Monday, October 5, 2020


 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

                                  কতো আকাশ

                       গৌতম বিশ্বাস

 

 

 বিকেলের দিকে আকাশটা বড়ো নিচে নেমে আসে ডাক্তারবাবু । আর পেটে তলায় তলায় চাপ ধরে ।

তবে যে চালাচ্ছিস রিক্সা ?

সে আপনি , তাই । নইলে কতক্ষণ চলে যেতাম বাড়ি ।

হুম , বুঝেছি । একবার আসিস ।

 

ডাক্তার অবশ্য কোয়ার্টার অবদি যায়না । মাঝে দিপ্তীদির চায়ের ঠেকে নেমে যায় । রসুল গিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয় ডাক্তারি পোশাক । ওর বৌদি যা দেবার দেয় । ব্রিজ ব্রতময়ের অনেকদিনের নেশা ।

 

আজ কিছু দেরি হ’ল। পুজোর চাঁদা চাইতে এসেছিলো ছেলে ছোকরা সব । ডাক্তার কিনা । দাবী তাই ল্যাজেগোবরে করে দেবারই কথা । সেইসব চাপান উতোর , দু’এক কথাবার্তায়,  দেরী হয়ে গেলো ।

 

সে এক। কিন্তু রসুল যা বলল , সে ভাবনার কথা । আকাশ নিচে নেমে আসে । কাব্য নয় । কাব্য করার কথা নয় রসুলের । তার মানে , তার মানে কি দমচাপা লাগে ?  দমচাপা লাগলে কি আকাশ নিচে নেমে আসে , ঘিরে ধরে , পেটের তলায় তলায় !

 

না , আজ আর খেলা হবেনা । ব্যাপারটা ভাবাচ্ছে বড়ো । আকাশ নেমে এলে পেটের তলায় তলায় চাপ ধরে । এতদিন থেকেও এদেশের ভাষা শিখলোনা ডাক্তার । পেটের তলায় নয় , তলায় তলায় ।

অদ্ভুত । ভাবনাটা ভেবলে দিচ্ছে । কথা সহজ নয় । ডাক্তারি শাস্ত্রে পেটের তলায় তলায় ব’লে কিছু কি লেখা আছে ? কই , দেখেনি তো !

 

আকাশ নেমে আসে , তারইবা মানে কী ? বিকেলের দিকে নামে ।

 

বড়ো বিব্রত বোধ হচ্ছে ।

 

আজ ছ’মাসের ওপর ব্রতময় এই কানাঘটি গ্রামের হাসপাতালে এসেছে । সেই শুরু থেকেই রসুলের রিকশা। আধঘন্টাটাক পথের বাড়ি ফেরা । নানা গল্পই হয় । বেশিভাগই রসুলের পরিবারের নানা অসুখ , আরো নানা গ্রামীন ব্যাপার স্যাপার । কিন্তু তার নিজের কোনও অসুখ  ছিলো কখনও বলেনিতো !

 

চায়ের দাম মিটিয়ে উঠে পড়ল ব্রতময় । দশ মিনিটের পথ । হেঁটেই ফেরে বরাবর ।

 

চান সেরে মেঘনাকে বলতে সে তো হেসেই কুটিকুটি । বলে , তুমিও যেমন , তোমার পেশেন্টও তেমনি । রাজযোটক । ডাক্তার পদ্য লেখে , মাথায় আকাশ ভেঙে আসে রিকশাওলার ।

 

ব্যাপারটা অত সহজ নয় , বুঝলে । সব অমন দুচ্ছাই করে ফেলে দিলে হবেনা ।

তুমি নিশ্চিত , ও এমনটাই বলেছে ?

তবে আর বলছি কী ? সেই জন্যেই তো খটকা গো ।

তবে আর কী । যে বলেছে তাকেই জিজ্ঞেস করো ।

 

রাতে আজ ঘুম হবেনা । বিকেলের দিকে আকাশটা বড়ো নিচে নেমে আসে ডাক্তারবাবু , আর পেটে তলার তলায় চাপ ধরে ।

 

উঠে পড়লো ব্রতময় । হালকা চাদর গায়ে বেড়িয়ে এলো পথে । রাত কতো হবে ,সাড়ে তিনটে কি পৌনে চারটে । আপাতত দিপ্তীদির চায়ের দোকান ।

আকাশে রঙ লাগতে এখনো কিছু দেরি ।

 

                                                ২

 

বিকেলের দিকে আকাশ কি সত্যিই নেমে আসে রে রসুল ?

আসেতো ।

আর পেটের তলায় তলায় ব্যথা করে ?

ব্যথা তো বলিনি , চাপ ধরে বলেছি ।

 একটু ভেঙে বলবি তো নাকি । নইলে চিকিৎসা কি ছাই হবে ? তলায় , না তলায় তলায় ?

বলছি তো তলায় তলায় । ছাড়ুন ডাক্তারবাবু , বাদ দিন । ও কিছু নয় ।

তা বললে হচ্ছেনা রসুল । রাতে ঘুম হয়নি আমার । ভোরে দিপ্তীদির চায়ের দোকানে বসেছিলাম জানিস ? ঘুম এলোনা সারারাত ।

আজ আর নতুন কবিতা নেই , ডাক্তারবাবু ?

এই এই ডান দিকে যা , ডাইনে ফের রসুল ।

 

ফিরতেই বুড়োধন বট । কবেকার কে জানে । দু’শো তিনশো , নাকি আরো কত বছরের জন্ম । পাকুড় আসলে । কী মহিমা । সে যে দেখেছে , সে জানে ।

সেইখানে রিকশা থামতে বসলো গিয়ে দুজনা ।

 

নে , এবার বল ।

 

বিরাট বটের চাঁদোয়া নামিয়ে এনেছে আকাশ । ব্রতময় রসুলের এতটা পাশে ঘেঁসে বসলো , ওর ঘামের গন্ধ পাচ্ছে ।

 

কি রে , বল । এইতো আকাশ নেমে এসেছে । তোর পেটের তলায় তলায় চাপ লাগছে কিনা বল ।

রাজাকার জানেন , ডাক্তারবাবু ?

হু , জানি বৈকি , মুক্তিযুদ্ধের বিট্রেয়ার ।

মুক্তিযুদ্ধ জানেন ?

জানি মানে , দেখিনি তো আর , শুনেছি । তা তুই হঠাত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়লি যে বড়ো ? তুই জানিস নাকি মুক্তিযুদ্ধের কথা ।

শেষ অব্দি জানিনা । পালিয়ে এসে ছিলাম । আসলে

কী বলছিস রসুল , তুই মুক্তিযুদ্ধ দেখেছিলিস !

শুধু তাই নয় ডাক্তারবাবু , আমার বাবা ছিলো একজন রাজাকার ।

বলিস কী !

ঠিকই বলছি ডাক্তারবাবু , বাবাকে টেনে নিয়ে কোথায় ফেলে দিয়েছে জানিনা । পারলে আমিও করতাম । আমার জন্মদাতা , পিতা একজন রাজাকার ছিলেন । যদি জানতাম , আমিই খুন করতাম ওঁকে । আল্লাহ আমায় সে সুযোগ দিলেন না ।

তারপর ?

আমার বন্ধু সমর খবর এনেছিলো । বাবার হত্যায় হয়তো সেও শামিল ছিলো । কিন্তু সে ছিলো আমাদের ইস্কুলের সেরা ছেলে । আর আমার জিগরি দোস্ত । জানিনা বেঁচে আছে কিনা ।

হ্যাঁ , কী বললো সে ?

বললো , জলি , আমার ডাকনাম ছিলো ওটাই , বললো , ভাগ জলি , চাচাবাবু নেই , শেষ , এবার তোকে ধরবে ওরা । ভাগ , ভেগে যা ইন্ডিয়া । তো এলাম । সাঁতরে নদি পার হয়ে না খেয়ে না দেয়ে এলাম । ভিক্ষে করে চললো কিছুদিন । কতই বা বয়স তখন , চোদ্দ , পনেরো , কে জানে ।

 

তারপর ? এছাড়া আর কিছু আসছেনা জিভে ।

 

ফিকে হয়ে আসছিলো সব । কম সময় তো নয় । শরীর ভেঙে আসছিলো । ভাবলাম , একবার দেশটা না দেখেই মরে যাবো ?

 

গেলি ?

 

না । সে আর হ’ল কই । ওপাড়ার এক বাড়ির বাবুকে নিয়ে গেছিলাম সেদিন রিকশায় । দেখি ছবি হচ্ছে ।

 

টিভি ? হ্যা , দাশগুপ্ত বাবুর আছে । ছবি হচ্ছে তো কী ?

 

না , ছবিতে পদ্মা ছিলো । আমি দেখেছিলাম । জল খাবার ছুতোয় , এই একটু শরীর খারাপ এসব করে বেশ অনেকক্ষণ দেখেছিলাম ।

 

বেশ করেছিস দেখেছিস । কিন্তু তাতে কী হল ?

 

দেখছিলাম আমার দেশ । আহ আমি কি চাইনি , বলো ডাক্তারবাবু , শুধু বাবার কারণে ।

 

হুহু করে কেঁদে উঠলো রসুল ।

শুধু বাবার কারণে আমি আমার একান্ত নিজের আকাশ হারালাম ডাক্তারবাবু ।

 

বুঝেছিরে । চল । বলে ঘারে হাত দিয়ে রসুলকে নিয়ে চললো ব্রতময় ।

 

                             ৩

 

রিকশা চালাচ্ছে ডাক্তার । রসুল হোই হোই, লাগলো লাগলো , করে চলেছে ।

 

 

এখন আর বিকেল নেই । চাঁদ উঠেছে অনেক ওপরে আকাশে । একটা আকাশ ।

 

 

                                     

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment