Thursday, April 4, 2024


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০



আজ কোনো আরিস্ততল নেই
অশোক কুমার ঠাকুর

আরিস্ততল বলেছিলেন
রাজাকে দার্শনিক হতে হবে
অথবা দার্শনিককে রাজা হতে হবে।
তারপর কতো যুগ কতো সহস্রাব্দ
রাজাকে দার্শনিক হতে দেখা যায় নি
দার্শনিকরাও কখনো রাজপদ নিতে চান নি।

অজ্ঞানীরাই জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের
শাসন করে চলেছে যুগ যুগান্তর ধরে

অজ্ঞানের হাতে জ্ঞান নিয়ন্ত্রণ হতে হতে
পাল্টে গেছে জ্ঞানের সংজ্ঞা।

আজ কোনো আরিস্ততলও নেই।


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০


গল্প হলেও সত্যি
    লীনা রায়

১
না হয় খুঁজে হন্যে হলি
পাঞ্চজন্য, ভিক্ষে ঝুলি,
হয়ত ভবি ভুলবে খানিক
ভাবের অভাব,তুক মাদুলি।

২
রং মিছিলে ভেকধারী আর
সামিল হল ব্রহ্মচারী –
তুষের আগুন লাল ফাগুনে
গনগনে আঁচ , স্বৈরাচারী।

৩
গজব খবর আজব দেশের
ডিঙিয়ে পাহাড় ঐ ছোটে,
খুঁজছে ভোলা শব্দকোষে
কথার অর্থ ফুট নোটে ।

৪
তুক করে ঐ ছুঁক ছুঁকে হাত
যুক্তি ভুলে মুক্তি পাবার,
টাকা মাটি,মাটিই টাকা
হক কথা ভাই লাখ টাকার।


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০



রথচক্রগ্রাস

লিপিকর


ঔপন্যাসিক ভাবিয়া রাখিয়াছিলেন এটি তাঁহার নবতম সৃজনে ব্যবহার করিবেন।


ব্যস্ত মহানগরীর ব্যস্ততর এক মোড়ে রক্তিম নিষেধসঙ্কেত উচ্ছ্বাসের হরিৎ হইবার অপেক্ষায় সারি সারি নিষ্প্রাণ ব্যক্তিগত যানের মধ্যে প্রথমে ছিল একটি বাদামী বর্ণের গাড়ি। (ঔপন্যাসিকের কলমে  চালিকার দেহবল্লরী হয়তো আরও কিছুটা মূর্ত হইত, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে থাকুক গাড়ির লাল রঙের L চিহ্নটি। )


আলোকসঙ্কেত পাল্টাইলেও তরুণীর পথ-তরণীটি ঢাল অতিক্রম করিয়া ডাহিনে  নিজ গন্তব্যে যাইতে পারিতেছিল না, পশ্চাতের চালকদের ক্যাঁকো-ফোনি নিছকই উপস্থিত সকলের রক্তচাপ বৃদ্ধি করিতেছিল। পার্শ্বের সারির গাড়িগুলি দ্রুত হুশহাশ  চলিয়া যাইতেছিল।  আরক্ষাকর্মীটি অনুধাবন করিতে পারিতেছিলেন কী ঘটিতেছে এবং সাহায্য করিবার ঈপ্সাও সামান্য হইলেও তাঁহার ছিল, কিন্তু গাড়ীচালনা বিদ্যাটি তাঁহারও অনধীত। তিনি নিরাসক্ত চক্ষে যান নিয়ন্ত্রণের সবুজ আলো পুনরায় লাল হইতে দেখিলেন। (শব্দগুনতি-ব্যস্ত হইলে হয়তো ঔপন্যাসিক আরক্ষা-দফতর, তাহাদের প্রতিনিধি-র মানসিকতা বা দক্ষতা লইয়াও কিঞ্চিদধিক অক্ষর ব্যয় করিতেন, আমরা নজর রাখি পরের গাড়ীটির উপর।)


বাদামী যানটির অব্যবহিত পশ্চাতে একটি শ্বেতবর্ণের ভাড়াগাড়ী আটকাইয়া ছিল। পূর্বের সবুজসঙ্কেতেই এই পথযোগটি তাহার অতিক্রম করিবার কথা, কিন্তু সম্মুখের গাড়ীটির অযোগ্যতাযোগ তাহাকে এক্ষণেও আটকাইয়া রাখিয়াছে। সৌভাগ্যক্রমে এমুহূর্তে তাহার কোনো সওয়ারী নাই। সঙ্কেত রক্তবর্ণ হইলে সে নিজ বাহন হইতে নামিয়া  বাদামী গাড়ীর চালিকাকে নামিতে বলিল। তরুণীটি তাহা করিলে সে গাড়ীটি চালাইয়া ঢালের উপর দিয়া বামদিকের সরণীতে উঠাইয়া, তরুণীকে তাহার চাবিটি প্রত্যাৰ্পণ করিল। (জীবনের গতিপথ কীভাবে পাল্টায়, সে সম্বন্ধে ঔপন্যাসিক আরও সুন্দর পরিচ্ছেদ গাঁথিতে পারিতেন, আমরা দেখি গাড়ির মালকিন তাহার পরে কী করিল।)


বিড়ম্বিত তরুণীটি গাড়ীতে উঠিয়া, পুনর্বার যানে জান আনিয়া, চালককে ধন্যবাদ দিয়া, বামদিকের মার্গেই চলিয়া গেল, পরবর্তী পথসংযোগে উল্টামুখে ফিরিতে তাহার অসুবিধা হইবার আশঙ্কা কম, কারণ সেস্থলে চড়াই-উৎরাই আলোচ্য মোড়টির তুলনায় অনেক শমিত। (ঔপন্যাসিক হয় তো এই পর্বে আসিয়া নতুন ভাবনা, চরিত্র বা সঙ্কটের অবতারণা করিতে পারিতেন, আমরা লক্ষ্য করি, সেই বিশেষত্বহীন যান-চালকের পরবর্তী কর্ম।)


ট্যাক্সিচালকটি প্রায় দৌড়াইয়া নিজ বাহনে ফিরিয়া তাহা চালু করিল, লাল ফের সবুজ হইবার উপক্রম হইয়াছে। আরক্ষাকর্মীটিও তাঁহার উদ্বেগ মোচন উদযাপন করিতে দুই বেপরোয়া বাইক-ধারীকে সংহত চালনার নির্দেশ দিয়াই ক্ষমা করিলেন। আলোক, কালের নিয়মে ও যন্ত্রের দক্ষতায়, পুনরায় সবুজ হইলে ট্যাক্সি ডাহিনে নিজ গন্তব্যে গেল, তরুণী, ট্যাক্সিচালক, আরক্ষাকর্মী কাহারো সেই ঘটনা সম্বন্ধে বিশেষ চিন্তা রহিল না। (ঔপন্যাসিক চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই খন্ডদৃশ্যটি তিনি কোন স্থলে ব্যবহার করিবেন, সেই অবসরে আমরা অন্য কোন অণুগল্পে মনোনিবেশ করি।)


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০


অশ্রু সু 

শর্মিষ্ঠা



পেরিয়ে যায় কত কত দশ তারিখ! বছরের আবর্তে মাস! বয়স বেড়ে যায়, আয়ু গড়িয়ে চলে। অস্তমিত সূর্যের দেশে একে একে জ্বলে ওঠে মাটিতে জোনাক থেকে আকাশের তারা। পিক পিক আলো। কালপুরুষ, সপ্তর্ষীমণ্ডল। আরও কত কী! সবাই তো আর পরিচিত নয়! নাম-না-জানা অথচ বড্ড সহজ গল্পরা ফাঁকটাক খুঁজে টুক করে লুকিয়ে পড়ে। সহজ অচেনা হয়ে ওঠে। আড়াল হলো সহজ থেকে কঠিন রূপান্তরণের জ্যামিতিক বিচরণ। 


       এখন ধান রোয়ার কাজ চলছে। ক্ষেতের পাশে সোঁদা গন্ধ সর্বত্র। জমির গোড়ালি ডোবা জলে সাদা ধ্যানমগ্ন বক। দূর থেকে দেখলেও সনাক্ত করা যায়। মাঝে মাঝে কিছু কিছু জমিতে যেন সবুজ ভেলভেটি ওম ধরেছে। নদী শুকিয়ে উদোম চর। তার উন্মুক্ত বুকে শিবরাত্রির মেলা বসেছে। নদীর ওপর ব্রিজ যেন এখন পার থেকে দেখলে আকাশছোঁয়া মনে হয়। পারুলের বাবা জিলিপি ভেজে লোহার শিক দিয়ে তুলেই রসে ডুবিয়ে দিচ্ছে। গাঢ় আঠালো রস। রসের কড়াইতে লাভের পরিণামে আত্মহত্যা করেছে কয়েকটা ডাসা কালো পিঁপড়ে। তাদের নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা নেই। জিলিপি দাঁতে কাটলেই আঙুলের ফাঁক দিয়ে কব্জি বেয়ে গড়িয়ে নামে চিকন ধারা। চ্যাটচ্যাটে। চম্পা টাগরায় জিভের শব্দ তুলে চালতার আচার চিবিয়ে খাচ্ছে। চেবাতে চেবাতে অলীক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সার্কাসের তাঁবুর দিকে। ছোট তাঁবু। দু'চারটে বাঁদর, একটা হাতি আর কয়েকটা কথা বলা কাকাতুয়া। ওইই গরীব সার্কাসওয়ালার সম্বল। তার পাশে নৌটঙ্কি শুরু হবে। এসব বাইজির নব্য সংস্করণ। ওদিকে গোবিন্দ ঠিক তাক করে গাদাবন্দুকে লক্ষ্যভেদ করে ফেলেছে। সবুজ ফুলের মাঝের বেলুন থেকে ডানদিকের নীল বেলুন ঘেঁষা হলুদটা এবং সুতোয় ঝোলানো পেরেক আর পাঁচ পয়সা। খুশি ও। আহাঃ! পয়সা উসুল! শিবের ত্রিশূল কপালে এঁকে দিতে লালচন্দন নিয়ে ঘুরছে শিব ভক্তরা। আসলে স্টিলের প্লেটে কিছু নগদ পাওয়ার আশা। 


          এসব ডালভাতের দৈনন্দিন সংলাপ আর ভীষণ সহজের ভেতর খুউব সহজ হয়ে যেতে ইচ্ছে হয় ডালিয়ার। সহজ হতে পারলে যতিহীন হাউমাউ করে কাঁদা যায়। শুধু হৃদয় আছে বলেই অনাবিল নিঃশর্ত ভালোবাসা যায়। 'কখনও কি নদী হতে পারবো! আমাকে ঘিরে খুশির মেলা বসবে!' নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে ডালিয়া এগিয়ে যায় মেলার নকশীকাঁথায়। ধুলো ওড়ে হাওয়ায়। কত বুনোট! নির্দিষ্ট দূরত্বে সবাই। ঘুরতে ঘুরতে হাওয়ামিঠাইএর দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো ও। এক 'বোঙ্গা' গোলাপি চিনি মাঝখানে ঢেলে দিচ্ছে যুবক ছেলেটা। গোল করে ঘুরছে স্টিলের বড় বাটি। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে গোলাপি জাল। মাকড়সার জালের মতো। একটা কাঠি গোল করে ঘুরিয়ে সেটাই ওতে আটকে নিচ্ছে। ডালিয়া একদৃষ্টে দেখছিল মিঠাই বানানো। জিভে পড়লেই যে অস্তিত্বহীন, তার অবয়ব তৈরিতে কত কায়দা! কত রঙিন কল্পনার মায়াজাল! কারুকার্য! কয়েকমাস আগেও ইন্দ্রজিৎকে ও কতবার বলেছে, অনুনয় বিনয়ের সুরে, 'আমাকে একটা মেলা দেখাতে নিয়ে যাবে ইন্দ্র? কত বছর দেখি না! সেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে চরকের পিঠ ফোটানো দেখতে যেতাম। তারপর বড় হয়ে সব যেন গল্প আর স্মৃতি হয়ে গেল! কাগজের প্লেট থেকে তালপাতার চামচে ঘুগনি তুলে খেতাম। ময়ূরের পালকে ছোট ছোট ফুল লাগিয়ে ওরা ফুলদানি বানিয়ে দিত। আমিও দুটো কিনেছিলাম। পুতুলের জন্য। কতদিন হাওয়ামিঠাই খাওয়া হয় না! ইন্দ্র...' পিছনে ফিরে ডাকতেই শুনতে পেয়েছে নিচের তলার দরজা খোলার শব্দ। গ্যারেজ থেকে সটান বেরিয়ে যায় কালো স্কর্পিও। ইন্দ্রর অত সময় কোথায়! ডালিয়ার বকবক শুনবে! তার চেম্বারে তখন ক্লায়েন্ট বসে। ততক্ষণে অফিস থেকে দুবার ফোন এসে সারা! 

― এই যে নেন।


ঘোর কাটলো দোকানের ছেলেটার ডাকে। হাত বাড়িয়ে গোলাপি হাওয়া মিঠাই নিয়ে যতটা সম্ভব হাঁ করে কামড় দিতেই কোথায় মিঠাই! শুধু মিঠাজল। আরেকবার, আবার... সববারই তাই। ডালিয়ার ঠোঁটের চারপাশে লেগে আছে গোলাপি আঁশ। ও প্রাণপণে শুষে নিচ্ছে ঈপ্সিত সুধা। সার্কাসের তাঁবুর ওপর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একটা তারা। নক্ষত্র। সেদিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো, 'বাবাই না!'


        সকালে প্রহ্লাদের মাকে রান্নার ফিরিস্তি দিয়ে ডালিয়া বেরিয়ে এসেছিল। টাঙন পারের শিবের মেলা দেখতে যাবে। এ বাড়িতে বাবা নেই প্রায় ছয় বছর। মা'ও গতবছর ডালিয়াকে ফাঁকি দিয়ে চলে গিয়েছেন। শীতের রাতে ঠাণ্ডা বরফের মতো শক্ত শরীরটা একলা পড়ে ছিল লেপের তলায়। ডালিয়া কয়েকদিন আগেই ইন্দ্রকে আর্জি জানিয়েছিল যে মাকে ওর কাছে এনে রাখার। কারণ উত্তরবঙ্গের এ অঞ্চলে শীতের বড্ড দাপট! সে আর্জি মঞ্জুর হতে আরও চারদিন। তারপর ট্রেনের টিকিট পেয়ে অকুস্থলে এসে পৌঁছানোর আগেই মায়া কাটিয়ে ফেললেন ওর মা।


           ডালিয়া টোটো রিজার্ভ করে নেয়। একলা খোলা বাতাসে ভরদুপুরে ঘুরতে ওর খুব ভালো লাগে। উচ্ছন্নে যাওয়া মন্দ মেয়েদের মতো! যা ও কোনওদিনই হয়ে উঠতে পারেনি। মন্দ হয়ে ওঠা ওর কাছে রহস্য। তার অন্তরালে কী কী থাকে বা প্রাপ্তিযোগ কী তা জানার তুমুল ইচ্ছে ওর সেই বয়ঃসন্ধি থেকেই। ডালিয়ার তকমা, খুব ভালো মেয়ে। হাইরোডের বাঁপাশ ঘেঁষে মধ্যগতিতে ছুটছে বাহন। হঠাৎই ডালিয়ার মনে হলো, সেই বিয়ের পরে শপিং মলে ইন্দ্র ওর জন্য হট-প্যান্ট কিনতে গিয়ে কেমন তছনছ করা দৃষ্টিতে ওকে মাপছিলো! স্ট্রবেরি প্রিন্টের গোলাপি প্যান্টটা ওকে দিয়ে বলেছিল একটা গোলাপি ব্রেসিয়ার কিনতে। সাথে নেটের ট্রান্সপারেন্ট নাইটগাউন। ইন্দ্রর একের পর এক অযাচিত আবদারে ডালিয়া বিস্ফারিত নেত্রে কুঁচকে উঠছিল। রাতের আঁধারটুকু শরীর খেলার পরে সকাল হলেই এ যেন অন্য ইন্দ্র! সেদিন ক্যালেন্ডারে জ্বলজ্বল করছিল দশ। বিবাহবার্ষিকী। ‘আজও তো দশ! কেন একবারও খোঁজ নিলো না ইন্দ্র! কেন একবারও শুনতে চাইলো না আমায়! একবারও ফোন এলো না!...’ দু’হাত দিয়ে নিজেকে প্রায় জাপটে ধরলো ডালিয়া। টোটোতে ফরফর করে বাতাস এসে লাগছে চোখে-মুখে। ছিটকে পড়ছে সামান্য চোখের জল। খুঁজে পাওয়া দায়!


      হলদিবাড়ী পেরিয়ে বাঁ দিকের ঢাল ধরে গাড়ি আলের পথ ধরলো। এবড়োখেবড়ো রাস্তা। এক মিনিট স্থির বসা যায় না। সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি। তলপেটের সেলাইয়ের জায়গাটা চিনচিন করে উঠলো ব্যথায়। প্রহ্লাদের মা অনেকবার বলেছিল, 'অহনও তো কাটা শুকায় নাই! ওই রাস্তায় এহন যাইস না মা! অত ঝাঁকুনি প্যাটে লাগব। ম্যালা তো থাকব পনেরদিন!...' ডালিয়া কথা শোনেনি। অবাধ্য হতে ইচ্ছে হচ্ছিল ওর। 'কখনও তো অবাধ্য হই! আমার কথাও তো কেউ রাখেনি! কেউ না! বাবাই, মা! ইন্দ্র! কেউই না! ডাক্তারবাবুও না! বাবাই তো ছেড়ে চলেই গ্যালো! কত কিছু বায়না না মিটিয়েই চলে গ্যালো! বলেছিল কাঁটাতার পেরিয়ে পদ্মা পারে আমরা দু’জন হাত ধরে জোৎস্নায় হাঁটবো! বলেছিল বাহিনের জমিদার বাড়ির ছাদে চুপিচুপি উঠবো! একদিন কালীর মোখা পরে রাতের অন্ধকারে তোর মাকে ভীষণ ভয় দেখাবো!...আরও কত কী! বাবাইএর সাথে তো আড়ি হয়নি কোনওদিন! তাহলে লুকিয়ে গ্যালো কেন! একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি মাকে বেশি ভালোবাসো না আমাকে! সেও একবারই! একবারই রাগতে দেখেছিলাম বাবাইকে। তারপর আর কখনও জিজ্ঞেস করিনি। বুঝেছিলাম, ভালোবাসার পৃথক পৃথক সংজ্ঞা হয়।...' পেটের ব্যথাটা বাড়ছে। ডালিয়া ভাবলো, একবার টোটোওয়ালাকে বলবে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্তু এখানে তো দূরদূরান্ত পর্যন্ত শুধুই জমি! জনমানবহীন! মেরুদণ্ড সোজা ও শক্ত করে বসলো ও। নিজেকে শক্ত করা ছাড়া অন্য উপায় নেই। ফিরে যাওয়াটাও বোকামো হবে। কারণ শহর ছেড়ে বহুদূর এসে পড়েছে ও।


         দুটো বাঁক পেরোতেই মনে হলো একটা পাড়ায় ঢুকছে ও। হাতে সিমেন্টের খালি ব্যাগ নিয়ে বছর দশেকের এক মেয়ে গরুর চারিতে খড় ঢালছে। একবার মুখ তুলে দেখে নিলো ডালিয়াকে। এখানে বসন্ত এলেও শীত এক্কেবারে চলে যায়নি। শীত এখানে মিঠে রোদ্দুর বিছিয়ে দিয়েছে। লিচুগাছের ডালে কচিপাতা সুখ। রান্নাঘর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সেদ্ধ ভাতের ঘ্রাণ। পুকুরঘাট থেকে দুয়ার পর্যন্ত ভেজা চুলের ডগা থেকে টপটপ করে পড়তে থাকা জলের ডটেড লাইন নিঃসঙ্গ পড়ে আছে। যেন প্রেয়সী তাকে ত্যাগ করেছে এইমাত্র। তারই ইশারার দিকে ঠাঁয় তাকিয়ে। থালা ভরা বিউলির ডাল গা-গরমে ব্যস্ত। হাফপ্যান্ট পরা দুটি ছেলে ফর্দাফাই করে দিচ্ছে আম-কাঁঠালের গাছের গোড়ায় চড়ুইদের খুনসুঁটি। ওদের হাতে খড়ির পাতলা লাঠি। মাঝে মাঝেই পুঁইএর লকলকে ডগা টালির ওপরে পড়ন্ত রোদ্দুরে চকচক করছে। ডালিয়ার মনে পড়লো একবার পুঁইএর বিচি হাতে ডলে এক্কেবারে ভির্মী খাইয়ে দিয়েছিল মাকে। ‘আর সব্বার মতো মাও তো কথা রাখলো না!’ ধুলো উড়ছে চারপাশে। নিঝুম পাড়া। শুকিয়ে গেছে পুকুরের জল। সামান্য অবশিষ্টতেই কাদার ভেতরে গুগলি খুঁজছে কয়েকটি হাঁস। 'ইন্দ্র কেন যে ডঃ সেনের কথায় রাজি হলো! কেন বললো না একটু রিস্ক নেওয়া যায়। শুধু টিউমারটা কেটে বাদ দিয়ে ইউটেরাসটা রাখলে কী হতো! এক-দুমাস তো দেখাও যেত! সঙ্গে সঙ্গে তো আর ক্যানসার হচ্ছে না! আর কিছুদিন তো চেষ্টা করা যেত! যদি...'


              বুকের ভেতরটা খালি হয়ে এলো ওর। মনে হলো ওর বদলে কোনও একটা অস্তিত্বহীন অবয়বকে বহন করে চলেছে টোটো। না, আর কোনও ঝাঁকুনি বোধ হচ্ছে না ওর। কোন ব্যথাও না! ধুলোর ভেতরে হালকা হাওয়ায় দুলে উঠছে ক্যালেন্ডার। আজকের তারিখ দশ। ‘শুভ বিবাহবার্ষিকী ডলি!’ নিজের মনে নিজেই বলে উঠলো ও। নাকি নিজেকে উইশ করলো! ‘এই নামেই তো ইন্দ্র ডাকত! কবে যেন শেষ ডেকেছিল!’ চৈত্রের রুখা-সুখায় জলদি শুকিয়ে যাবে তলপেটের সেলাই। ফসিলের মতো থেকে যাবে দাগ। ডালিয়া এতদিনে দাগরাজি হতে পেরেছে। একটু যেন হাসলো ও। মন্দ হতে আর বাঁধা কোথায়! ‘দিদি ম্যালা আইসা গ্যাছে। নামো! তুমি ঘুইরা আইসো। ঐদিকের অশত্থ গাছের তলায় আমি বইয়া থাকুম। তয় বেশি দেরি কইরো না!...’ টোটো থেকে নেমে দাঁড়ালো ডালিয়া। আর কিছুক্ষণ পরেই তো ধুলো জমে যাবে এই দশে। আবার অপেক্ষা অন্য কোনও দশের! ততক্ষণ না হয় একটু হুল্লোড় হয়ে যাক এই গন্তব্যহীন, লক্ষ্যহীন, বেনামি জীবনের সাথে! একা! বাবাইএর ‘ফুল’। মায়ের ডালিয়া আর ইন্দ্রর ডলি! ‘এক্কেরে নির্ভার!’...



 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০




শতবর্ষের আলোকে অমিয়ভূষণ মজুমদার
সঞ্জয় এস. সাহা

১৯১৮ সালের ২২ শে মার্চ, কোচবিহার শহরে মাতুলালয় জন্মগ্রহণ করেছিলেন অমিয়ভূষণ মজুমদার। পিতার নাম অনন্তভূষণ মজুমদার, মাতা ছিলেন জ্যোতিবিন্দু দেবী। পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনা জেলায় সারা থানায় পাকুরিয়া গ্রামে। তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়েছিল মা- দিদিমার কাছে রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণের গল্প শুনে। লেখাপড়ায় তার বাবা সেকেলের ছিলেন। তাকে কলকাতায় ভর্তি হয়ে অসুস্থতার কারণে ফিরে আসতে হয়। ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হন কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজে । অল্প বয়সেই চাকরিতে যোগ দেন। বাইশ বছর বয়সে বিবাহ করেন গৌরীদেবীকে। স্ত্রীর ভূমিকা তাঁর জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অমিয়ভূষণের সাহিত্য রচনার প্রধান উৎসাহদাতা ছিলেন তিনি এবং সমস্ত লেখার প্রথম পাঠিকাও তিনি। নিজের সাহিত্য সৃষ্টির সম্পর্ক অমনীয় পোষণ বলতেন, "আমি কি উপন্যাস লিখতে চাই তা এখনও লেখা হয়নি। অর্থাৎ  আমি যাকে উপন্যাস বলে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হবো না তেমন উপন্যাস লেখার চেষ্টা করে থাকি। হয়তো তা কোনদিনও লেখা হবে না, লেখা হলেও ছাপা হবে না, কিন্তু সেগুলি আমার জাগ্রত ও নিদ্রার আনন্দ। এই আনন্দ ছাড়া আমার চলে না, এমন নেশা ধরেছে যখন লিখি না তখন ছবি আঁকি। আমার ছবি কোন exhibition - এ পাঠাবো কিনা তাও জানিনা। কিন্তু তুলির টানে। ফলকে রং তুললে মনে হয় মস্তিষ্কে সহস্রদল পদ্ম থেকে মধুস্রাব হচ্ছে। আমার যে উপন্যাস ছাপা হবে তা লিখতেও এমন হয়।"

সঞ্জয় ভট্টাচার্যের "পূর্বাশা" পত্রিকায় প্রথম অমিয়ভূষণ মজুমদারের গল্প প্রকাশিত হয়। এছাড়া "চতুরঙ্গ", "গণবার্তা", "ক্রান্তি" পত্রিকায় তিনি লেখা পাঠান। ১৯৫৭ সালে "গড় শ্রীখন্ড" তার প্রথম উপন্যাস। এই উপন্যাসটি ১৩৬০ সাল থেকে ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৬১ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে "পূর্বাশা" পত্রিকায় কালপর্বে প্রকাশিত হয়। এটি ধারাবাহিক প্রকাশকালে লেখক পরিচিতি হিসেবে সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদকীয় মন্তব্য করলেন, " তরুণ সাহিত্যিকদের মধ্যে শ্রীযুক্ত অমিয়ভূষণ মজুমদারই এমন একজন লেখক যিনি বহুবিধ কোণ থেকে জীবনকে দেখতে জানেন । তাঁর রচিত গল্প ইতিপূর্বে সাহিত্য পিপাসুদের তৃপ্তি দান করেছে। 'গড় শ্রীখন্ড' তাঁর প্রথম উপন্যাস আমাদের আশা আছে-- এ রচনাটি তাঁকে বাংলা উপন্যাসের আসরে একটি সম্মানের আসন দান করবে ।" এই ভবিষ্যৎ বাণী যে কতটা সত্য তা আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। একে একে তাঁর উপন্যাস গুলি হল--''নয়ন তারা'', "দুখিয়ার কুঠি", "নির্বাস", "মধু সাধুখা", "রাজনগর","ফ্রাইডে  আইল্যান্ড অথবা নরমাংস ভক্ষণ  ও তাহার পর" , "মহিষকুড়ার উপকথা", "বিশ্বমিত্তিরের পৃথিবী", "সোদাল", "মাপচক হরিণ", "হলোং মানসাই উপকথা", "চাঁদবেনে" প্রভৃতি। তিনি অসংখ্য ছোট গল্প লিখেছিলেন । তাদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে "প্রমীলার বিয়ে", "তাঁতি বউ", "সুনীতি", "দীপিতার ঘরে রাত্রি", "দুলারহিনদের উপকথা", "সাদা মাকড়সা", "অধ্যাপক মোহিত স্যানের উপাখ্যান", "শীলতার দ্বীপ", "সাইমিয়া ক্যাসিয়া" প্রকৃতি গল্প যেন তাঁর ভিন্ন ভিন্ন  পরিবেশন।

অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রধান পরিচয় তাঁর কথাসাহিত্যিক হিসেবেই। 'গড় শ্রীখন্ড', 'রাজনগর', 'মহিষকুড়ার উপকথা', বা 'ফ্রাইডে আইল্যান্ড'-- এর মতো ভিন্ন পথের সৃষ্টির জন্যই পাঠকের কাছে আজও সমাদৃত। তবু একথাও নিঃসন্দেহে বলা যায় তিনি সাহিত্যিক হিসেবে বাঙালির কাছে যথেষ্টই উপেক্ষিত।  বাঙালি আর বিস্মৃতি শব্দ দুটি প্রায়শ হাত-ধরাধরি করে চলে, তা যে সম্পূর্ণ সত্য, এ কথা বলা হয়তো একটু বাহুল্য হয়ে যাবে, তবু অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তি পান না তাঁর যথাযথ সম্মান, আবার অনেকক্ষেত্রেই তা বর্ষিত হয় অযোগ্য কারও উপর। এর কোন ধরাবাঁধা ফর্মুলা নেই। অমিয়ভূষণ মজুমদার  বহু পুরস্কার পাওয়া সত্ত্বেও অনাদৃত ।  তবু কোনও উপলক্ষ এলে, অল্প কয়েকজন হলেও উৎসাহিত হয়ে ওঠেন, মলিন আলোকচিত্র থেকে সরানো হয় ধুলোর আস্তরণ। অমিয়ভূষণ মজুমদারের শতবর্ষ তেমনই এক আয়োজন-সম্ভাবনার মুহূর্ত। তাঁর "প্রবন্ধসংগ্রহ" ধরে নেওয়া যায়, সেই উদযাপনেরই ফসল । ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এগারোটি প্রবন্ধ নিয়ে একটি সংকলন---"লিখনে কি ঘটে", প্রকাশক আনন্দ পাবলিশার্স, পরে তা ঠাঁই পায় অমিয়ভূষণ মজুমদারের "রচনাসংগ্রহ" -তে । আলোচ্য সংগ্রহ -তে সেইসব প্রবন্ধের পাশাপাশি রয়েছে অগ্রস্থিত প্রবন্ধ এবং কিছু চিঠিও, যা ভাবনার গভীরতা এবং মৌলিকতায় হয়ে উঠেছে প্রবন্ধ। শিল্প-সাহিত্যই অমিয়ভূষণ মজুমদারের প্রবন্ধের মূল বিষয়, কিছু নিবন্ধন আত্মজৈবনিক। অবশ্য সাহিত্যভাবনাতেও স্বাভাবিকভাবেই এসেছে নিজস্ব বক্তব্য। রাজনৈতিক মতামতও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন লেখক।


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০




সেদিন চৈত্র মাস
স্বপন কুমার দত্ত

আবার একটা বছর হয়ে গেল শেষ। চারদিকে উদাসী মন পাগল করা হাওয়া বোধহয় বুঝিয়ে দেয় -- এখন চৈত্র মাস। শুকনো পাতা উড়িয়ে, ধূলো ছড়িয়ে, পুরোনোক সরিয়ে নতুনের আবাহনে তাই মাতোয়ারা চৈত্র মাস।
      
সেকারণেই বোধহয় সঠিকভাবেই কবি লিখেছিলেন,-- " সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ।"
       
সর্বনাশের শুরুতো চৈত্রের প্রথম থেকেই। চৈত্র সেলের বড় বড় সাইনবোর্ড বক্ষ বিদীর্ণ করা লক্ষ্মণের শক্তিশেলের থেকেও আরো ভয়ঙ্কর। আপনি আপনার অর্ধাঙ্গিনীকে যতই বোঝান, যে সেলের জিনিস ভালো হয়না, কোন ব্যবসায়ী অত বোকা নয়,যে লাভ ছেড়ে দিয়ে ফিফটি পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে মাল দেবে। ভবি ভোলবার নয়, আপনাকেই বুদ্ধু বলে অভিহিত করে একগাদা বাজার হবে সেলের হাট থেকেই। উল্টে বোঝাবে, গোটা বছরের প্রেজেন্টেশন, মাসীর শাড়ি আরও কত কী যে সস্তায় হল--তুমি
বুঝবে কোত্থেকে? ছাত্র ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে বুদ্ধিটাও করে ফেলেছ ভোঁতা!  কিন্তু ওনার তখন বোধোদয় হয়, তখনতো সব শেষ! এক ধোয়ার পর? লাভের গুড় খায় পিঁপড়েয়! সেলে‌ কেনা বারো হাতের শাড়ি ন' হাত হলে বপুতে আর কুলোয় না। আরে কলেবর হস্তীসম হলে সেলের মালের আর দোষ কি? ডাইনে টানলে বিয়ে হয়না, আর বায়ে টানলে.... সাধে কি আর বলে," বারো হাত কাপড়েও কাছা দিতে পারে না।"

         চৈত্র মাসে বের হয় , গাজনের সঙ। ঢাকের বাদ্যির সাথে সাথে শিব পার্বতীর নাচ, হনুমানের
লম্ফঝম্ফ, মুন্ডমালিনী কালিকার ভয়াল মূর্তিসহ শোভাযাত্রা আরও কত কী! সারাবছর আমজনতা যে সঙ সেজে নেত্যসহ সংসার করে, এটা বোধহয় তার‌ই প্রতীকী! গিন্নির মন পাবার জন্য ভেতরে চাপা রাগ থাকলেও হাসি হাসি মুখ করে প্রেমিক পতি সাজতে হয়।‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ গাজনের সঙ এর চেয়ে এগুলো কম কিসে?
        
এমাসের কল্যানে আছে, সিদ্ধি,ভাঙ, গাঁজা, আফিমের নেশার মৌতাতে বুঁদ হয়ে থাকার ঢালাও ব্যবস্থা। অবশ্য বাঘছাল পরিহিত ভোলে বাবার ঐ ব্যাকডেটেড ফর্মুলার নেশা এখন একেবারেই অচল। বরং বিশ্বায়নের কল্যানে মুক্ত বানিজ্যের ছত্রছায়ায় প্রদান করে নিয়েছে, চরস,ড্রাগস,ব্রাউন সুগার,হাসিস আর সর্বকালের প্রাণহরা সোমরস " বিপিনবাবুর কারণ সুধা!"
        
এরপর চরকের বনবন পাক খাওয়া। পাক খাওয়ার শুরুতো জন্মের আগে থেকেই। মাতৃজঠরে থাকবার সময়েই ডাক্তারের কাছে পাক খাওয়া! পাক খেয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েও নেই নিস্তার। এরপর স্কুলে ভর্তির জন্য শুরু হয় পাক খাওয়া। সেও দারুণ রকমারী। মার ইন্টারভিউ, বাবার পারসোনালিটি টেষ্ট ,তারপর অবোধ
শিশুটির লটারির পাক খাওয়ার পর বরাত ভালো হলে ছিড়বে ভর্তির শিকেয়। পাক খাওয়ার শেষ হয়না সহজে। পাশ করে চাকরির জন্য অবিরাম পাক খাওয়া। দরজায় জানালায় পাক খেতে খেতে কপালের জোর থাকলে ঘুচতে পারে বেকার নামের বদনাম। হল এবার চাকরি, এবার চাই নারী। অর্থাৎ বিয়ে, সেখানেও পাক খাওয়া। ছাদনাতলায় না ছ্যাদা হবার তলায় - একেবারে গুণে গুণে সাতটি পাক খেয়ে
তবে আপনার মোক্ষলাভ! সবথেকে হালকা শোলার টোপর পড়িয়ে দিয়ে পরে বিরাশি সিক্কা ওজনের মাল বহনের উপযুক্ত করবার জন্যই বোধহয় চোখকান বুঁজে সাতপাক খাওয়ানোর ব্যবস্থা! 
           
এক বন্ধুর বিয়েতে বরযাত্রী গিয়ে হাত পাক ঘোরাবার সময় লেগে গেল ধুন্দুমার কান্ড। পাত্রপক্ষের বক্তব্য , সাতপাক হয়ে গিয়েছে।অথচ কন্যাপক্ষ মানতে নারাজ, তাদের নাকি হয়েছে ছ' পাক। কেউ রাজি নয়, এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে। অগত্যা আমাকেই নামতে হয় ময়দানে। বন্ধুকে বলি, " ডরো মত্, তুমিতো এখন ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছ সূর্যের মতো, তোমার চারদিকে পাক খাচ্ছে তোমার অর্ধাঙ্গিনী। যাহা সাত,তাহাই আট। ওতে কিছু যায় আসে না। এরপর তোমার প্রিয়তমা থাকবেন ঠাঁয় বসে আর তুমি বেকুব তার চারপাশে পাক খেয়ে মরবে লাট্টুর মতো। মুখে ' রা ' কাড়বার থাকবেনা ক্ষমতা। সর্বদাই
মোলায়েম করে বলতে হবে," দেহি পদপল্লব মুদারম"! বিয়ে বাড়ীর লোকজন সব হাসিমুখে আর একপাক ঘুরিয়ে হন ক্ষান্ত।
        
এরপরতো জীবনের অন্তিম কাল পর্যন্ত শুধু পাক খাওয়ার পালা। প্রাত্যহিক জীবন যাত্রা, ছেলের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে, সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ে অবিরাম একই পাক খেয়ে চলা। পিঠে বড়শি সেঁধিয়ে চরকের খুঁটিতে ঝুলিয়ে মানুষের পাক খাওয়ানোটা তাইতো সংসার আবর্তে পাক খাওয়ার সমার্থক। বেঁচে থাকবার লোভে মানুষতো আগেই টোপ লাগানো বড়শি গিলে বসে আছে। টোপ ও যায়না খোলা আবার বড়শিও যায়না খোলা। এ এক আজব" খুড়োর কল"!
           
সংসারী মানুষই যে শুধু পাক খাওয়ার যন্ত্রণায় বিদ্ধ তা নয়, সংসার বিবাগী রামপ্রসাদ ও ওই বেদনায় দীর্ণ। তাইতো তিনি গেয়েছিলেন, " মা আমায় ঘোরাবি কত, কলুর চোখ ঢাকা
বলদের মতো।" 
          
তবুও আসে চৈত্র মাস, আসে চৈত্র সেলের বাজার, বাজে গাজনের ঢ্যাম কুড়াকুড় বাদ্যি, চলে গাজনের সঙ। মন আনচান করা এলোমেলো হাওয়ায় গাছের পুরোনো পাতা ঝরিয়ে চৈত্রমাস ঘোষণা করে নতুন বছরের আগমন বার্তা। পুরোনোকে সরিয়ে তবেইতো জায়গা নেবে নতুন।


 
মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০


বিপত্তি
 রীনা মজুমদার 

কর্তামশাই গিন্নিমাকে আড়াল করে, রাতে খাওয়ার সময় একটুকরো রুটি দিয়েছে আমাকে। সেই রুটি খেতে গিয়েই যত বিপত্তি মাঝরাতে!

গিন্নিমা সারাক্ষণ কর্তামশাইকে বলে চলে, "ওই নেংটি ইঁদুরকে বিষ দিয়ে তাড়াতে হবে। সারা ঘরময় এই দৌরাত্ম্য আর সহ্য করবো না।  কর্তামশাইও ছাড়েন না বলতে, "গনেশ বাবার বাহন, বাবার দয়াতে  ভাল মন্দ খাচ্ছ পরছো। সেটা মনে রেখো!"
কত্তামশাই আমাকে যারপরনাই আদর করেন। দিব্যি আছি।

একদিন কর্তামশাইকে না জানিয়ে গিন্নিমা এক বেড়ালছানাকে এনে হাজির। ব্যাস লেগে গেল কর্তামশাই ও গিন্নিমার সেই ধুন্ধুমার কান্ড!

গিন্নিমার যুক্তি-- মা ষষ্ঠীর বাহন। তোমার আদরের বাহন যদি থাকে, তবে মা ষষ্ঠীর বাহন কেন ঘরে থাকতে পারবে না? ছেলে মেয়ে দুটো বাইরে থাকে, ওদেরও ভালো মন্দ আছে! 
কর্তামশাইও ছাড়ার পাত্র না, কত্তামশাইয়ের যুক্তি -- আমার নেংটি স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করতে পারবে না। 
আমি বাবা গর্তে বসে কর্তামশায়ের যুক্তিতে হাততালি দিই মহা আনন্দে। যাক, দেখেশুনে চলাফেরা করে ভালোই চলছিল আমাদের চারজনে। 

 বিপত্তিটা ঘটলো মাঝরাতে! সেদিন সেই একটুকরো রুটি খেতে গিয়েই। কর্তামশাইয়ের দেওয়া রুটিটা যেই না একটু কামড় দিয়েছি, হঠাৎ কখন মেনিটা এসে লেজে দিয়েছে পা! টান মেরে পালাতে গিয়ে-- উঃ আঃ কী যে কোমড়ে লাগলো! ঘুম আসে না ব্যথায়। গিন্নিমারও হয় ব্যথা। মনে পড়ল, গিন্নিমাকে দেখতাম ড্রয়ার খুলে একটা মলম লাগাতে। তাই নিঃশব্দে গেলাম একটু মলম লাগাতে! যেই না টেনেছি ড্রয়ারটা -- ক্যাচ করে একটা বিকট শব্দ! 

ব্যাস! মাঝরাত, গিন্নিমা ঘুমের  ঘোরে চোর চোর করে এমন চিৎকার! কর্তামশাইও ঘোরের মধ্যে কে কে? ধর ধর বলে পাড়া মাথায় করে চিৎকার চেঁচামেচি। পাড়ার লোক জন চলে এল। এ বলে পুলিশে খবর দাও, কেউ বলে কোথা দিয়ে পালালো! ধরতে পারলে জ্যান্ত পিটিয়ে মারব। 
কে কার কথা শোনে! রাত কেটে ভোর হয়ে গেল তবুও কর্তামশাই গিন্নিমা শান্ত হয় না! বিপত্তি বলে কথা! 
এ তো মহা বিপদ। আমি কী আর করি! গর্তে ঢুকে বাবাকে ডাকি, শান্ত করো বাবা দুজনকে। বছর শেষের এই বিপত্তি আর না আসে। বছর শুরু হয় তো আমার বাবার পুজো দিয়েই! 
সারারাত ঘুম হয়নি, জয় বাবা গনেশ। 


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০



ইমনকল্যাণ
 অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

ড্রইং রুমটায় নীচু স্বরে গুঞ্জন উঠছিল থেকে থেকে।কদিন ধরেই এমন চলছে।মধুরা নার্সিং হোম থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকেই।আজ তো দোলের অজুহাত আছেই। রং দেওয়ার আছিলায় আরো একটু বেশি সংখ্যায় এরা সব এসে হাজির হয়েছে।মায়ের অবিরাম বলে চলায় আর কান্নাকাটিতে মধুরাকেও এসে দাঁড়াতে হয়েছে এদের মাঝে।কত দুঃখ আর দেবে বাবাকে, মাকে। এমনিতেই তো মরে বেঁচে আছে মানুষ দুটো কিছুদিন যাবত।মধুরাকে একটু স্বাভাবিক দেখলে, ওর মুখে একটু হাসি দেখলে প্রাণ পায় যেন এঁরা। নিজের জীবনের সমস্ত রং চলে গেলেও অনুজ্জ্বল ফ্যাকাসে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তাও মধুরা এঁদের জন্যই শুধু সকলের দেওয়া রং মুখে মেখে ঘরের এককোণে বসেছে সবাইকে সঙ্গ দিতে।
 জানলা ঘেঁষে বসে বেশ অনেকটা ওপর থেকে দামাল বসন্ত বাতাসের হুটোপুটির দিকে আলগোছে চেয়ে ছিল মধুরা। দামাল..ঠিক আবিরের মতো।মুখটা মনে ভেসে উঠতেই চোখের কোণ চিকচিক করে উঠলো।
অবন্তীকার প্রায় ফিসফিস করে বলা আন্তরিক কথাগুলো কানে এল,
'কী করে ওর মতো ছেলে এমন পারলো! আবিরের বিয়ে!আমার তো ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে।'
খসখসে গলায় চাপা স্বরে ব্রততী বলে উঠলো,'না ভাবতে পারার আছেটা কি? এটাই খুব স্বাভাবিক।ওর নিজের জীবন,নিজের সিদ্ধান্ত এবং উপযুক্ত সঠিক সময়ে ও সেটা নিয়েছে।'
নীচু আওয়াজে বাসবীদি যোগ করলো,'যতই আমরা এগোই না কেনো,এখনও সমাজ, পরিবার ও কিছু মূল্যবোধের ওপরে আমরা উঠতে পারিনা।'
কাতর স্বরে অবন্তীকা বলল,'থামবে তোমরা প্লিজ.. কোথায় বসে কথাগুলো বলছো সে খেয়ালটুকু অন্তত রাখো..'
এত মন কেমনের মধ্যেও হঠাৎ খুব হাসি পেল মধুরার। এই ব্রততী আর বাসবীদি মিলেই কিছুক্ষণ আগে মায়ের সামনে কত ভালোবাসা দেখিয়ে মধুরাকে জোর করে ফলগুলো খাওয়ালো.... 
আর নিতে পারছেনা মধুরা।এরা নিয়ম করে সেই কবে থেকে দায়িত্ব নিয়ে আসা শুরু করেছে এখানে।মা-বাবার ধারণা এরা এলে মধুরার মন ভালো থাকবে,ও পুরোনো সবকিছু ভুলে যাবে ধীরে ধীরে, ওর একা লাগবেনা।ও একা ঘরে থাকলেই মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে,বাবা অস্থির হয়ে বাড়িময় পায়চারি করে বেড়ায়।এমনিতেই এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে..বাবা- মাকে নতুন করে আর চাপ দিতে মন চায়না বলেই এদের মাঝে এসে বসা।মধুরা শুধু অবাক হয় এটা ভেবেই ,ওকে যারা ছোট থেকে মানুষ করলো ওর মনটাকে একটুও বোঝেনা তারা। বাবা- মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছেনা, ওর এখন কিছুদিন নিজের মতো করে থাকবার খুব প্রয়োজন.... 
                            বড় বিরক্তিকর লাগছিল মধুরার। দম আটকে আসে আজকাল সকলের  এই অতিরিক্ত মনযোগে, এতটা বাড়াবাড়ি রকমের লোকদেখানো ভালোবাসায়। সবটাই ভীষণ মেকি মনে হয়। সবাই মিলে এগুলো করে  আরও বেশি করে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই ভয়ংকর দিনটির কথা। করুণা ঝরছে যেন সকলের দৃষ্টিতে। 'কারো অনুকম্পা চাইনা  আমার.. চাইনা'.... চিৎকার করে বলে উঠতে মন চায়। 
ছোটবেলা থেকে এমনিতেই না চাইতেই সব পেয়ে বড় হয়ে ওঠা। বড় দুই দিদির সঙ্গে বয়সের বিস্তর ফারাক থাকায় বহুবছর আগেই তারা নিজ নিজ কর্মজীবনে, সাংসারিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাবার চাকরি থেকে অবসর আর মধুরার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার শুরু। বাড়ির সকলের থেকে প্রয়োজনের চাইতে বেশি আদর পেলেও মধুরার চাইতে বয়সগত বিস্তর ফারাকের জন্যই হয়তো বা বাড়ির কেউই সে অর্থে মধুরার বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি। 
                            ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার সময় থেকেই জীবনে বন্ধুত্বের আসল আস্বাদ মিলেছে। চাকরিতে জয়েন করবার পর সেই পরিধি বেড়েছে আরও। বাড়ির লোকজন, পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, চেনা পরিচিত লোকজনদের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাছের, ভালোবাসার বন্ধুদের, কলিগদের মুখগুলোও কেমন অচেনা হয়ে গেছে এখন। মধুরার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর ভেতর পর্যন্ত পড়ে নিতে চায় ওরা কেউ কেউ। মা ঘরে না থাকলে এমন সব প্রশ্ন করে, যে মধুরার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, 
'তোমরাও যে মেয়ে সেটা ভুলে যাও কেমন করে? এ ঘটনাটা সেদিন তোমাদের যে কারোর সঙ্গে ঘটতে পারতো। '
মনের সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আর ক'দিনের মধ্যে অফিস যাওয়া শুরু করবে ভেবেছিল। ভেতরের যে দগদগে ক্ষত সে তো রয়েই যাবে নিজের মতো। তবুও সময়ই হয়তো প্রলেপ হয়ে উঠবে একদিন এ কথা ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেই হবে, নিজের জন্য যতটা নয় বাবা মায়ের জন্য আরো বেশি করে। কিন্তু সেখানে তো এরাই থাকবে।এই মানুষগুলিই।এ মুহূর্তে বাইরে কোথাও চাকরির খোঁজখবরের কথা ভাবতেও পারছেনা। অচেনা নতুন কোনো পরিবেশে গিয়ে নতুন করে মানিয়ে নেবার মনও নেই আর।
                ভুলতে চেয়েও ভুলতে পারে কই.. মধুরার মন বার বার পিছিয়ে যায় অন্ধকার সেই দিনটিতে। 
              পাশের দুরন্ত পাহাড়ি ঝোরাটির মতোই কলকল করতে করতে এগিয়ে চলেছিল কয়েকজনের ছোটখাটো একটি দলের স্বতঃস্ফূর্ত ছেলেমেয়ে গুলো। হঠাৎ পাওয়া কয়েকদিনের ছুটির আনন্দ লুটে নিতে ঝাঁক বেঁধে বেরিয়ে পড়েছিল ওরা। 
                                  পূর্ব ভারতের এই অদেখা পাহাড়টিকে ঘিরে মধুরার বেশ কৌতূহল ছিল। সাহিত্যপ্রেমী বাবার কাছে এই পাহাড়ের পৌরাণিক গল্প শোনার পর থেকে এই পাহাড় ওকে টানতো খুব। আবিরকে একবার কখনো বলেছিল সবটা। ব্যাস্, সে- ই তোড়জোড় করে সকলকে একসঙ্গে করে এখানে আসবার পরিকল্পনা করে ফেলল। আবির এমনই। শান্ত মধুরার জীবনে ঝোরো হাওয়া হয়ে এসেছিল সে। মধুরার মনের সমস্ত বন্ধ দরজাগুলোও জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে সমস্ত আগল ভেঙে অচেনা স্রোতের টানে ভেসে গিয়েছিল। তারপর.... শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা.... 
                                এখানে এসেও বন্ধুরা একটু বাড়তি ভালোবাসার সুযোগ করে দিয়েছিল আবির আর মধুরাকে। সকলের সঙ্গে বেড়িয়েও তাই দলছুট হয়ে নিজেদের মতো করে চারিদিকের সৌন্দর্য্যকে লুফে নিতে নিতে আর বাবার থেকে শোনা কল্পলোকের ছবি আঁকতে, আঁকতে আবিরের হাত ধরে এগিয়ে চলেছিল মধুরা। 
              গল্প কথার মাঝে হঠাৎ ওরা আবিষ্কার করেছিল, ওরা পথ হারিয়েছে। প্রথমে খুব মজা লেগেছিল দুজনের। এরপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যার ছায়া গাঢ় হতেই কেমন একটা অনুভূতি বাসা বাঁধছিল মনের মধ্যে। দুজনে মিলে বন্ধুদের নাম ধরে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া পায়নি কারো। ছায়া ছায়া পথ ধরে কয়েকটি লোক তাদের পালিত পশুগুলিকে নিয়ে বাড়ি ফিরবার পথে তাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সেখানে। ওদের সবটা বলায় ওরা পথ দেখিয়ে ওদের নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। 
                         'না, না, না'..... নিজের তীব্র এই আর্তনাদ নিজের কানে এখনও বড় স্পষ্ট মধুরার। একটা প্রায় অন্ধকার ঘরে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা লোকগুলো বেঁধে রেখেছিল আবির আর ওকে। ওদের মোবাইল থেকে শুরু করে সঙ্গে থাকা টুকিটাকি সমস্ত জিনিস নিজেদের জিম্মায় করে নিয়েছিল ওরা। এরপর মধুরার দিকে হাত বাড়িয়েছিল। ওদের অনুনয়,  কাকুতি মিনতি,  চোখের জল কিচ্ছু সেই নির্মমতা, বিকৃতি, পাশবিকতাকে স্পর্শ করেনি। আবিরের চিৎকার,  প্রতিবাদ সব ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল ওদের লিপ্সার কাছে। প্রচন্ড মারধোর করে আবিরকে প্রায় অজ্ঞান করে ওরা তিনজন পর পর ক্ষুধার্ত শিকারি পশুর মতো মধুরার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যন্ত্রণা ও আচ্ছন্নতার মধ্যেও আবিরের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল মধুরার কানে। চরম অসহায়তার মধ্যে দিয়ে পার হয়েছিল সেই অন্ধকার রাত। মানুষরূপী হিংস্র পশুগুলোর লালসার শিকার অচেতন মধুরাকে নিয়ে আবিরের সেখান থেকে ফিরে আসা, সে এক অন্য গল্প। 
           নিজেকে নার্সিং হোমের বেডে আবিষ্কার করবার পর থেকে এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত মধুরাকে একমাত্র সাথ দিয়ে গেছে আবির। আর সকলে সঙ্গে থেকেও যেন সঙ্গে নেই। বাড়ির লোকেরা লজ্জায়, কে কী বলবে সেই ভাবনায়, অহেতুক কান্নাকাটি করে আরও দুর্বল করেছে মধুরাকে। কী হতে পারতো বা পারতোনা তা নিয়ে খোশ গল্প বানিয়েছে অনেক কাছের আত্মীয়েরা। এর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে নীতি উপদেশ দিতে বিনা আমন্ত্রণেই বাড়িতে এসে আজকের মতোই প্রায় প্রতিদিন আড্ডা বসিয়েছে কিছু বন্ধু, কলিগ। কিছুদিন আগে পর্যন্ত  এই পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে নিয়েছে আবির। বাড়িতে লোকজনের আসা যাওয়া অনেকটাই কমে এসেছিল তখন আগের তুলনায়। তবে হঠাৎ করেই আবিরের আসা- যাওয়া বন্ধ হয়েছে কয়েকটা দিন ধরে। মধুরাকে বলেছে অন্য কোম্পানিতে জয়েন করবে শিগগিরই, তাই ব্যস্ততা চলছে খুব। 
মধুরার চিকিৎসা থেকে শুরু করে কাউন্সেলিং, ওকে ওই ভয়ানক ট্রমা থেকে বের করে আনার জন্য ডাক্তারের নির্দেশে যাবতীয় কিছু নিয়ে যা কিছু করবার সবটাই একার দায়িত্বে করে গেছে আবির। একবারের জন্য কোনো সমবেদনা, অহেতুক সহানুভূতি দেখায়নি মধুরার সামনে। মধুরার মুখটা দেখে কষ্টে বুক ফেটে গেলেও হাসিমুখে সবটা করে গেছে কোনো প্রসঙ্গ না তুলে। আবিরের এই গভীরতা বারে বারে ছুঁয়ে গেছে তখন মধুরাকে। আরও ভালোবেসেছে ওকে,শ্রদ্ধা মিশে গেছে সে ভালোবাসায়। 
আবির বিয়ে করবে এরমধ্যেই.. কানাঘুষোয় খবর এসেছে মধুরার কাছে। এখনও তো ওর কলিগরা এ নিয়েই কথা চালাচালি করছে। একেবারে প্রথমে খবরটা মধুরাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওই নারকীয় ভয়াবহতার থেকে বের হবার লড়াইয়ের মধ্যে আবিরের বিয়ের খবর প্রচন্ড আঘাত হয়ে এসেছিল মধুরার কাছে। ফোনেও একবারের জন্যও এ নিয়ে প্রশ্ন করেনি আবিরকে। মধুরার বাস্তববাদী মন নিজেকেই নিজে বুঝিয়েছিল অনেককিছু। সত্যিই তো, ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসলেও বিয়ের কোনো প্রতিশ্রুতি কখনো দেয়নি আবির। ওদের আলাপ ও ভালোবাসার সময়কালও খুব অল্প দিনের। আবির সবসময় বলতো, 'ভালো বন্ধু হিসেবে আমাকে সবসময় পাশে পাবি।'বন্ধুর দায়িত্ব সে নিজের সবটুকু দিয়ে পালন করেছে। তবুও এই ভরা বসন্তে কুয়াশা জমাট বাঁধে মনে। একরাশ শীতকাল বরফ শীতলতা নিয়ে ছেয়ে বসে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুচোখ ছাপিয়ে  অকাল বর্ষার জলধারা নেমে আসে গাল বেয়ে।

দু সপ্তাহ পর..... 

                                 কুমকুম চন্দনে সাজানো  স্নিগ্ধ মুখখানির দিকে তাকিয়ে ছিল আবির। রাজ্যের বাইরে একটি কোম্পানির নতুন চাকরিতে জয়েন করবার তাড়াহুড়োয় চটজলদি এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হলো আবিরকে। এজন্য পাত্রীর বাড়ির ও আবিরের বাড়ির লোকেরা কেউই সেভাবে প্রস্তুত ছিলেননা।হাতে হাত রেখে মন্ত্রোচ্চারণের সময় নিজের হাতের উষ্ণতা টুকুকে ভরসায় ও বিশ্বাসে ছড়িয়ে দিচ্ছিল নববধূর হাতে।নিজের চোখের আনন্দকে ভাগ করে নিচ্ছিল কাজল কালো মায়াবী চোখদুটির সঙ্গে।সাত পাকের প্রতিটি আবর্তের চিরন্তন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জড়ানো কথাগুলিকে আগামীর নিশ্চিত সত্য হিসেবে অগ্নি দেবতার কাছে প্রার্থনা করে নিচ্ছিল দুটি সুন্দর মন। 
                             'যদেতৎ হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম। যদিদং হৃদয়ং তব, তদস্তু হৃদয়ং মম..... ' বৈশাখী বাতাসে উড়ে উড়ে মধুর ধ্বনি হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছিল শুভ পরিণয়ের মন্ত্রোচ্চারণ। আবিরের দেওয়া সিঁদুর ছুঁয়ে যাচ্ছিল মধুরাকে.. হ্যাঁ, মধুরাকেই।একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে, একটা সুন্দর স্বপ্নের সত্যি হবার মাহেন্দ্রক্ষণকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পার হচ্ছিল ওরা দুজন। মধুরার চোখের বিষন্নতা তখন বদলে যাচ্ছিল আনন্দে, মন জুড়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল মিষ্টি এক আগামী, যার সবটা জুড়ে শুধু একটাই নাম..... 'আবির'....আর আবিরের ঠোঁট এত ভিড়ের মাঝেও মধুরার কানের কাছে নির্জনতা খুঁজে নিয়ে 'বন্ধু' বলে ভালোবাসার আশ্বাস ছড়িয়ে ডেকে নিচ্ছিল সুন্দর এক উজ্জ্বল সত্যিকারের গল্পকে।




 মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০




ভাঙা কুলো
হেমন্ত সরখেল 

তাকে দেখতে চাওয়া জীবনের সবথেকে বড়ো ভুল হ'ল। এতদিন ভেবে নেওয়া গেছিল, যা কৃতকর্ম সবই ভুল। তার ডিগ্রি নির্ধারণের চেষ্টাও করে ওঠা হয়নি। ভুল তো ভুলই, তার আবার ছোটো বড়ো কী! এইবার, তার সম্পর্কে নাক গলাতে এসে ভুলের একটা ডিগ্রি নির্ধারণের সময় এ'ল। ইস, যদি অন্ততঃ, তার একটা ছবি থাকতো!
           তাকে কেউ চায় না। তাই, সে কোথাও থাকে না। থাকে না মানে, তার উপস্থিতি কেউ টের পায় না। মাত্র, বিয়েবাড়িতে নোংরা কোথায় ফেলা হবে, কাজের লোকেরা ছোট বাইরে পেলে কোন স্থানে যাবে, কুকুর কে তাড়াবে, গাড়ি কোথায় পার্ক করা হবে– এসবগুলো সে চুপচাপ সমাধা করে দেয়। সেদিন নবীনের বাবার ব্যাগের হ্যান্ডেল ছিঁড়ে সব্জিগুলো রাস্তায় পড়ে গেল। সে তার গেঞ্জির মধ্যে সব তরকারি ঢুকিয়ে বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিয়ে এ'ল। দিলীপের মায়ের রক্ত লাগতো। অত রাতে কে দেবে! সে দু ইউনিট দিয়ে দিলো। তার 'ও পজিটিভ'। সে ব্যাপারটায় পজিটিভ হয়ে গেল। 
        মাখনের বড়দা বিদেশে থাকে। মাখনের মতো চেহারা। টোকা দিলে যেন শরীর থেকে রক্ত বের হয়ে যাবে। ওদের মায়ের শ্মশান যাত্রায় হাতে ঝোলানো যে মাটির হাঁড়ি, যার মধ্যে ঘুঁটে জ্বালানো ছিল, তার তাপ লাগছিলো বড়দার হাতে। সোনার অঙ্গ পুড়ে যায় আর কি! মায়ের শেষ যাত্রা, কষ্টে প্রাণ যাচ্ছে কিন্তু কিছু বলতে পারছেন না। সকলেই হাঁটছে অথচ টের পাচ্ছে না। কোত্থেকে সে এলো আর, হাত থেকে হাঁড়ির দড়িটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিলো। সারাটা রাস্তা, তারপর সে হাঁড়িটাকে বয়ে নিয়ে চললো আর, বড়দা তার হাতটা ধরে থাকলেন। ছুঁয়ে থাকলেও একই ফল হয়, লোকে বলে। তার হাতে তাপ লাগলো না শ্মশান অব্দি। 
                সে রাতে কোথায় থাকে, কোথায় খায়, কোথায় ঘুমায় কেউ জানে না। যখন প্রচণ্ড দুপুরে সূর্য তা তা করে রোদ দেয়, পাড়ার সুনশান গলিতে জিভ বের করে কুকুর হাঁফায়, পিচের রাস্তা গলে ওঠে, ঝিলমিল করে বাতাসের ঢেউ সেই রাস্তার বুকে, যখন প্রিপেইড ট্যাক্সি গরমে সওয়ারীর কাছে মস্ত দাম হাঁকে তখন সে দুলুর দোকানের জল বাঁকে করে টেনে দেয়। রোদ পড়ে এলে দুলু দোকান খুলবে, জল তো লাগবে! বিকেলে আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই আবার রাতে দোকান বন্ধ করার সময় সে আসে। হাতে হাতে গুছিয়ে দেয়। দুলু দোকান বন্ধ করার ফাঁকে আবার সে কোথাও গায়েব। দুলু জানে, সে সকালে আসবে, দোকান খোলার সময় সব বাইরে বের করে দিয়ে অশোকের পিসিমার দোক্তা পাতা কিনে দিতে ও পাড়ায় চলে যাবে। ঘুরঘুর করবে পাড়া থেকে বাজার, বাজার থেকে স্টেশন, স্টেশন থেকে রেশন দোকান। কারও কোন প্রয়োজন হলে সে সেখানে থাকবে। কেন থাকবে, কীভাবে পৌঁছে যাবে, জানবে কী করে, এসব অবান্তর কথা। এ না জানলেও চলবে। শুধু, সে থাকবে, থাকে, থাকেই। এটাই নিয়ম। এ আর বেশী কথা কী!
            সেদিন তুমুল বৃষ্টি। কেমন?এক হাত দূরের মানুষ আবছা লাগে তেমন। তার মধ্যে বাবার পা স্লিপ করলো সিঁড়িতে। মাথা ফেটে, পা মচকে সে এক বিদিকিচ্ছিরি কাণ্ড। ঘরে মানুষ বলতে আমি, বোন আর বাবা। মা গেছেন কবেই। সেও এই সিঁড়ি থেকে গড়িয়েই। আমি সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরালাম। এই ঝুম বৃষ্টিতে কাকে পাই? বাবা রীতিমতো গোঙাচ্ছেন। মনে পড়লো, যদি তাকে পাই! সে তো সবার বিপদে সর্বত্রই। নীচের ঘরে বাবাকে বোনের জিম্মায় রেখে তাকে খুঁজতে ছাতা নিয়ে বের হলাম। অতি কষ্টে চুপচুপে ভিজে রাস্তার এ'মাথা ও'মাথা, দুলুর চায়ের দোকান, মাখনদের ছাদ তোলা রোয়াক, দেবেশদের গোয়ালঘর সব দেখে যখন ফিরলাম, বাবা মায়া কাটিয়েছেন, বোনের কোলে মাথা রেখে শান্তিতে ঘুমোচ্ছেন। সুবুক সুবুক করে কেঁদে চলেছে বোন। বৃষ্টিটা ধরে এসেছে। যদি ওকে পেয়ে যেতাম তাহলে হয়তো ওর ডেকে আনা ট্যাক্সিতে অন্ততঃ বাবাকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার সুযোগটুকু থাকতো। ইস, যদি সময়মতো ওকে পেয়ে যেতাম!

           না। এর পর আর এ তল্লাটে ওকে কেউ দেখেনি। আমি বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সমস্যায় আবার বারবার ওকে খুঁজেছি। শুধু আমি কেন, সবাই খুঁজেছে। কেউ পায়নি। দুলু জবাব দিতে দিতে নাজেহাল হয়েছে। ও ও ওকে দেখেনি। ও কোথায় কেউ জানে না। কেউ কোথাও ওকে দেখেছে বলেও শুনিনি। কতদিন ওকে দেখি না! দেখতে খুব মন চায়। কোথায় হতে পারে ও! যদি জানতাম ঠিক যেতাম। পেপারে দেব? ছবি চাই তো! তা ও তো নেই! এবার উপায়?


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০




ঈদের শোক

নবী হোসেন নবীন


সুগন্ধি চালের পোলাও

পেটে দাউ দাউ আগুন জ্বালে।

ক্ষুধা হতে আক্ষেপ বাড়ে

আনন্দের ঢেউ জাগে না খুশির সাগরে।

মাংস ফ্রিজের খাবার হয়ে

জমা হয় হিমাগারে।

ঈদ আসে ঈদ যায়

ক্ষুধার উত্তাপে গলে না বরফ।

যেখানে জীবন আছে জীবিকা নেই

ক্ষুধা আছে খাবার নেই

ঈদ আছে আনন্দ নেই

সেখান ঈদ শুধু কেড়ে নেয় নিদ।

অন্যদিকে ঈদ পুনর্মিলনী উৎসব দেখে

 আরও কিছু শোক পায়

দেহের কফিনে ঢাকা বেঁচে থাকা শব


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০





শিল্পী- চিত্রাক্ষী রায় 





 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০


প্রতিটি মানুষ কবিতা লিখুক
রেজাউল করিম রোমেল 

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কবিতা লিখুক। 
কবিতা লিখুক প্রতিটি নদী, সাগর, মহাসাগর,
গ্রহ,নক্ষত্র, এলিয়েন, জ্বিন জাতি,প্রতিটি মানুষ ও মানুষী।
কবিতা হোক বিশ্বময়।

শিল্প সাহিত্যের চর্চা হোক।
চর্চা হোক সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রাঙ্কন। 
চর্চা হোক শিল্পের প্রতিটি শাখা প্রশাখা।
কবিতা লেখা হোক মহাবিশ্বের সব কূল সঙ্গে নিয়ে। 

কবিতাই আমাদের  মুক্তির একমাত্র পথ।


 

মুজনাই 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩০


সতীমায়ের মেলা
শ্রাবণী সেনগুপ্ত 

নদীয়া জেলার চাকদহ থানার ঘোষপাড়া গ্রামে দোল পূর্ণিমাতে অনুষ্ঠিত উৎসব ও মেলা হচ্ছে সতী মায়ের মেলা। এই মেলা প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। প্রায় কুড়ি বিঘা জমির উপরে এই মেলা বসে। হুগলি বর্ধমান কলকাতা নদীয়া মেদিনীপুর বাংলাদেশ ২৪ পরগনা বাঁকুড়া পুরুলিয়া প্রভৃতি জায়গা থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষের ভিড় হয়। পূর্ব রেলপথের শিয়ালদহ রানাঘাট শাখায় কাঁচরাপাড়া স্টেশন থেকে 8 কিলোমিটার দূরে ঘোষপাড়া বৈষ্ণব সমাজের কর্তাভজা সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র অর্থভাজা সম্প্রদায়ের প্রবর্তক আউজা দেহ রক্ষা করার পর তার ২২ জন মন্ত্র শিষ্যের মধ্যে ঘোষপাড়ার রামশরণ  পাল গুরুপদ লাভ করেন। এখনো রামশরণের বংশধররাই এই সম্প্রদায়ের পরিচালক। রামশরণের  সহধর্মিনী কর্তাভজা সম্প্রদায়ের কাছে সতীমা নামে খ্যাত হয়। ভক্তদের কাছে সতী বা পরমা প্রকৃতি যোগমায়া। সতীমার পুণ্য স্মৃতি স্মরণ করতে প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় ঘোষপাড়া সতীমার উৎসব ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।









সতীমার কোন মন্দির বা মূর্তি নেই। কর্তা রামশরণের  আদি ভিটায় ভক্তগণের কাছে অতি পবিত্র বলে বিবেচিত। ভিটায় সতীমার সিদ্ধিলা ক্ষেত্র ডালিমতলা, রামশরণ ও পরবর্তী কর্তাদের কুটির, তাদের ব্যবহার শয্যা ও অন্যান্য দ্রব্যাদি বর্তমান। কর্তামা সতীমার বাসগৃহ এবং তার সমাধিস্থান অবস্থিত। ভিটার পিছনে হিমসাগর নামে এক বৃহৎ অগভীর দিঘির জল ভক্তদের কাছে অতি পবিত্র ও সর্ব রোগ ঘরে ভক্তরা ডালিম গাছের ডালে ঢিল বা মাটির ঘর বেঁধে মানসিক করে থাকে। এবং গাছ তলায় সতীমার উদ্দেশ্যে চিঁড়ে মুড়কি, বাতাসা ,কদমা ও চিনির মঠের ডালা নিবেদন করেন।
        
দোলের আগের রাত থেকে উৎসব শুরু হয়। সারারাত ধরে চলে। দোলের দিন খুব সকালে '' অনুষ্ঠিত হয়। তারপর ভক্তদের মধ্যে দোল খেলা শুরু হয় এই দোল খেলায় কেবল আবিরই ব্যবহৃত হয় এবং জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হিন্দু মুসলমান সকলেই এই দোল উৎসবের অংশগ্রহণ করেন কর্তাভজা দলের অনুগামীরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কীর্তন গান করেন, প্রসাদ বিতরণের পর এই দিনে উৎসব শেষ হয়।







     
সতীমার উৎসব উপলক্ষে এখানকার আমবাগানে সপ্তাহব্যাপী এক বিরাট মেলা বসে। মেলাটি ঘোষপাড়ার মেলা নামে প্রসিদ্ধ। এখানকার আম বাগানে সৃষ্টি সম্বন্ধে শোনা যায় যে যেসব দূরাগত যাত্রী বংশ পরম্পরায় এই উৎসবে আসতেন তারা গাছের ছায়ায় প্রাণ লাভের জন্য একটি করে আমগাছ রোপন পড়ে যেতেন। তাদের পরিবার পরিজনেরা আজো মেলায় এলে নিজের নিজের নির্দিষ্ট বৃক্ষতলেই অবস্থান করেন। এখানেই রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া করে থাকে। যদি কোন গাছ মরে যায় তাহলে সেই জায়গায় তারা আরেকটি চারা রোপণ করে যান। মেলায় বিভিন্ন ধরনের লোক আসে সতী মায়ের মহিমা কীর্তন করতে। রোগগ্রস্তরা ডালিম তলার  মাটি মেখে হিমশায়রের জলে স্নান করে দন্ডি কাটেন ।সাধারণ দর্শনার্থীরা আসেন মেলা দেখতে, সন্ন্যাসীর দল উপার্জনের আশায় আসে। মেলায় প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা গেছে মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের চাইতে বেশি। গাগঞ্জে সংস্কার আচ্ছন্ন মহিলারা সন্তান কামনা মুখ সন্তানের মুখে কথা ফোটানো রোগব্যাধির প্রতিকার ইত্যাদির উদ্দেশ্যে ভিড় করেন। বিকৃত মস্তিষ্ক সন্তানহীনা ,রোগগ্রস্ত, বোবা অন্ধ ,খোঁড়া, বৃদ্ধ ,নারী পুরুষ সকলে দন্ডী কাটেন। বোবা ছেলের মায়ের দন্ডী কাটা শরীরের ওপর বোবা ছেলেকে শুইয়ে দেওয়া হয়। বোবা ছেলেকে মন্দিরের পান্ডারা চড় মারতে মারতে বলে' কথা বল কথা বল। মা বল বল মা'। লোকো বিশ্বাস ডালিম তলার মাটি মেখে হিমশায়ারে স্নান করলে সতীমার কৃপায় সন্তানহীনা মায়ের সন্তান হয়, বোবা কথা বলে, অন্ধদৃষ্টি পায় খোঁড়া চলৎশক্তি পায় নিরাময় হয়। ভক্ত ও উপাসকরা পরম বিশ্বাসে সতীমার সমাধিতে নোয়া সিঁদুর দেয়।





        
কিংবদন্তি আছে এক পান বরজে কুড়িয়ে পাওয়া শিশু পরবর্তীকালে সাধনার সিদ্ধিলাভ করে আউলচাঁদ নামে খ্যাত হন। লোকবিশ্বাস তিনি নবদ্বীপের নিমাই। বিষ্ণুপ্রিয়ার অভিশাপে তাঁর মর্ত্যলীলা। 'কৃষ্ণচন্দ্র গৌর চন্দ্র আউলে চন্দ্র তিনিই এক একে তিন'। নানা রকম অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ডে তিনি পারঙ্গম  ছিলেন। একবার তিনি কমন্ডলুতে গঙ্গাকে ভরে দিলেন। রামচরণ পালের মুমূর সুশ্রী সরস্বতী দেবীকে বাঁচিয়েছিলেন তার কমন্ডলুর জলে। একবার একটি মরা গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে তিনি গরুটিকে জীবন দিয়েছিলেন। এই গরুটির মালিক ছিলেন রামশরণ বাবু এত উপকারে কৃতজ্ঞ রামশরণ ও সরস্বতী যখন আউলচাঁদ কে স্থায়ীভাবে কামনা করেন, তখন আউলচাঁদ তাদের পুত্ররূপে জন্মাবার  অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীকালে সরস্বতী দেবীর গর্ভে আসেন দুলাল চাঁদ তিনিও আবার বলা হয় দুলাল চাদি নদের নিমাই আর সরস্বতী দেবী শচীমাতার অবতার সতী মা। এই সতীমা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব করতেন। আজও লোকে তাই পরম আবেগে বলে 'কলিকালে বলে দুলাল চাঁদের জয়/ হিমসায়রে স্নান করিলে মরা মানুষ জ্যান্ত হয়/ জয় সতী মা, জয় মা।'

      এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ আউল বাউলের গান মেলায় সমবেত বাউলেরা ছোট ছোট আসরে বিভক্ত হয়ে সারা রাত গান করে থাকেন। বেশ কয়েক বছর আগে আমার একবার এই মেলা প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই সময় আমাদের সঙ্গে ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফাদার দ্যা‌ঁতিয়েন । সেই সময় প্রচুর মহিলা বাউল এর দেখা পেয়েছিলাম। সারারাত ধরে বাউল গান শুনে সমৃদ্ধ হয়েছিলাম। আজও সতী মায়ের মেলা স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত।