Sunday, February 1, 2026


 

ভৌতিক গল্প 


অলৌকিক 

শুভেন্দু নন্দী 


ক্লান্তিতে অবসন্ন দেহ ও মন। প্রচন্ড ক্ষুধায় কাতর ঐ পরিশ্রান্ত পথিক। সন্ধ্যা নেমেছে। চারিদিক ঘোর কালো ও ঘুপসী আঁধার। অমাবস্যার রাত। কে যেন এদিকেই আসছে ক্ষিপ্র গতিতে। চোখ দুটোও জ্বলছে অন্ধকারে।  যেন শিয়ালের ধূর্ত চোখ এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছে। কিছুদূরে একটা জীর্ন,দীর্ন চালাঘর। ঘরের দেওয়াল মাটির। চারিদিক খোলা। ঐ আগন্তুক দাওয়ায় উঠে দরজায় মৃদু টোকা দিতে থাকে। প্রথমটা কোনও সাড়াশব্দ মেলেনা।
- কেউ কী আছেন? পথিক ক্ষীণ স্বরে বলতে থাকে।
কিন্ত কোনও উত্তর মেলেনা।
তারপর হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হোলো আর দরজাও খুলে গেলো।
- কে তুমি? একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ। 
- এই ঘরে তুমি থাকো? একটু জল খাওয়াতে পারো?
' জল? ঐ যে পুকুর দেখছো- ওখানে যাও- এই নাও
ঘটি।
- ওতো কচুরপানায় ভর্তি-  এঁদো পুকুর!....
- দাঁড়াও । আমি আসছি -
পথিক দেখলো সামনে নারী মূর্তি, সারা দেহ সাদা
কাপড়ে ঢাকা।
-তুমি কে? অন্ধকারে তো মুখ দেখা যাচ্ছেনা। ঘরে প্রদীপ জ্বালাও নি কেন?
- তেল নেই। আমি... কিছুক্ষণ থেমে বললো- অমি রমলা।
- কি হোলো? চিনতে পারলেনা আমাকে? এসো, আমার সঙ্গে।  ঘটিটা আমায় দাও।জল পান করার
পরে পরেই হঠাৎ বাতাসের হাওয়ায় আবরন উন্মোচিত ও 
নারীর রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ আর মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখে পথিকের মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে নামলো। আতঙ্কে মুর্ছা গেলো। অনেকক্ষণ নীচে পড়ে থাকলো। জ্ঞান হতে দেখলো জনা দুই মানুষ তাকে ঘিরে রয়েছে।
- আমি কোথায় ? পথিক ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো।
ঐ দুজন সমস্বরে বলে উঠলো-" তুমি শ্মশানে পড়েছিলে। আমরা দেহ সৎকার করতে এসেছিলাম এই শ্মশানঘাটে - কিন্তু তুমি আসলে কি করে এখানে?
- আমি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভাঙ্গা চালাঘরের কাছে এসেছিলাম। ওখানে ' রমলা' বলে একজন স্ত্রীলোকের দেখা পেয়েছিলাম। ও আমাকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
- পুকুর কোথায় ? ওটাতো একটা শীর্ণকায় নদী- শ্মশানঘাট! আরে! রমলাকে তো আমরাই দাহ করে ফিরছিলাম। আমরা এই দুজন ছাড়া সবাই চলে গ্যাছে। তোমাকে দেখেই তো দাঁড়িয়ে পড়লাম। তা, তুমি কী রমলাকে চিনতে? একজন প্রশ্ন করলো।
- বিলক্ষণ। কিন্তু তোমাদের কথামতো সে তো আর নেই! এ কি করে সম্ভব?  
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো ঐ আগন্তুক, 
- তাকে তো আমি অন্ধকারে ভয়ংকর অবস্থায় দেখেছি। ভাবতেই পারছিনা
- তুমি কী তাকে আগে থাকতেই চিনতে? তার সাথে কিভাবে তোমার পরিচয় হয়েছিলো ? এই নাও, জল খাও"
জল পান করে পথিক বলতে শুরু করলো।
- সে এক বিরাট কাহিনী। বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা রমলা। ওই গ্রামেই আমি থাকতাম। ওর বাবা দূরারোগ্য ব্যধিতে মারা যান। ওঁর জীবদ্দশায় আমিই তাঁর দেখাশোনা করতাম। সংসারের কাজ সামলাতো মা আর মেয়ে। ফলে রমলার সাথে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওর বাবা ইতিমধ্যে মারা যান। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ওর বাবা কাজ করতেন। বেশ কিছু টাকা কোম্পানী ওদের পরিবারকে সাহায্য করেছিলো, সবটাই আমার উদ্যোগে। যাই হোক, আজ রাজনগর স্টেশন থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করি। ট্রেনেই কখন যে আমার পিকপকেট হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। একেবারে কপর্দকশূণ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়। খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠি। কোন্ এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার বাড়ির কোনও ট্রেস পাচ্ছিলাম না। পাড়াগাঁ থেকে উঠে এসেছিলাম এই আধা-শহর রাজনগরে নতুন বাড়িতে । বাবার ব্যবসায়ে উন্নতির জন্যই তো এখানে আমাদের আগমন। যা বলছিলাম। অদ্ভূত ভাবে একটা চালাঘরের কাছে এসে পড়লাম। পিপাসা পেয়েছিলো প্রচন্ড।  তারপরেই তো সাদা কাপড় পরা একজনের সঙ্গে দেখা, তবে অবগুন্ঠনে ঢাকা। জল চাইতেই তার গলা শুনে ঠাহর হোলো সে একজন নারী। আমাকে চিনতে পেরে বলে উঠলো " আমি তোমার রমলা।" এটুকু ঠিকই ছিলো।  তার দেওয়া ঘটিটা তার কথামতন তাকে দিতেই হাওয়া়য় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তার শরীরের সাদা আবরন আর রক্তশূণ্য মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখেই আমার জ্ঞান হারানো। 

বলে পথিক থামলো। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো-
ওর বাবা মারা যাবার পর নিত্য আমার যাওয়া-আসা চলতে লাগলো। আর তার সাথে সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য। কিন্তু ওর মা আমাদের এই সম্পর্ককে একদম মেনে নিতে পারেননি। তাই আমিও ও বাড়ি যাওয়া-আসা একসময় ছেড়েও দিলাম। কিন্তু রমলা আমাকে ভালোবাসতো।
- শোনো এবার আমরা তাহলে বাকিটুকু বলি  কেমন। গ্রামের একজন বয়স্ক লোকের সাথে ওর মা বিয়ে ঠিক করেছিলো। টাকা-পয়সাওয়ালা লোক। দেখতে কুৎসিত আর গায়ের রং কালো- সবটাই আমাদের শোনা কথা। এই নিয়ে মা-মেয়ের সাথে প্রচন্ড অশান্তি,ঝগড়াঝাঁটি। তখন মেয়ের বিষপানে আত্মহত্যা। 
- কখন ঘটেছিলো ব্যাপারটা?- আগন্তুকের প্রশ্ন। 
একজন বলে ওঠে, "এই তো আজ ভোরবেলা। আমরাই তো থানায় গিয়ে সব ফর্মালিটি সেরে তার দেহের দাহকার্য সম্পন্ন করে ফিরছি। "
- তা বাবা, তুমিই কী রামদয়াল শর্মা? তোমার নাম ঐ বাড়িতে অহরহ শোনা যেতো। তাই অনুমান করেই বলছি"
- আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিই সেই হতভাগ্য রামদয়াল
-তাহলে তার অতৃপ্ত আত্মাই মরণের পরে তোমাকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ জল খাওয়াতে নিয়ে গেছিলো।পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির সন্ধান হয়তো আগেই পেয়েছিলো, একেবারে শ্মশানের নিকটে। হায়রে! কী মর্মান্তিক ঘটনা- একেবারে অলৌকিক।  এখন রাত দশটা। ঐ দোকানটায় বসে চা- বিস্কুট খাওয়া যাক। তারপর না হয় বাড়ি যাবে। সারাদিন তোমার তো খাওয়া হয়নি বাবা।"
- ঠিক আছে। এখানে সারা রাতই দোকান খোলা থাকে, তাই না?
- হ্যাঁ। টোটো রিক্সাও পাবে তুমি। তবে চার্জ একটু
বেশী। এই যা। এই নাও পঞ্চাশটা টাকা। আমি রমলার মামা।"
এর পরে রামদয়াল তাঁকে প্রণাম করলো। তারপর ধীর পায়ে অগ্রসর হোলো।

No comments:

Post a Comment