রাজমহল
বেলা দে
মেয়ের চাকুরীসূত্রে মালদা জেলার সামসী শহরে থেকেছি সাত বছর, প্রতিবেশীরা এতটাই মানবিক যে কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের আপনজন হয়ে উঠেছে, বুঝতেই পারিনি ছোট্ট এক শিশুকে নিয়ে আমি ও মেয়ে বাড়িঘর ছেড়ে ৩০০ কি মি দূরে আছি,বিপদে আপদে সবসময় কাছে পেয়েছি। মেয়েকে সে পাড়ায় "নবোদয় সংঘ" নামে এক সাংস্কৃতিক সংস্থার সদস্য হিসেবে নিয়েছে, ওদের ব্যবস্থাপনায় নাটক নাচ সবেতেই অংশগ্রহন করে ছেলে মেয়ে। ওরা যখন মনস্থ করলেন একদিনের ট্যুরে বেরোবে প্রতিবেশিরা মিলে, বেড়াতে কার না ভালো লাগে, রাজি হয়ে গেলাম। বেরিয়ে পড়লাম ১০ই মার্চ। রবিবার উইক এন্ড সবাই যেতে পারবে, টান টান উত্তেজনা নিয়ে রওনা হলাম সর্বমোট ২০ জন। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি উঠে পরলাম, যাব বিভাজিত বিহারের ঝাড়খন্ডের রাজমহল, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ছুটে চলেছে গাড়ি খুব ভোরে, আমাদের গাড়ির সাথে সাথে ছুটছে মুকুলায়িত আম্রকানন। জোরকদমে ঘড়ি আটটা ছুঁই ছুঁই যখন পৌঁছে গেল রতুয়া এরপরই খয়েরতলা, দেখতে দেখতে এসে গেল মানিকচক গঙ্গার ঘাট, ওপারে যাবার লঞ্চ তখনও ঘাটে ভেড়েনি। গঙ্গার পরপারে ঐতিহাসিক নগরী রাজমহল, লঞ্চ ছাড়ার নির্দেশিত সময় ১১ টা.
ঘাটপারের এক রেস্তোরাঁয় বসে চা জলখাবার খেয়ে একটু অপেক্ষা করতে না করতে এসে গেছে এসে গেছে বলে রৈ রৈ কান্ড জনতার, সব এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। ওপরে ওঠার খাড়া লোহার লম্বা সিড়ি, উঠতে গিয়ে প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত, পায়েও প্রচন্ডরকম ব্যাথা। আরেকজন প্রবীণ মহিলার একই অবস্থা, কর্তৃপক্ষ আমাদের দুজনকে নিচের তলায় কোনও মতে জায়গা করে দিয়েছে, বাকিরা সবাই ওপরতলায়। আসলে বহু স্থানীয় লোকেরা ওপারে যায় কর্মসংস্থানে। সর্বনিম্নে লোহার পাটাতনে অজস্র বোল্ডার বোঝাই লরী, যাত্রী বোঝাই ছোট গাড়ি, সেইসাথে আমাদের গাড়িটা।
ভাবছিলাম কিভাবে এত ভার বহন করে লঞ্চ। যদিও আমাদের লঞ্চখানা বিশালাকায়, সে বয়ে নিয়ে চলেছে লোহার মোটা শেকলে বেঁধে আরও দুটি ছোট ছোট যাত্রীবাহী লঞ্চ। এদিকে গঙ্গা তখন উত্তাল ঢেউয়ের সাথে হেলেদুলে ঢেউ কেটে কেটে এগিয়ে চলেছে। যেতে যেতে এক সহযাত্রীর মুখে শুনলাম জাহাজমালিক বাচ্চু সিং। সে নাকি অগাধ সম্পত্তির মালিক, এমন ১০ খানা লঞ্চ ও জাহাজ আছে, বর্তমানে সে প্রবাসী। তার বাড়িটা দেখে নিলাম বিরাট বড় ঠাকুর দালান, অতিথি শালা, রন্ধনশালা পাথরের তৈরি নানা বিগ্রহ। সর্বংসহা গঙ্গা যেন বুকে করে দোল দিতে দিতে আমাদের বয়ে চলেছে মায়ের মতন করে। এ এক অন্য অনুভূতি, অনন্ত ভাললাগা। এই আনন্দে ভেসে ভেসে কাটিয়ে দিতে পারি কয়েক যুগ।এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট মায়ের নরম বুকে ভাসার পর অবশেষে পা রাখলাম রাজমহলের মাটিতে। ওপারে এক হোটেলে নানা ব্যঞ্জনে দিবাহার সেরে সে গাড়িতেই রওনা হলাম, যেতে যেতেই দেখে নিলাম বৃটিশদের লালরঙা বহু উপনিবেশ, লাল পোস্ট অফিস,স্টেশন, থানা। স্টেশনের পাশেই চিনে মাটির কাপ প্লেট বাদন তৈরির কারখানা, ওদের শাসন কালে সব সামগ্রী কাঁচিয়ে নিয়ে যেত নিজেদের দেশে এমনটাই শোনা গেল স্থানীয় এক জনের কাছে, অথচ এদেশের শ্রমিকরা ঘাম রক্ত জল করে শ্রম দিয়েছে। নিজেদের কোনো পাওয়া ছিল না।সারাক্ষণ গাড়িতে বসে একঘেয়েমি ব্যাপারটা চলে এসেছে, গোধূলি সম্মুখ সমরে। গাড়ি এবার দৌড়ে চলে হিন্দু ধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান বারহারওয়া "বিন্দুবাসিনী মন্দির,"যেখানে সতীমায়ের বিন্দু বিন্দু রক্ত পতিত হয়েছে, একান্ন পিঠের এক পিঠ। বার হারোয়া ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। গঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান,এখানে ভাগীরথী নাম নিয়েছে।
ইতিপূর্বে আমার স্বামীর চাকুরী সূত্রে তিন বছর মালদায় ছিলাম ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সেসময় একবার এই মন্দিরে এসেছিলাম, বর্তমানে অনেক পরিবর্তিত। পাশেই দেখে নিলাম ইস্কন মন্দির-এর পিছনেই গঙ্গায় নামার ১৫০ খানা সিঁড়ি রয়েছে। আমরা পারবো না ভেবে আর যাইনি। মন্দির লাগোয়া পার্কে খানিকটা সময় বসলাম। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা গঙ্গায় বুকে, ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে উত্তর বাহিনী গঙ্গা। রাজমহল একসময় সুবা বাংলার রাজধানী ছিল। এদিকে পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। সবাই একবাক্যে স্বীকার, পেটে কিছু দেওয়ার। সুতরাং খাই খাই করে ফারাক্কা ছেড়ে মালদার এক স্বনামধন্য হোটেলে ডিনার সেরে ওয়ান ডে ট্যুরের ইতি।
No comments:
Post a Comment