সুনীল সাগরে, শ্যামল কিনারে
অনিতা নাগ
সুনীল সাগরকে সামনে থেকে দেখা খুব ছোটবেলায়। বয়স তখন চার। ভুবনেশ্বর ঘুরে পুরী যাওয়া। স্মৃতি বলতে অনন্তধ নীল জল। ঢেউ এর ভাঙা আর গড়া। বালি আর বালি। বালিতে বসে ঘর বানানো আর ঢেউয়ে ঘর ভেঙে যাওয়া। ডেকচিওলা। সিঙারার গন্ধ। নুলিয়া। তারা হাতে একটা বড় কালো টায়ার নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। মা বলতেন, এরা জলের পোকা। জলেই জীবন। সারাদিন এই জল নিয়েই বেঁচে থাকে। দাদারা নুলিয়ার সাথে ভাসতে ভাসতে সমুদ্রের কতো দূরে চলে যেতো। আমার ভয় করতো। বাবা হাত ধরে আমাকে স্নান করিয়ে দিতেন। সারা গায়ে বালি। মুখের ভেতর নোনা স্বাদ। এতো সুন্দর দেখতে জল এতো নোনা কেনো! খুব রাগ হতো। তবু ওই ঢেউয়ের ভাঙা গড়া কেমন ভালো লেগে গিয়েছিলো।
এরপর যাওয়া অনেকটা বড় হয়ে। তখন সমুদ্রকে ভালোবেসে ফেলেছি। নিমেষহারা তাকিয়ে থাকা নীল জলরাশির দিকে। ঢেউয়ের সঙ্গে মন ভাসিয়ে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে চলা। ততোদিনে রবিঠাকুরের সাথে নিবিড় সখ্যতা। সুখে, দুখে, আনন্দে তিনিই আশ্রয়। ডিঙি নৌকার মতো ঢেউয়ের সাথে ভেসে চলা, ‘দূরে কোথায়, দূরে দূরে’। তখন মন বড় অশান্ত। জীবনে নানান টানাপোড়েন চলছে। সব কেমন ফ্যাকাসে, রঙহীন। কিচ্ছু ভালো লাগে না। তবু বয়ে চলতে হয়। সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ালে এক ম্যাজিকে সব আলো আলো হয়ে যেতো। এই যে অনন্ত জলরাশি বয়ে চলে আপন ছন্দে, কে দেখলো, কে আনন্দ করলো, তাতে তার বয়েই গেলো। তার মন খারাপের সময় কোথায়! একদন্ড বিরামের সময় নেই। চরৈবতি। জীবন ও তো তেমন। তোমার জন্য সময় অপেক্ষা করবে না। সমুদ্র মানে জীবন, জীবিকা, পর্যটন। দেশের সুরক্ষা। আরো কতোকিছু। সমুদ্র সৈকতে কতো রূপ, রস, গন্ধ। কেনাবেচা, হৈহৈ। যাকে নিয়ে এতো আয়োজন সে কিন্তু বিরামহীন বয়ে চলেছে। যে’কদিন সমুদ্র শহরে ছিলাম নতুন করে সখ্যতা হলো এই সুনীল জলরাশির সাথে। সে শেখালো মন খারাপ আগলে বসে থাকলে মন ভালো হয় না। দুঃখকে ভাসিয়ে দাও। মনে মনে নত হলাম সেই সুনীল জলরাশির সামনে। রোজ সকালে সূর্যোদয়ের আলো মেখে হেসে খলখল, গেয়ে কলকল। সকাল থেকেই উৎসব শুরু হতো তাকে ঘিরে। জেলেরা নৌকা বোঝাই করা মাছ নিয়ে বালির চড়ায় এসে দাঁড়াতো। চকচকে রূপোলী মাছ। নিমেষে বিক্রি হয়ে যেতো। খুশীর হাওয়া পালে লাগিয়ে আবার সে নৌকা ভেসে পড়তো সাগরে।
তৃতীয় দর্শনে এই সখ্যতা আরো গভীর হলো বিয়ের কয়েক বছর পর প্রিয় মানুষটির হাত ধরে যখন এসে দাঁড়ালাম এই অনন্ত জলরাশির সামনে তখন অনেকটা পরিণত । মন তখন পূর্ণ। সেই কৃতজ্ঞতা নিয়ে যখন তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম মুহুর্তে এক ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো পায়ের পাতা। শিহরিত আমি। এমনও হয়! হয়, হয়। সে সব বোঝে। মনের কথা খানি পড়ে নেয় অনায়াসে। যে'কদিন ছিলাম শুধু আনন্দ আর আনন্দ। তারপর কতোবার গেলাম। মা বাবা আর মেয়েকে নিয়ে আনন্দ যাত্রায়। তখন তার কাছ থেকে আনন্দ নিয়ে এসেছি দু’ হাত ভরে। ছেলেকে নিয়েও গেছি। সাথে মা বাবা। মা বাবা’ কে নিয়ে শেষ বেড়ানো সমুদ্র শহরে। সেই আনন্দ রাখা আছে স্বযত্নে আপন মনের অলিন্দে। বারবার গেছি তার কাছে। শূন্য ঝুলি পূর্ণ করে দিয়েছে আপন মাধুরী দিয়ে।
জীবন বয়ে চলে আপন ছন্দে। সে'দিনের সেই ছোট্ট মেয়েটা তখন রীতিমতো ঘোর সংসারী। কর্তার কাজের সুবাদে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ঘুরে ক্লাম্ত। এক ঘর থেকে অন্য ঘর। চেনা মানুষ ছেড়ে অচেনা মানুষ। সংসার, ছেলে মেয়েকে বড় করতে করতে সমুদ্র প্রেম তখন মনের কোন গহীনে কপাট বন্ধ করেছে কে জানে! হঠাৎ সুযোগ হলো সমুদ্র শহরে যাওয়ার। যেখানে সে আগে কখনো যায় নি। শরৎচন্দ্রের বইতে পড়া ওয়ালটেয়ার, বর্তমান নাম ভাইজাক। সত্যি বলছো! এটাই ছিলো প্রতিক্রিয়া। সমুদ্র শহরে থাকবো! রোজ তাকে দেখতে পাবো! হ্যাঁ গো হ্যাঁ। রোজ কি, ইচ্ছে হলেই দেখতে পাবে। বারান্দায় বেরুলেই দেখতে পাবে।
শুধু সমুদ্র নয়। সেখানে আরেক প্রিয় পাহাড়ও আছে। শুরু হলো অপেক্ষা। ছেলের ১০ ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে এলাম সমুদ্র শহরে। এ’ তো অবিশ্বাস্য। কি অপূর্ব শহর। সমুদ্র আর পাহাড় প্রহরীর মতো আগলে রেখেছে শহরটাকে। আবার তাদের রূপ, রস, গন্ধ দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে শহরটাকে। আমার প্রিয় সখীকে সবসময় দেখতে পাওয়া! অবিশ্বাস্য! দীর্ঘ জীবনের সব অপূর্ণতা নিয়ে তার কাছে এলাম। এখানে সে রহস্যময়ী। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলে। বালুকা বেলা এখানে নেই। সাজানো শহর। রাস্তার পাশ ঘেঁষে বাঁধানো জায়গা। সিঁড়ি দিয়ে নামা যায় সমুদ্রের কাছে। তবে পাথর থাকায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আমার বাড়ী থেকে বড়জোর ১০০ মিটার। সে তখন জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গেছে। সক্কাল হলেই প্রাতঃভ্রমণে বেড়িয়ে পড়া। আঁধার সরিয়ে আলোর পরশে জেগে উঠ। তারপর সুনীল সাগরের অতল হতে সূর্যের আর্বিভাব। নীল সমুদ্রে তখন সোনালী আলোর লুটোপুটি। বীচ রোডে তখন শুধু প্রাতঃভ্রমণকারীদের চলাফেরা। সকাল সাড়ে সাতটার পর যানবাহন চলতো। সে’ এক অনির্বচনীয় মুহুর্ত। ঐ মুহুর্তটায় লুকিয়ে থাকতো কতো যে রহস্য। বৃষ্টির দিনে তাই মন খারাপ হতো। তবে তখন তো তার অন্য রূপ। তখন সে উত্তাল। ভয় হতো। অমাবস্যা, পূর্ণিমায় তার রূপ যেতো বদলে। চাঁদের আলোয় সে চির যৌবনা সুন্দরী, চপলা এক নারী যেনো। তেমনি অমবস্যার নিকষ কালো আঁধারে সে রুদ্ররূপে নৃত্য করতো।
বেশ চলছিলো। হঠাৎ এক অসুস্থতায় হারিয়ে গেলো জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। অনেক ডাক্তার, অনেক ওষুধ। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। শরীরে জোর নেই। মনে শক্তি নেই। কি হবে আমার সংসারের! মেয়ে তখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছেলে এগারো ক্লাস। আমার জন্য এদের স্বপ্নগুলো যেনো অধরা না থাকে। ঘুরে আমাকে দাঁড়াতেই হবে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দূরে ঐ অনন্ত জলরাশি বয়ে চলেছে আপন ছন্দে। তার বয়ে চলাতেই আনন্দ। বাকী সব কিছু থেকে উদাসীন। কর্তাকে বললাম আমাকে তার কাছে নিয়ে চলো। ব্যাস্ত শহরে হাজার কোলাহল। ও'পারে সারি দেওয়া জাহাজে আলো ঝিকমিক করছে। আমি বসলাম গিয়ে তার কাছে। শক্তি দাও। আলো দাও। তুমি তো হারতে শেখাও নি। পারের কাছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়ছে ঢেউ। আবার নতুন তরঙ্গ তৈরী হচ্ছে। অনেকক্ষণ বসে রইলাম। নিজের ভেতরে ডুব দিলাম। নিজেকে ফিরে পাওয়ার যাত্রা শুরু হলো। এ’ একান্তে আমার লড়াই। ফিরলাম এক সময়ে। এক নতুন যাত্রা শুরু হলো। কিন্তু তার কাছে বারবার ছুটে যাওয়ার এই আকূতি বাড়তে লাগলো। কর্তা আর ছেলে বেড়িয়ে গেলে ধীরে ধীরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম। সূর্য তখন মাঝ গগনে। সেই উজ্জ্বল আলোয় সমুদ্রের জলে মণিমুক্তোর জলকেলি। দূরে দূরে বাণিজ্য জাহাজ চলেছে আপন ছন্দে। ঢেউয়ের মাথায় দোল খেতে খেতে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে জেলে নৌকা। কখনো ছাদে গিয়ে দাঁড়াতাম। একটু একটু করে জোর ফিরে পাচ্ছিলাম। আপন ছন্দে বয়ে চলতে চলতে এমন কতো জনকে সে জীবন শক্তি ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিস কে রাখে। মাঝে মাঝে সমুদ্রের সামনে গিয়ে বসতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতো। ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠতো। আলোর রোশনাইতে ঝলমলিয়ে উঠতো সমুদ্র শহর। আমি ফিরতাম আপন কুলায়। ততোদিনে তার সাথে সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। সে আমার আরো নিবিড় হয়েছে। জীবনযুদ্ধে সে আমার জীবনদাত্রী। এ’ কথা কখনো বলা হয়নি কাউকে। কিন্তু যতোবার কোনো সমুদ্রতটে গেছি মনে মনে তার কাছে নত হয়েছি। চারদিকের আনন্দ, হৈচৈ এর মধ্যে জীবন তাকে অন্য ভাবে চিনতে শিখিয়েছে। সে তখন আমার দৈনন্দিন জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে।
কিন্তু এই সুন্দর রূপের যে ভয়াল, মারণ রূপ দেখলাম ২০১৪ তে হুদহুদ সাইক্লোনে তা মনে থাকবে আজীবন। এমন ভয়াল রূপ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। তিথি অনুযায়ী সমুদ্র উত্তাল হয়। কিন্তু এমন ভাবে একটা সাজানো শহরকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে ভাবতেই পারিনি। মেয়ে বিদেশে, ছেলে প্রবাসে। একটা সময় এমন হলো আমার দাদা আর বন্ধুকে বললাম আমাদের খবর না পেলে ছেলেমেয়েকে দেখিস। প্রচন্ড গর্জনে সে ভেঙে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব। শুধু ঈশ্বরকে স্মরণ। রক্ষা করো, রক্ষা করো। দু'দিন পর যখন সে প্রলয় থামলো তখন শহরটা ধ্বংস হয়ে গেছে। যে সমুদ্র আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলো, তার এই রুদ্র, ভয়াল রূপ কল্পনাতীত। কেটে গেছে অনেক বছর। সমুদ্র শহর ভাইজাক আবার নতুন করে সেজে উঠেছে। আমরাও সে শহর ছেড়ে চলে এচেছি। সে’ আসা যন্ত্রণার। মনে হয়েছিলো আমাকে আমার জীবন থেকে উপড়ে নিয়ে এলো। তবু সেটাই সত্যি। আস্তে আস্তে সব সয়ে যায়। আজও যখনই সমুদ্রের সামনে দাঁড়াই তখনই এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভাসিয়ে দিই। আর বলি যতোদিন এ’ জীবন, ততোদিন তুমি আমার সাথেই আছো। চোখের আড়ালে, তবে মনের আড়ালে নয়। সম্প্রতি গিয়েছিলাম ভারতবর্ষের দক্ষিণতম প্রান্তে। সেখানে তিন সাগর এসে মিলেছে। ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর আর আরব সাগর। তিন ধারাকে তাদের রঙের পার্থক্যে আলাদা করা যায় বটে, কিন্তু তিন ধারার বিভেদহীন বয়েচলায় সেই ছন্দ জীবনকে উত্তোরণের পথ দেখায়। সমাজের চারদিকে যখন নানান বিভেদের বেড়াজাল, সহনশীলতা শূণ্যে গিয়ে ঠেকেছে, আলোর থেকে অন্ধকার যখন সমাজ ব্যবস্থাকে গ্রাস করছে তখন অনন্ত, বিপুল জলরাশি আপন চলার ছন্দে জীবনের চরম পাঠ শিখিয়ে চলেছে। মনে পড়লো প্রাণের ঠাকুরের কথা ‘দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে’। তোমাকে নিয়ে জীবনের এই পথচলা আমার চলবে। চড়াই- উতরাই, আলো-আঁধার কাটিয়ে এগিয়ে চলবো। চরৈবতি চরৈবতি।

No comments:
Post a Comment