Friday, October 9, 2026


 

শরৎশশীরা
মৌসুমী চৌধুরী 

            তারপর... জন্মের সার্ধশতবর্ষ পরে একদিন খানিকটা কৌতুহল বশেই তিনি এসে দাঁড়ালেন রূপনারায়ণের তীরে। শরতের গলা সোনা রোদ্দুর তখন নদীর ওপর চকচক করছে। মাথার ওপর যেন কেচে ধুয়ে নীল দিয়ে মেলে দেওয়া আকাশটার উদাত্ত বিস্তার। তাতে গা ছেড়ে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজাতুলোর মতো অলস মেঘেরা। নদীর দু'ধারে মাথা নেড়ে শরৎ বন্দনা গাইছে সাদা কাশফুলের ঝাড়। বহুদিন পর দেউলটি গ্রামে তাঁর প্রিয় নদীটির পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনুভব করলেন মা আসছেন। আকাশে বাতাসে তাঁরই পদধ্বনি। 
      আমাাদের প্রিয় সেই লেখক আজ বৃদ্ধ থেকে বৃদ্ধতর হয়েছেন বটে তবে একেবারে নুয়ে পড়েননি। পরনে থান ধুতি, চোখে মোটা কাঁচের চশমা। হাতে বাঁশের একটি লাঠিতে ভর দিয়ে ঠুক ঠুক করে তিনি এসে বসলেন তাঁর গাঁয়ের সেই অশ্বত্থ গাছটির তলায়, যা এক সময় ছিল তাঁর বহু সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সামনে রূপনারায়ণ বয়ে চলেছে শান্ত লয়ে। অশ্বত্থ তলার পাশ দিয়ে গাঁয়ের ভোলাদার সেই চায়ের দোকানটাকে বাঁ হাতে ফেলে দূর শহরের দিকে চলে গেছে কালো কুচকুচে নতুন পিচ রাস্তাটা। একটা সবুজ রঙের ই-রিকশা চালিয়ে একটি মেয়ে পিক পিক হর্ন বাজাতে বাজাতে পার হয়ে গেল লেখকের সামনে দিয়ে। রিকশার পিছনের সিটে বসে উচ্চস্বরে হাসছে আর কলকল করে কথা বলছে জনা চার একুশ-বাইশের কিশোরী। শরৎচন্দ্র চশমাটা একটু নাকের ডগায় নামিয়ে নিয়ে হাঁ করে চেয়ে রইলেন তাদের দিকে।
     রূপনারায়ণের কূলে কাশফুল আর বাতাসের কানাকানি চলছে। হঠাৎ সেই কাশফুলের আড়াল থেকে উঁকি দিল একটি উনিশ-কুড়ির কিশোরী মুখ। মেয়েটি শাড়ি পরেছে তবে ব্লাউজখানা বেশ কায়দা করে বানান, অনেকটা হাফহাতা জওহর কোটের মতো। কোথায় গেল অচলা, বিজয়া,  রাজলক্ষ্মীদের সেই লেস লাগানো ঘটিহাতা ব্লাউজ? অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন লেখক শরৎচন্দ্র। 
     মেয়েটির কাঁধ থেকে ঝুলছে লম্বা ফিতের একটা জিন্সের ব্যাগ আর হাতে ধরা চকচকে স্মার্টফোন! ​শরৎবাবু একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলেন,
_ 'ওখানে কে ও? সাবিত্রী নাকি হে? নাকি আমাদের সেই অভয়া'?
       ​মেয়েটি খিলখিলয়ে হেসে একেবারে যেন গড়িয়ে পড়ল। কাশঝাড় সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল লেখকের ঠিক মুখোমুখি। যেন এক কাশজাত কন্যা__মেয়েটির পরনের দুধ সাদা খোলের শাড়িতে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক নীল পাখি ___ "তন্বী শ্যামা শিখরিবদনা"...  ঢোঁক গিললেন শরৎবাবু।
__'ধুর দাদু! তুমিও না, কি যে বলো! আমি কেন সাবিত্রী-অভয়া ইত্যাদি হতে যাব? আমি তো সানভি। আর ওই যে ই-রিকশা চালিয়ে তোমার সামনে দিয়ে চলে গেল, ওটা অভয়াদি।"
কলকল করে বলে চলে সানভি মেয়েটি,
__'মিতুল, পলি, পাপিয়া, রুকসানারা তো অভয়াদির ই-রিক্সায় চড়েই অফিসে গেল। দেখলে না? ওরা এবার বি.এ. পাস করে পঞ্চায়েত অফিসে ডেটা এন্ট্রির কাজ পেয়েছে। রোজ অভয়াদিই রিক্সা চালিয়ে ওদের দিয়ে আসে অফিসে। ...'
     ​শরৎচন্দ্র বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
__'বলছ  কী গো!  ... মানে এ আমার সেই অভয়া'?
__'ও দাদু, তোমার মনে নেই? তোমার কলমই  তো অভয়াদিকে সাহস যুগিয়েছিল। অত্যাচারী স্বামীকে ত্যাগ করে সমাজের সংকীর্ণ আচার ও সংস্কারের গন্ডি ভেঙে অভয়াদি আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে'।
সানভির কথাগুলো বড় আনন্দ দিল শরৎবাবুকে।
 __'আচ্ছা সাবিত্রী...মানে সে কি আজও সেই মেসেই রাঁধুনির কাজ করে? তার সতীশেরই বা খবর কি'?
​_'ওসব তোমার আমলের কথা, দাদু'! 
সানভি তার ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল,
__'এখন আর কেউ অত ভালো রান্নার হাত নিয়ে ঘরে বসে থাকে না। সাবিত্রীদি তো হোম ডেলিভারি খুলেছে। বেশ নাম ছড়িয়ে পড়েছে তার ক্লাউড কিচেন "রসেবশে"-র। আর সতীশদা? তাঁর সঙ্গে তো সাবিত্রীদির কবেই বিয়ে হয়ে গেছে'।
খল খল করে হেসে উঠল মেয়েটি,
_' তুমি তো সাবিত্রীদিকে খুব কষ্ট দিয়েছিলে, দাদু। তরুণী বিধবা সাবিত্রীর দুঃখে তোমার প্রাণ একটুও কাঁদেনি তখন! সতীশদার সঙ্গে তার বিয়েটা দিয়ে দিলে কি ক্ষতি হত বল তো? তোমার হাতেই তো কলম ছিল। ছু্ঁড়ে মারতে তো পারতে সমাজের মুখে'।

অর্বাচীন মেয়েটির ওপর বড়ই বিরক্ত হলেন শরৎচন্দ্র,
__' এই মেয়ে, তুমি তো বেশ বাচাল হে! বিধবা সাবিত্রী আর সতীশের বিয়ে দিয়ে আমি কি ওদের হোটেলে তুলতুম? তখনকার সমাজের মুরুব্বীরা ওদের সমাজে ঠাঁই দিত? যত্তসব'!

__ 'আহা আহা রাগ কর কেন, দাদু? জানি গো জানি, মা তো সবসময় বলেন তুমি কত্ত আধুনিক মনস্ক ছিলে! "শেষ প্রশ্ন"  উপন্যাসে তুমি বিয়ে, প্রেম ও সামাজিক নীতিবোধের প্রথাগত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলে। তুমিই নাকি "শেষপ্রশ্ন" উপন্যাসে আজকের দিনের 'লিভিং টুগেটার' রিলেশানের আভাস দিয়েছিলে সেই কত বছর আগে'!
   একটু মুচকি হাসলেন শরৎবাবু। তাঁর মনেপড়ে গেল কমলের কথা। প্রচলিত সমাজ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান সেই স্বাধীনচেতা বিদ্রোহিনীর কথা। বিড়বিড় করে বললেন,
_ 'কে জানে কেমন আছে কমলটা'!
__'তোমার কমলের নাম তো এখন কমলিনী গো, দাদু। শুনেছি, তিনি নাকি মুম্বাইতে এক পাঁচতারা হোটেলের ম্যানেজার। আর কোন এক বিখ্যাত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পীর সঙ্গে লিভিং রিলেশানে আছেন। তাঁর এখন খুব হাই-ফাই ব্যাপার'!

__'ও তাই নাকি? তাই নাকি? ও মেয়ে চিরকালই অমন ছিল...সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখত। হাঃ হাঃ...'!

সানভিও হাসতে হাসতে এক নাগাড়ে আরও বলে চলল, 
__'তুমি যাদের পল্লীবালা বলে বইয়ের পাতায় বন্দি করে রেখে গিয়েছিলে, তারা এখন বেশির ভাগই স্বনির্ভর। আজ তারা প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক চেতনার আলোকে আলোকিত। তাদের কেউ ওই মোড়ের মাথায় বিউটি পার্লার খুলেছে, কেউ গাঁয়ের স্কুলে পড়ায়, কেউ রিক্সা চলায়, কেউবা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর লোন নিয়ে মুরগি-ছাগলের খামার, অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা আর আর রকমারি হস্তশিল্পের ব্যবসা করছে। কেউ কেউ কলকাতার শপিং মলে সেলস গার্লের কাজও নিয়েছে। অনেকেই নার্সিং ট্রেনিং শেষ করে বিভিন্ন নার্সিংহোমে চাকরি করছে। কেউবা কলকাতায় লেখাপড়া শেষ করে আই.টি কোম্পানিতে কাজ করছে। ওদের আবার "ওয়ার্ক ফ্রম হোম", অর্থাৎ ওরা ল্যাপটপের মাধ্যমে ঘরে বসেই অফিস করছে'।
  ​        শরৎচন্দ্র আস্তে আস্তে অশ্বত্থ গাছের গুঁড়িতে গিয়ে বসলেন। তাঁর একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে বিন্দু, অনুরাধা, অচলা, ভারতী, কমললতা, রাজলক্ষ্মী, পার্বতীদের কথা। সমাজ যাদের চোখের জল আর ত্যাগের মহিমায় মুড়ে বঞ্চনার হার-ই কেবল পরিয়ে গিয়েছিল সেই সময়।
​__'তা ওদের ঘরে কি আর কোন দুঃখ নেই, সানভি? সমাজের চোখরাঙানি, জাতপাতের বিচার, বাল্যবিবাহের অভিশাপ ... এসব কি একেবারে ধুয়েমুছে গেছে'?
বৃদ্ধের গলায় এক অদ্ভুত আকুলতা।
​   সানভি এবার একটু গম্ভীর হল। শাড়ির আঁচল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা মুছতে মুছতে বলল, 
  'দুঃখ কি আর একেবারে নেই, দাদু? লড়াইয়ের চেহারাটা শুধু বদলেছে। লড়াই অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে গো। এখন আর সমাজ কোন মেয়েকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না ঠিকই, কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন ট্র্যাপে পড়ছে মেয়েরা। কাজের জায়গায় যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে, তাদের প্রেমিকেরা কখনও কখনও তাদের মিথ্যে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে পাচার করে দিচ্ছে মিডলইস্টে। আবার এমনও হয়েছে মেয়েদের খুন করে তাদের টুকরো টুকরো দেহ ফ্রিজে রেখে দেয় প্রেমিকেরা! প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে কোন কোন ছেলে মেয়েদের মুখে অ্যাসিড ছু্ঁড়ে মারছে। এমন কি জানো, এখন পাঁচ বছরের বালিকাও গণধর্ষণের শিকার হয়? কত যে বীভৎস ঘটনার ঘনঘটা, কী আর বলি দাদু'!
    সূর্যদেব ততক্ষণে মাঝ আকাশে। নীল আকাশ থেকে যেন একেবারে ফেটে পড়ছে উজ্জ্বল রোদ্দুর। দূরে গাঁয়ের গাজনতলার মাঠে দুর্গাপূজোর প্যান্ডেল বাঁধার ঠুকঠাক শব্দ ভেসে আসছে। 
   ​শরৎচন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু ম্লান হাসলেন, তারপর বললেন,
__​'হু্মম... সমস্যা তো আছেই, সানভি। তবে কিছুটা স্বস্তির যে আমার পল্লীবালারা আর অবলা নেই। তারা আর্থিকভাবে খানিকটা স্বনির্ভর হয়েছে। অবশেষে তারা কিছুটা হলেও নিজেদেরকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পেরেছে। এতেই আমার অনেক আনন্দ'।

    ​সানভি মুচকি হেসে বলল,
 'দাদু, একটা সেলফি নেবে আমার সঙ্গে? ফেসবুকে দেব। ক্যাপশনে লিখব—আমার মায়ের প্রিয় গল্পকারের সাথে হঠাৎ দেখা এক শরত-দুপুরে'!
     হো হো করে হাসতে হাসতে চশমাটা নাকের ওপর ভালোভাবে এঁটে শরৎচন্দ্র মোবাইল ক্যামেরার দিকে তাকালেন। শরত রোদ্দুরের সোনালি আভায় তাঁর মুখখানা চকচক করে উঠল।


 

ছাই রঙা এক আলোর ক্যানভাস

 অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

কদিন ধরে বিরাজের যে কী হয়েছে সে নিজেই ঠাহর করতে পারে না ঠিক করে। পাখিদের ঘুম ভাঙার আগে যে মানুষটার ঘুম ভাঙে আর আলো আঁধারির মধ্যেই টুকটুক করে নিত্যনৈমিত্তিক কাজকর্ম শুরুর তোড়জোড় চলে, তার আজকাল বিছানা ছাড়তেও বেলা হচ্ছে বেশ। রেশমার একটানা কথায় ঘোর কাটে যখন, ধড়ফড় করে উঠে গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসে কী যেন করতে হবে! ততক্ষণে কোমরে হাত দিয়ে রেশমা তার সামনে। প্রথম থেকেই রেশমা তার বোহারি কম ছোরি বেশি। আর এখন তো পুরো কর্তৃত্ব চালায় তার ওপর। ভালোও বাসে যেমন তেমনি শাসনের শেষ নেই। ছেলে দিব্যর ছোটবেলার খেলার সঙ্গী, বিরাজের আদরের সেই নানি আজ প্রায় মধ্যবয়সী হয়েও ছোট্টটিই আছে বিরাজের চোখে। 

এই চোখ নিয়েই যত সমস্যা। বাদল, ফুস্রো সবকিছু উধাও হয়ে ঝকঝকে চম্পকিল ঘামাইল দিনেও চোখের সামনে থেকে তাদের হোমস্টে টা উধাও হয়ে যায় হঠাৎ। রংবেরঙের চরাগুলোর নানান সুরের শিস, যেগুলো বিরাজের সব চেনা; কিচ্ছু কানে ঢোকে না। এমনকি অনেকটা কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখের একেবারে সামনে থেকেও মনের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। বুবার মুখ ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে আমার হাসি হাসি মুখখানি। 
" বাবু তিমি কাঁহা ছৌ"..... 
পাহাড়ের ধাপ বেয়ে পিঠে ভুট্টা, আলু আর অন্যান্য কিছু সবজি ভর্তি ডোকো নিয়ে যেতে যেতে বুবার মন পড়ে থাকে চকচকে সানুটার দিকেই। ছেলেটা যে তার পেছন ছেড়ে কখন উধাও হয়ে গেছে পাইন বনের ওদিকটায় সেটা তার জানা আছে ভালো করে। পুতলী দেখলেই হলো। সেটার পেছন পেছন ধাওয়া করবে যতক্ষণ পারে। আর যত চরা ডাকতে থাকে, তাদের চিরবিরের সঙ্গে দুষ্টু ছেলেটাও তাল মেলায়। পাহাড়ি ফুলগুলোর সঙ্গে,পিঠে কাঠের বোঝা নিয়ে এগিয়ে চলা খচ্চর গুলোর সঙ্গে একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে চলে যতক্ষণ না শহরের বাতো আসে। বাজারে গিয়েও পটর পটর করে লাগাতার বল্নু চলতেই থাকে ছেলেটার। 

বিরাজ নামে সেই ছোট্ট ছেলেটাই এখন শুধু আঁখার কাছে আর আরও কাছে বেশি সময়ই বাদল আর ফুস্রোতে ঘিরে থাকা সেসময়ের এই পাহাড়ি শান্ত জনপদটি। না ছিল ঠিকঠাক রাস্তাঘাট, না যাতায়াত কা সাধন। কত কষ্টই যে করতে হয়েছে বুবা আর আমাকে। কালিম্পংয়ের বাজার থেকে বুবার সন্ধ্যে হয়ে যেত ফিরতে। এখন যেটা হোমস্টে সেখানেই ছিল তাদের ইকরা ঘর। সারাদিন খেতের কাজ সেরে আমা রাতের জন্য বেশিরভাগ দিন রান্না করত ভাত, ডাল, সবজি সঙ্গে থাকত মুলো বা টমেটোর গোলমরিচ দেওয়া টক আচার। আবার একেকদিন অন্য পদও থাকত। বিগত কিছুদিন ধরে রাতের খাওয়ার পাতে কতদিন যে রেশমাকে বিরাজ বলে উঠেছে, " অলি কতি ভাত দেউ আমা''...রেশ্মার অবাক চোখের সামনে এরপর পাতের ভাত পাতেই পড়ে থেকেছে। আর উদাস মুখে সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে সে মনে মনে খেয়েছে আমার হাতে তৈরি রায়ো কো সাগ, কুখুরা কো মাসু বা এক আধদিন গুন্দুরুকের সঙ্গে পছন্দের ভুট্টার ধিঁড়ো। 

" তিমিলাই কে ভয়ো?"
চমকে উঠল বিরাজ। অচেনা লাগছে মুখটা। প্রাণপণ চেষ্টা করে বেশ অনেকটা পরে মনে করতে পারল রেশমাকে। ছলোছলো চোখে রেশমা ততক্ষণে দিব্যর কাছে গিয়ে তার এই ভুলে যাওয়া, অন্যমনস্ক থাকা নিয়ে হাজার কথা পেড়ে ফেলেছে। জোরদার দাবি জানাচ্ছে ভোলিতেই বুবাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার জন্য। সদা ব্যস্ত দিব্য বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করছে রেশমাকে। ছেলেটার খুব মেহনত যাচ্ছে কিছুদিন যাবত। শহর থেকে বাজার হাট সবটাই তাকে করতে হচ্ছে নিজেদের ও টুরিস্টদের জন্য। রান্নাটা পুরোপুরি সামলাতে হচ্ছে রেশমাকে। 

বরাবর একলা হাতে সবটা সামলাত বিরাজ নিজেই। বুবা, আমি দুজনেই একে একে চলে গেছে তার বিহারও আগে। দিব্যর দুই বছরে স্ত্রী আঁচলও চলে গেল। এরপর দিন গড়িয়েছে নিজের মতো। ছেলের বিয়ে, নাতি, নাতিনি। তখনও চাষবাসের কাজই করত বিরাজ। পরবর্তীতে আয়তনে ছোট সেই আলু, ভুট্টা চাষের জমিই চায়ের বাগানের রূপ নিল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সঙ্গে একটা দোকান চালাত মোমোর। ছেলে অবশ্য পরে দোকানের হাল ধরেছিল। পাঁচ ছ বছর আগে ছেলের ইচ্ছেতেই এই হোমস্টে। 

সবেরৈ হলো কী না হলো সে উঠে কুঁচো দিয়ে ঝাঁটপাট থেকে শুরু করে, কুখুরা, পোথী গুলোকে খোর থেকে বের করে দিত। ফুল কো বুটায় নতুন নতুন কোন ফুল এলো কিনা ঘুরে ঘুরে দেখে নিত একবার। সেগুলোর রেখদেখ করে, দরকার মতো পানি দিয়ে লেগে পড়ত হোমস্টের টুরিস্টদের বেড টি বানাতে। এরপর একে একে যে যেমন খেতে চায় সেঁকা, চাপাতি, মকাই কো রুটি বানাত একে একে। সঙ্গে দিত আলুর আচার। আবার যারা চিউরা খেতে চায়, ছোলা ভেজে, ডিম সেদ্ধ করে চিঁড়ে ভাজার সঙ্গে পরিবেশন করত। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হতো দুপুরের তোড়জোড়। রেশমা বাচ্চাদের সামলে যখন যেমন পারত পাশে পাশে সাহায্য করত। এর মাঝে আবার কখনো কখনো পাহাড় বেয়ে ছুটতে হতো শহরে বাজার আনতে। বাইক নিয়েই যাতায়াত করেছে কিছুদিন আগে পর্যন্তও। ফিরে এসে আবার কাজ। দুপুরের খাবার মিটিয়ে সামান্য বিরতির পরই বিকেলের খাজার জন্য মোমো, চাওমিনের জোগাড়। এর মাঝেই কুখুরা পোথীদের তাড়া লাগিয়ে খোরে ঢোকানো, জল ভরা, নাতি নাতিনি আবেশ আর তারার সঙ্গে হুটোপুটি লেগেই থাকত। তারাকে তো চোখে হারাত বিরাজ। তারাও তার বাজে ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝত না। বিরাজের হাত ধরেই তার প্রকৃতি, পশুপাখিকে ভালোবাসতে শেখা, পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করা। ভালো পাত্র পেয়ে যাওয়ায় দিব্য মেয়ের বিহা করিয়ে দিল। সে এখন সসুরালীতে। নাতি আবেশ সিকিমের একটা স্কুলে পড়ায়। 

পাহাড়টা জেগে উঠছিল ক্রমশ। চরা গুলোর আজ যেন আর একটু তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙেছে। পাহাড়ের সঙ্গে লুকামারির খেলায় আপাতত হেরে বাদলের দল এ মুহূর্তে অদৃশ্যে আটঘাট বাঁধছে পাহাড়ের চোখে কানামাছির ধোয়াটে রুমাল বেঁধে দেওয়ার জন্য। দুপাশের সবুজ ছুঁয়ে পায়ে হেঁটে চলেছে একজন। কখনো অনামি পাহাড়ি ফুলের সঙ্গে কথা বলছে, কখনো পুতলীর সঙ্গে হাওয়ায় ভাসছে আবার কখনো চরাদের শিসে শিস মেলাচ্ছে। আবার কখনো গলার স্বর খানিকটা চড়িয়ে বলে উঠছে, 
" বুবা, ম ছু ".... 
রিটায়ার্ড আর্মিদের সাজানো বাড়িগুলো পার হচ্ছে একে একে। সকালের দৌড় সারতে সারতে বিরাজের পাশ কাটিয়ে মাঝে মাঝে চলে যাচ্ছে উঠতি বয়সের কিছু ভবিষ্যৎ আর্মি।  
বিরাজ হেঁটে চলেছে দ্রুত। বুবা অনেকখানি এগিয়ে গেছে এমনটাই মনে হচ্ছে তার। পাকদন্ডী পথের আর কতটা পেরোলে খুঁজে পাওয়া যাবে হারানো শৈশবকে! বর্ষার জল মাখা সবুজ ঘাসের খয়েরি- সাদা সেই পুতলীটার জন্য আনচান করছে মন। গোলাপি জবা কুসুমে ভরা টুকরিটা হাতে দাঁড়িয়ে আমা বলছে, " কেহী ভোগটে ল্যাই দেউ বাবু।" আলো ও ফুলের উৎসব তিহারের জন্য জোগাড় যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে বুবা আর আমার। 

হোচট খায় ভাবনারা হঠাৎ। তিহারের কথা মনে হতেই মনে পড়ে রেশমার মুখ। নানি ভোগটে তুলে দিতে বলেছিল গাছ থেকে। কাগ তো আজকাল দেখাই যায় না। কাগ তিহারে বিরাজ পাহাড়িয়া সব পাখিদের জন্য অনেক ফলমূল নিয়ে আসে। গতবারের কুকুর তিহারের দিন গলায় ফুলের মালা আর কপালে তিলক পড়ে লাটুটাকে রাম্রো দেখাচ্ছিল বড়। গাই তিহারের দিন আবেশ আসে। তারা আর জ্বাইঁ এসে পৌঁছোয় বাড়িতে। সেদিন সাঁঝে লক্ষ্মী মাতার পুজো করে রেশমা। আঁচলের কথা মনে পড়ে খুব ওইদিন। তারা রঙ্গোলি দেয়। পরদিন ভাইটিকা। ভাইয়ের কপালের সাত রঙের এই ফোঁটায় অনেক রঙের শুভকামনার ছবি আঁকা হয়। এজন্যই মূলত ভাই বোন ফেরে বাড়িতে। এর মাঝে টুরিস্টদের হেরচাহ চলে। 

এ হেন ব্যস্ততার সময়ে সে বাড়ি থেকে এভাবে বেরিয়ে পড়েছে! কপালে করাঘাত করে ফিরতি পথে হাঁটা দেয় বিরাজ। শরত আবার তাকে রওনা করায় ঘরের পথে। উৎসব তাকে ঘরে ফেরার আলো দেখায়। প্রায় ঘুমন্ত ছিমছাম একটা হোমস্টের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে শৈশব পেরিয়ে সদ্য জাগা সত্তর বছর। কাছের বর্ষপ্রাচীন শিব মন্দিরটিও জেগে ওঠে ঘন্টাধ্বনিতে। চোখ কচলে বিরাজ দেখে লাটু এগিয়ে আসছে পথ ধরে। এই পথ, পাহাড়, নিরিবিলি এই গ্রাম, পাখপাখালি,ঐতিহ্যের পার্বণ সকালের নতুন আলোয় তাদের ভূমিপুত্রকে জাগিয়ে রাখবার দায়িত্ব নেয় নিঃশর্ত অঙ্গিকারে। 



(বোহারি- বউমা, নানি- ছোট মেয়েদের আদরের ডাক, বাদল, ফুস্রো- মেঘ কুয়াশা, চম্পকিল- উজ্জ্বল, ঘামাইলো- রোদেলা, চরা- পাখি, বুবা- বাবা, আমা- মা,ডোকো- বোঝা, চকচকে- চঞ্চল, সানু- ছেলেদের আদরের ডাক, পুতলী- প্রজাপতি, চিরবির- পাখির শিস, বাতো- রাস্তা, বল্নু- কথা, আঁখা- চোখ, ইকরা ঘর- কাঠ, বাঁশ ও মাটির মিশ্রণে তৈরি বাড়ি, কুখুরা কো মাসু- মোরগার মাংস, সবেরৈ- ভোরবেলা, কু্ঁচো- একপ্রকার পাহাড়ি ফুলের ঝাড়ু, পোথী- মুরগী, ফুল কো বুটা- ফুলের গাছ, খাজা- জলখাবার,বাজে- ঠাকুর্দা, সসুরালী- শ্বশুরবাড়ি, চরা- পাখি, লুকামারি- লুকোচুরি, ভোগটে- বাতাবি লেবু, রাম্রো- সুন্দর, জ্বাইঁ- জামাই, হেরচাহ- দেখাশোনা)


 

শুভ বিজয়া 

ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য 


বহুদিন পর বাড়িটায় এল সেবন্তী। বড় রাস্তা থেকে অনেকটা ঢালু অপরিসর গলিপথে নেমে বাঁয়ে ঘুরে দু’পা হাঁটতেই দোতলা হলুদরঙা বাড়ি। সামনে ছোট লোহার গেট। তারপর জিগজ্যাগ নকশার সাদা গ্রীলঘেরা বারান্দা। এই বারান্দা পেরিয়েই বাড়িতে ঢুকতে হত একসময়।

 বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে সেবন্তীর। এত দ্রুত চলে গেল দিনগুলো! চোখ বুজলেই তো পাড়া মাথায় করা চেঁচামেচি, কপট কলহ আর মেজাজি আড্ডার সেই দারুণ উদাত্ত কলরোল এখনও স্পষ্ট শুনতে পায় সে!

 “ সুবু, এলি? গেটের আওয়াজ শুনলাম যেন!”

 চমকে বাস্তবে ফেরে সেবন্তী। ঘাড় হেলিয়ে তাকায় ওপরে। বড় জেঠিমা। শীর্ণ শিরাজর্জর দু’হাতে জানালার গ্রীল আঁকড়ে প্রবল আগ্রহে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। তাই কানের ভরসায় মানুষ চেনার আপ্রাণ চেষ্টা।

 সেবন্তী হাত নেড়ে বিষন্ন হাসে। পাশের ছোট দরজা ঠেলে সিঁড়িতে পা দেয়। ঘোরানো লাল সিমেন্টের চার থাকের সিঁড়ি। পা ভারী হয়ে আসে উঠতে উঠতে। সারা বাড়িময় রাক্ষুসে শূন্যতা বিশাল হাঁ করে যেন গিলতে আসছে তাকে।

 “ আয়, আয়!”

 চোখ তুলতেই দোতলার সিঁড়ির মাথায় দেখা যায় জেঠিমাকে। চিরকালের শক্তপোক্ত ছোট্ট চেহারার মিষ্টিমুখী মানুষটা আজ বেঁকেচুরে দাঁড়িয়ে আছে হাতের লাঠিতে ভর করে। ভাঙা শরীর জুড়ে ফেলে আসা অতীতের নির্দয় ছাপ।

 “ শুভ বিজয়া মনিমা!”, দ্রুত উঠে এসে রমলাদেবীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে সেবন্তী।

 শীর্ণ দু’হাতে সেবন্তীকে বুকের মধ্যে সজোরে আঁকড়ে ধরেন রমলাদেবী। মুহুর্তে বুঝি বদলে যায় গোটা পৃথিবী! জমজমাট বিজয়ার সন্ধের সেইসব উচ্ছ্বল হাসি, হুল্লোর, আনন্দ কোন জাদুবলে নিমেষে যেন ঝলসে ওঠে চোখের সামনে! আঃ! সুখসময়ের গোটাটাই তাহলে ভ্যানিশ হয়ে যায়নি! বাড়ির পড়ে থাকা মানুষদুটোর বুকের গোপনতম কুঠুরিতে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে আজও!

 থাক। বাস্তবে নয় নাই হল, বচ্ছরকার দিনের শুভস্মৃতিটুকু এভাবেই নাহয় চিরঅক্ষয় হয়ে থাকুক তাদের তৃষ্ণার্ত বুকদুটোর মধ্যে। আহা, এও যে পরম পাওয়া!



 

গতানুগতিক 

সুধাংশু চক্রবর্তী 


সবজি ব্যাপারী চন্দ্রনাথ সবে পসরা সাজিয়ে বসেছে। মন্দা বাজার। গুটিকতক খুচরো পয়সা সঙ্গে রাখতে হয়। বউ-এর লক্ষ্মীর ভাঁড় ভেঙ্গে খুচরো পয়সাগুলো সঙ্গে এনেছে। খদ্দেরকে খুচরো ফেরত দিতেই হয়।


‘টাকা ছাড় চন্দ্রনাথ’ শুনে চোখ তুলে মস্তানদের নেতা ধিনাকে দেখে চন্দ্রনাথের হাত-পা অসাড় হয়ে এলেও মগজ নীরবে কাজ করে চলেছে। এলাকার মস্তানদের ফুর্তির খরচ ব্যাপারীদেরই জোগাতে হয়। আপত্তি করলে ভরা বাজারেই মেরে আধমরা করে ছাড়ে। তেমন ঘটোনা চন্দ্রনাথের সামনেই বার কয়েক ঘটেছে। স্থানীয় নেতার ভোট মেশিন বলে পুলিশ এদের টিকিও ছুঁতে পারে না।


চন্দ্রনাথ দ্রুত ভাবতে থাকে কি করা উচিত। ভাবতে ভাবতেই ঠাণ্ডা মগজ তাকে বার্তা পাঠায়। তোরা এমনিতেই মরে আছিস চন্দ্রনাথ। খামোখা মরার ভয় পাচ্ছিস কেন? প্রতিবাদ কর। নইলে আজীবন এমন অত্যাচার সইতে হবে তোকে। চন্দ্রনাথ সেইমত সাহসে ভর করে বলে - এখনো বউনি হয় নি ধিনা।  

- ছেঁদো কথা ছাড়। দিবি কি না বল?
- নাহ্‌, দেব না।
- দিবি না? ধিনার হুঙ্কারে গোটা বাজার কেঁপে ওঠে।


চন্দ্রনাথ দেখছে ধিনার হাতের হকিস্টিকটা উঠে আসছে তার মাথার ওপর। এরপর কি হতে পারে সেটা জানে বলে চন্দ্রনাথের মত  বাজারের ভয়ভীত ব্যাপারীরাও চরম মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছে।

 

এতকিছুর পরও আজকের সভ্য সমাজ মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাচ্ছে, এ আই আরও উন্নত করছে এবং নির্দোষ হতদরিদ্র চন্দ্রনাথেরা প্রতিবাদের মাশুল গুনে চলেছে।


 

হরিহরের মাঠ 

শেখ আবির আল সাদ

সূর্যের উদয়-অস্ত দুটোই যখন অফিসে যাওয়া-আসার সময় দেখতে হয়, তখন বাড়ি এসে ঘুম ছাড়া আর খোশগল্প করার মন-মেজাজই থাকে না। আর তার ওপর যদি দায়িত্ব দেওয়া হয় রাতে বাচ্চাকে এই গণিত বা ইংলিশ বুঝাও, তাহলে কী অবস্থা হতে পারে তা বোঝা অতি সহজ। আমার ভাগ্যেও তাই জুটেছে। অতএব, ক্লান্তি আর ঘুমে ঝিমাতে ঝিমাতে আমি সমাস কত প্রকার কী কী পড়াচ্ছি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার শৈশবের ব্যাকরণ চর্চা। স্মৃতির অ্যালবামে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা কথা মনে পড়ে বেশ হাসি পেল। সেদিন কতগুলো মার খেয়েছি তা মনে নেই, তবে মনের গভীরে সুপ্ত সেই দিনের মারের ব্যথা বেশ টের পাচ্ছি।

মাত্র প্রাথমিক পার করে আমাদের জেলার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমরা গ্রাম থেকে শহরে এলাম আমার পড়াশোনার জন্য। বাবা-মা দুজনই চাকরি করতো বিধায় আমার জন্য প্রাইভেট খোঁজা হতে লাগলো। অবশেষে বাবা তার এক বন্ধুর ছেলে যেখানে কোচিং করে সেখানে আমায় ভর্তি করালেন। গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়ানো ছেলেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার নিবিড় চেষ্টা। সকালে উঠে, খাওয়া-দাওয়া করে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সারাদিন স্কুল, তারপর বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কোনোমতে একমুঠো খেয়েই আবার ব্যাগ নিয়ে কোচিং।

এরপরও যদি শান্তি মিলতো। না, আমাকে বাসায় এসে সকল পড়া তৈরি করে পরদিন আবার স্কুল। কখনো কখনো এত পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে খুব মন খারাপ হতো। তারপরও আমি কোচিং যেতাম শুধু একটা কারণেই। কোচিংয়ে আমার সাথে আরও শিক্ষার্থী ছিল এগারো জন। আমি সহ চারজন ছেলে, বাকি মেয়ে। চঞ্চল হওয়ায় সবাই বেশ তাড়াতাড়িই আমার বন্ধু হয়ে ওঠে। একটু দেরি হয়েছিল শুধু মেঘার সাথে বন্ধু হতে। এর কারণও ছিল বেশ।

এভাবেই চলছিল আমার নতুন জীবন।

আজ আকাশে বৈশাখ মাসের ঘনকালো মেঘ জমেছে, তারপরও যথারীতি আমি কোচিংয়ে হাজির। আমাদের ছোট একটা রুমে ক্লাস করানো হতো, তাই বেঞ্চ ছিল ডান পাশে ছেলেদের চারটি, বাম পাশে মেয়েদের চারটি। আমি সবসময় সেকেন্ড বেঞ্চের বাম পাশে বসতাম আর মেঘা বসতো মেয়েদের সেকেন্ড বেঞ্চের ডানে। আর কে কই বসতো তা ঠিক খেয়াল নেই। সারাদিন স্কুল করে ক্লান্ত থাকলেও কোচিংয়ে এসে আমরা সবাই যে যার মতো লাফালাফি, কামড়াকামড়ি, গল্প, তামাশা সবই করতাম। গণিত আর ইংলিশ ক্লাসের পর এখন শেষ বাংলা ক্লাস নেবেন লুৎফর স্যার। স্যার আসতেই আমরা চুপ। পদ পড়িয়ে বচনে যাবেন, এমন সময় কারেন্ট চলে গেলো। বাইরে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ আগে আসলেও এখন তা কালবৈশাখীতে পরিণত হয়েছে।

স্যার বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর হাতে একটা মোমবাতি সঙ্গে ভিতরে এসে জানালেন, বাড়ি যাওয়ার মতো উপায় নেই, ঝড় না থামা অব্দি এখানেই থাকতে হবে। আমাদের আতঙ্কিত হওয়া থেকে বাঁচাতে তিনি গল্পের আসর খুলতে বললেন। তিনিই শুরু করলেন গল্প। চোখ বন্ধ করে আমরা সবাই তার গল্প শুনতে লাগলাম। এভাবে স্যারের পর ইভান, সতী, তারপর আমার ঘাড়ে গল্প বলার ভার এলো। ওরা দুজনই বেশ গল্প বলেছে। আমি গাঁয়ের ছেলে, এর মুখ থেকে ওর মুখ থেকে কত গল্পই না শুনেছি। হুট করে আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ঠিক করলাম ওদের সবার সাথে মজা নেব। তাই আমি জানালাম, আমি সবার শেষে গল্প বলবো।

কালবৈশাখী তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সো-সো বাতাস চারপাশ তছনছ করছে। এরই মাঝে ওদের জানা সবচেয়ে ভয়ের গল্পটাই বলছে সবাই। একেকটা গল্প শুনে আমাদের দাঁতে দাঁত লাগার জোগাড়। প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের রাতে একটা নিভু-নিভু মোমবাতি যেন বর্তমানকেই ভৌতিক করে তুলেছে। থমথমে অবস্থায় এবার আমার গল্প বলার পালা। সকলের চোখ আমার দিকে। মোমবাতিটা আমার সামনে রেখে গলা পরিষ্কার করে গল্প বলতে আরম্ভ করলাম।

“গল্পটা আমার দাদা আমাকে বলেছেন। তিনি তখন হাইস্কুল পাশ করে কলেজে উঠেছেন। দাদার বাবা মারা যাওয়ায় তখন সে বাড়ির একমাত্র পুরুষ। মাকে নিয়ে সে তাদের পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে তার নানিবাড়ির গ্রামে এসে উঠেছেন কিছুদিন হলো। খবর এলো তার পৈতৃক গ্রামের বাড়ির ঝড়ে বেহাল দশা। দাদা একা সেখানে সকালে গিয়ে এটা-ওটা ঠিক করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় শেষের দিকে। মা বাড়িতে একা বিধায় আজই বাড়ি ফিরতে হবে। পুটলি আর টর্চ হাতে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।

ঝড়ের রাত, তার ওপর অমাবস্যা, টর্চের আলোতেও কিছু হচ্ছে না। দাদা গান গাইতে গাইতে গ্রাম পার করলেন, আরও চার ক্রোশ রাস্তা পাড়ি দিতে হবে হেঁটে। কারণ গরুর গাড়ি এদিকে চলে ঠিকই, তবে আকাশের অবস্থা ভালো না হওয়ায় কোনো গাড়ি নেই। গ্রাম থেকে বেরিয়ে সামনেই পাঁচগায়ের যৌথ কবরস্থান। এখানেই তার বাবাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা আসার আগে বারবার বলে দিয়েছেন বাবার কবরটা দেখে আসতে। আপন গ্রাম ছেড়ে, বাবার কবর ছেড়ে সেই কোন দূর গ্রামে থাকেন ভেবে দাদা ঠিক করলেন যত রাতই হোক বাবার কবরটা জিয়ারত করে তারপর বাড়ি যাবেন। যুবক পুরুষ, গায়ে রক্ত টগবগ করছে, তাই ভয়-টয় দাদা গ্রাহ্য করলেন না।

কাঁচা রাস্তা ঝড়ের জলে কাদাকাদা হয়ে গিয়েছে। অতি কষ্টে জুতো হাতে নিয়ে দাদা কবরস্থানের সামনে আসতেই গা শিউরে উঠলো তার। ভিতরে ঢুকে তার বাবার কবর খুঁজে নিতে লাগলো ছয় মিনিট। এরই মাঝে বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলো। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকানিতে প্রতিটা কবর যেন জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগলো। দাদা কবর জিয়ারত শেষে বের হবেন, এমন সময় তার মনে হলো কে যেন তাকে দেখছে।”

বলে আমি থামলাম। ওরা সবাই হাত শক্ত করে ধরে চুপ করে চোখ বন্ধ করে আমার গল্পে নিজেদের সেই কবরস্থানে উপস্থাপন করে ভাবছে। ঝড়ের বেগ বেড়েই চলেছে, মোমবাতিরও অর্ধেক শেষ। পানি খেয়ে নিয়ে আমি আবার শুরু করলাম।

“দাদার মনে হলো কে যেন তাকে দেখছে। টর্চ দিয়ে চারিদিক ভালো করে দেখলেন। না, কেউ কোথাও নেই। তিনি কবরস্থান থেকে বের হয়ে আবার কাদাময় রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরলেন। একটু যেতেই দাদা অনুভব করলেন কে যেন তার পিছু নিয়েছে। ঝড়ের পূর্বের তীব্র ঠান্ডা বাতাসে দাদার হাত-পা কাঁপতে লাগলো।

তবে তিনি যদি জানতেন কী হতে চলেছে, তাহলে বোধ হয় কাছের কোনো গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। কারণ সামনেই হরিহরের মাঠ। দু ক্রোশ বিস্তৃত মাঠ, কোনো জনমানব নেই। মাঠ পেরুলেই বাড়ি, তবে মানুষের মুখে অনেক বাজে কথা শুনেছে সে এ মাঠের সম্পর্কে। কোনো জমিদার হোক বা ডাকাত হোক, মানুষ মেরে সবাই এই মাঠেই পুঁতে রাখে। এ থেকেই মানুষের মুখে মুখে সত্যি বা মিথ্যা ভয়ের গল্প।

খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে সরু সে রাস্তা যতদূর চোখ যায় কোনো বাড়ি নেই। বাড়ি থাকলেই বা কী, গাঁয়ের চাষাভুষো লোক সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। যদিওবা কেউ নেশা বা তাসে আসক্ত থাকে, আজ সেও এই ঝড়ের রাতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমচ্ছে। গায়ে চাদর জড়িয়ে তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগলেন।

না, দাদা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তার পেছনে কার যেন পায়ের শব্দ আসছে। তিনি পিছনে আলো দিয়ে দেখলেন। কোথাও কিচ্ছু নেই। দাদা ভাবলেন মনের ভুল।

দাদা এর আগেও রাতে এপথ পার করেছেন, তবে আজ যেন সব কিছু কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে। তিনি আবার হাঁটা দিলেন। বিদ্যুৎ চমকানিতে সারা মাঠ মুহূর্তের ভিতর সাদা হয়ে যাচ্ছে। আবার সেই অন্ধকার, স্তব্ধতা হঠাৎ ফরসাকে ভয়ংকর করে তুলছে। তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে হাঁটছেন আর হাঁটছেন। আর বুঝি এক ক্রোশ, আর বুঝি আধ ক্রোশ, এমন সময় তিনি অনুভব করলেন তার ঘাড়ে কে যেন নিশ্বাস ফেলছে।

তিনি এবার রাগ করে বললেন, ‘কে আপনি? আমায় বিরক্ত করছেন কেন? সামনে আসেন।’

কোনো উত্তর নেই। তিনি আবার বললেন, ‘কী হলো, সাড়া দিচ্ছেন না কেন? সামনে আসেন।’

এবারও কোনো উত্তর নেই। দাদা ডানে-বায়ে তাকাতে তাকাতে খুব সতর্কতার সাথে যাত্রা শুরু করলেন। এরপরই হলো আসল ঘটনা।”

আমি থেমে গেলাম। সবাই অধীর আগ্রহে আমার গল্প শুনছে, মোমবাতি প্রায় শেষ। সবাই ক্লাইম্যাক্সে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। জিজ্ঞেস করতে লাগলো, “বল, বল। বল না কী হলো।”

আমি হো হো করে হেসে বললাম, “কী আবার হবে গাধার দল। দাদা বাসায় চলে এসেছে। তারপর মায়ের হাতের খাবার খেয়ে মনের সুখে...”

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার ঘাড়ে, পিঠে যে যার মতো পারে ততগুলো চর-থাপ্পড় মারতে লাগলো। আমার হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। শেষে মেঘাও আমায় প্রথমবারের মতো খুব করে একটা মাথায় গাট্টা মেরেছিল। এখনো প্রায়ই আমায় ওর গাট্টা খেতে হয়।


 



 


সিঁদুরে লাল দশমী 

দেবযানী চক্রবর্তী 


শ্রুতি আর রাহুল ---  দুই বন্ধু বান্ধবী একসঙ্গে স্কুলে পড়া শুরু সেই নার্সারি থেকে l  তারপর একের পর এক ক্লাস টপকে টপকে  টুয়েলভ পর্যন্ত একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা  l  শ্রুতির ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার আর রাহুল ছোট্টবেলা থেকেই বাবার কম্পিউটার নাড়াচাড়া করতে করতে কবে যে ওই রেক্টাঙ্গুলার স্ক্রিন আর মাউসটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও নিজেই জানে না l  দুজনে টুয়েলভ এর পরীক্ষা দিয়ে একজন  নিট আর আরেকজন  এআইইই  পরীক্ষায় বসে  l  ছাত্র হিসেবে ওরা দুজনেই খুব ভালো আর কঠোর পরিশ্রম করে  এই দুটি পরীক্ষার জন্য নিজেদের শখ  , আহলাদ ,  আনন্দ ভুলে প্রস্তুত হয় | আর কথায় আছে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প হয় না। ওরা পছন্দের বিষয় নিয়ে নতুন পড়ার যাত্রাপথ শুরু করে l  সুদীর্ঘ বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করতে করতে ওরা একে অন্যের ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠেছিল যেন  l  কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা , মিলেমিশে বিভিন্ন রেফারেন্স বই কেনা ,  প্রাইভেট টিউশন ,  কোচিং এই সব কিছু নিয়ে এই ছেলে মেয়ে দুটির জীবন একদম রকেট গতিতে এগিয়ে চলছিল l

চোখের সামনে দুজনেই দুটি লক্ষ্য ঝুলিয়ে রেখেছিল একজনের ডাক্তার হওয়া আর একজনের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার  l  মাঝে মাঝে রাহুল   অন্যান্য বন্ধুদের সাথে একটু দিকভ্রষ্ট হয়ে দুষ্টুমিতে মেতে উঠলে  শ্রুতি তখন  ওর কঠিন কঠোর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতো  l স্কুলের শিক্ষিকার মত প্রায় জোর করে ওকে পাখির চোখের  লক্ষ্যে   স্থির  করবার গুরু দায়িত্ব নিজের কাৃঁধে তুলে নিয়েছিল  l ফলে রাহুলের বাবা মা রাহুলকে নিয়ে খুব নিশ্চিন্তে থাকতেন আর ওদের মধ্যে কার বন্ধুত্বটাকে   প্রশ্রয় দিতেন l  রাহুলের পরিবারের আদি বাড়ি রাজস্থানের  জয়পুর l  এই মারোয়াড়ী পরিবারটি তিন পুরুষ আগে ব্যবসার কারণে জলপাইগুড়ি শহরে এসে   থিতু হয়  l  ওনাদের ডুয়ার্সে  চারটে চা বাগান আছে  l  রাহুলের বাবা কাকারা চা বাগান গুলি দেখাশোনা করেন l   কিন্তু রাহুলকে এই পারিবারিক ব্যবসা কোনদিনই আকর্ষণ করেনি  l তবে স্কুল-কলেজ ছুটি হলেই ওরা সব ভাই-বোনরা মিলে চা বাগানের বাংলোতে চলে যেত। ডুয়ার্সের শান্ত সবুজ চা বাগান ওর ভীষণ প্রিয় l  ঢেউ খেলানো  চা  গাছে ভরা নুড়ি পাথরের রাস্তায় বাবার জিপ গাড়ি নিয়ে ওরা ঘুরে বেড়াতো এ বাগান থেকে সে বাগান l   আর ভুটান থেকে নেমে আসা লিস ,   ঘিস ,  জলঢাকা  , ডায়না নদী গুলি যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলতো ---  আয়  , আয় ! দেখে যা আমরা কেমন আছি l

পুজোর ছুটি কিংবা বড়দিনের ছুটিতে বাগানে এসে ও দেখতে পেত নদীগুলি  একেবারে   শীর্ণকায় হয়ে যায়  l   সেই সময় ওরা নদীতে নেমে স্নান করত  l  জলে  পাথর ছোড়াছুড়ি করত l  

ওদিকে শ্রুতির পরিবার একেবারে বিশুদ্ধ মধ্যবিত্ত পরিবার l   বাবা ব্যাংক ম্যানেজার আর মা স্কুল শিক্ষিকা । ফলের শ্রুতি এক মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানার ঘেরাটোপে বড় হয়েছে l   আর এই মূল্যবোধের  জমিতে ওর মননের চাষবাস  l   শ্রুতি হায়দ্রাবাদ এর একটি বিখ্যাত চোখের হাসপাতালে চাকরি করছে l  রাহুল ওই শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক  l  দুজনেই পিজিতে থাকে ওদের পিজি দুটি শহরের এক প্রান্তে পাশাপাশি ওদের বন্ধুত্বের মতোই বন্ধু হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে  l  একে অন্যের সুখে দুঃখে শতকরা ১০০ ভাগ আনুগত্য দেখিয়ে সম্পর্ক অটুট রেখে চলেছে  l  মাঝে মাঝেই ছুটির দিনে শ্রুতি  ছোট্ট  স্কাইলার্ক  পাখি হয়ে যায় আর তখন রাহুলকে হতে হয়  ওর ওড়ার  আকাশ  l  দুজনে স্নান সেরে সুন্দর ফিটফাট হয়ে বেরিয়ে পরে  l  কখনো সালার জং মিউজিয়াম  , কখনো চৌমা হাল্লা প্যালেস  আবার কখনো ওরা   হুসেন সাগরের ধারে বসে টিফিন খেয়ে বাড়ি মানে পিজিতে ফেরে l   যতক্ষণ ওরা একসঙ্গে থাকে ওদের বকবকম বকম বিরামহীন ভাবে চলতে থাকে  l  শহরের আলোকস্তম্ভ গুলি  , আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ , ক্যাফেটেরিয়ার ওই কোনের চেয়ার টেবিলটি ও বোধহয় অবাক হয়ে ভাবে এই ছেলে মেয়ে দুটির সম্পর্কের উপচে পড়া  জীবনীশক্তির উৎস কি ?

কিন্তু শ্রুতিরা কি আদৌ এই বিষয়টি নিয়ে একবারও ভেবেছে  ? নাকি ভাবে  -- দেখে তো মনে হয় না ,   দুজনের কেউ কখনো এই দীর্ঘ একুশ বাইশ বছরের সম্পর্কে  রোমান্টিক  মুহূর্ত কাটিয়েছে কিনা  তাতে  যথেষ্ট সন্দেহ আছে  l   ওদের জগত চরাচরে যেন ওড়াতেই আনন্দ  ,  একজন কবিতা পড়ে আর একজন শোনে  l  এই পড়া  আর শোনাতেই সম্পর্কের  অস্তিত্বের   উলুধ্বনি  l   আর তার বিস্তার কত গভীর পর্যন্ত  কোনোটা নিয়েই ওরা সচেতন নয় কিংবা বলা ভালো ভাববার অবকাশ তৈরি হয়নি  l   সত্যি কথা বলতে কি ----  এভাবে দুটিতে আছে বেশ l  

এবারের দুর্গাপূজায় শ্রুতির বাড়ি  যাওয়া হবে না  l  বেচারী  ছুটি পায়নি l  প্রত্যেকবার ওরা দুজনে ছুটি পেয়ে দুর্গাপুজোয় জলপাইগুড়ি চলে যায় কিন্তু এবার শ্রুতি যেতে না পারায় রাহুল ও ঠিক করেছে ও যাবে না বাড়ি  l  শ্রুতি প্রথমে মন খারাপ করে কয়েক দিন রাহুলের কান ঝালাপালা করে কাটালো l  কিন্তু পরে অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রাহুলের সঙ্গে প্ল্যান করা শুরু করল পুজোর চারটে দিন কিভাবে কাটাবে? মা , পিসি  , মাসিরা সকলে ক্যুরিয়ার করে পুজোর শাড়ি ,  সlলোয়ার কামিজ পাঠিয়ে দিয়েছেন  l ওদিকে রাহুলের ও বাড়ি থেকে কুর্তা পাজামা চলে এসেছে l   রাহুলের সাথে মার্কেটে গিয়ে শ্রুতি শাড়ি আর সালোয়ার কামিজের সঙ্গে রং মিলিয়ে হাতের ,  কানের  , গলার কিছু অ্যান্টিক ফ্যাশন জুয়েলারি কিনে ফেলল  l চারদিন ধরে দুর্গাপূজা  l ফলে চার দিনের সাজগোজ  !  ওদিকে রাহুলের তরফ থেকে কোন উচ্চবাচ্য নেই  , গায়ে জামা গলালেই যেন হল !

 হায়দ্রাবাদের দুর্গাপূজা ওরা কোনদিন দেখেনি , তাই শ্রুতি বেশ উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে  l  হসপিটালে ওর সিনিয়রম্যাম সেদিন   গল্প করছিলেন যে হায়দ্রাবাদের যে বাঙালীরা পাকাপাকিভাবে এখানে থেকে যায় তারা কয়েকটি পূজো মন্ডপে সার্বজনীন দুর্গোৎসবে মেতে ওঠেন  l  এ রকমই কয়েকটি পূজোর আয়োজক হল  বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশন  , উৎসব কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন  , হায়দ্রাবাদ কালীবাড়ি ,  হায়দরাবাদ বেঙ্গলী সমিতি  , রামকৃষ্ণ মিশন l  শ্রুতি চার দিন অর্থাৎ সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত ডিউটির টাইম ম্যামের অনুমতি নিয়ে অন্যান্য  কলিগদের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেছে  l  যার ফলে  দুর্গাপূজার আনন্দ উৎসবে সামিল হতে ওর  আর কোন বাধা রইল না  l  সপ্তমী অষ্টমী নবমী  --  এই তিন দিন   প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ও টের পেল যে হায়দ্রাবাদে কত বাঙালি থাকেন   l শুধু বাঙালী কেন অনেক অবাঙালীরা ও এই মহান উৎসবের আনন্দ নিতে বেরিয়ে পড়েছেন ঘর থেকে  l  একটি প্যান্ডেলে  কলকাতা থেকে নামি   শিল্পীরা এসেছেন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে   l  বিভিন্ন প্যান্ডেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে  , স্থানীয় শিল্পীরা নাচ গান নাটকের আয়োজন করেছেন  l  বোঝাই যাচ্ছে যে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বেশ দীর্ঘ সময়ের l  অষ্টমীর দিন পিজির কিছু বাঙালী মেয়ে আর রাহুলের সঙ্গে শ্রুতি চলে গেল রামকৃষ্ণ মিশন l

সবুজ গাছে ভরা নুড়ি বিছানো রাস্তা চলে গেছে ঠাকুরদালানে  l  ওখানে ওরা মায়ের সামনে অঞ্জলী দিল l  রামকৃষ্ণ মিশনের   আশ্রমিক পরিবেশে  স্বামীজীর উদাত্ত কণ্ঠের মন্ত্র উচ্চারণে সে এক অনন্য অনুভূতি!  শাস্ত্রীয় বিধান ও পবিত্রতা এত সুন্দর ভাবে মেনে চলা হয়েছে যে মনে হচ্ছে এক স্বর্গীয় ঐশ্বরিক পরিবেশে যেন মা দুর্গা স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন  , আর তার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে উঠেছে এই ধরাধামে সকল প্রাণীকুল l  দুপুরে অমৃত সমান খিচুড়ি প্রসাদ খেয়ে ওরা ফিরে এলো পিজিতে  l  এভাবে তিন দিন  অনেক সাজুগুজু করে  প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে মা দুর্গার  দর্শন হল l   কয়েকটি বিখ্যাত বাঙালী হোটেলে বেশ পেট পুরে ভোজন ও হল l  শ্রুতির মা দশমীর দিন প্রত্যেকবার মা দুর্গাকে মিষ্টিমুখ  করlতে যান জলপাইগুড়িতে পাড়ার প্যান্ডেলে ,  মা সিঁদুর ছোৃঁয়ান আর ও বই খাতা কলম ঠাকুরদের পায়ে ছোঁয়ায়  l  কিন্তু হায়দ্রাবাদে  তো মা নেই l  অবশেষে   আবারও রাহুলের শরণাপন্ন হল শ্রুতি l  ঠিক হলো সকাল সাড়ে ১১ টায় ওরা দুজনে হায়দ্রাবাদ বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশনের মন্ডপে যাবে মা দুর্গার চরণে  বই  ছোঁয়াতে l

প্ল্যান অনুযায়ী শ্রুতি পেতলের  ট্রেতে বই  , খাতা , কলম আর মিষ্টি নিয়ে তৈরি হলো l  পরনে মায়ের চওড়া লাল পাড় জরির নকশা কাটা তসরের শাড়ি আর লাল টুকটুকে ব্লাউজ l  মানানসই   সেই হালকা গয়না ও পড়েছে l  আর ঢেউ খেলানো কোমর অব্দি চুল খোলা অবস্থায় পিঠে লুটোপুটি খাচ্ছে  l  ওরা দুজনে এবার চলে এলো মন্ডপে  l  বাঙালি মহিলারা মা দুর্গাকে সিঁদুর নিবেদন করছেন একে একে ,  তারপর নিজেরা একে অন্যকে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে মিষ্টিমুখ করছেন l  এভাবেই প্রত্যেকবারের মতো  দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটলো এই দশমীর দিন  l  শেষ এই দিনটিতে এক আবেগ ঘন পরিবেশ   ছেয়ে আছে সমস্ত মণ্ডপটিতে l  শ্রুতি মা দুর্গা আর সব ঠাকুরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে বই খাতা কলম তাদের পায়ে ছুঁইয়ে প্রণাম করল  l  রাহুল শ্রুতিকে পুরো ব্যাপারটাতে সঙ্গ দিল  l এবার পিজিতে ফেরার পালা  l মা দুর্গাকে আবার সামনের বছরের নিমন্ত্রণ জানিয়ে ওরা মণ্ডপের বাইরে বেরিয়ে এলো  l  শ্রুতি রাহুলকে ওলা কিংবা উবের এর কথা জিজ্ঞেস করবে বলে ওর দিকে তাকাতেই দেখে রাহুল ওর দিকেই  এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন দেখছে  , আর  একটু অন্যমনস্ক  ও  !  শ্রুতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ---  কি হলো রে? কিছু ভুলে গেলি নাকি  ? রাহুল স্থির দৃষ্টিতে   শ্রুতির দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল ---   হ্যাঁ  ,  সিঁদুর ,  চল বিয়ে করি l  তোর কপালটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে  !