গল্প
তরাই ডরায় না
চিত্রা পাল
তরাই,ও তরাসি তরাই,তরী তরণী মায়ের ডাক শুনতে পাচ্ছে ও, তার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর নামের মতো পরপর তার কত নাম। কিন্তু সাড়া দেবার অবস্থায় থাকলে তবে তো সাড়া দেবে। কোনো রকম করেই ওর গলার স্বর এখন একেবারে বেরোবে না। কি করে শব্দ বেরোবে!মায়ের ডাক শুনে ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই না দেখতে পেলো দরজায় লম্বা শুঁড় দুটো। আর মুখটা ওর দিকেই ফেরানো। ওর মনে হলো যেন কটমট্ করে চেয়ে আছে ওর দিকে।ওরে বাবা, এখন সাড়া দেওয়া যায়? যদি সাড়া শব্দ শুনলেই ওর দিকে ধেয়ে আসে ,গা বেয়ে উঠে পড়ে তাহলে? তাহলে মনে হয় ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে।
নাঃ, মেয়েটা আমাকে একেবারে পাগল করে দেবে। কি যে ভীতু হয়েছে,জন্তু জানোয়ারে ভয় খায়,সে তবু একটা কারণ থাকে,এ আরশোলা দেখে ক্যানো যে এতো ভয় পায়,কে জানে বাবা।এতো সব বকবক করতে করতে ভাই সোনাইকে কোলে নিয়ে যেই ওর মা ঘরে ঢুকলো,তরাই এর একছুট্টে মাকে জড়িয়ে ধরে তবে শান্তি।
কোথায় দেখলি তেনাকে? মায়ের প্রশ্নের উত্তরের জন্যে এখন গলার স্বর বেরোয়, কথা ফোটে মেয়ের, ঐতো, দরজার ফাঁকে। কই, কোথায়?আমি তো তাকে খুঁজেই পাই না,অথচ তোরই ঠিক চোখে পড়ে।তুই সব সময় খুঁজে খুঁজে বার করিস নাকি ওদের বলতো? বলেছি না,একগাছা ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে একেবারে নিকেশ করে দিবি।‘বলতে বলতেই ওর মায়ের চোখে পড়লো,আর ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে পিটিয়ে দিতেই শেষ। কিন্তু একবার ঘা খেতেই আরশোলা যেই ফরফর করে লাফিয়ে ওড়বার চেষ্টা করেছে,তরাই লাফিয়ে ঊঠেছে তড়াক্ করে,সেই ধাক্কায় ওর ভাই মাটিতে পড়ে মাথায় খেলো জোর ধাক্কা। কপাল এ জোর কালশিটে ছোপ। ওর ভাই এর একেবারে হেঁচকি তুলে কান্না। তরাই দৌড়ে গিয়ে জল এনে ভাই এর মাথায় থাবড়ায়।তারপরে কান্না থামানোর জন্যে কত আদর করে খেলনা এনে দেয়।
তরাই এর মা রেগে গেলেও রাগ সামলিয়ে নিয়ে ওকে বোঝায়,তরাই তুই মিথ্যে এতো ভয় পেলি।দেখলিতো এক বাড়িতেই সব শেষ। সেদিন তুই সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলিস, বেড়ালটা নাবছিলো,আচমকা ওকে দেখে তুই ভয় পেয়েছিলিস।তুই যদি সোজা ওপরে উঠে যেতিস কিছু হতো না, কিন্তু ভয় পেয়ে পিছু হটতে গিয়ে পড়ে যেতিস, আর হাড় গোড় সব ভাঙ্গতো যদি না মান্তুর মা তোকে ধরে ফেলতো। দ্যাখ, ভয় পেয়ে ও রকম করবি না। আরে ওরাও আমাদের দেখে ভয় পায় তা জানিস?
আসলে তরাই যে অনেক ব্যাপারেই খুব সাহসী, সচেতন সেই ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায় এই সব খুচরো ঘটনার তলায়। এই তো সেদিন ওর ক্লাসের মধুঋতা খুব কাঁদছিলো টিফিনেরসময়ে। ও একটা পেয়ারা এনেছিলো,টিফিনের সময়ে খাবে বলে, এখন দ্যাখে সেটা ওর ব্যাগে নেই। কে যেন কখন ওর ব্যাগ থেকে সেটা হাপিস করে দিয়েছে। তরাই ক্লাস ঘর থেকে বেরিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করে কেউ পেয়ারা খাচ্ছে কি না। দ্যাখে, দূরে পাচিঁলের ছায়ায় পল্টন আর রণি কি যেন করছে। দৌড়ে কাছে গিয়ে দ্যাখে,একটা চাকু দিয়ে পেয়ারা কাটার চেষ্টা করছে। খানিকটা কেটে যেই ছিঁড়ে নিতে গেছে,তরাই ও দের মাঝে পড়ে এক্কেবারে চিলের মত ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দৌড়ে মধুঋতার হাতে দিয়ে বলে শীগগিরি খেয়ে ফ্যাল। মধুঋতা ভয়ে ভয়ে ওর দিকে তাকাতেই তরাই বলে,তুই ওদের ভয় পাচ্ছিস?দাঁড়ানা, আসুক একবার,আমি সোজা ওদের মিসের কাছে নিয়ে যাবো। তারপরে মিস ক্লাসে এলে তরাই সব বলে দিলে ওরা মিসের কাছে খুব বকা খেলো।
এবার বার্ষিক পরীক্ষার পরে তরাই ওর মা বাবার সঙ্গে চলেছে শান্তিনিকেতন বেড়াতে, সঙ্গে ওর ভাই ও আছে। তরাই এখন বিশ্বকবির কবিতা পড়েছে, গান শুনেছে ওনার ছবি দেখেছে। ওর একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই শান্তিনিকেতন যাবার ব্যাপারে ওর খুব উৎসাহ। হঠাত্ ঠিক করা তো তাই শেষ মেষ কাঞ্চন কন্যাতেই বুকিং হল।
ট্রেনটা খুব লেট্ করছে। তরাই এর আর অপেক্ষা করতে ভাল লাগছে না। প্ল্যাটফর্মেই এদিক ওদিক দোকানগুলো দেখছে। খেলনার দোকানে একটা খেলনা রিভলবার খুব পছন্দ হল ওর।খুব ইচ্ছে হল ওটা কেনার। বাবার কাছে বায়না করে জোর করে ওই রিভলবারটা কিনলো। ওটার মজা হচ্ছে রিল ক্যাপটা একবার পরিয়ে দিলে পর পর অনেকগুলো ফায়ার করা যায়। ওর মা ওর হাতে বন্দুক দেখে বলে, তুই এটা কিনলি ক্যানো।তুই যা ভীতু ,ওতো পড়েই থাকবে।ও যে যাই বলুক তরাই এখন ওটাকে হাত ছাড়া করছে না। হাতেই রেখে দিয়েছে।
এখনও ট্রেন আসছে না। সবাই ছট ফট করছে, পায়চারি করছে। এমন সময়ে ঘোষনা শোনা গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন এসে যাচ্ছে। দূরে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। এখন এই গরমে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস সবাইকে স্বস্তি এনে দিলো। এমন সময়ে ঘোষণা শোনা গেলো, ট্রেন এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওভার ব্রীজ পেরিয়ে যেতে হবে ওই প্ল্যাটফর্মে। সবাই হুড়মুড় করে বাক্স প্যাঁট্রা নিয়ে ছুট লাগালো ওদিকে।এদিকে সেই মুহুর্তে শুরু হল কাল বৈশাখি ঝড়।ঠান্ডা হাওয়া সেই আগমন বার্তাই দিয়েছিলো ঠিকই, রাত বলে আকাশের অবস্থা বোঝা যায়নি। তুমুল ঝড় সঙ্গে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর এক কান্ড ঘটলো, হঠাত্ সব আলো নিভে গেলো। দক্ষ যজ্ঞ বা লংকা কান্ড বোধ হয় এভাবেই হয়েছিলো। যাত্রীদের হৈচৈ চিত্কারের ভেতরে সব ছাপিয়ে ভেসে এলো শিশু কন্ঠের গগন বিদারী চিত্কার।তার পরক্ষণেই ধ্বনিত হলো দুম দুম বন্দুকের গুলির শব্দ। শব্দ মাহাত্ম্যেই ভীড় হালকা।দেখা গেলো ওভারব্রীজের ওঠার সিঁড়িতে দুই শিশুকে জড়িয়ে ধরে তার মায়ের কান্না আর তাদের পাশে তরাই দাঁড়িয়ে তার বন্দুক হাতে। তরাই এর বাবা উদ্ভ্রান্ত হয়ে তরাইকে খুঁজছিলো। ওকে দেখতে পেয়েই সব শঙ্কা এক মুহুর্তে রাগে পরিণত হয়ে গেলো। ওর বাবা তার হাত ছেড়ে চলে আসার জন্যে তাকে চড় মারার জন্যে হাত তুলতেই কে যেন খপ করে তার হাত ধরে নামিয়ে দিয়ে তরাইকে বুকেজড়িয়ে ধরে। সে আর কেউ নয় ওই শিশুদুটির বাবা। বলে, আজ আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে আমার বাচ্ছাদুটোকে ফিরে পেয়েছি। ও যদি ও সময়ে সাহস করে ফায়ার না করতো, ওরা আর একটু হলে মানুষের পায়ের চাপে থেঁতলে যেতো। আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে অনেক ধন্যবাদ।দাদা, আপনার মেয়ের মতো সন্তান যেন সবার ঘরে হয়। আজ তরাই এর সাহসের প্রথম পুরষ্কার প্রাপ্তি ঘটলো ওর বাবার আনন্দাশ্রুতে।
No comments:
Post a Comment