গল্প
মৃত দেবদারুগাছ অথবা ঝরাপাতার কথোপকথন
তন্ময় ধর
১।
ওরা প্রথম এই গাছের নিচে বসেছিল সাত বছর আগে, যখন গাছটা এত মরা ছিল না, আর তারা দুজনও এত ক্লান্ত ছিল না একে অপরের গলার স্বরে।
"তুমি বলেছিলে," মেয়েটি বলল, অনেক পরের একটা সন্ধ্যায়, "আমরা কখনো সাধারণ দম্পতি হব না। এখন দেখো, আমরা তো সাধারণ দম্পতিও হতে পারলাম না, শুধু ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে রয়ে গেলাম।"
"সাধারণ হওয়াটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল," ছেলেটি বলল। "আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম নিজেদের ব্যতিক্রম, তাই সাধারণ জিনিসগুলো— সময়মতো ফেরা, ছোট রাগ মিটিয়ে ফেলা, প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করা— এগুলো শিখতেই ভুলে গেলাম।"
মালী তখন গাছের গায়ে লাল ক্রস আঁকছিল, দূরে দাঁড়িয়ে, তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল না, অথবা শুনেও শোনেনি বলে ভান করছিল।
২।
"তুমি কবে থেকে আমার মেসেজ চেক করা বন্ধ করেছ?" মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, প্রশ্নটা এমনভাবে করল যেন উত্তরটা তার আগে থেকেই জানা।
"যেদিন বুঝলাম," ছেলেটি বলল, "তোমার মেসেজে যা আছে, তার চেয়ে বেশি সত্যি তোমার নীরবতায়। ফোন তো শুধু শব্দ জমিয়ে রাখে। নীরবতা জমিয়ে রাখে অভিপ্রায়।"
"তাহলে তুমি কি বলছ, আমি তোমাকে ঠকিয়েছি?"
"না," ছেলেটি বলল, "আমি বলছি, আমরা দুজনেই একটা মিথ্যের ভেতর সুস্থির থাকার চেষ্টা করছিলাম, আর সেই মিথ্যেটা আমাদের নিজেদের তৈরি, কারো তৃতীয় মানুষের নয়। আমরা ঠকিনি একে অপরকে, আমরা শুধু থেমে গিয়েছিলাম বদলাতে বদলাতে একই দিকে।"
কাঠবিড়ালিরা ডাল থেকে ডালে লাফাচ্ছিল, তাদের ছোট্ট শরীরে কোনো দ্বিধা নেই, প্রতিটা লাফ একটা সিদ্ধান্ত, ফিরে আসার সম্ভাবনা ছাড়াই।
৩।
"মনে আছে," মেয়েটি বলল, "প্রথম বছর তুমি বলেছিলে আমার হাসিতে নাকি এমন কিছু আছে, যা তোমাকে ভয় পাইয়ে দেয়— কারণ তুমি জানতে না এত সুখ তোমার প্রাপ্য কিনা।"
"এখন আমি জানি," ছেলেটি বলল, "সুখ প্রাপ্য কিনা সেই প্রশ্নটাই ভুল ছিল। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, সুখটা আমরা রাখতে জানি কিনা। প্রাপ্তি সহজ, রক্ষণ কঠিন। আমরা দুজনেই প্রাপ্তিতে দক্ষ, রক্ষণে অপটু।"
"তুমি সবসময় এমন সুন্দর করে ব্যাখ্যা দাও," মেয়েটি বলল, গলায় এক অদ্ভুত তিক্ততা, "যেন ব্যাখ্যাটাই ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে।"
"হতে পারে না," ছেলেটি স্বীকার করল, চুপ করে গেল কিছুক্ষণ, তারপর যোগ করল, "কিন্তু যখন ভালোবাসা আর থাকে না, তখন ব্যাখ্যাই একমাত্র জিনিস, যা মানুষকে সৌজন্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।"
৪।
মৃত পাতাদের একটা কথোপকথন ভেসে এল মাটির নিচ থেকে, যা দুজনেই শুনতে পেল, যদিও কেউ স্বীকার করল না যে শুনেছে।
"ওরা কি চলে যাচ্ছে?" একটা পাতা জিজ্ঞেস করল।
"সবাই চলে যায়," আরেকটা পাতা বলল। "আমরাও তো ঝরে গিয়েছিলাম একদিন, ডাল ছেড়ে। কেউ কি জিজ্ঞেস করেছিল আমাদের মতামত?"
"তবু আমরা মাটিতে মিশে গিয়ে গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখি," তৃতীয় পাতাটা বলল। "মানুষ কি সেভাবেও বাঁচায় একে অপরকে, বিচ্ছেদের পরও?"
কেউ উত্তর দিল না পাতাদের প্রশ্নের। কিন্তু মেয়েটির চোখে জল এল, প্রথমবার, আর সে চোখ মুছল না, যেন জল মোছাটাও একটা সিদ্ধান্ত, যা নেওয়ার ক্ষমতা তার আর নেই।
৫।
"তুমি কি অন্য কাউকে খুঁজছ?" ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ, প্রথমবার সরাসরি।
"খুঁজছি না," মেয়েটি বলল, "কিন্তু স্বীকার করছি, একা থাকার ভয়টা এখন আর তেমন ভয়ংকর লাগে না, যেমন লাগত তোমার সঙ্গে থাকার প্রথম বছরগুলোয়। তুমি কি জানো এটা কতটা নিষ্ঠুর সত্যি, যে একা থাকার কল্পনাটা এখন তোমার সঙ্গে থাকার কল্পনার চেয়ে বেশি শান্তি দেয়?"
"জানি," ছেলেটি বলল, গলা কাঁপল সামান্য, "কারণ আমারও একই কথা মনে হয়, প্রতি রাতে, যখন তুমি ঘুমিয়ে পড়ো আর আমি ছাদে গিয়ে দাঁড়াই। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবি, যদি আজ রাতেই সব শেষ হয়ে যেত, তাহলে বাকি জীবনটা কি সহজ হত।"
"তাহলে আমরা কেন এখনও একসঙ্গে আছি?"
"অভ্যাসের জড়তা," ছেলেটি বলল, "আর একটা লজ্জা, যে সাত বছর একসঙ্গে থেকেও যদি বলি এটা ভুল ছিল, তাহলে সাতটা বছরও ভুল হয়ে যায়। কেউ নিজের অতীতকে এত সহজে ভুল বলতে পারে না।"
৬।
পাখিরা উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে, তাদের ছায়া মাটিতে পড়ল, আর সেই ছায়ার ভেতর দুজনের ছায়া প্রথমবার আলাদা দেখাল, যদিও তারা পাশাপাশি বসে ছিল, কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে।
"ছায়াও কি টের পায় বিচ্ছেদ?" মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, স্বগতোক্তির মতো।
"ছায়া শুধু আলোর অনুপস্থিতি," ছেলেটি বলল। "আমাদের মাঝেও এখন যা আছে, তা আলোর অনুপস্থিতি— একদা যা ছিল, তার ছায়া মাত্র, প্রকৃত অন্ধকার নয়, শুধু অন্ধকারের স্মারক।"
"তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?"
"না," ছেলেটি বলল, খুব দ্রুত, যেন প্রশ্নটা তাকে আঘাত করেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। "ঘৃণা করলে অন্তত একটা অনুভূতি থাকত ধরার মতো। যা আমার আছে তা ঘৃণার চেয়েও শূন্য— একধরনের করুণা, নিজের জন্য, তোমার জন্য, আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়ের জন্য।"
৭।
গাছটা সেই রাতে পড়ে গেল, নিঃশব্দে, কেউ লক্ষ করল না ঠিক কখন। সকালে মালী এসে দেখল শুধু গুঁড়িটা, শিকড় উপড়ানো, মাটিতে পড়ে।
কিন্তু দুজন মানুষ তখন আর একসঙ্গে ছিল না সেখানে। মেয়েটি চলে গিয়েছিল আগের রাতেই, একটা ব্যাগ নিয়ে, যাতে ছিল শুধু দরকারি কাপড় আর একটা পুরনো ডায়েরি— যে ডায়েরিতে সাত বছরের প্রতিটা তারিখে একটা করে ছোট্ট টিক চিহ্ন, যার মানে শুধু সে-ই জানত।
ছেলেটি একা বসেছিল গুঁড়ির পাশে, ভোরবেলা, রজনের গন্ধ শুঁকছিল, যেন সেই গন্ধের ভেতর এখনও কিছু একটা খুঁজে পাওয়া যায়, যা কথায় বলা যায়নি।
"তুমি চলে গেলে," সে বলল বাতাসকে, কারণ বলার মতো আর কেউ ছিল না, "আর গাছটাও চলে গেল। দুটো বিচ্ছেদ একসঙ্গে ঘটল, অথচ আমার মনে হচ্ছে না এই দুটোর মধ্যে কোনো সমান ওজন আছে। গাছের জন্য শোক করা সহজ— ওর মৃত্যু দেখা যায়, ছোঁয়া যায়। কিন্তু তোমার চলে যাওয়াটা এমন এক শূন্যতা, যার কোনো গুঁড়ি পড়ে থাকে না মাটিতে, শুধু ঘরের প্রতিটা কোণে একটা অনুপস্থিতি জমে থাকে, যাকে আমি প্রতিদিন সকালে নতুন করে আবিষ্কার করব।"
৮।
মাস তিনেক পর মেয়েটি একবার ফিরে এসেছিল সেই জায়গায়, একা, দেখতে গাছটা কেমন আছে— অথচ গাছ তো ছিলই না, শুধু একটা খালি জায়গা, ঘাস গজিয়েছে অগোছালোভাবে।
"তুমি কি জানতে," সে বলল নিজেকে, কারণ শোনার মতো কেউ ছিল না, "গাছটা যেদিন পড়ে গেল, সেদিনই আমি ব্যাগ গুছিয়েছিলাম? আমি ভাবতাম এটা কাকতালীয়। এখন মনে হয়, হয়তো গাছটাও জানত, ওর সময় শেষ হয়ে গেছে ঠিক তখনই, যখন আমাদের সময়ও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমি এটাও জানি, এই মিল খোঁজাটা আসলে নিজের কষ্টকে একটা গল্পের ভেতর গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা মাত্র, যাতে কষ্টটা একা, নিরর্থক না লাগে।"
খালি জায়গাটায় বাতাস বইল, আর সেই বাতাসে ভেসে এল পুরনো রজনের একটা ক্ষীণ, প্রায়-অস্তিত্বহীন গন্ধ, যা হয়তো ছিল না, হয়তো শুধু স্মৃতির কল্পনা— কিন্তু মেয়েটি সেই গন্ধ শুঁকে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ, যেন এটাই শেষ প্রমাণ, যে কিছু একটা সত্যিই ছিল একদিন, এই জায়গায়, দুজন মানুষের মধ্যে, একটা গাছের ছায়ায়।

No comments:
Post a Comment