অন্ধপ্রেম
সুকল্যাণ দে
___কি সুন্দর দেখাইতাসে গো আমায়। এই জড়োয়ার সেট শুধু আমারেই মানায়। কঙ্কনখানি তো আমার হাত জুইড়া একেবারে স্বর্ণশোভা ছড়াইতাসে। আমার নাত বৌগুলাও আমার রুপের কাছে টেক্কা পাইবো না।
আয়নার সামনে নিজের বিয়ের গয়নাগুলো গায়ে চড়িয়ে বিধবা ইন্দুবালাদেবী যেন নিজের সেই যুবতী রূপ ফিরে পেলেন।
হঠাৎ শৈলর আগমন।
------ ও ঠাকুমা, তোমার ওই জড়োয়ার সেট খানি দেবে গো আমায়। তুমি খালি তোমার বাক্সভর্তি গয়নাগুলো আমাদের কে দেখাও আর যক্ষের ধনের মতো নিজের কাছে রেখে দাও। একদিন আমি তোমার এই গয়না পরেই ছাড়বো।
-------- শুন শৈল, হইতা পারস তুই আমার নাত বৌ। কিন্তু এই গয়না আমি আর কাউরেই পরতে দিমু না। যদি এই গয়নায় তুই হাত ও লাগাইছস তাহলে তোর আমি হাত কাইট্টা ফেলামু। এই গয়না নিয়া আমি একেবারে চিতায় উঠুম। এই গয়না আমি কাউরে দিমু না। আমার বাপের বাড়ির দেওয়া পঞ্চাশ ভরি সোনার গয়না এইখানে রইছে।এই গয়নার বাক্সখানি আমার জীবনের প্রেম, আমার সম্পত্তি। এরে আমি কাউরে দিমু না।
_______ রাখো তোমার এই অন্ধপ্রেম। নিকুচি করেছে তোমার এই গয়না।
______ এই টুহুনি মাইয়্যা। তোর অত্ত বড় সাহস। তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করস। যা, নিজের মাতাল স্বামী কে গিয়া বল তোরে গয়না আইনা দিতে। যা বাইর হো ইখান থিকা। দুর হো।
চারমাস এর গর্ভবতী শৈল গোমড়া মুখ নিয়ে এসে স্বামী অহরেন্দ্রর কাছে এসে কান্নাকাটি।
_____ হ্যাঁ গো শুনছো। ঠাকুমার কাছ থেকে জড়োয়ার সেটটা আমি চেয়েছি বলে ঠাকুমা আমাকে যা নয় তাই বলে অপমান করলো। বলে কিনা তোর মাতাল স্বামীর কাছ থেকে গয়না চা গিয়ে।
_____ ঠাকুমা আমার মা কেই কোনো গয়না দেয় নি আর তুমি তো নাতবৌ।
কিন্তু অহরেন্দ্র মনে মনে এক ক্ষিপ্রতায় গর্জে উঠল। মনে মনে ভাবল
------- দাঁড়া বুড়ি। গয়নার বাক্স যদি আমি ঠাকুমার কাছ থেকে না সরিয়েছি তাহলে আমার নাম ও অহরেন্দ্র না। এই আমি প্রতিজ্ঞা করলুম।
সেদিন সন্ধ্যায় শৈল দোতালার ঘরের লম্বা বারান্দায় সন্ধ্যা প্রদীপ দেখাচ্ছে। হঠাৎ অসাবধানতাবশত একেবারে ঠাকুমার ঘরের কাছে সিঁড়ির সামনে প্রদীপ থেকে অনেকটা তেল পড়ে যায়। শৈল তেলটা মুছতে যাবে কি এমন সময় অহরেন্দ্রর ডাক। কাজটা বাকি রেখেই স্বামীর কাছে যেতেই অহরেন্দ্র বলে ওঠে
_____ হ্যাঁ গো, আমার আজ রাতে আসতে একটু দেরি হবে। তুমি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পরো। আসছি আমি।
স্বামী চলে যাওয়ার পর শৈল কুরুশের সেলাই নিয়ে বসল।
অনেক গভীর রাত। সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। মদ্যপ অহরেন্দ্র বাড়িতে ঢুকেই এক ফন্দি আঁটলো।
___ না , আজ রাতে ঠাকুমার গয়নাখানি চুরি করতেই হবে।
এইভেবে অহরেন্দ্র ঠাকুমার ঘরে চুপটি করে ঢুকে হাল্কা প্রদীপের আলোয় দেখলো ঠাকুমা গয়নার বাক্সখানি একহাতে চেপে ধরে ঘুমাচ্ছে। অহরেন্দ্র আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে গয়নার বাক্স একটু টেনে ধরতেই ঠাকুমা চিৎকার করে উঠলো।
_____ কেডা রে হারামজাদা?কেডা তুই?
ঠাকুমা লাঠি দিয়ে জোরে এক বাড়ি দেয় অহরেন্দ্রর পিঠে। ধস্তাধস্তিতে ঠাকুমা বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে গল গল করে রক্ত বের হতে থাকে।
আর অহরেন্দ্র গয়নার বাক্স নিয়ে দৌঁড়ে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে আসতেই সন্ধ্যেবেলায় পরে থাকা তেলে পা পিছলে পড়ে গিয়ে একেবারে দোতালার সিঁড়ি থেকে গড়াতে গড়াতে একেবারে নিচতলায়। এক বীভৎস আওয়াজে সারা বাড়ির সবাই জেগে উঠে দেখে অহরেন্দ্র নিচে সিঁড়ির কাছে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর প্রাণ নেই। গয়নার বাক্সর গয়নাগুলো সারা সিঁড়ি মেঝে জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দৌঁড়ে সবাই ঠাকুমার ঘরে গিয়ে দেখে মৃত ঠাকুমা রক্তাক্ত অবস্থায় খাটের পাশে পড়ে রয়েছে।
চার মাসের গর্ভবতী অভাগী শৈল স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসে এক জলভরা তিক্ত রক্তচক্ষুতে ওই ছড়িয়ে থাকা গয়নার দিকে চেয়ে রইল।
পাড়ায় পাড়ায় রটে গেলো গয়নার প্রতি অন্ধপ্রেম পরিবারের সর্বনাশ করে ছাড়ল।

No comments:
Post a Comment