাস টেনে ওঠে ওকে কিছু বলতে ইচ্ছে হল । একদিন সাহস করে কাছে গেলাম । কিন্তু সবকিছু গুলিয়ে গেল । অনেক চেষ্টা করেও মনের কথাগুলাে বলতে পারলাম না । আমার বন্ধু শহীদুল বুদ্ধি দিল সামনা সামনি যে কথাগুলি বলা যায় না সেগুলি চিঠিতে লিখে জানিয়ে দে । তার বুদ্ধিমত একদিন মনের সব কথা লিখে বিন্দুকে দিতে গেলাম । কিন্তু সে চিঠি নিল না । ভাবলাম তাহলে বিন্দু হয়ত আমায় ভালবাসে না । 


আশা ছাড়লাম না । হাতে চিঠি নেয়না বলে একদিন ডাকে চিঠিটা বিন্দুর ঠিকানায় দিয়ে দিলাম । ডাক পিয়ন চিঠিটা তার বাবার কাছে দিয়ে দিল । বিন্দুর নির্লজ্জ বাপ চিঠির বিস্তারিত পড়ে আমাকে শাসিয়ে গেল । বিন্দুর লেখাপড়া স্থগিত করে দিলেন । আমি মাধ্যমিক পাশ করে গেলে বিন্দু একবছর বিরতি দিয়ে মাধ্যমিক পাশ করে । তার পরের বছর বিন্দুরা তাদের গ্রাম বিলাসপুর ছেড়ে সপরিবারে ভারত চলে যায় । বিন্দুর বান্ধবী দিপালীর কাছ থেকে শুনেছিলাম সে নাকি আমাকে খুব ভালবাসত । বিন্দুর বড়বােন ভালবেসে ঘর ছেড়েছিল বলে তার বাবা তাকে দিব্যি দিয়েছিল । সে যদি কোনদিন এমনটি করে তবে সে আত্মহত্যা করবে । এ ভয়ে সে কোনদিন মুখ খােলেনি । নিরবে ভালবেসে গিয়েছে । 


আগষ্টের ১০ তারিখ ২০১৪ সালের সকালবেলা আমার শ্যালক সুজনের সাথে বিন্দু এসে হাজির । কপালে সিঁদুরের ফোটা ছিমছাম গায়ের রং এখনাে আগের মতই ফর্সা আছে । বয়স হলেও বয়সের ছাপ পড়েনি । কত আর বয়স ৪২ কিংবা ৪৩ হবে । বিন্দু আমার দিকে তাকিয়ে রইল । আমিও তার দিকে । আমি তাকে দীপার সাথে পরিচয় করে দিলাম । দীপা আগে থেকেই বিন্দু সম্পর্কে জানত । সে হাসিমুখে তাকে নিয়ে ঘরে গেল । 


রাতে জিজ্ঞাসা করলাম কেমন আছাে বিন্দু ? সে বলল কেমন আর থাকবাে ঈশ্বর যেমন রেখেছেন । আমার সম্পর্কেতাে সব জানো এবার তােমার সম্পর্কে বলাে । বিন্দু বলতে থাকলাে , এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পাঁচ বছর পর আমার বিয়ে হয় । ১৬ বছর ঘর করার পরও আমার কোন সম্ভান হয় না । আমার স্বামী রাগ করে নিরুদ্দেশ হয় । চার বছর তার জন্য অপেক্ষা করি । কিন্তু সে আসে না । পরে আমিও বাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন তীর্থে সময় কাটাতে থাকি । একদিন বিকাল বেলা বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণের সেই প্রেম যমুনার ব্রীজের উপর দীর্ঘদেহী ব্রহ্মচারী সুজনের সাথে সাক্ষাত এবং পরিচয় । তার মুখ থেকে তােমার সম্পর্কে সব জানি । শেষে সাহস করে তারই সাথে এখানে আসা ।যেহেতু দীপা ৮ মাসের গর্ভবতী তাই বিন্দু সংসারের সকল কাজ একাই সামলিয়ে নিচ্ছিল । দীপার ডেলিভারি ডেট আসল । যেহেতু তৃতীয় সিজার তাই অভিজ্ঞ ডাক্তার এবং ভাল হাসপাতালে নেয়া হল । দীপা এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে এ মায়ার সংসার ত্যাগ করল । 


বিন্দুবাসিনী ঐ সন্তানকে লালনপালন করতে লাগল । ধীরে ধীরে এ সংসারে তার মায়া বাড়ল । নতুন আশা জাগলো মনে ।পুরনাে প্রেমিককে আরাে কাছে পেতে চাইল । বহুদিনের পুরনো ভালোবাসার সঞ্চিত সম্মতি আর নতুন মায়ায় পুরনো প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার নিরব সম্মতির নিশ্চিত ভরসায় আমার আত্মীয়রা আমার সাথে বিন্দুর বিয়ের দিন ঠিক করল । 


বিয়ের একদিন আগে বিকালবেলা প্রায় ৫০ বছরের লম্বাটে শীর্ণকায় এক ভদ্রলােক এসে হাজির হল । নাম অবিনাশ । জানতে পারলাম সে বিন্দুর স্বামী । সে তাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছে । একরাত সে এখানে থাকলাে । প্রায় ৫ মাস ধরে বিন্দু এখানে এসেছে আমরা দুজনে আলাদা ঘরে থেকেছি । কিন্তু অবিনাশ বাবু আজ রাতে বিন্দুর ঘরেই থাকলাে । বুঝলাম সে তার অধিকার বলেই এ অধিকার দেখালো । কারণ বিশ বছর আগে কিছু বিবাহের মন্ত্র তাকে বিন্দুর সাথে একত্রে বসবাসের অধিকার দিয়েছিল ।মন্ত্রের অধিকার দূরত্বকেও হার মানালো। সেই ভারত থেকে আমার দেশে এসে আমার ঘরেই অধিকারের ক্ষমতা খাটাল ।সে রাতে আমার ঘুম হল না । জানি বিন্দুরও ঘুম হয়নি । পরদিন সকালবেলা বিন্দু আমার ছেলে শৈশবকে আমার কোলে তুলে দিয়ে বিদায় চাইল । আমি বিন্দুর মুখের দিকে তাকাবার সাহস পেলাম না । তবুও জোর করে তাকাতেই দেখলাম বিন্দুর অশ্রুসজল নয়ন । আমার বুকের বাম কোণায় সদ্য দীপাকে হারানোর ব্যথা আর বুকের ডান কোণায় পুরনো প্রেমিককে না পাওয়ার কষ্ট বুকের মধ্যখানে জমা হয়ে দুচোখ দিয়ে জল হয়ে প্রবল বেগে গড়াতে চাইল। কিন্তু পুরুষ বলে সে জল তরল হয়ে চোখ দিয়ে না ঝরে বরফ হয়ে বুকের পাঁজরে জমে রইল ।তারা সরষেফুলের মাঠের পাশ দিয়ে রেলষ্টেশনের দিকে চলে যাচ্ছে , আমি তাদের গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম।




 





আলোর পথে  

পার্থ সারথি চক্রবর্তী 


আকাশের সব মেঘে বৃষ্টি হয় না 

তেমনি সব আলো হয় না 

                                     ভাস্বতী 

কিন্তু খোঁজার চেষ্টা চলে 

অবিরাম , প্রতিনিয়ত।


অন্ধকারের কানা গলিতেও 

এমনকি ব্ল্যাকহোলের অভ্যন্তরে,

                      বিস্ফারিত চোখে;

তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে, আবহমান কাল।


এভাবেই চলতে থাকি

                     দিনের পর দিন।

আলোর পথে পথে, কখনো বা

                     সুখের কল্পপথে। 


 





উত্তরায়ণ

বিজয় বর্মন


উত্তরায়ণে রাতটা খুব ছোট ,

নিশুতির স্বপ্নরা,

নতুন স্বরলিপিতে বাজায় ধামসা মাদল,


হারিয়ে গেছে চাঁদ মনির আলো,

টিম টিম বাতি,

ঝোপঝাড় পেরিয়ে সাজানো বাগান।


সেই সব আজ ইতিহাস,

এখনও মেলা বসে, ফাগুনে ও শ্রাবণে ,

স্বপ্ন পূরণের আশায় জল ঢালা,

স্মৃতিতে লেগে আছে মাটির পুতুলের রং ।


আলোর ঝংকারে ঝাপসা চোখ,

আড়ালে দেখি চাঁদমনিকে ,যেন স্বপ্নের ঘোরে,

নিমেষে আবার হারিয়ে যায় ,

পুরনো স্বপ্নকে চাপা দিয়ে আবার,

নতুন স্বপ্ন দেখতে দেখতে,

আমিও ঢুকে যাই আলোর ঘূর্ণিতে ।


 






সিঁদোল

অখিল ঘোষ



   

    ছেলেকে নিয়ে নীরবালার স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেছে কবেই। মনের ভেতর গ্রন্থিত আশাগুলি আষাঢ়-প্লাবিত মরা রায়ডাকের স্রোতে ভেসে গেছে তার বহুদিন আগেই। আর আজ যেন সেই স্বপ্নাধার মনটাই ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেল। 

   মনে পড়ে নীরবালার--- ছেলে ছোটবেলায় দূর মাঠে যখন খেলতে যেত, বেলা ঢলে পড়ত পশ্চিমের বাঁশবাগানের আড়ালে, পুবের দিঘি থেকে হাঁসেরা উঠে এসে ধীরগম্ভীর পদে এগুতে থাকত নিজেদের আস্তানার দিকে, উত্তরের গুয়াবাগানের ওপর দিয়ে বাসায় ফিরত সাদা বকের সারি, দক্ষিণের 'ধুয়া' মাঠের ওপর দিয়ে বাদুড়েরা একটা দুটো করে রাতের সফরে বেরোতে শুরু করত, একদল শালিক 'ডারিঘর'-এর চালে বসে দিনের শেষ জটলাটা সেরে নিত, চড়ুই পাখিগুলো ফুড়ুৎ করে উড়ে শেষবারের মত ঝাপড়া আম গাছটার ভেতর সেঁধিয়ে পড়ত, তখনও ছেলের ফিরবার নাম নেই দেখে বুকের ভেতরটা কেমন করতো ওর। 'আগদুয়ারির' বিষহরি মণ্ডপে 'গছা' দিয়ে আসতে আসতে গলা ছেড়ে হাঁক পাড়ত সে--- অারে কা-ন্দু-রা রে-এ-এ...! 

   কান্দুরা ওর ডাকনাম। 'ছুঁয়াঘর' এ থাকার সময় দিনরাত শুধু কাঁদত বলে ওর ঠাকুর্দা এই নামটা দিয়েছিল। আসল নাম মংলু--- মঙ্গলবারে জন্মেছিল বলে--- এখন অবশ্য সেই নামটিও নেই, কলেজে ওঠার সময়ে কোর্টে গিয়ে পাল্টে 'মঙ্গল' হয়েছে।

   হাঁক শুনে ছেলে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করত-- কী হইছে মাগো, ডেকাইস্ ক্যানে? 

--- ডেকাং ক্যানে! সাইনঝ্যা পার হয়া যাবার ধইরচে, এ্যালাও বাড়িত আইসার নাম না করিস ক্যানে তো? জানিন্ ন্যা, এই সমায় খ্যাতে পাতারে, ঘাটায় আঘাটায় কত দ্যাও মাষাণ ভূত পেত্যানি ঘুরি বেড়ায়! 


---ভূত পেত্যানি মোর কী করিবে? --ছেলে নিজের বাহুতে চাপড় মেরে তাকে ভরসা দিত--- মোর সোতে পাইবে কিতা উমরা ? মোর ঝা গায়ের জোর!


--- তোর গায়ের জোর বিরাইবে ; বুজিবু, ঝেদিন গদ্দানত ঠাসি ধইরবে।


   সে কথায় পাত্তা না দিয়ে নীরবালাকে জাপটে ধরে মুখটা কীরকম যেন মায়ালু করে তুলে আব্দারী স্বরে বলত, ম্যালা ভোক নাগিছে মাগো, এ্যাকনা এ্যাও দিবু, আধাফুটা ? 

কপট রাগের স্বরে বলত নীরবালা--- যা হাঠ্যাং ধুয়্যা আয় আগোত। খেয়াদেয়া পড়া পড়ির বসিবু !

  হাত-পা ধুয়ে এসে এক 'জামখোরা' ভরে দুধ-আঁঠিয়া কলা দিয়ে আধাফুটা খেত হাপুস হুপুস করে। যেন কতদিনের ভুখা।

   ওর খাওয়া দেখতে বড় ভাল লাগত নীরবালার। যেদিন সিঁদোল হত, সেদিন তো খাওয়া ওর শেষই হত না। শেষে কারো বকুনি খেয়ে তারপর উঠত পাত থেকে। খাওয়ার ভারে উঠতেই পারত না। কোনওরকমে উঠে কুঁজো হয়ে হাত ধুতে যেত। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারত না। পেটটা হয়ে উঠত পুরো হাওয়া ভরা গোলগাল শক্ত একটা ফুটবলের মতো। কী ভালোটা যে লাগত তা দেখে নীরবালার ! হাত ধুয়ে এসে ঝালের চোটে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে ' হু-হা' করে বেড়াত। আর মাঝেমধ্যে বলত, 'খালুং রে খালুং, সে-ই খান খালুং আজি !' 

   সিঁদোল খেতে এত ভালবাসত ছেলেটা, আর আজ....

   এই তো সেদিনও, কলেজে পড়ার সময়, হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরেই বলত, মাগো, আজি সিঁদোল রান্দিবু! তোর হাতের সিঁদোল খাবার বাদে জিঁউ এ্যাক্কেরে আখাস ফাকাস নাগাইছে !

   এমনকি ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যে ক'দিন বাড়িতে থাকত, সাধ মিটিয়ে তো খেতই, যেদিন ফিরে যেত, হটপট-এ করে নিজের ও বন্ধুদের জন্য নিয়েও যেত। আর,মাঝেমধ্যেই বলত, মাগো ! তোর নাকান সিঁদোল রান্দিবার আর কাঙোয় নাপায়। উ-আ-হ ! কী সোয়াদ যে নাগে তোর সিঁদোলের ! 

নীরবালার মনে যে কী আনন্দই হত সেসব শুনে ! 

  আসলে নীরবালা সিঁদোলটা তৈরিও করে খুব মন দিয়ে আর খেটেখুটে।


   লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিল কান্দুরা। দ্বিতীয় হয়নি কখনও কোনও ক্লাসে। ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ হতে না হতেই মুম্বাইতে বড় একটি সংস্থায় বেশ উঁচু পদে চাকরী পেয়ে যায়। ফ্রিতে ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্রেনে-বিমানে যাতায়াত সবই কোম্পানি বহন করে। বেতনও দেয় বিরাট অঙ্কের। 

   সেই যে গেল ছেলে দূরে, নীরবালা আর নাগালই পেল না তার। মন শুধু তার আঁকুবাকু করে মরে। ছেলে রয় সুদূরে দিন-মাস-বছর। সযত্নে তৈরি করা সিঁদোল তার পড়ে থাকে অনাদরে। বর্ষায় ভরভরন্ত খেতপাথার নদীনালা খালবিল থেকে জাল-জাখৈ-ঝাঁটি-ঢোসকা-টেমাই-বুরুং ভরতি করে উঠে আসে চ্যাং শাটি দ্বারিকা খলিসা পুটি মলা কই শিঙি মাগুর ; ফাগুন-চৈতে 'বাহো' দিয়ে অথবা খালবিলের জল সেঁচেও ধরা পড়ে প্রচুর মাছ। বেছে বেছে যত্ন করে শুটকি দেয় নীরবালা, সিঁদোল বানায়; কিন্তু কেউ আর এসে বলে না--- মাগো, তোর হাতের সিঁদোল খাবার বাদে জিঁউ এক্কেরে আখাস-ফাকাস নাগাইছে ! 

   প্যালকা ভ্যালকা আধাফুটা ফোকতানি নীরবালার পড়ে থেকে থেকে আস্তাকুঁড়ের খাদ্য হয় শেষে। কান্দুরা ( নীরবালা ওকে কান্দুরা বলেই ডাকে এখনও) চলে গেছে দূরে, সেসব খাওয়ার মানুষ নেই। অন্যেরা খেলেও সেই তৃপ্তির ছাপ খুঁজে পায় না কারো চোখেমুখে নীরবালা। বলা ভাল, অন্য কারো তৃপ্তি তাকে তেমন শান্তি বা আনন্দ দিতে পারে না।


   সেই যে গেল ছেলে, আর তো কই এলোই না। বিষুয়া যায়, পুষনা যায়, তেরাবেড়া যায়, যাত্রা

যায়; যায় রাস, দোল সোয়ারি মেলা, নীরবালার দিন শুধু পথের পানে চেয়েই যায়। 

   যদিওবা দু একটিবার আসে ও, উল্কার মতো মুহূর্তে মিলিয়ে যায়। নীরবালা রোজ বিষহরি মণ্ডপে 'গছা' দেয়, দূরে মাঠের দিকে তাকায়, ছোট ছোট ছেলেরা মাঠে খেলা করে, নীরবালার মনটা হু হু করে ওঠে। ওর মনে হয় ছোট্ট কান্দুরা বুঝি ওই মাঠে খেলা করছে। আকুল হয়ে মনটা ওর ডেকে ওঠে--- আরে কান্দুরা রে-এ-এ-এ...

অন্তরের সেই ডাক কোথাও পৌঁছায় কিনা জানে না সে, কিন্তু ওর ভেতর থেকে সে ডাক উঠতেই থাকে, উঠতেই থাকে বিষুয়া থেকে পুষনায়, যাত্রা থেকে তেরাবেড়ায়। কান্দুরা আসে না। বড় কোম্পানি, বড় পদ, বড় বেতন, বড় দায়িত্ব; তাই ছুটি নেই। বহুদিন পর হয়তোবা আসে ধুমকেতুর মতন, আবার চলে যায় নিমেষে; আবার প্রতীক্ষায় থাকে নীরবালা। সে আসে না, তার টাকা আসে মাসে মাসে নিয়মিত। নীরবালা সে টাকা শুঁকে তুলে রাখে সিন্দুকে। মাঝেমাঝে বের করে শোঁকে, আবার রেখে দেয়। সে টাকায় গন্ধ আছে কান্দুরার। সেই গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে দুচোখ জলে ভরে যায় নীরবালার।


    পরপর তিন মেয়ের পর ষাইটোল মায়ের দয়া একমাত্র ছেলে কান্দুরা। একে পাওয়ার জন্য কী না করেছে নীরবালা--- কত জায়গায় হত্যা দিয়েছে; কত মায়ের পাট, বাবার থানে মানত করেছে। করেছে কত ব্রত পালন। বক্সিরহাটের পলিকা মেলায় গিয়ে মনস্কামনা কালী মাকে 'কইতর' দিয়ে পুজো দিয়েছে। ধুমপুরের মাসানকালী মন্দিরে পাঁঠা মানত করেছে। 'ডাংধরা মাও' এর পূজায় উপোস থেকে সোনার নথ দিয়ে সঙ্কল্প করেছে। করেছে মাসান পূজা, বুড়া ঠাকুরের পূজা, ষাইটোল পূজা, মূর্তি দিয়ে কাতিপূজা ; শেষে ভোঙর ডাঙানো, তাবিজ-কবজ, জলপড়া-ফলপড়া কিছুই বাদ রাখেনি নীরবালা একটি পুত্রসন্তানের জন্য। ওঝা ডেকে এনে বাড়ির চারপাশে অপদেবতার ' নজরকাটা' করেছে। ভাল করে পুজো করে লাগিয়েছে হনুমান নিশান--- যে যেটা বলেছে, অগাধ বিশ্বাস নিয়ে করেছে সেটাই। ছুটে গেছে কাছেদূরে সব থান-পাটে; মানত করেছে, পুজো করেছে গলবস্ত্র হয়ে, আঁচল পেতে যাচ্ঞা করেছে একটি পুত্রসন্তান। 

   সেই বহু আকাঙ্খিত বুকের ধন, হৃদয়ের টুকরা এখন বৈদেশিয়া।

   বুকের ভেতরটা চৈতের দুপুরের মতো খা-খা করে নীরবালার সবসময়। কান্দুরা বিহনে সেখানে মিষ্টি পাখিডাকা নেই, শীতল বাতাস নেই, মিঠে রোদ নেই, কাশফুলের দোলা নেই, বৃষ্টির ঝরঝর নেই। সেখানে আছে শুধু বিষণ্ণ সকাল আর বিবর্ণ বিকেল ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নিদ্রাহীন রাত। না জানি ছেলেটা কত কষ্টে আছে। ঠিকমতো খেতে পাচ্ছে কিনা কে জানে। খেতে ভালবাসে, কিন্তু কে খাওয়াবে ওকে যত্ন করে বিদেশ বিভুঁইয়ে? এই ভাবনার আবহেই নীরবালার দুঃস্বপ্নকণ্টকিত প্রতিটি রাত কাটে প্রায় বিনীদ্রভাবে। 

   নীরবালার মাঝেমাঝে মনে হয়, ছেলেকে অত ভাল করে লেখাপড়া না শেখানোই ভাল ছিল। জমিজিরেত যতটুকু আছে, 'হাইল্যার' আর পাঁচটা ঘরের ছেলের মতন হালকৃষি করলে মোটা ভাত মোটা কাপড়ের অভাব হত না। বুকের সোনাধন থাকত বুকের কাছেই। জমি থেকে ফিরে এলে রোজ দুপুরে আঁচল দিয়ে ঘর্মাক্ত কর্দমাক্ত শরীর মুছিয়ে দিতে পারত। 'বাইরড্যাগ' এ কাঁঠাল গাছের তলায় বাঁশের মাচার উপর চাটাই পেতে দিত, কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকত কান্দুরা আর তালের পাখা দিয়ে বাতাস করত নীরবালা। একটু জুরোলে গাছের জামির লেবু ছিঁড়ে এনে সরবত বানিয়ে দিত ; 'পাইছলা বাড়ি' র গাছ থেকে পাকা জম্বুরা পেড়ে এনে কাঁচা শুল্কি মরিচ চিনি লবন দিয়ে ঝাল করে মেখে দিত এক গামলা। তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা খেয়ে দিঘি থেকে গা ধুয়ে এলে যত্ন করে সিঁদোল দিয়ে ভাত বেড়ে দিত। খেয়ে উঠে পরম তৃপ্তিতে বলত--- সে-ই খান খালুং! 

   লেখাপড়া শিখে ছেলে এখন কোন যখের পুরীতে আটকে আছে কে জানে। 


   চাকরিতে যাবার পর থেকে তিনবছর এভাবেই কাটল। তারপর একদিন খবর এল--- ও বিয়ে করেছে। পাত্রী কোলকাতার এক বনেদি ঘরের মেয়ে। ইউনিভার্সিটি পড়ার সময়েই পরিচয় আর প্রেম। কোচবিহারের তপশিলী জাতি তথা রাজবংশী ছেলের সঙ্গে তাঁদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি নয় মেয়েটির বাবা-মা। তাঁরা অন্যত্র বিয়ের বন্দোবস্ত করছিলেন। মেয়েটি তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে সোজা কান্দুরার ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠে এবং উকিল ডেকে বিয়ে করে নেয় দুজনে। 

   নীরবালার বুকটা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল এ খবরে। একমাত্র ছেলের বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার। সে তার মনের অন্দরে সযত্নে একটু একটু করে বহুদিন ধরে থরে থরে সাজিয়ে রাখছিল নানা রঙীন পরিকল্পনা। স্বপ্নের সেই বিন্যাস নিজেই কখনও ভেঙ্গেছে সে, নিজেই আবার করেছে বিন্যস্ত আপনমনে, নৈমিত্তিক নিয়মে। দৈনন্দিন জীবনে নীরবালার অবশ্যকরণীয় একটা কাজে পরিণত হয়েছিল কিছুদিন যাবৎ এটা। 

   নিকট দূর সব আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে কান্দুরার, সমস্ত রীতি-প্রথা পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে। 'জব ছেঁড়া'-র পর মা সুবচনীকে গুয়াপান দেওয়া থেকে শুরু করে 'ষোলমাতৃকা পূজা' সবই যাতে ঠিকঠাক মতন হয়, সেজন্য উপযুক্ত এঁয়ো-বৈরাতির তালিকা প্রস্তুত করে রেখেছে মনে মনে। এছাড়া মনে মনে ঠিক করে রেখেছে--- বিয়ের দিন 'নারদের ভার' কে নেবে, কাকে 'মিতর ধরা' হবে, কে হবে 'পানি ছিটা বাপ' সবকিছু। 'সেরকীয় মারৈ' বিষহরি পূজা হবে, হবে 'জাগানি ভাসানি গীত', 'কইন্যা জুরানি গান'। দেশি ভুঁইমালীর বাজনার তালে তালে বৈরাতী নাচ নাচতে নাচতে হাইল্যার সকল সধবা জল ভরতে বা গঙ্গা নিমন্ত্রণ করতে যাবে...ইত্যাদি আরও কত যে পরিকল্পনা ছকে রেখেছে নীরবালা ! আর...

    আর... মনের একেবারে মধ্যিখানে একটা ইচ্ছা জমাট বেধেছিল--- একটা টুকটুকে রাজবংশী পাত্রী দেখে বিয়ে দেবে কান্দুরার। যাকে সে একেবারে নিজের মতন করে গড়ে তুলতে পারবে। বংশের তথা সমাজের চিরাচরিত আচার অনুষ্ঠান রীতিনীতি সংস্কার সব হাত ধরে শিখিয়ে পড়িয়ে যেভাবে নীরবালার শাশুড়ী নীরবালাকে এক পরিপূর্ণ রাজবংশী রমণীতে পরিণত করে দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে সে নিজেও তার পরম্পরাগত দায়িত্ব পালন করবে, এই বাসনাও মনের মধ্যে লালন করে এসেছে বহুদিন থেকে নীরবালা। বারো মাসে তেরো পার্বণের যে পরম্পরা তাকে তো বহমান রাখতে হবে আগামী প্রজন্মে। 

    বুক ভেঙ্গে কান্না এসেছিল নীরবালার সে খবর শুনে। সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা স্বপ্ন এভাবে গুড়িয়ে দিতে পারল কান্দুরা ! ভেবেছে নীরবালা। ওকে নিয়ে মায়েরও যে কিছু বাসনা থাকতে পারে, মায়ের যে আর দুটো ছেলে নেই যাকে দিয়ে অপূরিত সেই মনোসাধ চরিতার্থ করবে--- কান্দুরা কেন সেকথা একবার ভেবে দেখল না ? বহুদিন এসব ভেবেছে আর গুমড়ে গুমড়ে কেঁদেছে নীরবালা। যে পুত্রমুখ দর্শন করার জন্য একদিন কত থানে-পাটে-মন্দিরে হত্যা দিয়েছিল, সেই পুত্রেরই আর মুখদর্শন করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে সে। লাগাতার চলে অশ্রুবর্ষণ একান্তে, কতদিন তার হিসেব নেই। কান্দুরাকে ভুলতে তো পারে না, ক্ষণেক্ষণে পলেপলে মনে পড়েছে ; যখনই মনে পড়েছে, দুচোখ ভরে গিয়েছে জলে। শাওনের আকাশের মতো ঝরতেই থেকেছে ঝরতেই থেকেছে বিরামহীন। অবশ্য বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল কান্দুরা, কিন্তু কথা বলেনি নীরবালা।


   'সময়' একটা বড় গুণীন। তারই অতিবাহনে নীরবালার অভিমানী মাতৃহৃদয় একদিন প্রবোধ খুঁজে পায়--- আহা ! ছেলের সুখেই তো তার সুখ ! কান্দুরা যদি সুখী হয়, তবে তার আর কীসের দু:খ ! আর আজকালকার ছেলেমেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বাবা-মার প্রত্যাশা রাখাটাই বোকামী। এটাই যুগধর্ম। আর পরম্পরা রক্ষা ? নিজের সম্প্রদায়ের মেয়েকে পুত্রবধূ করলেই যে সে নীরবালার সবকিছু মেনে নিয়ে আগ্রহ সহকারে শিখেপড়ে নেবে তারই বা কী নিশ্চয়তা ? চারদিকে কম কিছু তো দেখছে না নীরবালা ! একটু আধটু স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে একেবারে সব বিদ্যেধরী হয়ে ওঠে। নিজের সমাজের, সম্প্রদায়ের, বংশের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, অশ্রদ্ধা করা বা অপ্রাসঙ্গিক মনে করাটাকেই তারা শিক্ষিত হওয়া বা আধুনিক হওয়া বলে মনে করে। এমনকি, নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতেও সঙ্কোচ বোধ করে। তাদের শিক্ষাদীক্ষার দম্ভ-অহমিকার কাছে নীরবালার মতন প্রবীণেরা তো আজকে জবুথবু, অস্তিত্বসঙ্কটে খাবি খাওয়া প্রাণী। নীরবালার কাঙ্ক্ষিত রাজবংশী পুত্রবধূও যে সেরকমটি হত না তা কে বলতে পারে ? 


    সময়ের ব্যবধানে নীরবালার হৃদয়ের ক্ষতস্থানগুলি প্রায় ভরে এসেছিল, কিন্তু আজ আবার এক প্রবল আঘাতে তীব্রবেগে শুরু হল সেগুলি থেকে রক্তক্ষরণ। 


   দুদিন আগে স্ত্রী আর তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে বাড়ি এসেছে কান্দুরা। বিয়ের পরপরই কোম্পানি ওকে বিদেশে পাঠিয়েছিল। বউকে সঙ্গে নিয়েই গেছিল। মেয়ের জন্ম ওখানেই। তিনবছর বয়স হয়ে গেল মেয়ের, না হল 'জাতকবচ', না হল 'ছুঁয়াকাটা নবুদ'; 'ভাতছোঁয়া', 'চূড়াকরণ' কিছুই হল না। হল না তো হল না, ও নিয়ে অতটা ভাবিত হয়না নীরবালা আর। নিয়ম আচার তো ধীরে ধীরে উঠেই যাচ্ছে সব। 

    ওরা আসার পর ঘটনাবহুল কয়েকটা দিন কেটে গেছে। ভাললাগা মন্দলাগা দুটো মিলিয়েই সবটা মেনে নিয়েছে নীরবালা। কিন্তু একটু আগেই যে ঘটনাটা ঘটে গেল, তাতে ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে গেল ভেতরটা ওর। বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে ফেলছে নীরবালা এখন। 


   এখানে আসার পর থেকেই কান্দুরার বউ কেমন যেন একটা নাক কোঁচকানো ভাব করছিল। কেমন একটা ঘেন্নাঘেন্না ভাব। মেয়েটাকেও কোলে দিতে চায় না। কখনও কোলে নিলে প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে চলে যায় নানান বাহানা করে। নাকি 'ইনফেকশন' না কী যেন হয়ে যাবে। এখানকার কোনও কিছুই নাকি কী বলে, 'হাইজিনিক' নয়। কথাগুলো এই ক'দিনে এতবার শুনেছে যে, মুখস্থ হয়ে গেছে নীরবালার। কিন্তু মানে জানে না একটিরও। তবে, সম্ভবত 'ভাল নয়' বা খুব খারাপ একটা কিছু হবে এটুকু অনুমান করেছে নীরবালা। মেয়েটাও হয়েছে তেমনি, কোলে নিলেেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে। কাল সন্ধ্যেবেলাই তো, কোলে নিয়ে গান করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছিল নীরবালা--- "আয় নিন্দোবালী আয়/ মোর সোনামইনা নিন্ যাবার চায়।/ এক শিয়ালে রান্দেবাড়ে তিন শিয়ালে খায়/ কানকাটা এক বুড়া শিয়াল ভুড়কি মারি চায়।"... 

   কিন্তু মেয়ে ঘুমোবে কী, আরও বেশি করে কাঁদতে শুরু করলো। ওর মা ছুটে এসে কোল থেকে কেড়ে নিল। সুর করে কেমন এক 'হামটি ডামটি' বলল, আর মেয়ে চুপ করে ঘুমিয়ে পড়ল। 


   টুকটুকে পুতুলের মতো দেখতে নাতনীটিকে কত আদর করতে ইচ্ছে করে, কোলে নিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে, ঘুম পাড়াতে ইচ্ছে করে; কিন্তু...


   

   আজ দুপুরে সবাইকে রান্না করে খাওয়াল বৌমা। মুরগীর মাংস রান্না করল। ওরকম মাংস রান্না জীবনে দেখেনি নীরবালা। তরকারিটার নামও আছে আবার একটা--- চিলি চিকেন ! 

   ওদিকে কান্দুরার কাকিমা কবুতরের মাংসের তরকারি দিয়ে গেছে। এটাও কান্দুরার প্রিয় খাবারের মধ্যে একটি। কান্দুরা বউকে বলল, খাবে নাকি? 

--- কী এটা ? 

--- চিলি কইতোর ! হাসতে হাসতে বলল কান্দুরা, মানে রেড চিলি আচ্ছা করে বেটে দিয়ে, লাল টকটকে ঝালেঝোলে পায়রার মাংস ! 

--- পায়রা ! ইউ মিন, পিজিওন ? পায়রাও খাও তোমরা? ম্যা-গো ! কী খাও আর কী না খাও তোমরা ! ছিঃ !


   আজ রাতে সিঁদোল হয়েছে। এতদিন বাদে কান্দুরার পাতে সিঁদোল দেবে, তাই সন্ধ্যা থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল নীরবালা। আহা ! কতদিন পর আজ কান্দুরার ভোজনতৃপ্ত মুখখানি দেখতে পাবে সে ; কতদিন পর আজ ওর হাতের সিঁদোলের প্রশংসা শুনতে পাবে ; অথবা শুনতে পাবে--- সে-এ-ই খালুং !

সেই কবে থেকে এসবের জন্য খরা কবলিত খেতের মতো তৃষিত হয়ে আছে নীরবালার ভেতরটা ! বৌমাকেও খেতে দেবে খানিকটা। কে জানে সমস্ত কিছু অপছন্দের মধ্যে ওর গ্রাম্য শাশুড়ির হাতের এই প্রাচীন খাবারটির অনুপম স্বাদ তৃপ্ত জিভের ডগায় করে নিয়ে যাবে তার বিদুষী বৌমা। হয়ত দূর ভবিষ্যতে যখন সে থাকবে না, তখন কোনওদিন কোনও ক্ষণে মনে পড়বে এই খাদ্যটির কথা, এই স্বাদের কথা। সেইসঙ্গে মনে পড়বে কোচবিহারের প্রত্যন্ত গ্রামের পুবে দিঘি, পশ্চিমে বাঁশবন, উত্তরে সুপারিবাগান, দক্ষিণে ধুধু মাঠঘেরা বাড়ির এক বিধবা রমনীর কথা--- 'কান্দুরা' ডাকনামের এক ছেলের মায়ের কথা। সেদিন নীরবালা যেখানে যে অবস্থাতেই থাক, একটা শান্তির বা সুখের বার্তা তার আত্মার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। 


   বৌমার পাতে সিঁদোল দিতেই জিজ্ঞেস করল--- এটা কী ?

কান্দুরা বলল--- এটা উত্তরবঙ্গের খুবই জনপ্রিয় একটা স্থানীয় খাবার। শুটকি মাছ গুড়ো করে---

 --- ওয়াক ! ওয়াক ! ওয়াক !

   শুধুমাত্র 'শুটকিমাছ গুড়ো' শুনেই বৌমা এমন ভাব করতে লাগল, যেন তার অন্নপ্রাশনের ভাত বেরিয়ে আসছে। ওয়াক ওয়াক করতে করতে পাত থেকে উঠে কলতলায় ছুটে গেল। কান্দুরাও চলল পেছন পেছন। ওকে দেখে ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো গর্জন করে উঠল ওর বউ--- আমাকে মেরে ফেলার জন্য এখানে নিয়ে এসেছ ? ওয়াক !...ওয়াক !...


হাতে পায়ে মুখে-চোখে মাথায় জল দিয়েও থামছে না 'ওয়াক ওয়াক'। 

  " এরকম একটা আনহাইজিনিক আনসিভিলাইজ্ড এঁদো পাড়াগাঁ... আর একদিনও এখানে থাকলে আমি মরে যাব!"...

   মুহূর্তের মধ্যে হুলুস্থূল লেগে গেল যেন। বউমার মুখ দিয়ে যেন খই ফুটতে লাগল। শুরু হয়ে গেল তীব্র বাদানুবাদ। ক্ষিপ্ত বউকে কোনওরকমে থামানোর চেষ্টা করতে লাগল কান্দুরা। কী বলছে আর কী না বলছে বৌমা ! কান্দুরা প্রাণপণে চেষ্টা করছে ওকে চুপ করানোর। ইশারায় বোঝাতে চাইল--- মা শুনছে সব !

কিন্তু কে শোনে কার কথা ?

   " আর না, একদণ্ডও এখানে থাকতে পারব না আমি। কালই এখান থেকে যাবার ব্যবস্থা কর তুমি, নইলে আমি একাই চলে যাব বলে রাখলাম !...ওয়াক !...

     কান্দুরা ওকে কিছুতেই থামাতে না পেরে কোনওরকমে ঠেলে ধাক্কিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে খিল এঁটে দিল দরজায়। 

   ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেল নীরবালা। সে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। নিজেকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগল--- কেন সে বৌমাকে সিঁদোল দিতে গেল !

  

 খাবারদাবার যেমন ছিল তেমনই ঢাকা দিয়ে নিজের ঘরে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে দিল। ওর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ আর অনর্গল ধারার চোখের জল সবটাই শুষে নিচ্ছে বালিশটা।কান্দুরা ইতিমধ্যে ওর কাকাতো ভাইকে দিয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে আনিয়েছে। ওদের ঘরে এখন দরজা আঁটা, খাওয়া দাওয়া চলছে। 

   চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে নীরবালার। চারপাশ থেকে এক বিকট রিক্ততা এসে ওকে ঘিরে ধরেছে। যে ছেলে ওর হাতের সিঁদোল পেলে অমৃতও স্পর্শ করত না, আজ সে হোটেল থেকে এনে খাবার খাচ্ছে ! পাতের সিঁদোল পাতেই পড়ে রইল ! নিজের পেটের একমাত্র ছেলে এভাবে পর হয়ে গেছে, একথা মনে হতেই কান্নার দুরন্ত স্রোত এসে নীরবালার বুকটাকে প্লাবিত করে দিচ্ছে। কেবলই মনে হচ্ছে, কে যেন ওর হৃৎপিণ্ডটাকে--- ওর কান্দুরাকে ওর বুক থেকে টেনে হিঁচড়ে খুলে নিয়ে যাচ্ছে। কান্দুরা যতই দূরে থাকুক, নীরবালার সবসময়ই মনে হত একেবারে কাছটাতেই রয়েছে ও ; এই বুঝি আবদারী সুরে বলে উঠবে--- মাগো, এ্যাকনা এ্যাও দিবু ?... মাগো, তোর সিঁদোল খাবার বাদে জিঁউ এক্কেরে আখাস-ফাকাস নাগাইচে !... মাগো...

এখানকার সবকিছুর মধ্যে থেকে নীরবালা সবসময় শুনতে পায় কান্দুরার কিশোর কণ্ঠের 'মাগো'..., 'মাগো'...

কান্দুরা যে মাঠে খেলত, সুপুরিবাগানের যেখানে দোলনা খাটিয়ে দোল খেত, ঘরের যে কোণ থেকে কোকিলপাখির ডাক নকল করে চেঁচাত--- কু-উ-উ-উ-উ !...প্রতিটি জায়গা থেকে ওর আবদারী ডাক শুনতে পায় নীরবালা--- মাগো !...মাগো !...মাগো !...

   কিন্তু আজ এখন মনে হচ্ছে কান্দুরা চলে গেছে দূরে,অ-নে-ক দূরে ! সেই ডাক আর সে শুনতে পাবে না।

   বুকের ভেতরটা ওর যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল, ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে খানখান হয়ে যেতে লাগল।

  "মাগো !... মাগো !..." 

   

   "মাগো !... মাগো !... নিন্ গেচিস্ মাগো ?"

   নীরবালা ধড়মড়িয়ে ওঠে। আরে, এ যে--- 

দরজা খুলে দেখে, কান্দুরা দাঁড়িয়ে আছে, "ভাত দে মাগো, ভোক নাগিচে !"

"ক্যানে, তুই খাইন্ নাই ?" 

" তুই ভাবিলু ক্যাংকরি মাগো, বাড়িত আসিয়া মুই তোর হাতের সিঁদোল না খেয়া ওইল্যা খাইম ! বোলে তোর হাতের সিঁদোলের বাদে কুন্দিন থাকিয়া জিঁউ মোর আখাস-ফাকাস নাগাইচে ! 

    বুক তোলপাড় করে দুচোখ ঝাঁপিয়ে দুরন্ত বেগে কান্না আসতে চায় নীরবালার। কোনওরকমে সামলে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় সে।

           


 





আলু

স্বপন কুমার দত্ত


কদিন থেকেই গিন্নির খ্যাচ্খ্যাচানি,--- " কি গো

আলু কবে আনবে? আলু ছাড়া কি দিয়ে রান্না 

হবে?" আমি না শোনার ভান করে থাকি। গিন্নি

এবার সুর সপ্তমে তুলে বলে, " কি গো তুমি কি

বয়রা হয়ে গেছো? তখন থেকে বকে যাচ্ছি কানে

ঢোকেনা?"

          এবার উত্তর না দিলে বেঁধে যাবে ধুন্দুমার

কাণ্ড। তাই বলি," না, এখনো হইনি,তবে খুব শীঘ্রই

হয়ে যাব।সব ওই আলুর দোষ।"

           " বুঝলামনা, কি আবোল তাবোল 

বকছো। এখনতো দেখছি, শুধু কান টাই নয়,

মাথাটাও গেছে" -- বলে উঠলো গিন্নি।

            আসলে বাজারে যাওয়ার নাম শুনলেই

হয় পেট খারাপ,নয় কন খারাপ,নয় মাথা খারাপ

লেগেই আছে।এমনিতেই লাগামছাড়া দর সব

কিছুরই,তার উপর আবার আলুতো একেবারে

উঠে গেছে জাতে।৮ -- ১০ টাকা কেজি দরে র

জিনিষ এক্কেবারে হাফ সেঞ্চুরি। এ সি রুমে 

ঢুকেছে তো ঢুকেছেই।বার হতে চায়না।হিমঘরে

যে কি মজা,কে জানে? আরে বাপু, এখনতো

হালকা ঠান্ডা পড়ে গেছে,এখন কিভাবে লটকে

পড়ে গেছিস? 

            ব্যাপারটা হল অন্য জায়গায়।ও খুব 

ভালোভাবে জেনে গিয়েছে যে ওর কোন বিকল্প

নেই।আলুর বদলে চলবেনা কচু বা কাঁচা কলা।

তাই ও একমেবাদ্বিতিয়াম।যতই দেশে শতকরা

আশিভাগ লোক আক্রান্ত মধুমেহে ,কিন্তু আলু

মোহে আকৃষ্ট লোকের সংখ্যা কমছে কই?

              কি সে নেই আলু? ঝালে,

ঝোলে, অম্বলে,মাছে,মাংসে,ফুচকা,চিপসে,

আলুকাবলিতে খাবলাখাবলি করে সেই আলু।তাই 

আলু সর্বত্রগামী।আলুর মুখে লাগাম দেবে সাধ্য কার?

তাই দর বেঁধেও নেই কোন লাভ।সুফল বাংলা বা

এনফোর্সমেন্ট ই বলো,সব সোর্স ই আলুতে এসে

কুপোকাত।

            গিন্নিকে বোঝাই," দেখো আমার সুগার,

আলু খাওয়া বারণ,তাই আলু না হলে হয় না?"

গিন্নির সাফ জবাব,--- তোমার বারণ, আমারতো

নয়।আলু চাই ,চাই।"

           অনিচ্ছাসত্ত্বেও গিন্নির কাছ থেকে একটা

থলে নিয়ে রওনা দিই বাজারের দিকে নেহাৎ

ব্যাজার মুখে ই। যা আছে কপালে দেখা যাবে।

আজ আলু নেবই।প্রয়োজনে আমার জন্মসূত্রে

প্রাপ্ত আলু খুলে যাক,সেও ভি আচ্ছা আলু আজ

চাই!

              প্রথমে পুরো গ্যা ট গরচা দিয়ে নিলাম

দুই কেজি আলু,গেলো করকরে একটা একশোর

পাত্তি।এরপর পেঁয়াজ।সেও কম কীসে? ঝাঁজে

সেও অস্থির।সেটা অবশ্য এক কেজিতে দিলাম 

ক্ষান্ত করে।মনে মনে ভাবলাম, বাড়ি গিয়ে

গিন্নিকে বলতে হবে,দুখানা লাগলে চালাবে

আধখানা দিয়ে।পেঁয়াজের গন্ধ পেলেই চলবে।

আমার পাঁজর খুলে নিতে পারো,সেও ভি আচ্ছা,

আর পেঁয়াজের পরত খুলতে হবেনা।

             যাক বাজার থেকে আমার বাড়ি বেশি

দূরে নয়।মাত্র তো দুটো জিনিষ,থলেটা হাতে নিয়ে ছুটছি হনহন করে।কেউ ডাকলে শুধু বলছি, " দাদা কেটে যাচ্ছে,কিন্তু রক্ত বের হচ্ছে না।" যাহোক বাড়ি পৌঁছে গিন্নির হাতে থলেটা

বীর দর্পে তুলে দিয়ে বললাম," আবার পনেরো

দিন পর আলুর কথা বলো।তানাহলে নির্ঘাত

হবে হার্ট এ্যাটাক।এক কাপ চা দিও"।

            সবেমাত্র খবরের কাগজটা নিয়ে বসতেই 

রান্নাঘর থেকে গিন্নির চিল চিৎকার,

" আলু কই গো? মাত্রা দুখানা আলু! কী ব্যাপার,

দুজনাই একটা একটা করে খাবো না শুধু 

নাড়াচাড়া করবো?" আমারতো এবার অবাক

হবার পালা! আরে দু কেজি আলু,দু খানা হবে

কেন? গিন্নিকে বলি, " আরে ভালো করে খুঁজে

দেখো।থাকবে থলের মধ্যেই,যাবে কোথায়?"

গিন্নির উত্তর," সব মেঝেতেই ঢেলে দিয়েছি।নিজে দেখে যাও।আলু কোথায়?"

              আলু আলু করে একেবারে আলুথালু

অবস্থা।গিন্নির তর্জন গর্জনে শুধু আমার বাড়ি

নয়,সমস্ত পাড়া আলুরোষে আলোড়িত।

               অগত্যা আলুর অবস্থান পরিদর্শনে

যেতে হয় রান্নাঘরে।গিয়ে দেখি,সত্যিই মাত্র

দুখানা আলু! কী ব্যাপার,ভেল্কি নাকী? এবার

থলেটা খুলে দেখতে গিয়ে চোখ শুধু ছানাবড়া

নয় একেবারে তালের বড়া।থলের নীচে মস্ত 

বড় বড় দুখানা ছ্যাদা, নিশ্চয়ই গণপতি বাপ্পার 

বাহনের কাজ। হা হতোস্মি! এতো মহার্ঘ্য আলু

গড়িয়ে গেছে তল দিয়ে।

              উপায় কী? আর একখান অন্য ব্যাগ

নিয়ে পটল তুলতে নয়,আলু কুড়োতে বাজার

অভিমুখে দিলাম দৌড়।দেখি একদল লোক

সঙ্গে ভি ভি ও ক্যামেরা,বুম নিয়ে আমার বাড়ির

দিকেই আসছে।আমাকে দাঁড় করিয়ে আমার

পাগল পাগল নানা ভঙ্গিমার ছবি হতে লাগলো

তোলা।আমারতো আলুর শোকে দিশেহারা

অবস্থা।মুখে কিছু পারছিনা বলতে।

বাম হাতে ধরা ভদ্রলোক বললেন, " দাদা আপনার 

এই আন্দোলন যে পুরোপুরি অহিংস ছিল, তা 

বোঝাই গেছে। আপনি এই মহার্ঘ্য আলু বাজার

থেকে কিনে এসেছেন ফেলতে ফেলতে।আমরা

এটা সবটাই করে রেখেছি ভি ভি ও।" আমি

যতই তাদের বোঝাতে চেষ্টা করছি, যে এটা

আমার কোন প্রতিবাদ নয়,এটা নেহাতই থলে

বিপর্যয়,কিন্তু কে শোনে কার কথা।ওনাদের

বক্তব্য," এটা টেলিভিশনে লাইভ টেলিকাস্ট

হচ্ছে এবার যদি নেতা,মন্ত্রীদের নিদ্রাভঙ্গ

হয়।সত্যিইতো আলু এখন আমজনতার 

নাগালের বাইরে। এবার আপনি কিছু বলুন"

          আমার তো তখন বিপর্যস্ত অবস্থা।

ঘটনার আকস্মিকতায় আমার কোঁচা খোলার

অবস্থা।আমি কথা বলার অবস্থায় নেই।মনে মনে

ভাবছি,গিন্নি যদি এসময় টিভিটা খুলে বসে থাকে 

তাহলে তো সাড়ে সর্বনাশ। এতদরে আলু

কিনে রাস্তায় ছড়িয়ে হচ্ছিল বিপ্লব করা।আমার

আলুই দিবে বার করে। এ ই বয়সে আলুর দোষ।

মনে গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো দিয়ে ছাড়বে।ভয়ে ভয়ে

বলি, " দাদা, আমার মানসিক অবস্থা এখন যা

তাতে আর বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা নেই।আপনারা 

যা বোঝার বুঝে নিন,আমাকে ছেড়ে

দিন।" 

           অগত্যা কিছু লোক আমার অপারগতা

অনুধাবন করতে পেরে ভিড়ের মাঝে একটু রাস্তা

করে দেওয়ায় আমি ছুটলাম বাজারের দিকে,যদি এখনো দুচারটে আলু মানিক্য পাওয়া

যায়।


 





বন্দীজীবন

 চন্দ্রানী চৌধুরী 


হেমন্ত দিন অলস দুপুর 

বন্দী গৃহকোণ

ছোট্ট শিশুর আর কি আজ

পড়ায় বসে মন ?

ফুটবল আর ক্রিকেট মাঠে

মন থাকে যার পরে 

অনলাইনের এবিসিডি

বুঝবে কেমন করে ?

খোলা আকাশ ডাক দিয়ে যায়

বন্ধুরা সব ঘরে 

নিয়ম বেঁধে জীবন যাপন

তাল কেটে যায় সুরে

একলা পড়া একলা আঁকা 

একলা কবিতায়

সম্ভাবনার কুঁড়ি আজ

স্তব্ধ নিরালায় । 


 






রাই বিরহ গাঁথা

সৌম্যদীপ চক্রবর্ত্তী           


শ্রীমতি হৃদয়ে ছিল যত প্রেম জমা 

অভিসারর মাদকতা আসক্তি বাড়ায়, 

যমুনারর বুকে আঁকা নীলাভ উপমা 

মোহন বাঁশীর সুরে কোথায় হারায়?


হৈমন্তী-পূর্ণিমা রাস- যুবতি বয়স 

চেনাা সখী অলিগলি মধুবনে মেশে; 

নিকুঞ্জেে যুগল মায়া নিঃসঙ্গ নিরস 

আলো-হাসি মুছে ফেলে যোগিনীর বেশে।


অভিমানী চাবুকের আহ্লাদী ক্ষত- 

পুষ্পবৃষ্টিি হ'য়ে আনবে সুদিন, 

নাা বলা ইচ্ছে-কথা আজও আছে যত; 

সেদিনইই মেটাব প্রিয় প্রতিক্ষার ঋণ।।




 











কবিতার খাতা আমার ফসলের মাঠ 

মজনু মিয়া 


লেখা লেখে শেষ হবে না, যা অযুত নিযুত কাল;

খাতা আমার ফসলের মাঠ, ভাবনা উথাল-পাথাল।  

চষিত জমির বুক চিঁড়ে, কচি গাছের মুখে 

সোনালি ফসল ফলে তার, সমতল ঐ বুকে। 

কাস্তে চালায় কাটে পাকা ফসল উঠায় ঘরে, 

গর্ভবতী মহিলা যেন্ বেড় ঢোল উঠে ভরে। 

আদর যতনের সুখ এই ফল মিষ্টি মধুর স্বাদে, 

শিশির ভেজা ঘাসে হাঁটে সুখ আনন্দে প্রাতে। 

যেদিকে চোখ যায় ফসল মাঠ হাওয়ায় দোলে দোলে,

কবিতার পংক্তি সাজায় বেশ অপরূপের দেশে, 

আমি তো জন্মেছি এই দেশ তাকেই ভালোবেসে।

মাঠের ফসল ঘরে গিয়ে পিঠা পায়েস গড়ে 

শীতে পরশীর আপ্যায়ন হয় ভাজা খুব মরমরে! 

খড়ের গাদায় গরু বাঁধা উঠান ছড়ানো ধান, 

অগ্রাহায়ণের রাতে হয় মেলা বৈঠকী গান। 

আমার বুকে চোখে স্বপ্ন মা গো তোমায় নিয়ে, 

শেষ হবে না লেখা কভু আমার সকল দিয়ে। 

Saturday, October 31, 2020


 

স্মরণ 

 


 রঞ্জন ভট্টাচার্য 

লক্ষ্মী নন্দী 

প্রয়াণ- ১লা নভেম্বর, ২০২০

 

 সম্পাদকের কথা

 হেমন্তের হলুদে বিষাদের স্পর্শ। মা ফিরে গেছেন। অশ্রুসজল করেছেন আমাদের। আসলে আমাদের সবাইকেই ফিরে যেতে হয়। মায়ের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য একটাই যে, মা আবার ফিরে আসেন কিন্তু আমরা আসবো না। তবে ব্যক্তি জীবন থেমে গেলেও, রয়ে যাবে জীবনপ্রবাহ। আর সেই প্রবাহের হাত ধরে আমরাও আসবো ফিরে অন্য নামে, অন্য বেশে। জীবন বোধহয় এইজন্যই সুন্দর। জীবন না ছেড়ে যাবার আকুলি তাই সবসময়!

হারিয়েছি অনেককে এবার। আলোর উৎসবের প্রাক্কালে তাঁদের কথা মনে হচ্ছে বারবার। বিরুদ্ধে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে গেলেন কত ব্যক্তি-মানুষ। হেরে গিয়েও যেন জিতিয়ে গেলেন মানবজীবনকে। বলে গেলেন নিরুচ্চারে যে, অন্যের স্বার্থে তাঁদের এই চলে যাওয়া তখনই মাত্রা পাবে যদি সম্মিলিত লড়াইয়ে আমরা মুক্ত করতে পারি এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। তাই এই দীপাবলি হয়ে উঠুক প্রকৃত আলোর উৎসব, অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের উৎসব।



মুজনাই অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা অনলাইন দীপাবলি সংখ্যা ১৪২৭


মুজনাই সাহিত্য সংস্থা 
রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020
হসপিটাল রোড 
কোচবিহার 
৭৩৬১০১
 
 প্রকাশক- রীনা সাহা 
সম্পাদনা, প্রচ্ছদ,  অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 

মুজনাই সাহিত্য পত্রিকা অনলাইন দীপাবলি সংখ্যা 


 

 এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা 

ডঃ ইন্দ্রানী বন্দোপাধ্যায়, বিপ্লব গোস্বামী, সুবীর সরকার, রাহুল, সত্য মোদক, ইন্দ্রানী পাল, অনুনয় চ্যাটার্জি, পার্থ সারথি চক্রবর্তী, উমা শঙ্কর রায়, মাথুর দাস, রীনা মজুমদার, আফতাব হোসেন, মৌসুমী চৌধুরী, সুদীপ কুমার বোস, দেবদত্তা লাহিড়ী, তপেন্দু নারায়ন রায়, বিজন মজুমদার, কমলেশ মন্ডল, সায়ান্তন ঘোষ, অতনু মৈত্র, আপরোজা খাতুন, ফিরোজ হক, চুমকি দাস, সাত্যকি, নবনীতা, অদিতি মুখার্জি (সেনগুপ্ত), নিত্য রঞ্জন, মজনু মিয়া, শ্যামল কুমার রায়, অমিতাভ সরকার, প্রনব রুদ্র, বিজয়কৃষ্ণ সরকার, মাম্পী রায়, অঞ্জলী দে নন্দী

 

 

 

 

 


 

 

 

 

 

 

 

 

 

কাল স্বরূপিনী কালী ও বঙ্গদেশে কালী পুজোর সূচনা
                ড. ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
 
কালী নামটিতে রয়েছে  রহস্য ও মাধুর্যের অপরূপ সম্মেলন। কলনাৎ সর্বভূতানাং মহাকালঃ প্রকর্তীতঃ  যিনি সর্বভূতকে কলন বা গ্রাস করেন তিনি কালী। দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপটি হলেন কালী। সৃষ্টির আদিতে যখন দশ দিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন তখন তিনি একমাত্র বর্তমান ছিলেন। তিনি স্বয়ং ব্রহ্মা কেও কাজে নিয়োজিত করেন।শিব তাঁর মায়ায় বশীভূত হয়ে পদতলে নিষ্ক্রিয় শবের মত শুয়ে থাকেন । তিনি রুদ্রাণী মহাকালী তাই প্রয়োজনে জগৎ সংহার ও করতে পারেন-- 
মৃত্যুর্জিহ্বা মহামারী জগৎসংহারকারিণী
 মহারাত্রিঃ মহানিদ্রা মহাকালী অতিতামসী....
 মহানির্বানতন্ত্রে দেবীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অস্ত্রের প্রতীক বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
সৃষ্টির আদিতে সব তমোময়  শুধু মাত্র তিনি ই ছিলেন তাই তাঁর গায়ের রং ঘোর কালো। তবে সাধকরা তাঁকে দেখেন নানা রূপে নানা বর্ণে ,শ্যামা রূপা কালীর মধ্যে ভক্তরা বরাভয় মূর্তি খুঁজে পান।তাই   তিনি  সব কিছু র উর্দ্ধে ভাব ও ভক্তির  বিষয় মাত্র।
তিনি সংহার করেন ,প্রলয়কালে সব তাঁর মুখের ভিতর  লয় পায় তাই তিনি করালবদনা।
আলুলায়িত কেশ গতির প্রতীক।জীবকে মায়া ডোর থেকে মুক্তি দেন এবং  বিলাসবর্জিতা ও নির্বিকার তাই তিনি মুক্তকেশী।
তাঁর চারটি হাত , বাম ঊর্ধহাতে খড়্গ, সেই খড়্গ দিয়ে  নিষ্কাম সাধকের মোহপাশ ছিন্ন করছেন।নীচের হাতে ধরে রেখেছেন  সাধকের ,যা তত্ত্ব জ্ঞানের আধার।অন্য দুটি হাতে ভক্ত কে দিচ্ছেন বরাভয়। ভয় ও কারুণ্যের সমাহার তাঁর চার হাতে।
দেবীর গলায় মুন্ডমালা ,এর সংখ্যা পঞ্চাশ।এই পঞ্চাশ টি মুন্ড বর্ণমালার পঞ্চাশ টি বর্ণের প্রতীক।
সর্ববন্ধন যিনি দূর করেন ,দশদিক যাঁর আবরণ ভূমাস্বরূপিনী দেবীর বস্ত্রের কি প্রয়োজন ? তাঁর যোগ্য বস্ত্র পাওয়া যায় না তাই তিনি দিগম্বরী।
তাঁর দু কানে দুটি শিশুর শব কানের আভরণ এর কারণ রূপে তন্ত্র বলেছেন  -   বালকের মতো সরল সাধক ই দেবীর প্রিয় ,দুটি  শবের আভরণ তার প্রতীক।
দেবীর শ্বেত দন্ত পংক্তি সত্ত্ব গুণের প্রতীক,ঐ সাদা দাঁতের চাপে দমন করে রেখেছেন রজোগুণ, তাঁর রক্ত বর্ণের জিভ রজো গুণের প্রতীক। 
তাঁর অনাবৃত বক্ষস্থল বিশ্ব মাতৃত্বের প্রতীক।
তাঁর কোমর বেষ্টন করে আছে মৃত মানুষের হাত।হাত দিয়ে মানুষ কাজ করে,যে যেমন কাজ করে  সে পরবর্তী কালে  ফল পায় , পছন্দ মত ফল দেবার জন্য তিনি হাত গুলি জড়িয়ে রেখেছেন। মানুষের সব কাজ কালীতেই লীন হয় এটি তার ই প্রতীক।
স্বর্গ মর্ত্য ও পাতাল এই তিন লোক এবং অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের  সব কিছু  সূর্য,চন্দ্র ও অগ্নি এই তিনটি চোখে দেখেন বলেই তিনি ত্রিনয়না।
মহাকালী নিত্য ক্রিয়াশীল আদি প্রকৃতি এবং শিব নিষ্ক্রিয় পুরুষ।শিব শক্তির অধীন।শবাকার শিব শক্তি
যুক্ত না হলে প্রাণ ফিরে পান না,স্পন্দিত হন না। তাই জাগ্রত হবার অপেক্ষায় দেবীর মুখাপেক্ষী হয়ে পায়ের তলায় তিনি শয়ান।
শ্মশান মানুষের কর্মভোগের শেষে বিরতির স্থান।
মুক্তি দাত্রী করাল বদনার আলয় ই তাই শ্মশান। তাঁকে পেতে গেলে জাগতিক কামনা বাসনা ত্যাগ করতেই হবে।
তন্ত্রমতে শক্তি ও শিব একে অপরের পরিপূরক। কালী সৃষ্টি,ধ্বংস,পুষ্টি ও বৃদ্ধি র মূল কারণ।শিব ও শক্তির মিলনে সাম্যরস থেকে উৎপন্ন হয় বিশ্বজগৎ।
    পরবর্তী কালে  ধীরে ধীরে তান্ত্রিক আচারের মধ্যে    দুর্নীতি ঢুকে পড়ে ও দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের ফলে বাঙালি হিন্দু সমাজের সর্ব স্তরে এক মহাদেবী কে তুলে ধরার এক নতুন প্রচেষ্টা শুরু হয়। আরো বলা যায়,  ষোড়শ শতকে এমন কয়েক জন বিখ্যাত  সাধকের আবির্ভাব হয়েছিল যাঁরা প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রের পুনর্মূল্যায়ন করেন ও তন্ত্র শাস্ত্রের  যন্ত্র ও ঘটের পরিবর্তে শাক্তদেবী কালী কে প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে আমাদের বাংলায় কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাত্রিতে কালীর যেরূপ মূর্তি পূজা করা হয় তার প্রতিরূপের বর্ণনা আছে আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকে বঙ্গদেশে রচিত বৃহদ্ধর্মপুরাণে। সাধারণ ভাবে গৃহীত একটি মত হলো যে আনুমানিক ষোড়শ শতকে নবদ্বীপবাসী তান্ত্রিক  সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ বঙ্গদেশে তান্ত্রিক উপাসনার ক্ষেত্রে শক্তিদেবীকে কালীরূপে প্রতিষ্ঠা করেন।বৃহদ্ধর্মপুরাণ অনুসারে নিজের হাতে মাটি দিয়ে স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী প্রতিমা গড়ে অমাবস্যার রাতে নিজে পুজো করে বিসর্জন দিতেন।সেই অর্থে তিনি বঙ্গদেশে কালীপুজো র প্রবর্তক।তবে রাজার আনুকূল্য না পেলে কোনো সামাজিক বিধি প্রচলিত হয় না।তাই আরো দুই শ বছর পর কৃষ্ণনগরের মহারাজা কালীভক্ত কৃষ্ণচন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে  প্রথম সামাজিক স্তরে কালীপুজোর প্রচলন করেছিলেন একথা বলা যেতে পারে।
কালী উপাসনা প্রচারে মঙ্গলকাব্য , শাক্তপদাবলী ও শ্যামাসঙ্গীতের গুরুত্ব অপরিসীম একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে।
পরিশেষে দেখা যায় যে পার্বত্য জনজাতির প্রিয় অনার্য দেবী  ক্রমে বঙ্গদেশে শিবের সহচরী  ও শক্তির দেবী   রূপে স্বীকৃতি পেয়েছেন , শুধু তাই নয় ক্রমশঃ ভক্তের কাছে বিপদতারিনী মা  আদ্যাশক্তি রূপে আরাধিত হয়েছেন। এমনকি আত্মজা রূপে  অন্তরের সিংহাসনে স্থান পেয়েছেন ... কাল স্বরূপিনী কালী কে প্রিয়জন ভেবে মানস পুজো করেছেন ভক্তরা।কালী যে বঙ্গ দেশে বাঙ্গালীর হৃদয় জয় করে গৃহবধূ রূপে ও  ঘরে ঘরে চিরন্তন আসন পেয়েছেন তার সার্থক প্রতিচ্ছবি দেখি সাধক কমলাকান্তের পদাবলী তে কালীর রূপ বর্ণনায় --
     ''কালো রূপ দেখিলে আঁখি জুড়ায়
    কপালে সিঁদুর, কটিতে ঘুঙুর, রতন নুপূর পায়
হাসিতে হাসিতে কত দানব দলিছে,রুধির লেগেছে পায়।''


 

 

 

 

 

 

 

 

খবরের কাগজ বিক্রেতা থেকে রাষ্ট্রপতি

বিপ্লব গোস্বামী

খবরের কাজগ বিক্রেতা থেকে বিখ‍্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী, শেষে দেশের একাদশতম রাষ্ট্রপতি।না এ কোন সিনেমার গল্প নয়।এ কোন গল্প বা নাটকের নায়কের কথা নয়। সিনেমার গল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এক মহা নায়কের নাম এ.পি.জে আব্দুল কালাম।যিনি সমগ্ৰ ভারতবাসীর কাছে গর্ব।যার অনন‍্য কীর্তি ও দেশত্ববোধ প্রত‍্যেক ভারতবাসীর কাছে এক মহান অনুপ্রেরণা।

                 ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর অধুনা ভারতের  তামিলনাড়ু রাজ‍্যের উপকূল সংলগ্ন রামনাথস্বামী জেলার রামেশ্বরমে এক দরিদ্র তামিল মুসলমান মৎস‍্যজীবী পরিবারে আব্দুল কালামের জন্ম।তাঁর পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আব্দুল কালাম।তাঁর বাবার নাম জয়নুল আবেদিন ও মায়ের নাম অশিয়াম্বা।তাঁর  বাবা ছিলেন অতি দরিদ্র এক নৌকা চালক।যিনি রামেশ্বরামের ও তার সংলগ্ন ধনুষ্কোডিতে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের পারাপার করতেন।অভাবের সংসার তাই অল্প বয়সেই  পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বভার পরে কালামের উপর।পড়াশোনার খরচ চালানর জন‍্য খরবের কাগজ বিক্রি করতেন তিনি।সময় সময় বাবাকে নৌকা চালাতেও সাহায‍্য করতেন।
    
              রামেশ্বরম প্রাথমিক বিদ‍্যালয় থেকে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু।তারপর রামনাথপুরম স্কোয়ার্টাজ ম‍্যাট্রিকুলেশনেরস্কুল থেকে মাধ‍্যমিক পাশ করেন।পড়াশোনায় তিনি ছিলেন সাধারণ মানের  ছাত্র কিন্তু পড়াশুনার প্রতি তার মনোযোগ ছিল গভীর ।তিনি খুব পরিশ্রমী ছিলেন।রাত দুইটা পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন আবার ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে বাবাকে কাজে সাহায‍্য করতেন।বিদ‍্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত করার পর পরিবারের আর্থিক অভাব মিটাতে তিনি সংবাদ পত্রে লিখতে শুরু করেন।

               রামনাথপুরম স্কোয়াটর্জ ম‍্যাট্রিকুলেশন স্কুল থেকে শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি ভর্তি হন চিরুতিরাপল্লী সেইন্ট জোসেফ কলেজে।১৯৫৪ সালে সেই কলেজ থেকেই পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক পাশ করেন।উক্ত কলেজে পড়ার সময় বিশিষ্ট অধ‍্যাপক চিন্নারেড্ডি ও কৃষ্ণমূর্তির সান্নিধ‍্যে তিনি বিকিরিত রশ্মির জ্ঞান অর্জন করেন ।সেই সময়ই বিজ্ঞান চেতনার আধ‍্যাত্মিক চেতনার অপূর্ব মিলন ঘঠে আব্দুল কালামের।স্নাতকোত্তর ডিগ্ৰী অর্জন করে তিনি ভর্তি হন মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এম.আই.টি)।সেখান থেকে তিনি এ্যারোনটিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং -এ ডিপ্লোমা করেছিলেন।তারপর বাঙ্গালোর হিন্দুস্তান এ্যারোনেটকিস্ লিমিটেড থেকে বিমান ইঞ্জিনিয়ারিং -এর স্নাতক ডিগ্ৰি লাভ করেন।
      
              ১৯৬০ কালাম ভারতীয় পতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার এ্যারোনটিক‍্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাবলিশমেন্ট অর্গানাইজেশনে (আইএসআরও) তে বিজ্ঞানী হিসাবে যোগদান করে তার কর্ম জীবন শুরু করেন।সেখানে তিনি প্রখ‍্যাত মহাকাশ বিজ্ঞানী ডঃ বিক্রম সারাভাইয়ের অধীনে কাজ করতেন।এরপর ১৯৬৯ সালে ইণ্ডিয়ান স্পেস রিচার্জ অর্গানাইজেশনে (আইএসারও)স‍্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল প্রকল্পের পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পান।১৯৮০ সালের জুলাই মাসে আটারো তারিখে তাঁর নেতৃত্বে এস এল বি -৩ রকেটে রোহিনী নামের উপগ্ৰহকে তার কক্ষপথে সফলতার সঙ্গে স্থাপন হয়।এই উপগ্ৰহ স্থাপনের ফলে ভারত একটি মাইলফলক ছোঁয়ে ফেলে।এরপর এই মহান বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে মাত্র দশ বছরে ভারত পাঁচটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মিশাইল নাগ,পৃথ্বী,আকাশ,ত্রিশূল ও অগ্নি ক্ষেপনাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়।এই ক্ষেপনাস্ত্র গুলো তৈরি করে ক্ষেপনাস্ত্র শক্তির দিক থেকে ভারত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নিত হয়।মহাকাশবাহী রকেট ও ব‍্যালিস্টিক ক্ষপনাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে বিপ্লব আনার জন‍্য আব্দুল কালামকে "ভারতের মিশাইল ম‍্যান" বলা হয়।

           ১৯৮২ সালে আব্দুল কালাম প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত হন।সেই বছর আন্না বিশ্ববিদ‍্যালয় কর্তৃক তাঁকে "ডক্টরেট" উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।ঐ বছর স্বদেশী মিসাইলের উন্নতির জন‍্য তাঁর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় যেখানে তাঁকে সভাপতি নিযুক্ত করা হয়।১৯৯৮ সালে কালামের নেতৃত্বে ভারত দ্বিতীয় বারের জন‍্য পরমাণু বোমার সফল পরীক্ষা করতে পরেছিল।পরমাণু বিস্ফোরণের সেই সফলতা তাঁকে ভারতের সবচাইতে বিখ‍্যাত ও সফল পরমাণু বিজ্ঞানী হিসাবে পরিচিত করে তোলে।

             ছোটবেলা খবরের কাগজ বিক্রি করা আব্দুল কালাম ২০০২ সালে ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হন।তাঁর কার্যকাল ছিল ২০০২-২০০৭ সাল পর্যন্ত।তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হয়ে সর্বদা ভারতের উন্নতির স্বপ্ন দেখতেন।বাচ্ছা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি অতি আন্তরিক ভাবে ভাব বিনিময় করে আনন্দ উপভোগ করতেন।রাষ্ট্রপতি হিসাবে জনগনের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি ছিল অত‍্যন্ত স্বচ্ছ।তিনি জনগণের কাছে এতটাই শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন যে জনগণ তাঁকে জনগণের রাষ্ট্রপতি (people's presiden)বলে অভিহিত করত।তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের অনুপ্রেরণা।মৃত‍্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন কর্মঠ ও নিয়মানুবর্তিতা।রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েও তার জীবন যাপনের কোন পরিবর্তন হয়নি।তিনি যথা রিতি রাত দুটায় ঘুমাতে যেতেন এবং ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতেন।সাধারণ মানুষের জন‍্য ছিল রাষ্ট্রপতি ভবন খোলা।বিশেষ করে বাচ্ছাদের জন‍্য সব সময় খোলা ছিল তার দরজা।

              তিনি কতটা মানব দরদী ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা কালীন একবার রমজান মাসে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়।কারণ ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন‍্য একটা নিয়মিত রেওয়াজ আছে যে রাষ্ট্রপতি রমজানের ইফতার পার্টির আয়োজন করেন।সে অনুযায়ী আয়োজনের উদ‍্যোগ নেওয়ার পর তিনি জানতে চাইলেন সে পার্টিতে কত টাকা খরচা হবে।তিনি জানতে পারলেন সে পার্টিতে প্রায় ২২ লক্ষ রুপি খরচা হবে।তখন তিনি নির্দেশ দিলেন সেই টাকা দিয়ে খাদ‍্য, পোষাক ও কম্বল কিনে কয়েকটি এতেম খানায় দান করতে।এরপর নিদিষ্ট এতেমখানা বাছাই করে রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা হয় এবং তার কথা মত নিদিষ্ট এতেমখানায় খাদ‍্য ও পোষাক বিতরণ করা হয়।

               কালামের প্রাপ্ত পুরস্কার ও উপাধির সংখ‍্যা ছিল প্রচুর।তিনি ৪০ টি বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্ৰী লাভ করেন। ১৯৮১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মাননা প্রদান করে।তারপর তিনি ১৯৯০ সালে ভারত সরকার কতৃক পদ্মবিভূষণ সর্বোচ্ছ অসামরিট সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্ছা অসামরিক সম্মান "ভারতরত্ন" সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন।তাছাড়া তিনি ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার  কতৃক বীর সাভারকার,২০০৭ সালে  অনারারী ডক্টরেট অব সায়েন্স,২০০৭ সালে  ইক ,কে কতৃক কিং চার্লস মেডেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।এছাড়া তিনি জাতীয় নেহেরু পুরস্কার,ইন্দিরাগান্ধি জাতিয় সংহতি পুরস্কার প্রভৃতি অনেক উল্লেখযোগ‍্য পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন।

              তিনি নব প্রজন্মকে প্রজ্জ্বলিত করে রাখতে চেয়েছিলেন।তিনি শিক্ষা ব‍্যবস্থান সৃজনশীলতার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।তাছাড়া তিনি সময়োপযোগী শিক্ষা ব‍্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিলেন।তিনি মানুষের মাঝে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসতেন।ভালোবাসতেন নিজের জীবনের শিক্ষা তরুণ সম্প্রদায়ের কাছে পৌছে দিতে।এভাবেই ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মেঘালয়ের শিলং শহরে অবস্থিত ইণ্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম‍্যানেজমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানে "বসবাস যোগ‍্য পৃথিবী" নামক বিষয়ে বক্তব‍্য রাখছিলেন।ভারতীয় সময় ৬ টা ৩০ মিনিটে বক্তব‍্য রাখা অবস্থায় তার হার্ট এ্যটাক হয়ে যায়।সঙ্গে সঙ্গে তাকে বেথানি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সন্ধ‍্যে ৭ টা ৪৫ মিনিটে তিনি ইহলোক ত‍্যাগ করেন।

                একজন অতি সাধারণ মৎস‍্যজীবি -নৌকা চালক গরীব ঘরের ছেলে সততা,পরিশ্রম,মেধা,যোগ‍্যতা ও দক্ষতার ফলে কতদূর এগোতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এ.পি.জে আব্দুল কালাম।তাঁর অনন‍্য অবদান প্রতি জন ভারতবাসীর কাছে অনুপ্রেরণা।নব প্রজন্মের কাছে তিনি আদর্শ পুরুষ।দেশবাসীর কাছে তিনি প্রণম‍্য হয়ে আছেন আর অনন্ত কাল ধরে থাকবেনও।


 

 

 

 

 

 

 

 

 প্রতিবেদন

সুবীর সরকার

ঘোরানো সিড়ির নিচ থেকে নিরবতা উঠে এলে
আর তো সেভাবে কিছুই করার থাকে না
শুধু ভাঁজ খুলে যাওয়া রুমাল
ছায়া খুঁজে নিতে থাকা বেড়াল
প্রিয় শব্দের তালিকায় যুক্ত হতে থাকে
                                       গুনগুন
 সাজিয়ে রাখা পালকি ও ভাঙা রাজবাড়ি
 নিয়ে যে প্রতিবেদন লিখবার কথা 
                                ছিল,সেটা আর লেখা
 হয় না।
 গোল  শহরের সাইডলাইনে আমি 
                            সানগ্লাস পরা রেফারি
 সূর্যাস্ত ও পাখিদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেখি
 গরম ভাত থেকে ধোয়া 
                               উঠছে।


 

 

 

 

 

 

 

 

 চেনা আকাশের উপকেন্দ্র ও বাকিটা

---------------------------------------------------------------------
খানিকদূর

              « স্থিরাঙ্ক »     সমাধান গণিত

                  ০}০}০}০}০}{০{০{০{০{০

        অনেকক্ষণ ~ 
                              [ মুখ →  ]]
                                               ← বিন্দু ]

     (উৎপাদন) - ৎ
                               =
                                   ভবিষ্যৎ বিয়োজক

                                       ||

                                   ভাসমান ঝুলবারান্দা


++++++++++++


অভ্যস্ত ব্যাকরণ ~ দৃশ্য 
                         আকার          স্ব ~ (+) হলো

                                        ||

                                  পাল্টালে

                                  জল = আকার (+) নি
   ]] সমান্তরাল

আকাশ    }}     মহাকাশ 
                                                           (আ)
                                     }} অথবা > (রো)
                                                  (কি)
                                                  (ছু)

        "অবিন্যস্ত ~ জ্যা"_____


শব্দরূপ : রাহুল গাঙ্গুলী



 

 

 

 

 

 

 

 

 

প্রাচীর
        সত্য মোদক

দুরন্তপনা নেই!
নেই আবেগঘন অভিমান
এখন,
রাগ-অনুরাগ-অভিমান-চলন-
বলন-হাসি-কান্না 
সবিই কেমন যেন বিশ্বাসের পরিপন্থি৷
তোমার চোখ আমাকে নতজানু করেনা৷
তোমার গড়া প্রাচীর 
আমার হারমানায়
এখন উদভ্রান্তের মত খুঁজি .......


 

 

 

 

 

 

 

 

 মুখ

ইন্দ্রাণী পাল

আজও তবে আমাদের কথাবার্তা
নেই

বিসর্জনের প্রতিমা ভেসে যায়
খোলা চুল ভিজে বুক জরির সাজ
কবেই উড়ে গেছে নীলকণ্ঠ

যতদূর চোখ যায় তোমার মুখ
ঘুমিয়ে আছে

আমার কান্না পায়।