রম্য রচনা
দশপ্রহরণ ধারিনী
গৌতমেন্দু নন্দী
কৈলাস থেকে দেবী দুর্গার এই মর্ত্যে আগমন নিয়মিত বাৎসরিক ব্যাপার। চারদিনের জন্য পতি দেবতার সঙ্গ ছেড়ে স পুত্র কন্যা সহ মর্ত্যে পিতৃগৃহে যাত্রা করার সময় মহাদেব "বেস্ট অফ লাক" উচ্চারণ করেন কিনা জানা না থাকলেও স্ত্রী পুত্র কন্যা বিনে চ্যালা চামুন্ডাদের নিয়ে চারটা দিন যে সুখনিদ্রা দেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু এবার বেঁকে বসলেন মহাদেব ----
" এবার মর্ত্যে যাওয়া বাদ দাও, কী হবে গিয়ে? তোমার ঐ দশপ্রহরণের এখন আর ধার নেই। দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। নিজে নারী হয়ে নারীদের নিরাপত্তা কি রক্ষা করতে পারছ? খুন, হিংসা,ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। "অভয়া"র ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গোটা মর্ত্যবাসী কতো বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আন্দোলন করল সারা বছর জুড়ে। দোষীদের তো কোন শাস্তি হলোনা! পারলে ধর্ষক, হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে? অথচ তুমি নাকি নারী শক্তির প্রতীক!
তাছাড়া প্রতিবছর তোমার মর্ত্যে যাওয়ার প্রাক্কালে বন্যা,ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্যার্তদের দুর্দশা যেন নিয়মিত বাৎসরিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের দুঃখ, যন্ত্রণা প্রশমনে এখন তুমি ফেইলইওর। অসময়ে নিম্নচাপ,ভারী বর্ষণ, বন্যা,ভাঙ্গন -----এর কী জবাব দেবে তুমি?
তোমার মর্ত্যে আগমনের আগমনী বার্তা মহালয়ার পূণ্য প্রভাতে মন্দ্রিত হয় দেবী বন্দনার প্রথম মন্ত্রে যে মর্ত্যালোকে, সেই মর্ত্যবাসী দরিদ্র, নিরন্ন, অসহায় মানুষগুলোর সামনে দাঁড়াবে কীভাবে? মর্ত্যবাসী প্রদত্ত বিশেষণ "দশপ্রহরণ ধারিনী"র মিথ্যে বোঝা আর কতদিন বহন করবে? সেই কবে অসুর দলন করেছিলে দশপ্রহরণে!
বর্তমানে দুষ্কৃতী, খুনী, ধর্ষক ---অসুরদের দমনে সেই প্রহরণ কি কোন কাজে লাগছে? এখন ঐসব "অবসোলেট"। দেখছনা মর্ত্যবাসী এখন স্মার্টফোনে "নেট" এর মাধ্যমে ডিজিটাল অ্যাকসেসে কেমন আপডেট হয়ে উঠেছে। "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা" প্রয়োগে অসাধ্য সাধন করে চলেছে! আর তুমি! সেই মান্ধাতার আমলের অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে এ সময়ের অসুরদের বধ করতে মর্ত্যে যাচ্ছ?
তোমার আগমনের বার্তায় মর্ত্যবাসী যখন আনন্দে উদ্বেলিত ঠিক তখনই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। এতো ব্যর্থতা নিয়েও মনুষ্য-- কুলের ভক্তি পূজা গ্রহণ করতে তোমার বিবেকে বাধেনা? তাই বলছি, এবার নো মুভমেন্ট টুওয়ার্ডস....."
এবার পার্বতী বলে ওঠেন --" কিন্তু প্রভু, এই কটা দিনের জন্য ওরা যে প্রতীক্ষা করে থাকে। ব্যবসায়ীরা
পুজোর বাজারে দুটো পয়সার মুখ দেখে। লেখক-সাহিত্যিকরা দু-কলম লিখে অর্থ, খ্যাতি দুটোই অর্জন করে। ট্র্যাভেলার এজেন্সিগুলোও হোটেল,হোমস্টের ব্যবসায় লাভের মুখ দেখে এই পুজোর সময়েই। এগুলোওতো পজিটিভ সাইড নিঃসন্দেহে। আর বন্যা,ভাঙ্গন আছে বলেইতো টিকে আছে মর্ত্যের কিছু রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতিগুলো।যতো সমস্যা তত প্রতিশ্রুতি, তত রাজনৈতিক প্রচার।
যা রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করে বৈকি !"
পাল্টা যুক্তি দেন মহাদেব " কেন বুঝতে পারছনা তোমার পুজো ব্যাপারটা এখন "সেকেন্ডারী"।পুরোহিতরা পুজোয় পুরো মন দিতে পারছে কি? তাদের সঙ্গেও এখন স্মার্টফোন। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেই মোবাইলের রিং টোন বেজে যায়। মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে। তোমার সাবেকি চিন্ময়ী রূপটিও আজ মর্ত্যে উপেক্ষিত। "থিম" এর নামে তোমার মূর্তি তৈরি হচ্ছে শিশি,বোতল, কাগজ,দড়ি আরও কত কিছু দিয়ে। শিল্পকর্মের আড়ালে ভক্তি শ্রদ্ধা সব গায়েব। নিয়ম রক্ষায় বিশাল মন্ডপের এক কোনায় ছোট্ট মৃন্ময়ীর চিন্ময়ী রূপটি পূজিত হচ্ছে।
যেখানে মর্ত্যেও এখন ঘন্টায় একশ,দুশো কিলোমিটার গতিতে যানবাহন ছুটছে সেখানে এখনও পড়ে আছে ঐ নৌকা বা ঘোড়াতেই। আর নামেই "দশপ্রহরণ ধারিনী "! ঐ দশ অস্ত্রের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী এ কে ফর্টি ফাইভ, এ-কে ফর্টি সেভেন সহ আরও সব উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র, যেগুলো মর্ত্যের অসুরদের হাতে এখন অ্যাভেইলেবল। তাদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে চাইছে ত্রিশূল, রামদা, কুড়াল, তলোয়ার --এইসব অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে! এই সময়ের সন্ত্রাস দমনে এগুলো এখন " অবসোলেটেড প্রহরণ....!!
শিব দুর্গা র এই সংলাপ শেষ হতে না হতেই স্বপ্নভঙ্গ হয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল মহালয়ার পূণ্য প্রভাতে আর কানে ভেসে আসতে লাগল -- ---
" জাগো তুমি জাগো, জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিনী ,অভয়া শক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো......."

No comments:
Post a Comment