মহা অষ্টমীর সন্ধি পুজো
প্রদীপ মুকুটী
সেদিন ছিল সপ্তমী। প্রদীপের মনটা বড্ড খারাপ। বলতে গেলে সারা বছর অপেক্ষার পূজো, যাকে আমাদের শারদীয় দুর্গো উৎসব বলা হয়। মা এলে আর সময় দেন না। মা আসছেন, মা আসছেন—এতেই বড় আনন্দ। নানান প্রস্তুতির মাঝে মা দুর্গাকে খুঁজে পাওয়া যায়।
তেমনি এর মাঝে বড় দায়িত্ব বন্ধুদের এক করা। পূজোর দায়িত্বের মাঝে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা, সবার টিকিট কাটার তাড়া দেওয়া, ছুটির দরখাস্ত দেওয়া। এসব দায়িত্ব কাঁধে নিতে ভালোবাসে প্রদীপ।
ওর নামেরও যেন সার্থকতা আছে। ও নিজে জ্বলে সবাইকে আলো দেয়। সবার খেয়াল রাখাটা ওর জীবনের অঙ্গ। কিন্তু সব কিছুর মাঝে আজ ও বড় বেসুরো হয়ে গেছে। সবার সঙ্গে সব যোগ রেখেও ও আজ ভোকাট্টা।
প্রদীপ জলপাইগুড়িতে থাকে, কাজের সূত্রে থাকে ঝাড়খণ্ডে। আগে জায়গাটা বিহারের মধ্যে ছিল। জায়গাটা কোথায়? হুম, বলা হয়নি—মাইথন। যাকে ভারতের প্রথম দিকের ড্যাম ও জলবিদ্যুৎ তৈরির প্রযুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা বলা যায়। সেখানেই অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে কাজ করে প্রদীপ।
ছুটির দরখাস্ত সমেত সব গুছিয়ে রেখেও, সব বন্ধুদের দেওয়া সময়ে ও পৌঁছাতে পারল না। না, কারণটা ও নয়। কারণটা মা দুর্গা প্রদীপকে ‘দুগ্গা দুগ্গা’ করতে দিলেন না।
তিন দিনের বৃষ্টিতে ড্যাম টইটম্বুর। খুব বেশি জলের চাপে মনে ও কাজে বড্ড চাপ বেড়ে যায়। তখন সব ছুটি বাতিল।
প্রদীপ মানুষটাই এমন—সবাই ছুটি নিলেও, দায়িত্বের কারণে ছুটি ভাঙতে ও দ্বিধা করে না।
সেই বিপদে প্রদীপ সামলে ছিল কয়েকজনকে নিয়ে। পূজোর সামনে না, পূজো তো শুরুই হয়ে গেছে। এর মাঝে বন্যা হলে কত মানুষের কষ্টে ভাসবে, তা ভাবতে গেলে মন কেমন করে ওঠে।
সপ্তমীর সন্ধ্যার সময় প্রদীপ বর্ধমান স্টেশনে এসে পৌঁছালো। টিকিট ছিল কাল, সে যাত্রা তো হয়নি। আজ তো টিকিট তো দূরের কথা, বসার জায়গা পাওয়া যাবে কি না, তারই চিন্তা।
এর মধ্যে প্রদীপ স্টেশন মাস্টারের ঘরে গিয়ে ডিভিসিতে কাজ করা এবং পরিস্থিতির কারণে কাল যেতে পারেনি—এসব বলে কিছু একটা সেরে ফেলেছে।
সময়ে দার্জিলিং মেল আভিজাত্য নিয়ে বর্ধমান স্টেশনে প্রবেশ করল। স্টেশন মাস্টারের কথা মতো তার একটা ব্যবস্থা হলো। ট্রেন একদম কানায় কানায় পূর্ণ। সবাই চলছে বাড়ি। সবার মনেই পুজোর ঢাক বাজছে। আজ কারও কষ্টই কষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। আজ যেন সবাই সবার আত্মীয়। সবারই সহযোগিতার হাত বাড়ানো।
ট্রেন তার গতি নিয়ে সবাইকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ছুটছে।
সকাল ৮টা নাগাদ এনজেপির প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। সবাই তার নিজের আনন্দ মনে নিয়ে—কেউ বাড়ি, কেউ প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে—স্টেশন ছাড়ল। প্ল্যাটফর্মেই ঢাকের আওয়াজ কানে বাজছে। সঙ্গে প্রদীপের মন বাড়ি পৌঁছনোর ব্যস্ততায় ভরে গেল।
৯টা ৩০ নাগাদ জলপাইগুড়ি স্টেশন ছাড়ল দার্জিলিং মেল। প্রদীপ হন্তদন্ত হয়ে নেমেই রিকশা নিয়ে ছুট দিল। ভাগ্য সাথ দিল, রিকশাওয়ালা ছিল পরিচিত। তাই দু-চার কথা আর জলপাইগুড়ির খবর নিতেই পৌঁছে গেল বাড়ির দোরগোড়ায়।
বাড়িতে ঢুকতেই বাড়িতে উৎসবের মতো রং নিল। সবার খবর আর গুরুজনদের প্রণাম সেরেই সোজা বাথরুমে। আজ যে অষ্টমী, পুষ্পাঞ্জলি তো দিতেই হবে।
প্রদীপ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে তৈরি হয়ে সোজা পুজোমণ্ডপের দিকে। সঙ্গ নিল বোন দোলাকে।
মণ্ডপে ঢুকেই মা দুর্গাকে প্রণাম সেরে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতেই অভিযোগের কথার বৃষ্টি প্রদীপকে শুনতে হলো। তার উত্তরে সবাই প্রদীপকে বাহবাই দিল। বলা যায়, অষ্টমীর হিরো।
এরই মাঝে নজরে পড়ল দোলারই এক বান্ধবীকে। নামটা সম্ভবত সীমা। কত ছোট দেখেছি, বেশ বড় হয়ে গেছে। এসব ভাবতে ভাবতে একদম পুজোমণ্ডপের সামনে।
মাইকে তখন ঘোষণা হচ্ছে, “যারা পুষ্পাঞ্জলি দেবেন, তারা ফুল হাতে নিয়ে তৈরি হোন। আর মা-কে কেউ ফুল ছুড়ে দেবেন না।”
সবাই ফুল নিয়ে তৈরি। প্রদীপ নজর করল, এই অঞ্জলির লাইনে সীমাও তৈরি। তেমনি সীমাও একই নজর করল।
এবার মা দুর্গার অঞ্জলি শুরু। মন দিয়ে মন্ত্র বললেও মন বসছে না পুজোয়। নজর চলে যাচ্ছে সীমার দিকে।
যা হওয়ার নয়, তা কেন হচ্ছে?
প্রদীপ মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মনটা বেশ বিচলিত করে তুলেছে। মন মনের কথাই ভাবে। মনের নেই ধর্ম, নেই শাস্ত্র, নেই পুজো—তাই সব এলোমেলো হয়ে যায়।
মন কোনো বাঁধ মানে না, কোনো হিসেব জানে না। মনের কথা মনই শোনে, মনই বোঝে।
মা-কে দেওয়া অঞ্জলি শেষে প্রণাম করে প্রদীপ বলল,
“মা গো, সবাইকে খুব ভালো রেখো মা গো।”
আবার চোখে ধরা দিল সীমা।
হালকা রঙে সুতোর কাজে শাড়ি জড়িয়ে রয়েছে সীমাকে। চুল ছাড়া, কেউ যেন জোর করে সোজা করে দিয়েছে। কানে ছোট দুল, তার দায়িত্ব নিয়ে দুলছে। গলায় শোভা বাড়িয়ে ঝুলছে মালা। এক হাতে একটা খুব সরু বালা, তবে খুব জৌলুশে।
সীমাকে বেশ লাগছে।
মনের মাঝে না বলা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রদীপ একটু মন হারানো হয়ে পড়েছে। সীমাও নজর করছিল প্রদীপকে, কিন্তু তাতে একটু ভয় মাখানো ছিল।
“এই প্রদীপদা, কেমন আছো? তুমি কবে এসেছো?”
“আরে সীমা, কত বড় হয়ে গেছো!”
“আমি? আজই সকালে এসেছি। আছি ভালোই। তুমি?”
“প্রদীপদা, আমি ছোটো, কিন্তু আমি ছোটো নই। আমিও ভালোই আছি। কদিনের জন্য এসেছো?”
“আছি, পুজো কাটিয়ে যাবো।”
“তাহলে পুজোর কদিন দেখা হবে।”
এরই মাঝে প্রদীপের ডাক পড়ল—
“কিরে, আটকে গেলি তো! এদিকে আয়, একটু আড্ডা মারি।”
প্রদীপ বেশ লজ্জা পেয়ে বলল,
“এই সীমা, আসছি। পরে দেখা হবে।”
বেসামাল মনটাকে সামলে নিয়ে বলল,
“হুম, রাজা, বল কী বলছিস?”
“আরে মলয়, রতন, দুলাল—কী খবর তোদের? আর আমাদের খবর কও আর নিবি? তুই তো এখন আস্ত এক খবরের কাগজ!”
“আরে বাবা, সেটা আবার কী?”
“তা তুমি কী করে বুঝবে? তুমি তো থোত্ত থেলে!”
দুলাল এগিয়ে এসে বলল,
“আরে ছাড়, বেচারা আজই এসেছে। ক্লান্ত তো বটেই।”
“তো, তো, তো—কী বলিস তোরা সবাই মিলে? আজ রাতে একটু দুষ্টুমি হবে তো?”
“সবাই একসাথে হবেই হবে!”
চিৎকারে সবার নজর ওদের দিকে।
“কিরে? কী হবে?”
“হবেই হবে!”
হ্যাঁ, গল্পটা ঠিক পথে এগোচ্ছে। এই অংশে দুটো জিনিস বিশেষভাবে ভালো হয়েছে—
সবার অজান্তেই বন্ধুদের বন্ধুত্বের ও আনন্দের উল্লাস সবার মন ছুঁলো। দুপুর পেরিয়ে গেছে। অষ্টমীর প্রসাদ খিচুড়ির আনন্দ এক আলাদা মাত্রা এনে দেয়।
প্রদীপের বন্ধুরা মিলে প্রতিবার খিচুড়ি পরিবেশন করে। এবার প্রদীপের উৎসাহ একটু আলাদা।
“কী রে প্রদীপ, এত ব্যস্ত কেন? কাউকে খুঁজছিস?”
“আরে, কিসের ব্যস্ত? কাকে খুঁজব? তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে পরিবেশন কর তো, খুব খিদেও পেয়েছে।”
এর মাঝেই সীমা প্রসাদ নিতে বসলো। প্রদীপের বন্ধুরা এর-ওর দিকে তাকিয়ে হেসেই ফেলল। প্রদীপ তৎপরতার সঙ্গে পরিবেশন করতে করতে সীমার দিকেও নজর রাখল। পরিবেশনের ফাঁকে সীমাকে বলে এলো,
“আজ বা কাল একবার বাড়িতে এসো।”
বন্ধুদের নজর থেকে সেটাও এড়ালো না।
সবাই খিচুড়ি-লাবড়ার স্বাদ নিয়ে বিকেলের প্রস্তুতির জন্য যে যার বাড়ি ফিরে গেল।
প্রদীপ খুব ক্লান্ত ছিল। তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েও তার ক্লান্তি আর কাটছে না। প্রদীপের এবার শরীরের সঙ্গে মনের ক্লান্তিও জড়িয়ে ধরেছে। এটা সবারই জানা, প্রদীপ একটু আলাদা মানুষ। কিন্তু আজ প্রদীপ মনের ক্লান্তি আর ভাবনায় ডুবে রয়েছে।
শরতের এই দুর্গাপুজো আমাদের জীবনে অনেক কিছু গড়ে যেমন দেয়, তেমনি দেয় বদলে। যেমন আনন্দের স্পর্শে মাতিয়ে তোলে, তেমনি বিরহের বেসুরও বাজে। মা আসেন তিন দিনের জন্য, তবে তাঁর আসা আর ফিরে যাওয়ার দিন সংখ্যাহীন। এর মাঝে কত প্রেম জড়িয়ে ধরে, কত প্রেম এড়িয়ে যায়—এই ভাঙা-গড়ার খেলায় নীরবে সামিল থাকে আমাদের মা উষা, মা উমা, মা দুর্গা।
সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত ছুঁইছুঁই। প্রদীপ তার ক্লান্তি বিছানায় ছেড়ে সবার সঙ্গে কথা মতো তৈরি হবে, এমন সময় সীমা আর দোলাকে নিয়ে হাজির।
“প্রদীপদা, এলাম তোমার কাছে। কতদিন কথা হয় না। তুমি এখন মাইথনে থাকো, খুব সুন্দর না জায়গাটা?”
“আরে দাঁড়াও, একবারে এত প্রশ্নের উত্তর দেব কী করে? এক নম্বর, ঠিক বলেছ—মাইথনে থাকি। দুই, সত্যি খুব সুন্দর।”
“তুমি এখন কী পড়ছো?”
“তুমি না, প্রদীপদা! দোলা, আমি একসঙ্গেই তো পড়ি।”
“এই পড়া-পড়া ছাড়ো তো। আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে কবে? খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
“ঠিক আছে বাবা, হবে। আজ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারব।”
“ওমা! আড্ডা না ছাই! তোমরা না সবাই ওই একই আড্ডা!”
বলে ওরা পালিয়ে গেল।
একে একে পাঁচ বন্ধু ঠিক সময়ে হাজির। মলয় তার ব্যাগ থেকে সুরার বোতল বের করে ঢেন্টারেং করে মাথায় নিয়ে কোমর দোলাতে লাগল। সঙ্গে সাথ দিল রতন।
বাস, গ্লাস টেবিলে রেখেই রাজা বলল,
“ঢাল, ঢাল, ঢাল! আজ যুদ্ধের তো এটাই ঢাল!”
রতন বলল,
“মলয়, কম করে ঢালিস। আমরা কেউ তো অভ্যস্ত নই। পুজোমণ্ডপে যেতে হবে কিন্তু। অনেক কাজ আছে, আমাদেরই সামাল দিতে হবে।”
রাজা এক চুমুক দিয়ে বলল,
“ইস্, কী তেতো রে! ইস্!”
মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল।
এইভাবে দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষের পথে।
প্রদীপ বলল,
“দেখ রাজা, তুই তেতো বলে মুখটা কেমন করলি। কিন্তু কিন্তু একটা কথা ঠিক—খেতে ভালো নয়, একদম ভালো নয়। কিন্তু খাবার পর তো ভালো লাগে!”
“এই মলয়, আমায় একটু নেনো কাজু দে তো।”
মলয় বলল,
“নেনো কাজু! সেটা কোথায় পাব?”
“দুর মাতাল! দেখ, ওসব বলবি না। একসঙ্গে বসে আছি আর আমি মাতাল? মাতাল হলে সবাই মাতাল!”
“আরে, নেনো কাজু মানে ওই বাদাম ভাজাটা দে!”
সবাই হো হো করে হেসে দিল।
সব শেষে সবাই মণ্ডপে এসে হাজির হলো। সবার মুখে তখন নিষ্পাপ ও সরল হাসিতে মুখ ভরা।
পুজোর আনন্দে আজ সবাই মেতে। আজ যে মহা অষ্টমী। প্রদীপের বন্ধুদেরও একটু বাড়তি আনন্দে সাজানো। দর্শনার্থীদের ভিড়ে তখন মণ্ডপে লোকে লোকারণ্য। বয়স ধরে বিভিন্ন জায়গায় আড্ডার জটলা, গল্পের আর শেষ নেই। তবুও দুর্গাপুজো বলে কথা—ঢাকের কাঠিতেই তো নাচ।
প্রদীপ চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে সীমাকে। সীমা যেন সীমানা ছেড়ে না যায়! প্রদীপের চোখ সীমাকে এড়িয়ে যেতে দিল না। সীমাও কিন্তু প্রদীপের নজরে নজর মিলিয়ে এই ভিড়ের মাঝেও হারিয়ে গেল না।
এরই মাঝে মলয় বলে উঠল,
“এই প্রদীপ, কী ব্যাপার? এত উদাস কেন? তোর চোখ দুটো ওদিকে কী দেখছে রে?”
মলয় এসব বলেই চলেছে।
রতন উঠে এসে বলল,
“বাবা প্রদীপ, তুমি আর প্রদীপ নেই। তোমার মন এখন অন্যদিকে ভাসছে। তুই এবার ডুবেছিস প্রেম পুকুরে। এবার যাবে ঘুম, কাজকর্ম ছেড়ে এবার ঘুরে বেড়াবি!”
“দূর রতন, তুই কী যাতা বলছিস? আমি—”
“যাতা? মোটেই না। আমি এই ব্যাপারে সিনিয়র। আমি তো প্রেমে ডুবেই আছি রে। এবার তুই ডুব দে।”
“দূর রতন, তুই উল্টোপাল্টা বকছিস।”
“এই প্রদীপ, আমি যাই? ব্যাপারটা মিটিয়ে আসি। মানে, সব বলে আসি?”
“নারে বাবা রতন, আমি নিজেই যাব। যা বলার আমি বলব।”
“কী! কী! তুই, প্রদীপ, তুই বলবি?”
হো হো করে হেসে ফেলল সবাই।
পুজোমণ্ডপের চারপাশে তখন লোকে লোকারণ্য। মায়ের সামনে হচ্ছে ধুনুচি নাচ। ঢাকের তালে মনের মাঝে দোলা দিয়ে চলেছে। প্রদীপ তার নজর সরাতে পারেনি, তেমনি সীমাও নয়।
ভিড় যেন ওদের লুকোচুরি খেলার মাঠ।
প্রদীপ উঠে দাঁড়াল।
“এই তোরা বস, আমি একটু আসছি।”
ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সীমার কাছে।
“এই সীমা, এদিকে একটু আসবে?”
সীমা যেন অপেক্ষাতেই ছিল। ভিড়ের মাঝে কিছু শুনতে না পেলেও সীমা বুঝে নিয়েছিল।
সীমা এসে বলল,
“প্রদীপদা, কী বলবে?”
“ও হ্যাঁ, তোমাকে না আজ ভীষণ ভালো দেখাচ্ছে। সবাই তোমাকে খুব নজর করছে, সবাই তোমাকে পছন্দ করছে।”
“তাই নাকি, প্রদীপদা? তুমি সবার এত খোঁজ রাখো কেন গো? তোমার ভালো লাগেনি, বলো!”
“না না, তেমন নয় সীমা। মানে, আমার ভালো না লাগলে তোমায় ডাকি? আসলে কী যে বলি তোমায়! আজ মহা অষ্টমীতে কী ভিড় না?”
“দূর, ভিড় তো! আমি কী করব বলো তো? পুজোয় ভিড় না হলে ভালো লাগে?”
“তুমি কাল আসনি। আমার যে কী মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তা তোমার বোন দোলা জানে। তুমি যখন চাকরি পেয়ে মাইথনে চলে গেলে, তখন চাকরি পাওয়ার জন্য খুশি হলেও তুমি চলে যাবে বলে মন খুব খারাপ হয়েছিল। তোমার সব খবর দোলাই বলে দিত।”
“তাই?”
“আমি তোমায় ছোটই দেখে গেলাম। আজ তোমায় অন্য সীমা বলে দেখছি। তুমি সত্যিই আমার কাছে মন ছোঁয়া সুন্দরী।”
“প্রদীপদা, আমি... আমি তোমায় কী বলি? তুমি কি কিছুই বোঝো না? এতদিনেও বুঝতে চাও না?”
এত ভিড়ের পুজোমণ্ডপে ওরা যেন দু’জনেই শুধু নিজেদের কথা বলছে। ভিড়ে থাকা মানুষগুলো ওদের ঠেলে চলে যাচ্ছে, তবুও ওরা যেন দু’জনেই নিজেদের এক আলাদা জগতে।
মহা অষ্টমীর আনন্দে সাজানো মণ্ডপ পরিপূর্ণতায় ভরা। আলোর রোশনাইয়ে যেন মনের আলো জ্বলে উঠেছে। এই আলোর মাঝেই সীমার মনে প্রদীপ জ্বলে উঠেছে।
লাজুক সীমা প্রদীপের দিকে চেয়ে আবার নতুন করে দেখছে। প্রদীপ আজ সেই প্রদীপ নেই। প্রদীপ আজ নতুন আলোয় ভরা।
ভিড়ে ঠাসাঠাসির মধ্যে হঠাৎ পড়ে যেতে গিয়ে প্রদীপ সীমাকে আঁকড়ে ধরল।
“কী হলো, প্রদীপদা?”
“না, পড়ে যাচ্ছিলাম, তাই। সরি।”
“প্রদীপদা, আমায় এমনি করেই ধরে রেখো না গো। আমায় এমনি করেই আগলে রেখো। আমি তোমায় নিয়ে এক অন্য জগতে হারিয়ে গেছি, প্রদীপদা।”
“সীমা... সীমা, আমি তোমায় সারাজীবন আগলে রাখব। আমি সারাজীবন তোমায় নিয়ে এই পথ ধরে চলব। এই পুজো আমাদের জীবনে পুজো হয়ে থাকবে, সীমা।”
উলুধ্বনির সঙ্গে ঢাক বেজে উঠল। সন্ধিপুজো শুরু।
এই মহা সন্ধিপুজোর সঙ্গে আরেক সন্ধিক্ষণ। প্রদীপ আর সীমার যুগলবন্দি সানাইয়ের সুরে বেজে উঠল।
সন্ধিপুজোর ঢাকের তাল আর উলুধ্বনিতে পুজোমণ্ডপ মেতে উঠল। উপচে পড়া ভিড়ে প্রদীপ-সীমা হারিয়ে গেল।
সন্ধিপুজোর সন্ধি আজ নতুন বন্ধনের সন্ধি হলো।

No comments:
Post a Comment