ছাই রঙা এক আলোর ক্যানভাস
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী
কদিন ধরে বিরাজের যে কী হয়েছে সে নিজেই ঠাহর করতে পারে না ঠিক করে। পাখিদের ঘুম ভাঙার আগে যে মানুষটার ঘুম ভাঙে আর আলো আঁধারির মধ্যেই টুকটুক করে নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম শুরুর তোড়জোড় চলে, তার আজকাল বিছানা ছাড়তেও বেলা হচ্ছে বেশ। রেশমার একটানা কথায় ঘোর কাটে যখন, ধড়ফড় করে উঠে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসে কী যেন করতে হবে! ততক্ষণে কোমরে হাত দিয়ে রেশমা তার সামনে। প্রথম থেকেই রেশমা তার বোহারি কম ছোরি বেশি। আর এখন তো পুরো কর্তৃত্ব চালায় তার ওপর। ভালোও বাসে যেমন তেমনি শাসনের শেষ নেই। ছেলে দিব্যর ছোটবেলার খেলার সঙ্গী, বিরাজের আদরের সেই নানি আজ প্রায় মধ্যবয়সী হয়েও ছোট্টটিই আছে বিরাজের চোখে।
এই চোখ নিয়েই যত সমস্যা। বাদল, ফুস্রো সবকিছু উধাও হয়ে ঝকঝকে চম্পকিল ঘামাইল দিনেও চোখের সামনে থেকে তাদের হোমস্টে টা উধাও হয়ে যায় হঠাৎ। রংবেরঙের চরাগুলোর নানান সুরের শিস, যেগুলো বিরাজের সব চেনা; কিচ্ছু কানে ঢোকে না। এমনকি অনেকটা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখের একেবারে সামনে থেকেও মনের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। বুবার মুখ ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে আমার হাসি হাসি মুখখানি।
" বাবু তিমি কাঁহা ছৌ".....
পাহাড়ের ধাপ বেয়ে পিঠে ভুট্টা, আলু আর অন্যান্য কিছু সবজি ভর্তি ডোকো নিয়ে যেতে যেতে বুবার মন পড়ে থাকে চকচকে সানুটার দিকেই। ছেলেটা যে তার পেছন ছেড়ে কখন উধাও হয়ে গেছে পাইন বনের ওদিকটায় সেটা তার জানা আছে ভালো করে। পুতলী দেখলেই হলো। সেটার পেছন পেছন ধাওয়া করবে যতক্ষণ পারে। আর যত চরা ডাকতে থাকে, তাদের চিরবিরের সঙ্গে দুষ্টু ছেলেটাও তাল মেলায়। পাহাড়ি ফুলগুলোর সঙ্গে,পিঠে কাঠের বোঝা নিয়ে এগিয়ে চলা খচ্চর গুলোর সঙ্গে একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে চলে যতক্ষণ না শহরের বাতো আসে। বাজারে গিয়েও পটর পটর করে লাগাতার বল্নু চলতেই থাকে ছেলেটার।
বিরাজ নামে সেই ছোট্ট ছেলেটাই এখন শুধু আঁখার কাছে আর আরও কাছে বেশি সময়ই বাদল আর ফুস্রোতে ঘিরে থাকা সেসময়ের এই পাহাড়ি শান্ত জনপদটি। না ছিল ঠিকঠাক রাস্তাঘাট, না যাতায়াত কা সাধন। কত কষ্টই যে করতে হয়েছে বুবা আর আমাকে। কালিম্পংয়ের বাজার থেকে বুবার সন্ধ্যে হয়ে যেত ফিরতে। এখন যেটা হোমস্টে সেখানেই ছিল তাদের ইকরা ঘর। সারাদিন খেতের কাজ সেরে আমা রাতের জন্য বেশিরভাগ দিন রান্না করত ভাত, ডাল, সবজি সঙ্গে থাকত মুলো বা টমেটোর গোলমরিচ দেওয়া টক আচার। আবার একেকদিন অন্য পদও থাকত। বিগত কিছুদিন ধরে রাতের খাওয়ার পাতে কতদিন যে রেশমাকে বিরাজ বলে উঠেছে, " অলি কতি ভাত দেউ আমা''...রেশ্মার অবাক চোখের সামনে এরপর পাতের ভাত পাতেই পড়ে থেকেছে। আর উদাস মুখে সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে সে মনে মনে খেয়েছে আমার হাতে তৈরি রায়ো কো সাগ, কুখুরা কো মাসু বা এক আধদিন গুন্দুরুকের সঙ্গে পছন্দের ভুট্টার ধিঁড়ো।
" তিমিলাই কে ভয়ো?"
চমকে উঠল বিরাজ। অচেনা লাগছে মুখটা। প্রাণপণ চেষ্টা করে বেশ অনেকটা পরে মনে করতে পারল রেশমাকে। ছলোছলো চোখে রেশমা ততক্ষণে দিব্যর কাছে গিয়ে তার এই ভুলে যাওয়া, অন্যমনস্ক থাকা নিয়ে হাজার কথা পেড়ে ফেলেছে। জোরদার দাবি জানাচ্ছে ভোলিতেই বুবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য। সদা ব্যস্ত দিব্য বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করছে রেশমাকে। ছেলেটার খুব মেহনত যাচ্ছে কিছুদিন যাবত। শহর থেকে বাজার হাট সবটাই তাকে করতে হচ্ছে নিজেদের ও টুরিস্টদের জন্য। রান্নাটা পুরোপুরি সামলাতে হচ্ছে রেশমাকে।
বরাবর একলা হাতে সবটা সামলাত বিরাজ নিজেই। বুবা, আমি দুজনেই একে একে চলে গেছে তার বিহারও আগে। দিব্যর দুই বছরে স্ত্রী আঁচলও চলে গেল। এরপর দিন গড়িয়েছে নিজের মতো। ছেলের বিয়ে, নাতি, নাতিনি। তখনও চাষবাসের কাজই করত বিরাজ। পরবর্তীতে আয়তনে ছোট সেই আলু, ভুট্টা চাষের জমিই চায়ের বাগানের রূপ নিল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সঙ্গে একটা দোকান চালাত মোমোর। ছেলে অবশ্য পরে দোকানের হাল ধরেছিল। পাঁচ ছ বছর আগে ছেলের ইচ্ছেতেই এই হোমস্টে।
সবেরৈ হলো কী না হলো সে উঠে কুঁচো দিয়ে ঝাঁটপাট থেকে শুরু করে, কুখুরা, পোথী গুলোকে খোর থেকে বের করে দিত। ফুল কো বুটায় নতুন নতুন কোন ফুল এলো কিনা ঘুরে ঘুরে দেখে নিত একবার। সেগুলোর রেখদেখ করে, দরকার মতো পানি দিয়ে লেগে পড়ত হোমস্টের টুরিস্টদের বেড টি বানাতে। এরপর একে একে যে যেমন খেতে চায় সেঁকা, চাপাতি, মকাই কো রুটি বানাত একে একে। সঙ্গে দিত আলুর আচার। আবার যারা চিউরা খেতে চায়, ছোলা ভেজে, ডিম সেদ্ধ করে চিঁড়ে ভাজার সঙ্গে পরিবেশন করত। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হতো দুপুরের তোড়জোড়। রেশমা বাচ্চাদের সামলে যখন যেমন পারত পাশে পাশে সাহায্য করত। এর মাঝে আবার কখনো কখনো পাহাড় বেয়ে ছুটতে হতো শহরে বাজার আনতে। বাইক নিয়েই যাতায়াত করেছে কিছুদিন আগে পর্যন্তও। ফিরে এসে আবার কাজ। দুপুরের খাবার মিটিয়ে সামান্য বিরতির পরই বিকেলের খাজার জন্য মোমো, চাওমিনের জোগাড়। এর মাঝেই কুখুরা পোথীদের তাড়া লাগিয়ে খোরে ঢোকানো, জল ভরা, নাতি নাতিনি আবেশ আর তারার সঙ্গে হুটোপুটি লেগেই থাকত। তারাকে তো চোখে হারাত বিরাজ। তারাও তার বাজে ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝত না। বিরাজের হাত ধরেই তার প্রকৃতি, পশুপাখিকে ভালোবাসতে শেখা, পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা। ভালো পাত্র পেয়ে যাওয়ায় দিব্য মেয়ের বিহা করিয়ে দিল। সে এখন সসুরালীতে। নাতি আবেশ সিকিমের একটা স্কুলে পড়ায়।
পাহাড়টা জেগে উঠছিল ক্রমশ। চরা গুলোর আজ যেন আর একটু তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙেছে। পাহাড়ের সঙ্গে লুকামারির খেলায় আপাতত হেরে বাদলের দল এ মুহূর্তে অদৃশ্যে আটঘাট বাঁধছে পাহাড়ের চোখে কানামাছির ধোয়াটে রুমাল বেঁধে দেওয়ার জন্য। দুপাশের সবুজ ছুঁয়ে পায়ে হেঁটে চলেছে একজন। কখনো অনামি পাহাড়ি ফুলের সঙ্গে কথা বলছে, কখনো পুতলীর সঙ্গে হাওয়ায় ভাসছে আবার কখনো চরাদের শিসে শিস মেলাচ্ছে। আবার কখনো গলার স্বর খানিকটা চড়িয়ে বলে উঠছে,
" বুবা, ম ছু "....
রিটায়ার্ড আর্মিদের সাজানো বাড়িগুলো পার হচ্ছে একে একে। সকালের দৌড় সারতে সারতে বিরাজের পাশ কাটিয়ে মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছে উঠতি বয়সের কিছু ভবিষ্যৎ আর্মি।
বিরাজ হেঁটে চলেছে দ্রুত। বুবা অনেকখানি এগিয়ে গেছে এমনটাই মনে হচ্ছে তার। পাকদন্ডী পথের আর কতটা পেরোলে খুঁজে পাওয়া যাবে হারানো শৈশবকে! বর্ষার জল মাখা সবুজ ঘাসের খয়েরি- সাদা সেই পুতলীটার জন্য আনচান করছে মন। গোলাপি জবা কুসুমে ভরা টুকরিটা হাতে দাঁড়িয়ে আমা বলছে, " কেহী ভোগটে ল্যাই দেউ বাবু।" আলো ও ফুলের উৎসব তিহারের জন্য জোগাড় যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে বুবা আর আমার।
হোচট খায় ভাবনারা হঠাৎ। তিহারের কথা মনে হতেই মনে পড়ে রেশমার মুখ। নানি ভোগটে তুলে দিতে বলেছিল গাছ থেকে। কাগ তো আজকাল দেখাই যায় না। কাগ তিহারে বিরাজ পাহাড়িয়া সব পাখিদের জন্য অনেক ফলমূল নিয়ে আসে। গতবারের কুকুর তিহারের দিন গলায় ফুলের মালা আর কপালে তিলক পড়ে লাটুটাকে রাম্রো দেখাচ্ছিল বড়। গাই তিহারের দিন আবেশ আসে। তারা আর জ্বাইঁ এসে পৌঁছোয় বাড়িতে। সেদিন সাঁঝে লক্ষ্মী মাতার পুজো করে রেশমা। আঁচলের কথা মনে পড়ে খুব ওইদিন। তারা রঙ্গোলি দেয়। পরদিন ভাইটিকা। ভাইয়ের কপালের সাত রঙের এই ফোঁটায় অনেক রঙের শুভকামনার ছবি আঁকা হয়। এজন্যই মূলত ভাই বোন ফেরে বাড়িতে। এর মাঝে টুরিস্টদের হেরচাহ চলে।
এ হেন ব্যস্ততার সময়ে সে বাড়ি থেকে এভাবে বেরিয়ে পড়েছে! কপালে করাঘাত করে ফিরতি পথে হাঁটা দেয় বিরাজ। শরত আবার তাকে রওনা করায় ঘরের পথে। উৎসব তাকে ঘরে ফেরার আলো দেখায়। প্রায় ঘুমন্ত ছিমছাম একটা হোমস্টের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে শৈশব পেরিয়ে সদ্য জাগা সত্তর বছর। কাছের বর্ষপ্রাচীন শিব মন্দিরটিও জেগে ওঠে ঘন্টাধ্বনিতে। চোখ কচলে বিরাজ দেখে লাটু এগিয়ে আসছে পথ ধরে। এই পথ, পাহাড়, নিরিবিলি এই গ্রাম, পাখপাখালি,ঐতিহ্যের পার্বণ সকালের নতুন আলোয় তাদের ভূমিপুত্রকে জাগিয়ে রাখবার দায়িত্ব নেয় নিঃশর্ত অঙ্গিকারে।
(বোহারি- বউমা, নানি- ছোট মেয়েদের আদরের ডাক, বাদল, ফুস্রো- মেঘ কুয়াশা, চম্পকিল- উজ্জ্বল, ঘামাইলো- রোদেলা, চরা- পাখি, বুবা- বাবা, আমা- মা,ডোকো- বোঝা, চকচকে- চঞ্চল, সানু- ছেলেদের আদরের ডাক, পুতলী- প্রজাপতি, চিরবির- পাখির শিস, বাতো- রাস্তা, বল্নু- কথা, আঁখা- চোখ, ইকরা ঘর- কাঠ, বাঁশ ও মাটির মিশ্রণে তৈরি বাড়ি, কুখুরা কো মাসু- মোরগার মাংস, সবেরৈ- ভোরবেলা, কু্ঁচো- একপ্রকার পাহাড়ি ফুলের ঝাড়ু, পোথী- মুরগী, ফুল কো বুটা- ফুলের গাছ, খাজা- জলখাবার,বাজে- ঠাকুর্দা, সসুরালী- শ্বশুরবাড়ি, চরা- পাখি, লুকামারি- লুকোচুরি, ভোগটে- বাতাবি লেবু, রাম্রো- সুন্দর, জ্বাইঁ- জামাই, হেরচাহ- দেখাশোনা)

No comments:
Post a Comment