Friday, October 9, 2026


 

না দেখা আলো

ভবরঞ্জন দাস


যে লোকটি জনতার দরবারে ঢুকল তাকে দেখে কল্যাণ সামন্ত থমকাল। লোকটার মুখে এখন মাস্ক। আর তাতেই বোঝা যাচ্ছে না লোকটার বয়স কত। তবে প্যান্ট শার্ট পরা দেখে আর কালো কুচকুচে চুল দেখে বুঝল বয়স অল্পই হবে। সেই ভেবে এগোল, কি চাই?

চাইতো অনেক কিছু কিন্তু দিচ্ছে কে?

কল্যাণ সামন্ত একজন জন প্রতিনিধি। এলাকার জনগণের অভাব অভিযোগ শোনার জন্য প্রতিদিন সকালে সকলকে সময় দেয়। সবার কথা শোনে। লোকটা এসেছে। তাই জানতে চাইল, তা কি প্রয়োজনে আসা হয়েছে?

আমি গুরুতর সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে এসেছি। 

সমস্যায় না পড়লে কেউ আমার কাছে আসে না। 

সে জানি এবং জানি এলে সমাধান হয়ে যায়। 

হে হে তা সমস্যাটা কি?

সমস্যা গুরুতর। 

 শুনি। 

আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছি। 

বাংলায় বাংলায়। 

বলছি। আমি পরিচয় হীনতায় ভুগছি। 

পরিচয় হীনতায়? তা বেশ বেশ। একটু বিস্তারে শুনি। 

এই সেদিন পর্যন্ত যাদেরকে বাবা-মা বলে জানতাম, এখন দেখছি তারা আমার বায়োলজিক্যাল ফাদার নয়। 

বাংলায় বাংলায়। 

মানে তারা আমার বাবা মা নয়। 

তা আমি কি করতে পারি?

আপনি অনেক কিছু করতে পারেন। তার জন্যই আসা। 

তা বেশ বেশ। মহাশয়ের নিবাস?

শান্তিপুর। 

কাছেই তো। আমি কিভাবে সমাধান করতে পারি? কল্যাণ সামন্ত আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিল, বলে ফেলো। 

আমার বাবার নাম সাগর ঘোষ। মায়ের নাম মায়া ঘোষ। বর্তমানে তারা মৃত। গত মাসে বাবা মারা যান। মরার সময় একটা প্যাকেট দেন। আর তা খুলেই জানতে পারি ওনারা আমার বাবা-মা নন। ওনারা আমার পালক পিতা-মাতা। 

কেস জন্ডিস মনে হচ্ছে। 

হ্যাঁ। সেই রকমই। 

কল্যাণ সামন্ত একটু চিন্তায় পড়ল। কিছু একটা ভাবল। তারপর বলল, কোন ইঙ্গিত?

সেই ইঙ্গিত এর ব্যাপারেই আপনার কাছে এসেছি। 

আমি তো ওই নামে কাউকে চিনি না। 

ওদের চেনার কথা নয়। আর ওনারাও আপনাকে দেখেনি কখনো। 

তাহলে?

আপনি আগে কালনায় থাকতেন?

হ্যাঁ। 

নিভুজিপাড়ায়?

হ্যাঁ। 

বাবার নাম হারাধন সামন্ত?

হ্যাঁ। তুমি তো দেখছি সব ঠিকুজি মুখস্ত করে এসেছ। ব্যাপার কি হে? ব্ল্যাকমেইল টেইল... 

ছি ছি। লোকটা জিভ কাটল, বাবা-মায়ের আশীর্বাদে আমার বিস্তর বিষয় সম্পত্তি। নিজে মাস্টারী করি। 

তাই?

ব্ল্যাকমেইল করার জন্য আসিনি। এসেছি আমার জন্মদাতার খোঁজে। 

তা আমার নাম পেলে কোথায়?

ওই প্যাকেটে। 

প্যাকেটে! কল্যাণ সামন্ত চিন্তায় পড়ল। 

চিন্তায় পড়লেন?

তা একটু পড়েছি বৈকি। 

বাপি। একটা মেয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। 

কি?

টাকা দাও। কলেজের ফিস জমা দিতে হবে। এক যুবতি এল। পরনে শালোয়ার কামিজ। কাঁধে ব্যাগ। লোকটাকে এক পলক দেখে কল্যাণ সামন্তর দিকে তাকাল, দাও। 

কল্যাণ সামন্ত পকেট থেকে আলমারির চাবি দিয়ে বলল, আলমারি থেকে নিয়ে নে। 

মেয়েটি চাবি নিয়ে চলে গেল। 

আমার বড় মেয়ে। 

জানি। 

জানো?

নাম দিশা। 

আর কি জানো?

আপনার সাত মেয়ে। 

হ্যাঁ। ছেলের আশায় আশায় সাতমেয়ে হয়ে গেল। 

সাত জামাই পাবেন। এটাই বা ক'জন পায়?

কল্যাণ সামন্ত তাকাল লোকটার দিকে। কথাটা শোনার পর খুব রাগ হল। রাগটা হজম করল। হ্যাঁ, সাত জামাই এর নাচন কুদন সহ্য করতে হবে। 

কি আর করবেন বলুন?

তা তো বটেই। 

সবচেয়ে ছোটটার বয়স পাঁচ। 

তাও জানো দেখছি। 

জানতে হয়েছে। 

চটপট বলে ফেলো। আমি কি করতে পারি?

করবেন তো?

আমার দ্বারা যতদূর সম্ভব, তা করব। 

পরে ভুলে যাবেন না তো?

শোনো আমি একজন জনপ্রতিনিধি। জনগণের ভাল-মন্দের দিকে নজর রাখাই আমার কর্তব্য। তবে সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যায় না। করিও না। মানুষের সমস্যা মিটিয়ে ফেললে কেউ আর আমার কাছে আসবে না। বুঝেছ?

বুঝেছি। 

এবার বলে ফেলো তোমার কি সমস্যা?

আমার জন্মদাতার খোঁজে এসেছি। 

তোমার বয়স কত?

তিরিশ। 

তিরিশ। কল্যাণ সামন্ত বলল, দু’দিন আগে কি খেয়েছি তাই বলতে পারি না। আর কত বছর আগের কথা, মনে থাকার কথা নয়। তা বলতো দেখি...

নিভুজী পাড়ায় গিয়ে খোঁজ করলাম। লোকটা বলল, একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করতে বলল তিরিশ বছর আগেই নাকি এক অজানা কারণে হারাধন বাবুরা নিভুজি পাড়া ছেড়ে চলে আসেন। উনি বললেন এই শহরের কথা। 

ও। কল্যাণ সামন্ত চিন্তিত হয়ে বলল, বাবা তো নেই। 

নেই মানে?

মারা গেছে। 

কবে?

তিন বছর হল। 

লোকটাকে একটু হতাশ দেখাল। 

কল্যাণ সামন্ত আড় চোখে একবার লোকটাকে মাপল। বাবাকে কেন খুঁজছে? বাবার সঙ্গে কি দরকার?বাবাই যখন নেই তখন আর ভয়ের কিছু নেই। তাই বললে, তাহলে ওঠা যাক। 

কেন?

বাবাই তো নেই। 

তা বটে। আচ্ছা মেমারীর মহেশ ডাঙ্গার নাম শুনেছেন কখনো?

মেমারীর মহেশ ডাঙ্গা? না শুনিনি। 

একটু মনে করার চেষ্টা করুন। 

না। মনে পড়ছে না। 

যখন নিভুজি পাড়া ছাড়লেন, তখন আপনার বয়স কত ছিল?

কত হবে, আঠারো উনিশ হবে। 

তাহলে তো আপনার মনে থাকার কথা। 

না। মনে পড়ছে না। 

চিনু মন্ডলের কথা মনে আছে?

চিনু মন্ডল! কল্যাণ সামন্ত একটু চমকে উঠল। 

মেমারির মহেশ ডাঙ্গার চিনু মন্ডল। যাকে চিনি মাসি বলে ডাকতেন। 

হ্যাঁ মনে পড়েছে। চিনু মন্ডল বলে একজন কাজের মেয়ে আমাদের বাড়িতে কাজ করত। 

তখন চিনু মন্ডলের বয়স তিরিশের উপরে। বাল বিধবা। 

হ্যাঁ। মায়ের গয়নাগাটি, টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়ে ছিল। তারপর আমরাও চলে এলাম নিভুজি পাড়া ছেড়ে। 

আচ্ছা। 

তারপর থেকে এখানেই আছি। 

চিনু মন্ডল চুরি করে পালাল, তার জন্য আপনার বাবা  ডাইরি করেছিলেন?

মনে নেই। 

একটু মনে করার চেষ্টা করুন। 

 কল্যাণ সামন্ত মিথ্যে মিথ্যে একটু ভাবার চেষ্টা করল, না। মনে পড়ছে না। 

উল্টে চিনু মন্ডলই কেস করেছিল। তাতে হারাধন সামন্ত অ্যারেস্ট হন। 

কি জানি। মনে পড়ছে না। 

আপনি পালিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলেন। 

মিথ্যে কথা। 

এটাই সত্য। লোকটা জোরের সঙ্গে বলল, তখন চিনু মন্ডল পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল। কি ছিল না?

জানিনা। 

চিনু মন্ডল বাচ্চা নষ্ট করতে চায়নি। 

কল্যাণ সামন্ত মাথা নিচু করল। 

হারাধন সামন্ত ও কল্যাণ সামন্ত পরস্পর পরস্পরের দিকে আঙ্গুল তুলল। লোকটা বলল, ছেলেকে জেল খাটা থেকে বাঁচাতে হারাধন সামন্ত সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিল। কি সত্যি বলছি তো?

আমি কিছু জানি না। 

লোকটা শব্দ করে হাসল, জানিনা বললে তো হবে না সামন্ত বাবু। হারাধন বাবু বেঁচে থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেত। তিনি নেই। তাই আপনার কাছ থেকেই সত্যিটা জানতে চাই। 

তখন আমার বয়স আঠারো, চিনু মাসির চৌত্রিশ। বয়সে বড় এক যুবতির সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক হতে পারে?

সে আপনি জানেন। 

চিনু মাসি আমার মামাবাড়ির গ্রামের মেয়ে। মায়ের বিয়ের সময়ই ওকে এখানে পাঠিয়ে দেয়। আমাকে জন্মাতে দেখেছে। আমাকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। 

আর তাকেই ভোগ করলেন? লোকটা বলেই পকেট থেকে একটা নেকলেস বের করল, দেখুনতো এটা চিনতে পারেন কিনা?

কল্যাণ সামন্ত চমকে উঠে বলল, হ্যাঁ। এটা আমার মায়ের নেকলেস। হারিয়ে গিয়েছিল। তুমি কোত্থেকে পেলে?

চিনু মন্ডলের কাছ থেকে। 

নেকলেসটা ওর কাছে গেল কি করে?

চিনু মন্ডলের মুখ বন্ধ করতে আপনি দিয়েছিলেন। আপনি অল্প বয়সেই পেকে ঝুনো হয়ে গিয়েছিলেন। লোকটা হাসল, দেখতে হবে তো বাবাকে। 

আলফাল বকো না। আমার বাবা হারাধন সামন্তর নামে কোন বদনাম ছিল না। 

আপনি ঠিক জানেন হারাধন সামন্ত আপনার বাবা?

মানে! তুমি কি বলতে চাও?

চিনু মন্ডল কিন্তু অন্য কথা বলে গেছে। 

কি বলেছে?

তা শুনলে চমকে উঠবেন। 

কল্যাণ সামন্ত চুপ করে রইল। 

চমকে উঠলেও আমাকে বলতে হবে। লোকটা একটু হাসল, জনার্দন সামন্ত আপনার কে হন?

কাকা। 

ঠিক তো?

হ্যাঁ। কাকা। 

উনি আপনার জন্মদাতা। 

না। 

হ্যাঁ। ঠিকই বলছি। 

কল্যাণ সামন্ত চিন্তায় পড়ল। 

সন্তানের বাবা কে তা একমাত্র মা ই বলতে পারে। লোকটা বলল, আপনার মা কাজল সামন্ত। বছর ঘুরলেও মা হতে পারল না। তখন চিনুর শরণাপন্ন হল। বুদ্ধি দিল। সেই বুদ্ধিতেই আপনার জন্ম। 

স্যাটআপ!

বাংলায় বাংলায়। 

কল্যাণ সামন্ত দেখল তার কথা লোকটা তাকেই ফিরিয়ে দিল। ওকে এক পলক দেখে রাগটা হজম করে বলল, চিনু মন্ডল আমার মাকে কলঙ্কিত করতে পারল!

হয়তো ঘটনা সত্যি। লোকটা বলল, হারাধন সামন্ত ছিলেন শারীরিকভাবে অক্ষম। তাই চিনু মন্ডলের পেটে ওর সন্তান আসতেই পারে না। তাহলে বাকি রইল কে?

কল্যাণ সামন্ত লোকটার দিকে তাকাল। 

 লোকটা আবার বলল, কে?

বাকি থাকলম আমি। 

এটা সরল অংক। দুইয়ে দুইয়ে চার। লোকটা বলল, চিনু মন্ডল সেই রকমই বলে গেছে। 

কল্যাণ সামন্তর চোয়াল ঝুলে পড়ল। 

কি করে পারলেন?

আমি নির্দোষ। 

আপনি কথা দিয়েছেন। 

কি কথা?

আমার সমস্যার সমাধান করে দেবেন। 

কল্যাণ সামন্ত বড় চিন্তায় পড়ল। 

লোকটা আবার বলল, আপনার মা কাজল সামন্তকে ডাকুন। 

না না। কল্যাণ সামন্ত আঁতকে উঠল, তুমি মুখ বন্ধ রাখতে ক'লাখ নেবে বলো। বলেই তাকাল লোকটার দিকে। চোখে মুখে একটা আকুতি। 

লোকটা কি যেন ভাবল। তারপর বলল, আপনাকে আগেই বলেছি আমার বিস্তর স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি আছে। এবং চাকরি করি। তাই টাকা পয়সার প্রতি আমার লোভ নেই। আমি চাই পরিচয়। এবার ভেবে দেখুন কি করবেন?

দেখো। আমি একজন জনপ্রতিনিধি। তুমি এভাবে চাপ দিলে আমি অন্য ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব। চিনু মন্ডল অন্য কারো বাচ্চা পেটে ধরে আমাদের ফাঁসাতে চাইছিল। 

মিথ্যে কথা। 

বেশি চেঁচিও না ছোকরা। 

লোকটা হেসে উঠল। 

কল্যাণ সামন্ত ভড়কে গেল। 

লোকটা হাসি থামাল। 

কল্যাণ সামন্ত বলে উঠল, তুমি চিনু মন্ডলের ছেলে তার কি প্রমাণ? বলতো কে তুমি? 

আমি। লোকটা একটু থেমে বলল, আমি সায়ন মন্ডল। সায়ন ঘোষ। সায়ন সামন্ত। বলতে বলতে মুখের মাস্ক টা খুলে ফেলল। 

কল্যাণ সামন্ত চমকে উঠে দেখল তার সামনে বসে তারই রিপ্লিকা। তাকিয়ে রইল। হুবহু একই রকম দেখতে। সায়নের মুখে তার মুখ বসান। 

সায়ন উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বাইরে এল। একবার পিছন ফিরে তাকাল। দেখল কল্যাণ সামন্ত তার দিকে বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। 

সায়ন একটু হেসে হাতটা বোলারের মতো শূন্যে নাচাতে নাচতে রাস্তায় পা রাখল। ওর চোখে মুখে যুদ্ধ জয়ের হাসি।

No comments:

Post a Comment