ভ্রমণ
চরৈবেতি (পর্ব উটি)
রণিতা দত্ত
উত্তরবঙ্গে থাকি। এমন অভ্যেস নষ্ট করে রেখেছি যে, একটু গরমে হাঁসফাঁস। ঝটপট চলে যাওয়া দার্জিলিং বা কালিংপং বা তৎসংলগ্ন পাহাড়ে। তরতর করে উঠেপড়া স্বস্তি পেতে। একটা উইকএন্ড। ঠান্ডা হওয়া খানিক। আবার এসে কাজে ঝাঁপ। অদম্য এক ইচ্ছে,ভারতের দক্ষিণের পাহাড় দেখার। ইচ্ছেটা মনে মনে পুষে রাখি। বায়না করি পশ্চিমের ঘাটমালা নীলগিরি, আন্নামালাই ঘোরার । আমার সঙ্গীটি বোঝেন না। বলেন, " পাহাড় তো পাহাড়ই! ওর আবার উত্তর দক্ষিণ কি আছে..!"
আসলে নিজের বিষয় বলে জানি, প্রাচীনতম শিলার কি আদি অকৃত্রিম গঠন,নিরক্ষীয় উষ্ণমন্ডলের স্বাভাবিক উদ্ভিদের ঘন সবুজ বিস্তার, ভিন্ন ধরণের ফল ফলাদির ফলন, মানুষের জীবনযাপনের রস রূপ রঙ সবেতেই কি ভীষণ বণ্য সুগন্ধি। বিচিত্র বৈচিত্র যে আনাচে কানাচে রয়েছে। ওখানে না গেলে ভারি লোকসান হয়ে থাকতো। সত্যি বলতে কি ঘোরা বেড়ানোটা একটা নেশা। ইস্কুলে হলিডে লিস্ট পেয়ে পোগ্রাম করে রেখেছিলাম। হঠাৎ করে দাবদাহ কোথাও একটা বাড়লো। আমার শহরে তখনও হালকা কিছু গায়ে দিতে হয় ভোরের আয়েসী ঘুমে। শিক্ষাবর্ষে নির্দিষ্ট নির্ঘন্টকে নস্যাৎ করে গ্রীষ্মবকাশ ঘোষিত হল। অতয়েব টিকিট কেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়া হলো।
ভোর ভোর বাড়ি ছাড়লাম। বাগডোগরা থেকে। ৭:৪৫ মি এ ফ্লাইট। পৌঁছে গেলাম বেলা ১১:২৫ এ। কেম্পেগৌড়া আন্তৰ্জাতিক বিমানবন্দরে।গাড়ি ঠিক করা ছিল। প্রযুক্তিনগরীকে অতিক্রম করে ছুটে চলল আমাদের "মেক মাই ট্রিপ "সংস্থা থেকে বুক করা চারচাকাটি | মাইসর এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে চললাম। পথে ইডলি মেদুবড়া খেয়ে জঠরের যজ্ঞাহুতি হলো।আমাদের ক্যাব ড্রাইভার মুরলী এগেলেপ্পা। দক্ষ গাইড, অনর্গল কথা বলতে আলাদা চার্জ করে না।তাই এট্টুও যান্ত্রিক লাগছে না যাত্রা। যেতে হবে কম করে সাত ঘন্টা মত। কিছুটা এগিয়েছি ও আমাদের দেখতে বলল জানলার বাইরে। দেখি পাথুরে ঢালে বড় বড় প্রস্তরচাই ব্যালেন্স করে দাঁড়িয়ে। এগেলেপ্পা বলল, "সাব এয়ে শোলে সিনেমার গব্বরের ডেরা হ্যায় 'রামগড়'হ্যায়।" ভারি ভাল্লাগলো। রোমাঞ্চিত। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ভারি গলায় গব্বর সিং বলবে,, "আরে ও.. হঃ শ্যামহা কিতনে আদমি থে...." বলেও ফেললাম সেই ডায়লগ।
একটু এগিয়ে ডানদিকে গেলে সিল্ক সিটি রামাশা। এরপর গাড়ি ঢুকলো বান্দিপুর রিজার্ভ ফরেস্টে। ঢেউ খেলানো টোপগ্রাফির ওপর দিয়ে গাড়িটা ক্রমশ উঠছে, গাছপালার প্রকৃতি বদলে গেছে। কর্নাটকের এই অভয়ারণ্যে বাধ্য ছেলের দলের মত সম্ভর আর চিতল হরিণ দলবেঁধে আমাদের অভ্যার্থনায়। ওদের করুনদিঘল মায়াবী চাউনিতে অদ্ভুত ভালো লাগা। নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ হাতি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি অবলোকন করে যাচ্ছে।খানিকটা দূরে পাঁচ সাতটি হাতি দলধরে খাওয়ারের খোঁজে। ঝোপে গাছের নাতিউচ্চ ডালে ময়ূর লেজ নামিয়ে বসে। শুনলুম প্রায় দুশোটির মত বাঘ রয়েছে এই জঙ্গলে। ঘন হচ্ছে বনজঙ্গল, সরু হয়ে আসছে রাস্তাঘাট। দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে । আলোছায়ায় মাখামাখি বনানী। ততক্ষনে আমরা বান্দিপুর ছেড়ে তামিলনাড়ুর মধুমালাই জঙ্গলে প্রবেশ করে ফেলেছি। দিনের আলোটুকু নিভে গেছে। ছায়া ঘেরা বিক্ষিপ্ত পশ্চিমঘাটের বিচ্ছিন্ন অংশ একদিকে আর সামনে প্রাগৈতিহাসিক কোন প্রাণীর মতো আধশোয়া অলস নীলগিরি। তারই পিঠবেয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে উঠেছে সরীসৃপের মতো পাকদণ্ডী পথ। এক্কেবারে প্রান্তে কিছু লোকালয়। গ্রাম বুরলিয়রে।এখানে একটু বিরতি।এতক্ষন জঙ্গলে গাড়ি দাঁড়ানোর অনুমতি ছিলনা। তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলার ছোট্ট গ্রাম এটা। সেখান থেকেই শুরু আরও চড়াই শুরু । এরপর ৩৬টি হেয়ার পিন টার্নিং। প্রশ্নাতিত ভাবে চ্যালেঞ্জি।এট্টু পরপর টার্ন, গাড়ি সোজা হওয়ার আগে আবার টার্ন। বাঁক তো নয়,যেন নীলগিরির আদি বাসিন্দা টোডা রমণীর চুলের বিনুনি। এসে পৌঁছানো গেল স্টার্লিং রিসোর্ট। থাকবার জায়গার গাল ভরা নামে আত্মম্ভোরিতার গন্ধ পাবেননা মোটে। গ্যাটের পয়সা দিয়ে থাকিনা সেথায়। আসলে মেয়ে চাকরি পাওয়ার পর এই হসপিটালিটি চেইনের মেম্বারশিপ গিফট করায় বছরে মোটে সাতটা দিন থাকতে দেওয়ার বদন্যতা দেখান এরা। গরম খাওয়ার আর নরম বিছানা, ভোর থেকে লাগাতার ১৪-১৫ঘন্টা জার্নি। তলিয়ে যেতে যেতে কি ভীষণ উত্তেজনা অনুভব করলাম।মন ক্যানভাসে এঁকে নিয়ে ফিরতে হবে হবে পার্বত্য রাজকন্যের রূপের ডালি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন ঝকঝকে রোদ। কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ের মাথায় যেন স্ফটিক মুকুট। পাহাড়ের মাথায় মেঘ লেগে আছে 'তাতা' ফুলের সাদা পাপড়ির মতো। ‘তাতা’ শব্দের অর্থ দাদুর মাথা! শুকিয়ে গেলে গোল তাতা ফুলের পাপড়ি সাদা হয়ে যায়। তাই অমন নামকরণ। চোখ বুঁজে একবুক বাতাস দিয়ে উড়িয়ে দিতে হয় পবিত্র এই ফুলের মিহি পাপড়ি। মনে মনে প্রার্থনা করতে হয় কিছু একটা।
ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ের গায়ে ভেড়ার লোমের মতো ঘন চা বাগান। চা পাতায় নরম রোদ পড়ে চকচক করছে ব্রেজিলিয়ান পান্নার মতো!প্রথম গন্তব্য সিক্সথ মাইল। প্রায় ৩০ মিনিটের পথ। চারিদিকে সবুজ পাহাড় আর নরম ঘাসের গালিচা বেছানো উপত্যকা। বেশ কিছু সময় প্রকৃতির কোলে সময় কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম 'নাইনথ মাইল' । প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি এই দুইটি স্থান শুটিং স্পট।
এবারে পৌঁছে যাওয়া গেল পয়করা লেক। এক্কেবারে ছবির মত দৃশ্যপট। মনোমুগ্ধকর ।দেখলাম এখানে বোটিং এবং হর্স রাইডিং এর ব্যবস্থা আছে । বয়স বাড়ার সাথে সাথে ওসব হুজ্জুতি মনে হয়। তাই লেককে বা'হাতে রেখে পায়ে পায়ে পঞ্চাশ মিটার মত হেঁটে পৌছালাম পয়করা জলপ্রপাতের সামনে। অদ্ভুত সুন্দর এক চঞ্চল কিশোরীর মত প্রপাতখানা। সুতীব্র জলপ্রপাতের প্রবাহমানতা মনকে জাস্ট ছুঁয়ে গেল। জলধারার সৌন্দর্য্যে বুঁদ হয়ে থাকলাম কিছুক্ষন। তারপর পৌঁছে গেলাম চকলেট ফ্যাক্টরিতে। ঘুরে ফিরে চকলেট ফ্যাক্টরি দেখে সেখান থেকে ভাঙা চোরা ইংরেজিতে হোমমেড চকলেট তৈরীর রেসিপি জেনে নিলাম। এখানকার চকলেটের স্বাদ বাজার চলতি চকলেটগুলির থেকে এক্কেবারে আলাদা । যেহেতু আমি চকলেটপ্রেমী মানুষ। এখান থেকে চকলেট কিনতে তাই ভুললাম না । এবারে খোঁজে ছিল এক 'নো ম্যানস ল্যান্ড' যেখানে পিন পতনের নিঃশব্দতা, একটিও টুরিস্ট সচরাচর নজরে পড়েনা এমন জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার। পায়করা রিজিয়ানে ই আছে এমন কিছু টোডা জনজাতির গ্রাম।প্রাচীন পদ্ধতিতে সেখানে চাষাবাদ হয়। প্রত্যন্ত কৃষি আর পশুপালন আদিবাসীদের জীবিকার ভিত্তি। খ্রিস্ট পূর্বাব্দের টোডে গ্রামে ঘুরে ফিরলাম।
আজ দ্বিতীয় দিন। সক্কাল সক্কাল উঠে পড়েছি। অনেকটা সময় নিয়ে যেখানে আছি সেই প্রপার্টিটা টহল মারলাম। একটু আউটকার্স হলে নিরিবিলিতে থাকা যায়। এই প্রপার্টিটা নিজেই খুব সুন্দর যে মনেহলো একটু হেঁটে ঘুরে নেওয়া যেতেই পারে। ঘাস জমিতে গাছের গায়ে ঝুলে থাকা আর্কিড মোহিত করে দিচ্ছিলো।ব্যালকনির নীচে ফুটেছে ‘জিমিকি পো’, গ্রামোফোনের মতো দেখতে ‘রেডিও পো’ অর্কিড। এতো স্নিগ্ধ সকাল। ভাল্লাগছিল খুব। বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। রাস্তার নাম 'রামকৃষ্ণ মার্গ'। দেখি দু পা এগিয়েই এক খন্ড প্রশান্তির আশ্রয়। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ। আড়ম্বর নেই,ছোট্ট অথচ সমাহিত। মনটা টইটুম্বুর হয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম উটির বিখ্যাত দোদাবেত্তা পিক দেখতে। বেস লেভ্যেল থেকে ৮৬৫২ ফিট উচ্চতায় রয়েছে দোদাবেত্তা,নীলগিরি পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । এখানকার টেলিস্কোপ হাউস থেকে দূরের শৃঙ্গকে দেখে মনে হল যেন গিয়ে ছুঁয়ে দিয়ে চলে আসি।! এই স্থানটি থেকে সম্পূর্ণ উটির একটা সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করা গেল ।দোদাবেত্তা থেকে গাড়ি চেপে ১০ মিনিট দূরত্ব অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম টি ফ্যাক্টরি ভিউ পয়েন্ট । এক কথায় বলতে গেলে এটি চা এর মিউজিয়াম । চা বাগানের বিপণি থেকে চা খেয়ে এগিয়ে চললাম বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিকে । এই বাগানটি সজ্জিত রং বেরঙের ফুল আর গাছের সমারোহে। এই বাগান দেখার পর মিনিট দশেক দূরত্বে পৌঁছে গেলাম রোজ গার্ডেনে। শোনাগেল এই গোলাপের বাগানে মোট ৪০০০ প্রজাতির গোলাপ গাছ রয়েছে। আমার সিজিন টাইমে এসেছি। নিরাশ করেনি সুন্দরী গোলাপের বাগিচা। যাত্রাপথে চলতি এক রেস্তরাঁতে লাঞ্চটা সেরে ফেললাম ।
'হেরিটেজ টয় ট্রেন'এ ওঠার বায়না করলাম না। দার্জিলিং এর জন্য ওঠা তোলা থাকুক। ট্রেনের ঝিকঝিক এর সাথে ' কস্ত মে লাহি লে লেই মা..'গানটা তো এখানে মিস করতে হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে প্রায় আধ ঘন্টার পথ অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম উটি লেকের ধারে। ওখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে ফেললাম। এতো মানুষজন দেখেই সময় কেটে যায়। সুভিনিরশপ ঘুরতে কি কম সময় লাগে! এবারে হোটেল ফেরার পালা । শহুরে যানজট বড্ডো বিব্রত করে। উটি দার্জিলিং এগুলো বড্ডো জণাকীর্ণ। একটু আউট কার্স লোকেশন থাকবার জন্য ভালো। ফিরে তল্পিতল্পা গুটিয়ে রাখলাম। পরদিন একটু আর্লি ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা হবো কোদাইকানালের উদ্দেশ্যে। ভোর ভোর চড়ে বসলাম। তখন জেগে ওঠে নি শৈলশহর উটি। শুধু কানঘেঁষে ফিসফিস বাতাসের শুনশান বয়ে যাওয়া। শিরশিরে বাতাস। বয়ে যাওয়া শূন্যতা ধুয়ে দেয় ফেলে আসা কংক্রিট শহর আর তার মলিন ধুলো। ইতিউতি নীল নীল পাহাড়ের সার। আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া পাইনের বন। পাইন বনে খোঁজাই যেতে পারে ১২ বছর পর ফুটে ওঠা ফুল নীলাকুরঞ্জি।কি মোহময় মায়া সে একযুগ পর পর ফোঁটা নীলাব্জ ফুলে। কোন দিন দেখা মিললে দেখাবো প্রমিস রইলো।





No comments:
Post a Comment