Sunday, February 1, 2026


 

হারানো রোদ

লীনা রায়

পর পর তিনবার শাঁখ বাজলো পাশের বাড়িতে। মাধবী তখনও বিছানায়। লেপের বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সন্ধ্যা দিতে হবে। তাই উঠতেই হলো। খাট থেকে নেমে মেঝেতে পা ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠল মাধবী। মনে হলো বরফের চাঁই-এর ওপর পা রেখেছে। সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল বরফ ঠান্ডা। শুরু হল কাঁপুনি। কোন রকমে টেনে হিঁচড়ে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে বিছানায় তোলে মাধবী। সন্ধ্যা দেওয়া হয় না। লেপের ভেতরেই হাত জোড় করে প্রণাম করে। ভগবানের কাছে অক্ষমতার জন্য মাফ চায়।

মাধবীর বয়স ষাট পেরিয়েছে। কিন্তু এত ঠান্ডা কোন শীতকালে পায়নি। আগে শীতের এত জামা কাপড়ও ছিল না। যদিও বয়স তখন বয়স কম। তাই হয়ত রক্তের জোর ছিল। ঠান্ডায় কোনদিন কাবু হয়নি মাধবী। উল্টে শীত তার বরাবর প্রিয়। কিন্তু এবার সব কিছু অন্যরকম। বড় অসহায় লাগছে।

দু'তলা বাড়ি। ওপর নিচ মিলিয়ে খান দশেক ঘর। বাড়ির সদস্য সংখ্যা পনের। শ্বশুর, শাশুড়ি ছাড়াও সাত অবিবাহিত ননদ, নিঃসন্তান খুড় শ্বশুর, শাশুড়ি। বাড়ির একমাত্র ছেলের বৌ মাধবী। কাজের লোক থাকলেও রান্না বান্না, ঘরদোর গুছোনো সব একা হাতে সামলেছে। একে একে তিন সন্তানের মা হয়েছে। দায়িত্ব বেড়েছে। একসময় শ্বশুর, শাশুড়ি চলে গেলেন। একে একে ননদদের বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেরাও পড়াশুনো শেষ করে চাকরি করতে বাইরে গেল। বাড়িতে তখন মাধবী আর ওর কর্তা।

কর্তা অফিসে বেরিয়ে গেলে বাড়ি ঘর, বাগানের দেখভাল করে আর বাকি সময়টা টিভি দেখে দিব্যি কেটে যেত। সময় মতো ছেলেদের বিয়ে দিয়েছে। তারা সংসার, চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে সেভাবে আসতে পারে না। ফোনে কথা হয়। ছুটির দিনে ভিডিও কল। বেশ চলছিল। কিন্তু দু বছর আগে হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যেই মানুষটা চলে যায়। আর এরপর থেকেই একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে মাধবীর জীবন।

বাবার মৃত্যুর মাস তিনেক পর তিন ছেলে একসঙ্গে বাড়িতে আসে। এত বড় বাড়িতে মায়ের একা থাকা নিয়ে তারা তিন জনেই বেশ চিন্তিত। সেজন্য তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঠিক করেছে বাড়িটিকে বিক্রি করা হবে। তারপর বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় একটি দু' কামরার বাড়ি বানানো হবে। তিন ভাই সব ঠিক করেই এসেছিল- বাড়ির খদ্দের থেকে জমির দলিল অব্দি। মাধবী কিছু বলেনি। সই করে দিয়েছিল। তিন মাস লেগেছিল নতুন বাড়ি তৈরী হতে। আর তারপরেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে উঠে আসে মাধবী।

অত বড় বাড়ি ছেড়ে এসে প্রথম প্রথম দম বন্ধ হয়ে আসতো। খোলা মেলা একটা পরিবেশ থেকে আচমকা দুটো ঘরে বন্দী জীবন। কষ্ট হত খুব। অভিমানে বুক টনটন করতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সয়ে আসে।

দু' বছরে কত কিছু বদলে গেল। নতুন বাড়ি, নতুন জীবন। এতে অভ্যস্ত হতে না হতেই শুরু হলো তাদের বিক্রি হওয়া বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ। বাড়ি ভাঙার শব্দে বুক ভেঙে যেত মাধবীর। দরজা, জানালা বন্ধ করে, টিভির আওয়াজ বাড়িয়েও কোন লাভ হত না। তার অমন সুন্দর বাড়ির জায়গায় এখন সাত তলা ফ্ল্যাট উঠছে।

এক পাশে সাত তলা ফ্ল্যাট, অন্য পাশে তিন তলা বাড়ি। মাঝে মাধবীর দু' কামরার বাড়ি। সারাদিন রোদের দেখা পাওয়া যায় না। শেষ বিকেলে সামনের বারান্দার কোন বরাবর এক চিলতে রোদ দয়া করে স্পর্শ করে যায়। হলদে রঙের মরা রোদ। সে রোদের রঙটুকুই সার। তাত নেই। মজা করে মাধবী ওর বাড়িটিকে বলে অসূর্যস্পর্শা। ভেজা ভেজা দেয়াল, বরফ ঠান্ডা মেঝে, ওম হারানো লেপ, তোষক নিয়ে মাধবীর নতুন সংসার।

সারাদিন বিছানায়। সন্ধ্যাটাও দিতে পারেনি। মনটা খচখচ করছে মাধবীর। এক কাপ গরম চা পেলে হয়ত শরীরটা একটু গরম হত। কান্না পায় মাধবীর। বাড়িটার কথা মনে পড়ে। চোখ বন্ধ করেও স্পষ্ট দেখতে পায় রোদে ভেসে যাওয়া সেই বাড়ির ছাদ, উঠোন। ঠিক সেই সময় বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। না দেখেও বুঝতে পারে তিন ছেলের কেউ একজন করেছে। লেপের বাইরে হাত বের করে ঠান্ডা ফোনটাকে ছুঁতে একটুও ইচ্ছে হলো না মাধবীর।

No comments:

Post a Comment