মৃত্যুভাবনায়—রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ
সুমনা গুহনিয়োগী
"জন্ম-মৃত্যু দোঁহে মিলে জীবনের খেলা /যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা পা-ফেলা।।"-‐রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সীমাহীন কালের মধ্যে চৈতন্যময় সংক্ষিপ্ত পর্যায়টির নাম জীবন, অথচ এই জীবনের নেপথ্যে রয়েছে মৃত্যুর অনিবার্যতা। তাই জন্মের সঙ্গে মৃত্যুকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়। পা তোলা এবং পা ফেলার মধ্যে যেমন চলার ছন্দ তৈরী হয় , জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তেমনি এই পৃথিবীর চলমানতা এবং নবীনতা রক্ষিত হয়।কিন্তু জীবন-মৃত্যুর এই অবিরাম লীলাকে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে বাংলার দুই প্রতিভাধর কবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি
জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। এখন সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করার যৎসামান্য চেষ্টা করা হল -‐--
"কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়? জয় অজানার জয়!"
---জীবন-মৃত্যুর নিয়ত খেলাকে কবি রবীন্দ্রনাথ এভাবেই প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি মৃত্যুর কপালে জয়টীকা এঁকে জীবন-নদে সাঁতার কাটতে চান। তিনি মনে করতেন, আদি-অন্ত, সৃষ্টি-প্রলয়ের মত জন্ম-মৃত্যুর মধ্যেও রয়েছে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। মৃত্যুর সাথে তাঁর নিবিড় সখ্যতা গড়ে উঠেছিল-- "মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান।" আবার 'শেষ সপ্তকে' উনচল্লিশ নম্বর কবিতায় তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় --
"মৃত্যু যে আমার অন্তরঙ্গ, /জড়িয়ে আছে আমার দেহের সকল তন্তু /তার ছন্দ আমার হৃদস্পন্দনে,/ আমার রক্তে তার আনন্দের প্রবাহ।"
মৃত্যু ছিল তাঁর হাতের ক্রীড়নক। মৃত্যুর কাছে তিনি নতিস্বীকার করেননি। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই যেন মৃত্যুর ওঠাবসা। তাঁর মনোভাব ব্যক্ত হয় এইরূপে --
"আমি মৃত্যু রাখাল /সৃষ্টিকে চরিয়ে চরিয়ে নিয়ে চলেছি /যুগ হতে যুগান্তরে /নব নব চারণক্ষেত্রে।"
সাধারণ মানুষ মৃত্যুশোকে অধীর হয়ে পড়েন। কিন্তু, তিনি তো সাধারণ নন। প্রিয়জনকে কেড়ে নিতে মৃত্যু বারবার এসেছে তাঁর শিয়রে। মৃত্যুর সেই প্রবল ঝটিকার দিনেও তিনি ছিলেন পর্বতের মত নিষ্কম্প, শোকে হননি মূহ্যমান। কারণ পন্ডিত বা আত্মজ্ঞ ব্যক্তি কারও জন্য শোক করেন না ---'নানুশোচন্তি পন্ডিতাঃ' (গীতা ২/১১)। অথচ ইন্দ্রিয়াসক্ত ভোগলিপ্সু মানুষের মনোজগতে সর্বদা মৃত্যুভয় বিরাজমান। তারা ভাবে কখন বা তাদের জীবনে নিভৃত পদসঞ্চারে ঘটবে মৃত্যুর প্রবেশ। কিন্তু সে ভয়ে কম্পিত হয়নি কবির হৃদয়। তিনি তো জিতেন্দ্রিয় পুরুষ। তাই তো অবলীলায় তিনি বলে ওঠেন--
"তাই এ ধরারে
জীবন-উৎসব শেষে দুই পায়ে ঠেলে 'মৃৎ-পাত্রের' মতো যাও ফেলে।" ----রসিক মানুষের কাছে 'প্রেম' ও 'মৃত্যু' একই মুদ্রার দুটো দিক। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যথার্থ রসিক।তাই তাঁর চেতনায় 'প্রেম' ও 'মৃত্যু'
একাকার হয়ে গিয়েছে। তিনি স্বয়ং বলেছেন--
"প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস /তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।"
বলতে দ্বিধা নেই, মৃত্যুকে এখানে অনেক লঘু করে দেখা হয়েছে।
কবি জানতেন, দেহ যখন কর্মফল ভোগের জন্য এই নশ্বর জগতে এসেছে, তখন তার বিনাশ হবেই। কেউ তাকে রোধ করতে পারবে না, কারণ "জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ।"
"জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে/ চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে?" --মাইকেল মধুসূদনের এই ভাবনা কবিগুরুর মনোজগতেও ঠাঁই পেয়েছে। তাঁর কথায়---
"আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে /তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে।" কিন্তু আবার পরক্ষণেই তাঁর কণ্ঠে যখন শুনতে পাই--
"মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই,"-- তখন যেন আমরা পাঠকসমাজ কিছুটা বিভ্রান্ত হই। কিন্তু তা নয়, দুটো বক্তব্যকে আপাতবিরোধী মনে হলেও এর মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আসলে কবির মতে, যশ বা কীর্তির মাধ্যমে মানুষ তার পাঞ্চভৌতিক দেহের বিনাশের পরেও সকলের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়।মহৎ কর্মের মধ্যেই তার বেঁচে থাকার সার্থকতা। শাস্ত্রেও বলা হয়েছে- "শরীরং ক্ষণবিধ্বংসী কল্পান্তস্থায়িনো গুণাঃ।"-- কবির অভিমত এই যে, মৃত্যু মানে মানুষের জীবনের চলার শেষ আর তার কীর্তির চলা শুরু।
তিনি বলেছেন--
"আমিও রেখে যাব কয়েক মুষ্ঠি ধূলি, আমার সমস্ত সুখদুঃখের শেষ পরিণাম।"
ঔপনিষদিক ভাবনায় কবিমন ছিল আচ্ছন্ন। তাই তো, উপনিষদের মর্মবাণী তাঁর সাহিত্যসাধনায় বারে বারে বিচিত্রভাবে এসেছে। তিনি বলেন, মৃত্যুর পর আত্মা দেহ থেকে মুক্তি পেয়ে শূণ্য অসীম আকাশে বিলীন হয়। তিনি মৃত্যুকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন--
"সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর /আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।"
ঔপনিষদিক ভাবনা কবিকে মানবচেতনা থেকে দিব্য চেতনায়, কবিত্ব থেকে ঋষিত্বের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঋষি কবি তাঁর 'নৈবেদ্য' কাব্যের একাংশে বলেছেন--
" শোন অমৃতের পুত্র যত দেবগণ দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহাদের,/মহান্তপুরুষ যিনি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়/ তাহারে জেনে, তাহার পানে চাহি/ মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্যপথ নাহি।"
রবীন্দ্রোত্তর যুগের অলোকসামান্য প্রতিভাধর কবি জীবনানন্দের কবিতা বহুমুখী ভাবের ও চেতনার জগৎ। সেখানে,প্রকৃতিপ্রেম -ইতিহাস- মৃত্যুচেতনা পরস্পর সম্পৃক্ত। বলা হয়ে থাকে, "জীবনানন্দ দাশ সেই বিশাল প্রতিভা-- প্রকৃতি যাঁর প্রাণ, স্বদেশ যাঁর অস্তিত্ব, সমাজ যাঁর এষণা, প্রেম যাঁর সত্তা, ইতিহাস যাঁর অন্বিষ্ট, ঐতিহ্য যাঁর চিন্তা, মৃত্যু যাঁর মনন, সময় যাঁর প্রজ্ঞা আর অবচেতনা যাঁর অভিজ্ঞান।
রবীন্দ্রনাথের মত মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিলনা জীবনানন্দের পক্ষে।
জীবনানন্দের কাব্যে মৃত্যু জীবনের দোসররূপে প্রতিভাত হয়নি। বিরহ বা বিচ্ছেদকে তিনি রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখেননি। তিনি জানেন, বিচ্ছেদ পূর্ণতা দেয় না, তাই তাঁর কাছে বিচ্ছেদের অর্থ অনন্ত শূণ্যতা। সাধারণ মানুষের মতো কবি জীবনানন্দ জানেন, মৃত্যু শারীরিক জীবনের ছেদরেখা, পরিচিত জগতের সমাপ্তি, অনুভূতিগুলির বিনাশ ছাড়া আর কিছু নয়-- "বাসাংসি জীর্ণানি যথা
বিহায় নবানি গৃহ্নাতি
নরোহপরাণি।।"
--জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নববস্ত্র পরিধানের গীতোক্ত ব্যাখ্যায় তাঁর মন সাড়া দেয়নি। তাই মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করার কথা কখনোই তাঁর মনে জাগে না। বরং একধরণের বিষন্নতা জীবনধারণের পক্ষেও যেমন সত্য ছিল তাঁর কাছে, তেমনই জীবনত্যাগের ক্ষেত্রেও ছিল ততখানি সত্য।
জীবনানন্দ জানতেন, মৃত্যু অনিবার্য, মৃত্যু অমোঘ।
আজকের তারায় ভরা সুন্দর আকাশ অদূর ভবিষ্যতে মৃত্যুর হিমশীলতায় বিলীন হবে না একথা কেউ বলতে পারে না।
"যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে, আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে
ডুবে যায়.........."।
স্নেহময়ী সুধাময়ী বঙ্গজননীর একান্ত অনুরক্ত কবি জীবনানন্দ। শ্যামল সুন্দর বঙ্গভূমির সাথে কবির নাড়ীর যোগ অথচ কবি জানেন, প্রকৃতির নিয়মে একদিন মৃত্যু আসবেই। নিশ্চিহ্ন করে দেবে জীবনের অনুরাগরঞ্জিত কামনাগুলি। ছিঁড়ে ফেলবে জাগতিক মায়ার বন্ধন---
"তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার
সন্তান।
বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে।"
-- কারণ এই সত্য। আবার অন্যত্র তিনি বলেছেন--
"আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর?
জানিনা কি আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেওয়ালের মতো
এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ।"
--মৃত্যু আগাম জানান নিয়ে আসে না।
কবি লিখেছেন, ---"কখন মরণ আসে কে বা জানে।"-- আকস্মিক ঝড় এসে যেমন পদ্মবনের সৌন্দর্য বিনষ্ট করে, তেমনই মৃত্যুও কখন আসবে তা অজ্ঞাত।---
"......... কালীদহে কখন যে ঝড়
কমলের নাল ভাঙে......।"
মৃত্যু শিকারী ইঁদুরের মত ওৎ পেতে থাকে তার অন্ধকার কক্ষে জীবনকে ভরে নেবে বলে ‐--"আমারে কুড়ায়ে নেবে মেঠো ইঁদুরের মত মরণের ঘরে।"
মৃত্যুভয় যেন কবিকে সর্বদা তাড়া করে বেড়াত।
কবি মনে করেন, জগতে শুধু চলিষ্ণু জীবনের জয়-জয়কার। মৃতেরা সব বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। '১৯৪৬-৪৭' এ তিনি লিখেছেন -‐-
"নীল হয়ে গেলে তারা তখন তো মৃত / মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না, কখনো।/
মৃতেরা কোথাও নেই, আছে"?
কিংবা 'অন্ধকার'-এ আমরা পাই 'ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম--
পউষের রাতে
কোনদিন জাগব না জেনে--
কোনদিন জাগব না আমি-- কোনদিন জাগব না আর।"---
মৃত্যুকে ঘিরে এক গভীর বিষন্নতাবোধ তাঁকে
সর্বদা কীটের মত দংশন করত। সেই বিষন্নতার সুর তাঁর মৃত্যু ভাবনাকে মেদুর করে তুলেছে। তিনি ভালোমত জানতেন, তিনি পৃথিবীতে না থাকলেও কোন কিছুই কিন্তু থেমে থাকবে না।
---"আমি চলে যাব বলে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মী প্যাঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?"
কবি এই ভেবে আশ্বস্ত ছিলেন যে, মহাকালের ভ্রুকুটিতে সবকিছু তছনছ হয়ে গেলেও সৌন্দর্য কিন্তু অটুট থাকবে। মানুষের মনোলোকেই সৌন্দর্যের চিরপ্রতিষ্ঠা। এই সৌন্দর্যের বিলয় নেই, ধ্বংস নেই--
"সময় মুছিয়া ফেলে সব এসে
সময়ের হাত
সৌন্দর্যকে করে না আঘাত।"
সারাজীবন কি যে কবির আকাঙ্খিত ছিল,
কী যে তিনি পাননি, তা নিজেও বোধহয় ভালো করে
বোঝেন নি। তাঁর নাবিক হৃদয়ে এক বন্দর থেকে আর এক বন্দরে শুধু ঘুরে মরেছে কোন্ দুর্লভ বস্তুর সন্ধানে কে জানে!-- "মৃত্যুরে ডেকেছি আমি প্রিয়ার অনেক নাম ধরে"। মৃত্যু বুঝি তাঁর বড়ই সাধনার ধন ছিল। ভাবুক কবি রোমান্টিক স্বপ্নকুহেলী রচনা করেছেন নিজ মৃত্যুকে ঘিরে। মৃত্যুর বিচ্ছেদ ভাবনা কবিকে বিষন্ন করলেও রূপসী বাংলার বুকে মৃত্যু তাঁকে অমৃতত্বের অধিকারী করবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। ---- "এ মাটির কোলে ছাড়া অন্যস্থানে নয়/ সেখানে মৃত্যুর আগে হয় না মরণ।" ---এখানেই তাঁর "মরণের ভালে জীবনের জয়টীকা"। "তবু যে মরি আমি এই মাঠঘাটের ভিতর,/ কৃষ্ণা যমুনার নয়-- যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ/ লেগে থাকে চোখে মুখে --রূপসী বাংলা যেন / বুকের উপর জেগে থাকে।"
রূপসী বাংলার অণুতে পরমাণুতে মিশে থাকবে কবির অস্তিত্ব --এই ছিল কবির অন্তিম ইচ্ছা। রণক্লান্ত কবি জীবনানন্দ মৃত্যুর কাছে নতিস্বীকার করেছেন বলে ভুল বলা হবে।সেই মৃত্যুঞ্জয়ী পথিক "জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে"পরম বন্ধু বাংলা মায়ের সাথে মিলিত হয়ে লাভ করেছেন মৃত্যুঞ্জয়ী মহিমা।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দুজনের মৃত্যুভাবনার জগৎ ভিন্ন হলেও দুজনেই মৃত্যুর গহন অন্ধকারে ডুব দিয়ে যে মুক্তো তুলে এনেছেন, তাতে দুই কবিই পরেছেন মৃত্যুঞ্জয়ীর শিরোপা। পরিশেষে বলা যায় যে, গীতার মর্মবাণী যদি আমরা আত্মস্থ করতে পারি , তবেই পাব পূর্ণ আনন্দ। আমাদের বুঝতে হবে, মৃত্যুতে দেহের বিনাশ হয়, দেহীর তো বিনাশ হয় না।
আত্মা চিরন্তন। তাঁর জরা, ব্যাধি, মৃত্যু বলে কিছু নেই---
"অজো নিত্যঃ
শাশ্বতোহয়ং পুরাণো।
ন হন্যতে হন্যমানে
শরীরে।।” (গীতা ২/২০)

No comments:
Post a Comment