Friday, October 9, 2026


 

শরতের ক্যানভাস 

  অভিজিৎ সেন 

বঙ্গ প্রকৃতির ছয় ঋতু বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চের সুনিপুণ অভিনেতা। শরতের অভিনয় বাঙালির মনে-প্রাণে-চেতনায় দাগ কেটে চলেছে আবহমান কাল খন্ড ধরে। বর্ষা মুখর সান্ধ্য যাপনের অন্তিমে ধীর লয়ে নেমে আসে কাশ-স্নিগ্ধ-শুভ্রতায় ঢাকা মোলায়েম মখমলি দোলায় শরতের প্রকৃতি,আন্দোলিত হয় আনন্দে,কলরবে। খন্ড খন্ড মেঘপুঞ্জ অনাবিল গগন মণ্ডল জুড়ে উড়ে চলে যায় কোনো অজানায়, নিরুদ্দেশের কূলে---ঘন গভীর নীলাকাশ মায়াবী শামিয়ানা উড়িয়ে রেখেছে যেন আসন্ন শারদ মঞ্চের অভিনয়ের জন্যে। ভাদ্র ও আশ্বিন,বাংলা বর্ষপঞ্জির পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাস, স্ব স্ব বেশ পরিধান করে নেমেছে বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে। প্রাচীন সংস্কৃত পঞ্জিকা ও পৌরাণিক সাহিত্যে ভাদ্র 'নভস্য' ও ভাদ্রের নক্ষত্র ভিত্তিক পৌরাণিক রুপ 'প্রৌষ্ঠপদ' নামে পরিচিত । বৈদিক সাহিত্যে আশ্বিনের সমার্থক শব্দ 'ইষ'। শরতের আগমনের প্রতীকী বার্তা আশ্বিন মাস। শ্রাবণের অঝোর ধারা শেষে বঙ্গ প্রকৃতির বুকে নেমে আসে গভীর প্রশান্তি। মেঘ ভেসে যায়। কাশফুলে ভরে ওঠে নদীকূল । উঠোনে ছড়িয়ে থাকে শিউলি ফুল। রাতে ধীর লয়ে বয়ে যায় হিমেল বাতাস। ভোরে সোনা ঝরা রোদ । দূর্বা ঘাসের মাথায় জমে থাকে জলবিন্দুর কণা, অগণিত হীরক কণার মতো! এই দুই মাস জুড়ে বাংলা প্রকৃতির বুকে যে রূপের রাশি সঞ্চিত হয়,প্রকৃতই,বঙ্গ প্রকৃতি হয়ে ওঠে 'রূপসী বাংলা'র মতন--কবি জীবনানন্দ দাশ বলে ওঠেন 'এখানে আকাশ নীল--নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল/ফুটে থাকে হিম শাদা-রং তার আশ্বিনের আলোর মতন' আমাদের মুখোমুখি বসিয়ে দেয় কাব্য পংক্তিগুলো শরতের এক মায়াবী শান্ত অনুভূতির আবহের কুসুম-কমল দোলায়।

                  শরতের অলৌকিক চিত্রপট সেজে ওঠে যেন দক্ষ কোন শিল্পীর তুলিতে, নতুন করে সেজে ওঠে বঙ্গ প্রকৃতি তার অলোকসামান্য কুশীলবদের নিয়ে । এরই মাঝে শোনা যায় বাংলার আগমনীর সুর। বেজে ওঠে দুর্গাপূজার সম্মোহনী ঢাকের শব্দ। ভোরের শিশির সিক্ত দূর্বা ঘাসের স্পন্দনে ভেসে আসে মায়ের চলার নুপুর নিক্কন। কোকনদের অপরূপ মায়ায় ভেসে ওঠে মায়ের মুখের প্রতিকৃতি। কাশফুলের দোলা,গভীর নীল দিগন্তের হাতছানি, টুকরো টুকরো মেঘেদের ভেসে যাওয়া,মেঘ-রোদের খেলা,সবুজের ঐক্যতান,দেশি ও পরিযায়ী পাখিদের বার্তা শরতের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে যে চিত্র অঙ্কন করে তা আবহমান বাঙালির জীবন শৈলির চিত্র,বঙ্গ ভূপ্রকৃতির অখন্ড চিত্র । শরতের প্রথম সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয় অসীম অনন্ত পরিচ্ছন্ন নীল আকাশে। নীল আকাশ জুড়ে শুভ্র মেঘমালাপুঞ্জ ছোট ছোট পানসি নৌকা বা ডিঙ্গির মতোই যেন ভেসে বেড়ায়। 'পদ্মানদীর মাঝি'তে বর্ষার মৌসুমে যেমন ভেসে বেড়ায় মাঝিদের নৌকো। আলো জ্বেলে থাকা নৌকো গুলো দূর থেকে প্রদীপের মতো মনে হয়। তখন যে ইলিশ মাছ ধরার মরসুম মাঝিদের কালক্ষয় করে আলস্য যাপন চলে না ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তেমনি নরম তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘের ভেলা নীল আকাশ জুড়ে চলেছে ভেসে। তাদের মাঝে কোন চঞ্চলতা নেই। আছে শান্ত ধীর লয়। আসন্ন শারদীয়া দুর্গোৎসবের আগমনের বার্তা দিয়ে চলেছে এই মেঘমালা। বঙ্গবাসী বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিস্ময় বিহ্বল চোখে,আবেশের আবর্তে ঘুর্ণিত হতে হতে শরতের নাট্য দৃশ্য গুলিকে এগিয়ে যেতে দেখে। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যের মাঝে ভেসে যায়, অন্তলীন হয়ে যায়। প্রতিটি দৃশ্য এক একটি গভীর আবেগের আবর্তে মনকে ঘুরিয়ে চলে। মেঘ ও রোদের অমল খেলা দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই আজ লুকোচুরি খেলা।/নীল আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলারে ভাই--লুকোচুরি খেলা' অথবা 'আজি অমল আকাশে নির্মল বাতাসে' অথবা 'শেফালী বনের মনে কি গুঞ্জন উপজিল' । শিউলি ফুল, রৌদ্রছায়া আর নীলাকাশ বাঙালির আবেগের,আকাঙ্ক্ষার ও অপেক্ষার এক একটি প্রতীক হয়ে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে নিপুণ অভিনেতার মতোই নিজেদের উপস্থাপন করে চলে। বাঙালি আনন্দে,আবেগে শরতের অভিনেতার সঙ্গে সমপ্রাণতা অনুভব করে ভেসে যায় শুভ্র দলবদ্ধ মেঘ রূপ, বলাকার মতো। পথঘাট,নদী,পুকুর ধান ক্ষেত সর্বদাই মনোহরনকারী রূপ ধারণ করে। বঙ্গদেশের ভূলোক থেকে দ্যুলোক সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয় বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে অন্বিত একই দৃশ্য । সমগ্র বঙ্গ দৃশ্য যেন ধরা পড়ে একটি দৃশ্যের মাঝে। বরাভয় বিদ্যুতের প্রহার,ঘন কুটিল বর্ষার সর্বগ্রাশি রূপ,কর্দমাক্ত পথপ্রান্তর,নদীর দুকূল প্লাবিত বন্যার তান্ডব বঙ্গ প্রকৃতির বুকে তখন অদৃশ্য হয়ে যায়--প্রকৃতি তাদের কোথায় কোন গুহার গহ্বরে বন্দী করে রাখে কে জানে ? বঙ্গ প্রকৃতি জুড়ে এখন শুধু শান্ত কোমল মোলায়েম আলো-ছায়ার খেলা চলে । মাঠে মাঠে সবুজ ধানের প্রাণ- চঞ্চল ঢেউ বাতাসের ছোঁয়ায় তরঙ্গের মতো ভেঙে ভেঙে যায়। প্রকৃতি জুড়ে এখন কেবল সবুজের আমন্ত্রণ।খালে,বিলে,দিঘিতে ভরে থাকে পদ্ম ও শালুক। লাল ও সাদা রংয়ের পদ্ম। লাল,সাদা ও নীল শাপলার মেলা বসে। জলাশয়ের ধারে জলে ভেসে বেড়ায় কমলি লতা,তার মাথায় হালকা বেগুনি ও সাদা ফুল থাকে ফুটে।

                   ভোরের বাতাসে মিষ্টি সুবাসে ভরিয়ে রাখে শিউলি, ছাতিম ফুলের তীব্র ও গভীর ঘ্রাণ,সাদা টগর ও লাল জবার রঙের ছোঁয়া এবং কামিনী ও নাগেশ্বর এর সৌরভে শরতের বাগান হয়ে ওঠে সুরভিত। আর নদী কূলে, মাঠের প্রান্তরে ধবল কাশফুল শরতের রঙ্গমঞ্চে বঙ্গ প্রকৃতির বুকে নামিয়ে আনে সুরলোকের সৌন্দর্যকে। ভারতের কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলা হয়--শরৎকালে বঙ্গ প্রকৃতিতে যেন সর্বত্র নেমে আসে এমনই স্বর্গীয় সৌন্দর্য তার সমস্ত মাধুর্য সমেত, যেদিকেই চোখ যায় না কেন !

             পিছিয়ে থাকে না দেশি ও বিদেশী পাখিদের দল। খালের শান্ত জলে,বিলের চড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বক, মাছরাঙ্গা ছোঁ মেরে জল থেকে তুলে নেয় মাছ । দোয়েল, শালিকের কিচিরমিচির ডাকে গ্রামীণ পরিবেশকে করে তোলে প্রাণবন্ত। আমন ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে উড়ে যায় দলবদ্ধ সবুজ টিয়া পরিচিত ডাক দিতে দিতে । সবুজে সবুজে মিলে মিশে হয়ে ওঠে একাকার । গাছের ডালে বসে সোনা ঝরা রোদে,ঘুঘু পাখি ক্লান্তিহীন ভাবে ডেকে যায়। আশ্বিনের শেষে অতিথি পাখির আগমন বার্তা আসে বঙ্গদেশে। হাওড়,
বাওড়,বিল ও সুন্দরবনের জলা ভাগে। সুদূর সাইবেরিয়া ও উত্তর ইউরেশিয়া থেকে আসে Northern Pintail 
ইউরেশিয়ান Wigeon ও Gadwali,Garganey নামে ছোট দ্রুতগামী হাঁস,Bar-headed Goose হিমালয় পর্বতমালার উপর দিয়ে সবচেয়ে উঁচুতে উড়ে আসা অন্যতম পরিচিত রাজহাঁস। শিকারি পাখি হিসেবে আসে উত্তর এশিয়া থেকে Spine,Ospreys এবং উজ্জ্বল নীল বুকের ছোট গায়ক পাখি বা নীলকন্ঠি (Bluethroat), কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চল থেকে আসে গাংচিল বা Gull--এরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে শরৎ ও শীতের শুরুতে বঙ্গ দেশে আসে জীবনধারণের জন্য। সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়।। জলাশয় বরফে জমাট বাঁধে। সমস্ত প্রান্তর বরফে ঢেকে যায়। মাছ,জলজ উদ্ভিদ, পোকামাকড় এবং শস্যদানা সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই খাদ্যের তাগিদে শরতের বঙ্গদেশের অনুকূল আবহাওয়ায় ও মুক্ত জলাশয়ে অর্থাৎ নদ-নদী বাওর ও বিলে নিরাপদে এরা আশ্রয় নেয় বিশ্রাম নেয়,নতুন ছানাকে জন্ম দেয় ও তাদের বড় করে তোলে। এরপর পরিযায়ী পাখির দল ফিরে যায় নিজের দেশে বসন্তের আগমনে, তখন বরফ গলতে শুরু করে। যেমন বঙ্গবাসী মা দুর্গার জন্য অপেক্ষা করে সমস্ত বছর ধরে তিনি আসেন,আনন্দে ভাসিয়ে শেষে বেদনায় কাঁদিয়ে দশমীতে ফিরে যান কৈলাসে। বিদেশি পাখিরাও যেন অপেক্ষা করে এভাবে গোটা বছর ধরে বঙ্গ শরতের রঙ্গমঞ্চে, নিজেদের ভূমিকা পালনের জন্যে। এভাবেই শরতের রঙ্গমঞ্চ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কুশীলবদের সম্মেলনে নানা রঙে,ঢঙে,বৈচিত্র্যে নব নব উপস্থাপনে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে নাট্যমঞ্চ।

                    সাদা সাদা কাশবনের ওপর দিয়ে সার বেঁধে উড়ে যায় সাদা বলাকার দল। অথবা মায়াবী হিমেল সন্ধ্যায় গোধূলির রাগে পশ্চিমের আকাশ শ্রান্তি মুছে তন্দ্রাচ্ছন্ন আবেশি আসর বসায়। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসে নিজেদের নীড়ের উষ্ণ নিরাপত্তার বৃত্তে। শরৎকালে পক্ষীকূল বঙ্গদেশকে, তার অলোকসামান্য প্রকৃতিকে জীবন্ত ও বর্ণময় রূপ দান করে থাকে। বর্ষার মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষণের পর প্রশান্ত নীল আকাশ ও স্তব্ধ জলাভূমি দেশি-বিদেশি পাখিদের হরবোলার ঐক্যতানে প্রাণের স্পন্দনে জাগিয়ে তোলে সমগ্ৰ বঙ্গে শরতের অনাবিল প্রকৃতির দেহ অবয়বকে ।

                    বঙ্গের এই শরৎ কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু
বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়,এর মাঝে ঘটে 'আত্মার জাগরণ'।
"শারদোৎসব" নাটকে তিনি শরতের নিষ্কলুষ প্রকৃতির মাঝে মুক্তির বার্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। নাটকের ১ম দৃশ্যে বর্ষার অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘনঘটা কাটিয়ে শরতের আলোয়
শুভ্রতা ও মুক্তির আনন্দ উদযাপিত হতে দেখা যায়। এখানে রাজা,সন্ন্যাসী,বালক ও প্রজারা সামাজিক ভেদাভেদের কৃত্রিম প্রাচীর ভেদ করে একত্রিত হয়েছে শরতের
উদার, উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে। এই আনন্দের মাঝে সকলের মিলিত হতে কোন বাধা নেই। রাজা বিজয়াদিত্য, তাঁর রাজকীয় পোশাক ও অহংকার ত্যাগ করে সাধারণ বেশে
শরতের অমল পরিবেশে আনন্দের ভাগ নিতে বেরিয়ে পড়েছেন। সন্ন্যাসী,প্রকৃতির মাঝেই খোঁজেন "পরম সত্যকে" । বালক উপানন্দ,সে এখানে 'আনন্দের প্রতীক'--সে কঠোর পরিশ্রম করে ঋণশোধ করতে চায়--'কাজ' তার কাছে একটি উৎসব। আবার লক্ষেশ্বরের মতো অর্থলোভী চরিত্র কেবল সোনা কুঁড়াতে চায়,নিজেকে বঞ্চিত রাখে সকল আনন্দ থেকে। নাট্যকার বোঝাতে চেয়েছেন মানুষের ভেতরের সত্য ও আনন্দ প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথেই এক সুরে বাঁধা। কবির কাছে শরৎ কেবল ঋতু পরিবর্তনের একটি কাল মাত্র নয়, বরং মানুষের মনের অন্ধকারকে দূর করে আলোর আবাহনের কাল। আত্মকেন্দ্রিকতা ও লোভের শৃংঙ্খল ভেঙে প্রকৃতি ও মানুষের মিলন মেলাই হলো শরৎকাল ।

                   পাশ্চাত্যের শরৎকাল ও বাংলার শরতের মধ্যে ভৌগোলিক পার্থক্য আছে। বাংলায় শরৎ নিয়ে আসে কাশফুল ও দেবী বন্দনার আনন্দ, ইউরোপে শরৎ হলো ফসল কাটার ঋতু। শীতের ঠিক আগের পাকা ফল ও সোনালী পাতার সময়কাল। জন কিটস "To Autumn" কবিতায় শরৎকালকে বিষাদ ঘন ঋতু হিসেবে না দেখে তাকে প্রাচুর্য ও পূর্ণতার কাল হিসেবে দেখেছেন। শরৎকে সূর্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেছেন 'Close bosom-friend of the maturing sun' দুই বন্ধু মিলে গাছে পাকা আপেল ও আঙ্গুরে ভরিয়ে তোলে। শরৎ তাঁর কাছে এক কৃষক বা শস্য সংগ্রাহক নারী। যে শস্য মর্দন স্থানে চুল এলিয়ে বসে আছে অথবা ক্লান্তি কাটাতে শস্যক্ষেত্রেই ঘুমিয়ে পড়েছে 'or on a half-reap'd furrow Sound asleep' । আবার তৃতীয় স্তবকে বলেছেন, বসন্তের সুন্দর গান থাকতে পারে,তবে শরতের সন্ধ্যার লালচে আকাশে ঝিঝিঁ পোকার ডাকে, নদীর তীরে উইলো গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট মশাদের দলের গুনগুনিয়ে কান্নার শব্দে, দূর পাহাড়ের ওপারে মেষ শাবকের ডাকে ও Swallow পাখির গানে শরতের নিজস্ব সুর ভেসে আসে। 'And gathering swallows twitter in the skies'। William Wordsworth তাঁর "The Solitary Reaper" কবিতায় শরতের ফসল কাটার পটভূমিতে পাহাড়ি বালিকার গান গাওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন--' Reaping and singing by herself/ stop here, aur gentle pass!/....The music in my heart I bore/long after it was heard no more ' ।

                   আধুনিক মার্কিন সাহিত্যে রবার্ট ফ্রস্ট শরতের সোনালী পাতার সৌন্দর্য ও তার ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে লিখেছেন 
তাঁর "Nothing gold can stay' কবিতায় কবি রূপকের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতাকে তুলে ধরেছেন। 'Nature's
frist green is gold/... But only so and hour/....So
dawn goes down to day/ Nothing gold can stay'. অথবা 'October' কবিতায় কবি অক্টোবরের এক নিস্তব্ধ শরৎ সকলকে ধীরে বয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। যাতে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পাকা ফলগুলো শীতের কনকনে ঠান্ডায় 
মুহূর্তেই নষ্ট না হয়ে যায় 'O hushed October morning mild/Thy leaves have ripened to the fall/Tomorrow's
wind,if it be wild /...Begin the hours of this day slow/...Release on leaf/...For the grapes sake.../
Whose leaves already are burned with frost /...
with the grapes still hanging on the twigs !'
                     
                বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 
'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপু ও দুর্গার কাশবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য,নীল আকাশ,মেঠো পথ,নদীর চরের কাশবন শরতের অপূর্ব চিত্রায়ন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 
'পন্ডিত মশায়ে' দুর্গাপূজা ও আশ্বিন মাসের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।'পল্লীসমাজে' পল্লী জীবনের আবহমান চিত্র অংকন করেছেন । উঠে এসেছে শরৎকালের মেঠো পথ, আমন ধানের ক্ষেত, শারদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক মেলামেশা ও সামাজিক টানাপোড়নের চিত্র ।
'শ্রীকান্তে'র প্রথম পর্বে আশ্বিনের স্বচ্ছ আকাশ ও দূর গাঁয়ের শারদীয় উৎসবের কথা আছে। 'দেবদাসে' চুনিলাল ও দেবদাসের শৈশব ও কৈশোরের চিত্র গ্রামীন প্রেক্ষাপটে শরতের শিশির ভেজা সকাল,কাশবন,শান্ত দীঘির জলের সৌন্দর্য পরোক্ষভাবে ফুটে উঠেছে।'অভাগীর স্বর্গে' শুরুতেই শরৎকালের নিখুঁত ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা উঠে আসে। আশ্বিন মাসের রোদের সকাল, নীল আকাশ, নদী কুলের শরতের স্নিগ্ধ রূপের বর্ণনা আছে। শরৎচন্দ্র তাঁর গল্পে,উপন্যাসে সামাজিক মেলবন্ধনকে বাংলার গ্রামীণ উৎসব বিশেষত শারদ উৎসব বা দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে বারে বারে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই আলো বাতাসের উৎসব হয়ে ওঠে শরতের উৎসব। যার প্রকাশ কাশের বনে, শিউলি তলায় নদীর চরে এবং ধানের ক্ষেতে। শরৎকাল হলো মুক্তি ও দানের প্রতীক। বর্ষার ভারাক্রান্ত অবস্থার অবসান ঘটে, আকাশ হয়ে ওঠে অমল,নির্মল। মানুষের মনও স্বার্থ,লোভ ও কৃত্রিমাতার আবরণ ছড়িয়ে নির্মল হয়ে ওঠে। মন যেন গেয়ে ওঠে "তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে"(রজনীকান্ত সেন) ।
                    
                  অসামান্য প্রতিভাধর নারী খনা শরৎকাল ও আবহাওয়া পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন 'ভাদ্রে আশ্বিনে হয় যে বৃষ্টি।/কহে খানা, তাতেই ধান্যের সৃষ্টি' বা 'ভাদ্রে নদী জল থৈ থৈ।/আশ্বিনে জল বই বই।।' বৈষ্ণব পদকার চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পদে শরতের জোছনা ও রসের বর্ণনা আছে। সেখানে প্রকৃতি ও মানবমন একাকার হয়ে গেছে। যখন চন্ডীদাস বলেন 'শারদ চাঁদ পবন মন্দ।/বিপিনে ফুটিল মালতী গন্ধ ।।/কোকিলা কুহরে ময়ূর নাচে।/সুরত রঙ্গে কানু যে আছে।'শরতের স্নিগ্ধ চাঁদ আকাশে উঠেছে, মন্দ মধুর বাতাস বইছে, বনে মালতী ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে। এমন মনোরম পরিবেশেই কৃষ্ণ রাসলীলায় মত্ত। অথবা 'শারদ চন্দ জিনিয়া মুখমণ্ডল/হাসিতে বিজুরী হানে' অর্থাৎ শ্রীরাধার মুখমণ্ডল এতটাই জ্যোতির্ময় যে তা শরতের নির্মল চাঁদকেও জয় করে নেয়, আর তার হাসি যেন বিজলীর মতো চমকে ওঠে। 
                 বিদ্যাপতি যখন বলেন--'শারদ চান্দ কোটি ভানু জিনিয়া অঙ্গ রুপ।/অমিয় ছানিয়া কেবা গড়ল অপরূপ'
অর্থাৎ কোটি শরতের চাঁদ ও সূর্যের উজ্জ্বলতাকে জয় করে যেন কে এক শিল্পী অমৃত ছেঁকে এই অপরূপ রূপ গড়েছেন। 
                 ভারতচন্দ্র তাঁর 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে বলেছেন--
'আশ্বিন মাসেতে বন্দো দেবী ভাগবতী /শারদীয় পূজা করি পরম ভকতি ।' 
                    কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বলেন ' গেল বরষা হইল 
প্রকাশ শরৎকাল/নির্মল হইল জল মেঘের জঞ্জাল' অথবা 
'ফুটিল কাশের ফুল নদীর তীরেতে/শিউলি ঝরিছে ফুটে 
ভোরের বেলাতে।' বাঙালির দুর্গাপূজার আনন্দ, উমার আগমন ও সামাজিক মিলনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন 'আশ্বিন মাসেতে হয় দুর্গোৎসব রঙ্গে/কত সুখ কত রঙ্গ হয় নানা সঙ্গে।'
                 কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী তাঁর 'সারদামঙ্গল'
কাব্যে বলেন 'শরতের শুভ্র মেঘ/সুনির্মল নিলাম্বরে/অমলের মত শোভা/প্রকাশিয়া চরাচরে।' 'সংগীত শতক'- এ বলেন 
'প্রভাতে শরতের আলো/শিশিরে ভিজিল পাতা/ফুটেছে 
শেফালিকা ফুল/আকুল ব্যাকুল লতা..'

                       শরৎকাল আবাহনের কাল। বাংলার পল্লী থেকে নগর সর্বত্র সাজো সাজো ভাব। এই ঋতু পরিবর্তনের 
চুম্বকীয় টানে মানুষের মনের কোণে জমে ওঠা বিষাদ ভেসে যায়, নতুন আশার আলো মনে সঞ্চারিত হয়। এই পরম মুহুর্তের জন্য বাঙালি সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে। গ্রীষ্মের প্রবল দাবাদহ সহ্য করে,দুকূল প্লাবিত বর্ষার তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে আবারো বুকে আশা বাঁধা এসময়,শরতের আগমনের পথ চেয়ে। শরৎ এলে তার প্রথম সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে অসীম নীল আকাশ । বর্ষার ঘন কালো মেঘের পরিবর্তে স্থান নেয় পেঁজা তুলার মতো নরম মেঘপুঞ্জ,কোন অজানার উদ্দেশ্যে নিঃশব্দে করে বিচরণ। প্রকৃতি লাভ করে স্বর্গীয় শোভা। পথে,ঘাটে,মাঠে শুরু হয় রোদ ও ছায়ার খেলা। বাংলার মেঠো পথ,সবুজ ক্ষেত আর নদী-নালা এক অদ্ভুত গতিময়তা লাভ করে। ভাদ্রের মাঝামাঝি সূর্যের আলো প্রখর ও তীব্র হলেও বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ভাবকে দূর করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনে কাঙ্ক্ষিত শুষ্কতা। আশ্বিন মাসে এই রোদ রূপ নেয় কাঁচা সোনার রঙে। শরতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসের ডগায় আলোর বিচ্ছুরণ-- মানুষকে গৃহের বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে প্রকৃতির উন্মুক্ত সৌন্দর্যের প্রাঙ্গণে । দক্ষিণা বাতাসের দোলায় দুলতে থাকে জ্যোৎস্না ভেজা কাশবন প্রকাশ্য দিবালোকে। নদীর জলের কলকল শব্দ এবং কাশের মৃদু খসখস ধ্বনি মিলে তৈরি হয় অপূর্ব প্রাকৃতিক সুরমূর্ছনা যা মুহূর্তে পথচারীর ক্লান্তিকে দূর করে দেয়। ভোরের হিমেল বাতাস ও পথে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধ আর অপরূপ দৃশ্য বাঙ্গালীর ভাবুক মনকে ভাসিয়ে রাখে শারদীয়া দুর্গাপূজার আনন্দ ঘন দিনের সুখ স্মৃতিতে, সে শুনতে পায় ঢাকের কাঠির শব্দ,কাঁসর ঘন্টার ধ্বনি, ধুনুচির সুবাসিত আবেশময় ধোঁয়া । দূরবাসী স্বজনেরা, প্রবাসীরা 
গৃহে ফেরার টান অনুভব করে। শারদীয় মিলনমেলায় ভরে ওঠে প্রতিটি বাঙালির গৃহকোণ। শরতের মনমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষের মনের মধ্যে যে আনন্দের স্রোত বইয়ে দেয় তাকে প্রকাশ করতে হাতে রং তুলি নিয়ে নেমে পড়ে কতো না অনামি শিল্পীরা। নাইবা হলেন তাঁরা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, ভ্যান গগ, মাইকেল এঞ্জেলো, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেইজ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা মকবুল ফিদা হোসেন। তবু তাদের অন্তর থেকে আঁকা চিত্রকর্মটি তাদের আনন্দের অভিব্যক্তি। তাই কচিকাঁচাদের অথবা অনামি শিল্পীর হাতে অঙ্কিত চিত্রের আনন্দের মূল্য কোন অর্থেই কম নয়। বঙ্গ ঋতুর শরৎকাল শিল্পীর তুলি ও‌ রঙ্গের কাল, এ যে কম বড় প্রাপ্তি নয় !

                মহালয়ার ভোরে আজো বাঙালি অপেক্ষা করে শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ। বাঙালির দুর্গোৎসবের নান্দী পাঠের মধ্য দিয়েই হয়। এরপর একে একে পঞ্চমী,ষষ্ঠী,সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী তিথির মঞ্চে আগমন দশমীতে ট্রাজেডির মধ্যে দিয়ে ঘটে নাটকের যবনিকা পাত । 'রামায়ণে' দেখা যায় পুরানের কালে রামচন্দ্রও সীতাকে উদ্ধার করতে শক্তিময়ী,মঙ্গলময়ী দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন অকালেতে, এই শারদ কালেই । শারদীয়া দুর্গোৎসব 'অকালবোধন' বলে তাই পরিচিত। ভাদ্রের সূচনায় প্রকৃতির ক্যানভাসে রূপের যে মেলা বসেছিল আশ্বিনের শেষে তা ধীরে ধীরে এক স্নিগ্ধ বিষাদের রূপ নেয় হেমন্তের আগমনে। শরৎকাল বাংলা ও বাঙালির মনে নাটকের মতই নানা দৃশ্যের অবতারণার মধ্য দিয়ে রেখে যায় অনাবিল শান্তির স্মৃতি। যে আত্মিক শুদ্ধি, শুভ্র প্রশান্তি দিয়ে যায় তা সারা বছর বাঙালির হৃদয়ে আলো হয়ে জ্বলজ্বল করে। অন্তর আমার তাই বলে ওঠে--

               বিস্তর জমে আছে ধুলো 
               সংকীর্ণের মলিনতা 
               শরতের শিশির ছোঁয়ায় 
               মুছে যাক্ সে আবিলতা ।
               শিউলি ছাতিম শাপলা শতদলে 
               ভেদাভেদহীন ঐক্যতান 
               শরৎ নাট্য মঞ্চ রাখে সাজিয়ে 
               প্রকৃতি মানুষে মিলে,গায় জয়গান ।

No comments:

Post a Comment