Saturday, October 31, 2026


 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ।।
আজিজুল হকের কাব্য সমগ্র (প্রথম খণ্ড)
পাতাবাহার প্রকাশনী
মূল্য - ৫৩০ টাকা
`মুখ ঢাকি লজ্জায়`, `মানুষটা আমার থাক`, `বিপন্ন ঈশ্বর এবং দূরত্ব`, `কিছু লাশের জন্ম হয় যেভাবে`, `ধূসর বর্ণমালা` ও `মাধবীলতার স্বপ্ন সন্ধান` কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিকে একত্রিত করে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আজিজুল হকের `কাব্য সমগ্র` (প্রথম খণ্ড)। আলাদা করেও অবশ্য এই সমগ্রের নাম রাখা হয়েছে- `বিষন্ন বর্ণমালা`। `বিষন্ন` বানানটি নিয়ে আমার একটু সন্দেহ রয়েছে। যতদূর জানি `বিষণ্ণ` শব্দটি সঠিক। অর্থাৎ যুক্তবর্ণটি হলো ণ্ণ (ণ-এর নিচে ণ, অর্থাৎ ণ্‌ + ণ)। অবশ্য আধুনিক বাংলা বানান বিধিতে কী রয়েছে, সেটা ঠিক জানা নেই বলে, আমার ভুল হতেও পারে। কিন্তু যদি সেটি না হয়, তবে আশা রাখব পরবর্তী সংস্করণে বানানটি প্রকাশক ঠিক করে দেবেন। বানান ভুল ধরে পাঠ প্রতিক্রিয়া শুরু করার ত্রুটি মার্জনীয়। কিন্তু না লিখে পারলাম না।
কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় প্রকাশক অমল দাশ লিখেছেন, `... কবির ভাবনা, চেতনা এবং প্রতিবাদী মনোভাবই বলে তিনি নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন। যখনই তাঁর সামনে জাতি বৈষম্য, বর্ণ বৈষম্য মাথা চারা দিয়েছে, তিনি নীরব না থেকে সম্মুখ সমরে একদিকে যেমন প্রতিবাদী হয়ে মোক্ষম জবাব দিয়েছেন, অপরদিকে সেইসব শ্রেণী বৈষম্যেরই চিত্র এঁকেছেন তাঁর কলমে, কানে বেজেছে বিজয় ডঙ্কা। পাঠকের মাধ্যমে তিনি আবারও সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এটা কোন মৌলবাদের দেশ নয়, এটা ভারতবর্ষ।`
প্রকাশকের এই কথা থেকে কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি কী বা কেমন হবে, সে বিষয়ে শুরুতেই একটি রূপরেখা পাওয়া যায়। এই কথার প্রতিধ্বনি করেই তাই যেন গ্রন্থের প্রথম কবিতা `পচন ধরেছে দেহে` কবি বলে ওঠেন, `রাতের অন্ধকারে আমার প্রিয়তমার/ নরম দেহে অনেক ক্ষত বিক্ষত চিহ্ন/ তার হৃদয়ের মধ্যে ভাগে ধরেছে পচন,/ ভাগলপুরের বীভৎস দাঙ্গার ধ্বংসাবশেষ/ তার প্রতিটি অঙ্গে জর্জরিত/ নির্লজ্জ গুজরাট কিংবা নন্দীগ্রাম/ তবুও মানবতার দোহাই দেয়/ আর আমার প্রিয়ার চোখে তখন জল/ বীভৎস যন্ত্রনায়,/ হিংস্র নেকড়ের লক্ষ্য তবুও/ প্রিয়তমার রুগ্ন দেহটা।` এইভাবেই বিভিন্ন কবিতায় নিজের ভাবনাকে মেলে ধরেছেন কবি। তাঁর কবিতায় অনায়াসে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, নজরুল, সুকান্ত, লেনিন, হো চি মিন, বুদ্ধ, বিমান সহ অনেকেই। খুব সহজেই তিনি বলে ফেলেছেন, `পাড়ার অমুক দাদাকে ধরাধরি,/ তমুক কমরেডের চিঠি....তারপর অনেকটা পথ, বুদ্ধ, বিমান, বিনয়ের/ কানে পৌঁছায় না,/ যেন কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বাড়াবাড়ি....` এই ক্ষোভ ও স্বপ্নভঙ্গ আসলে কবি আজিজুল হকের একার নয়। বহু মানুষের। যাঁরা একটি নির্দিষ্ট `ইজম`-কে ভালবেসে একদিন সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদেরই যেন প্রতিনিধিত্ব করছেন কবি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে। তবে মনে রাখতে হবে, এই বদল তাঁরা চেয়েছিলেন কোনও সহিংস পথে নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার মধ্য দিয়েই আসবে কাঙ্খিত পরিবর্তন। এমনটাই ভেবেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি। তার দায় কার, সেই বিষয়ে সমাজতাত্বিকরা ভাববেন বা বিশ্লেষণ করবেন। কবির কাজ সেটি নয়। তিনি নির্মোহভাবে যা দেখছেন, সেটিই তুলে ধরবেন। এটিই তাঁর মূল কাজ। কবি আজিজুল হক বহু ক্ষেত্রেই সেই ব্যাপারটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। কিন্তু এটাও ঠিক যে সবসময় তিনি নৈর্ব্যক্তিক থাকতে পারেননি। নিজেকে পরোক্ষ করে ফেলেছেন- `রুদ্র, তোমার মার্ক্স-এঙ্গেলসরাও দেখ ঘুমিয়ে পড়েছে/ তুমিও ঘুমাও/ বিপ্লবীরা এখন রাত জাগে বিকাশ ভবনে আর নবান্নের অলিন্দ জুড়ে,/ যার বিস্তৃতি তোমার শরীরটাকে ভেঙে দিয়েছে।`
এদিক থেকে দেখতে গেলে কবিতাগুলির স্লোগানধর্মীতা অস্বীকার করা যায় না। কবিতার রহস্যময়তা খানিকটা যেন অনুপস্থিত বলেই মনে হয়। কিন্তু পাশাপাশি এটাও ঠিক যে, আজিজুল হক সোজা কথা সোজাভাবেই বলেছেন। কোনও ঢাক ঢাক গুড় গুড় করেননি। কবিতা হিসেবে তাঁর কবিতা আগামীদিনে টিকবে কিনা, সেটা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু তাঁর কবিতার মধ্যে বর্তমানের যে সমাজ চিত্র ফুটে ওঠে, সেটি নিঃসন্দেহে গবেষককে সাহায্য করবে। এই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। আত্মরতির বন্ধনে নিজেকে বেঁধে না রেখে, এই যে সমাজ সচেতনতা, সেটিই কবির সবচেয়ে বড় সাফল্য। আরও ভাল লেগেছে যে, নগ্ন সত্যকে তুলে ধরতে কবি কোনও আপোষ করেননি। তাঁর প্রতিটি কবিতায় এই বিষয়টি চমকপ্রদ- ``স্বাধীনতা, তাঁর লজ্জা করে না,/ যখন হাতরস কিংবা বকদই তোমার কোলে জন্মায়?/ কিংবা যখন খাপাইডাঙার মেয়েটার আর্ত চিৎকারেও/ ঘুম ভাঙ্গলো না তোমার?` অথবা `বুদ্ধিজীবীরা পবিত্রতা বোঝেন,/ খান কয়েক নোংরা বিছানার সঙ্গে নিতান্ত গোপনে পাশাপাশি বিছানা/ শেয়ার করা।` কিংবা `যোনি শুধু যোনি নয়,/ নয় মাংসপিন্ডের শরণার্থী শিবির/ এ যেন শাসকের এক রাজনৈতিক মানচিত্র।` এইসব লাইনগুলি থেকেই কবির সমাজ চেতনা সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা করা যায়। অবক্ষয়ের এই যুগে খানিকটা ক্রান্তদর্শী হয়েই যেন কবিতার ভুবন পথে যাত্রা করেছেন তিনি।
তবে শুধু একটি বিষয়েই আটকে থাকেননি আজিজুল। তাঁর বহু কবিতায় উঠে এসেছে উত্তরবঙ্গের প্রান্তদেশে, ডুয়ার্সের মোহময়তা, নগর জীবনের আলো-আঁধার, প্রকৃতির উন্মুক্ত উদারতা, নিরুচ্চার প্রেম ইত্যাদি সবই। ছয়টি কাব্যগ্রন্থের মোট ২৮৯টি কবিতা বিষয়বস্তু ও প্রয়োগের দিক থেকে যে বর্ণময়তা সৃষ্টি করে, সেটি নিঃসন্দেহে অভিনব। ব্যক্তিগতভাবে ভাল লেগেছে `রাস্তা একটাই`, `দুঃখ জুড়ে থাকিস`, `আর এক ভারতবর্ষ`, `ভিসুভিয়াস`, `আত্মজা`, `কালবেলা` শীর্ষক কবিতাগুলি সহ অনেকগুলিই। কাব্যগ্রন্থগুলির প্রকাশকাল উল্লেখ না থাকলেও আশা করা যায় যে ক্রমপর্যায়ে কবিতাগুলিকে সাজানো হয়েছে। সেদিক থেকে দেখতে হলে, প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে যে কবির উত্তরণ শুরু হয়েছিল, তা ছয় নম্বর কাব্যগ্রন্থে অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। প্রথমদিকের আবেগ, উচ্ছ্বাস অনেকটাই সংযত। কবি অনেক পরিণত। অগ্রজ হিসেবে তবু বলব, আরও পথ বাকি। কবিতা শুধুমাত্র আবেগের নয়, কবিতা লিখতে ও বুঝতে বুদ্ধিমত্তারও যথেষ্ট প্রয়োজন হয়। হৃদয় ও মস্তিষ্কের সঠিক ও সুচারু প্রয়োগ এবং শব্দের যথাযথ ব্যবহার কবিকে অন্যদের চাইতে আলাদা করে। তাঁর নিজস্ব পরিভাষা সৃষ্টি করে। কবি আজিজুল হকের কবিতা পড়লে বুঝতে অসুবিধে হয় না, সেটি কার লেখা। সেদিক থেকে কবির নিজস্বতা তৈরি হয়েছে। আগামীতে আরও হবে এই বিশ্বাস রয়েছে।
বেশ কিছু ভুল বানান নজরে এসেছে। `স্পেস` দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু কিছু জায়গায় উদাসীনতা দেখা দিয়েছে। গ্রন্থের ৩৫১ পাতায় `বধূসর বর্ণমালা` শব্দবন্ধে `ব`কেন বুঝলাম না। এইসব ত্রুটি কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন। নইলে ভাল কাজ মূল্য পায় না। এই ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। গ্রন্থের পাতা ও মুদ্রণ ভাল। অমল দাশের প্রচ্ছদ যথাযথ। কোচবিহারের টাকাগাছের মতো ছোট্ট এলাকা থেকে গ্রন্থ প্রকাশের স্বপ্ন দেখা যেখানে কঠিন, সেখানে আই এস বি এন নম্বর সহ গ্রন্থ প্রকাশ করে প্রকাশক বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁর প্রকাশনা সত্যিই কাজ করতে এসেছে। এই ব্যাপারে তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য।
কবি আজিজুল হকের কবিতা যাত্রা আগামীদিনে শিখর স্পর্শ করবে, এই প্রত্যাশা রইল।
আলোচনা: শৌভিক রায়

No comments:

Post a Comment