Saturday, April 4, 2026


 

মুনা 

অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩২

। সম্পাদকের কথা 

     শৌভিক রায় 


আবার একটি সৌরবর্ষ শেষ হতে চলেছে। পুরোনোকে পেছনে ফেলে আবার নতুনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত আমরা। কিন্তু আদৌ কি কিছু নতুন হয়? নাকি সেই পুরোনো ব্যাপারগুলিই নতুনভাবে ফিরে আসে নববর্ষের মোড়কে! 

এই মুহূর্তে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে আমরা সবাই ব্যস্ত। আমাদের রাজ্যে নির্বাচন মানেই রক্তক্ষয়, হানাহানি। অতীত থেকেই চলে এসেছে এই পরম্পরা। এবার সঙ্গে যোগ হয়েছে এস আই আর। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উন্নতির স্বার্থেই এস আই আরের প্রয়োজন রয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কখনই জায়গা পাওয়া উচিত নয় এই দেশে সেই ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু  সেটি করতে গিয়ে যদি বৈধ নাগরিকদের সমস্যায় পড়তে হয়, তবে কাম্য নয় সেটিও। মুশকিল হল, সব কিছুকে পেছনে ফেলে এক্ষেত্রেও বড় হয়ে উঠেছে রাজনীতির চূড়ান্ত অশ্লীলতা। আর তাতে হাত পুড়ছে সাধারণ মানুষদের। 

আবার মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আঁচেও পুড়তে হচ্ছে আমাদের। জ্বালানি সংকট সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। কোনও স্তোকবাক্য আর বিশ্বাস করতে রাজি নন কেউ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, টাকার মূল্যের দ্রুত পতন। ফল মুদ্রাস্ফীতি আর নিত্যপ্রয়োজনী জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি। 

এই দুঃসময়ে এখন এটাই দেখার যে, আসন্ন নববর্ষ কোনও সুন্দর দিনের বার্তা নিয়ে আসে কিনা। যদি সেটা হয়, তবে সবচেয়ে খুশি হবেন সাধারণ মানুষ, যাদের নুন  আনতে দিন ফুরোয়। 


  

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


মুজনাই অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩২


এই সংখ্যায়  - 

প্রকাশকের কলাম- 

রীনা সাহা 

আঙ্গিক-

শ্যামলী সেনগুপ্ত, অমলকৃষ্ণ রায়, বেলা দে, কল্যাণী লাহিড়ী, অশোক কুমার ঠাকুর

প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভাবনা- 

রেবা সরকার, অনিতা নাগ, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, কবিতা বণিক

গল্প- 

মৌসুমী চৌধুরী, লীনা রায়, অমিতাভ চক্রবর্তী, শুভেন্দু নন্দী, তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য, অভিজিৎ সেন

কবিতা প্রথম পর্যায়- 

নির্মাল্য ঘোষ,  অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী, কেতকী বসু , তন্ময় কবিরাজ, অলকানন্দা দে,

প্রতিভা পাল, শ্রীতমা ত্রিপাঠি, রীনা মজুমদার, প্রাণেশ পাল, 

মধুমিতা দে রায়, সোমনাথ মুখার্জী, মনোরঞ্জন ঘোষাল

বেড়ানো -

জয়িতা সরকার

কবিতা দ্বিতীয় পর্যায়- 

বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী, শিশির আজম, মহঃ সা নো য়া র,

পলাশ পাল, চিরঞ্জিত মন্ডল, অবুঝ বালক, জীবন সরখেল, মিত্রা রায় চৌধুরী, 

আশীষ  কুমার  বিশ্বাস, মজনু মিয়া, প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী

ছবি- 

হৃদান সরকার 


মুজনাই অনলাইন চৈত্র সংখ্যা ১৪৩২


 

। প্রকাশকের কলাম 

          রীনা সাহা 


নির্বাচন....


এই আমি 
পৃথিবীর অন্ধকারতম হাঁ মুখ নির্বাচন করেও 
বুঝতে চাইছি না 
গুহাটাও মানসিক রোগী।

অথচ গুহায় ঢোকার আগ অবধি 
আমার কাঁধে 
শক্ত কিছু হাত ছিল 
যারা লোভী চোখের আলেয়ার রাজনীতি
বুঝতে পেরে সতর্ক করেছিল।

কিন্তু আমি 
যোগ্যতমের জয়কে পাত্তা না দিয়ে 
কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা শূন্যে ওড়াতে প্রস্তুত ছিলাম 
এক সিটিং,দুই সিটিং 
এরকম অজস্র সিটিং শেষে সর্বস্বান্ত 
এই আমাকে 
থেরাপিস্ট কথা দিয়েছে 
ভোটের ফল বেরোলেই বুঝে যাবো সব।

সবশেষে উলঙ্গ এই আমি 
মাথা থেকে পা , শুরু থেকে শেষ 
বাজি রাখি পাশা তাঁর কাছে 
একম্: এব: অদ্বিতীয়ম্: 
" বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ "
" সম্ভবামি যুগে যুগে..."


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

আঙ্গিক  


শেষ-শুরুর সন্ধিকাল অবগাহনে

অমলকৃষ্ণ রায়

যেদিনটা অতিবাহিত হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে ভেবে কী লাভ! বরং যে দিন আসছে সেটা কিভাবে ভালভাবে কাটানো যায় সেটা নিয়েই দরবার করাটা শ্রেয়। এ নিয়ে নানা মুনির নানামত থাকতেই পারে। কিন্তু কেউ যদি এ প্রসঙ্গে আমায় অন্তত প্রশ্ন করে বসে— বর্ষশেষ? নাকি শুরু নতুন দিন? কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্ব্যর্থহীনভাবে বলব, দুটোই। বর্ষশেষ আমায় নতুন বছরের দিনগুলোকে পরিকল্পনা মাফিক অতিবাহিত করার মতো সঠিক নির্দেশিকা দেবে; বিগত বছরে এটা ভুল করেছিলে, এবার কিন্তু সেরকম কিছু করে বসো না। সেভাবে দিনটা শুরু করো। নতুন বছরের প্রতিটা নতুন দিন তোমার কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠুক। একেকটা দিন তোমার কাছে যেন জীবনের উত্তরণের একেকটা পদক্ষেপ হয়ে ওঠে। নতুন বছরের দিনগুলো যেন তোমার প্রত্যাশা পূরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। গতবছরের বৈশাখের শুরুর দিনে তুমি অন্তত যা ভেবে বছরটা শুরু করেছিলে, সেটা অনুসরণ করে কতটুকু সাফল্যের ফসল ঘরে তুলতে পারলে, কতটুকুই বা তোমার প্রত্যাশাকে ছুঁতে পারেনি; আমার কাছে বর্ষশেষ মানে তারই আত্মসমীক্ষণ। আর নতুন বছরের শুরু মানে বিগতদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু বার্ষিক পরিকল্পনা; এ বছর যেন এসব কাজ ঠিকঠাক করে ফেলতে পারি। যা আশা করছি সেটা যেন এবার পূরণ হয়। ইতিহাস মানুষকে যে শিক্ষা দেয় তা হল, বিগতদিনের কৃত ভুলগুলো যেন জীবনে দ্বিতীয়বার আর না আসে। তেমনি বর্ষশেষও তাই, বিগত বছরের একটা আত্মসমীক্ষা জীবনপথকে অন্তত এক ধাপ উন্নীত করে দেয়। তাই একেকটা নতুন বছর শুরুর ক্ষেত্রে বর্ষশেষের একটা ভূমিকা থাকেই।

যে মানুষ তার জীবনটাকে চরৈবেতির মতো সারা বছর একঘেয়েমিতে কাটিয়ে দেয়, যার জীবনে যেমন আছে তার চাইতে বেশি কিছু চাওয়ার নেই পাওয়ারও নেই। কোনওদিন কোনও উচ্চাকাঙ্খা মনের মধ্যে আগে থেকে পুষে রাখে না; যদি জীবনে এমনটা হতো, যদি এরকম একটা জীবন উপভোগ করতে পারতাম। সেসব না ভেবে বরং ভাবে, যা চলছে চলুক না। বেশ তো আছি। কোনওরকমে খেয়ে-পরে দিন গুজরাতে পারলেই তো হল। সেসব মানুষের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তাদের কাছে বর্ষশেষ আর নতুন বছরের শুরুর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। তাদের কাছে বছর কবে শেষ হবে বা হল, নতুন বছর কবে শুরু হবে সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। তাদের কাছে বর্ষশেষ আর নতুন বছরের শুরু বছরের আর সব দিনেই মতোই একেকটা দিনমাত্র।

যে দেশের মানুষের সুখের সংজ্ঞাটাই ভিন্ন, জীবনে ভাল থাকা মন্দ থাকার মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করতেই জানে না। যে দেশের মানুষ জীবনের খারাপ সময়কেও ভাল সময়ের মতোই সমভাবে উপভোগ করতে জানে, তারা কখনও সংকটের আশঙ্কায় ভেঙে পড়ে না। যে দেশের মানুষ সবসময় যুদ্ধবিগ্রহ, গোলা বারুদ দেখে দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে গোলা বন্দুকের শব্দ কোনও ভয়ের সঞ্চার করে না।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, কীসব উদ্ভট কাল্পনিক কথাবার্তা। বাস্তব দুনিয়ায় এমন মানুষও কি আছে, যারা কিনা মৃত্যুকে ভয় পায় না। নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে বুক চিতিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। জীবনের সুখভোগ নিয়ে কোনওরকম পূর্বপরিকল্পনা করতে জানে না এমন মানুষ আবার আছে নাকি। আমি বলব, আছে। সত্যিই আছে, কোনও আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছি না। এই ভারতবর্ষের মাটিতেই এককালে এরকম মানুষ বাস করতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটা সময়ে ব্যাঙালোরে যুদ্ধ হানাহানি লেগেই থাকতো। সেখানকার গ্রামের কৃষকদেরকে যুদ্ধ চলাকালীন মাঠে কৃষি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। মৃত্যুভয়ে কবে যুদ্ধ থামবে, সেজন্য পরিবার-পরিজনদের নিয়ে মাটি খুঁড়ে আত্মগোপন করে বসে থাকতো না। মাঠে কাজ করতে করতে ক্ষেতের আলে বসে বিশ্রাম নিতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় বসতো, যুদ্ধে কে জিততে পারে। কার হার শুধু সময়ের অপেক্ষা। যুদ্ধ থেমে গেলে এই ভূখণ্ড শাসনের ভার কার কাছে ন্যস্ত হবে। পূর্বের শাসকই বহাল থাকবে তো, নাকি নতুন কেউ ক্ষমতায় আসবে। নতুন শাসক ক্ষমতায় এলে কী হবে। কাজের ফাঁকে তাদের শুধুমাত্র এইটুকু ছিল কৌতূহল। বছরের পর বছর যুদ্ধ, হানাহানি চলতে চলতে ব্যাপারটা ব্যাঙালোরবাসীরা অত্যন্ত সহনশীল হয়ে উঠেছিল। 

ব্যাঙালোর ক্যাণ্টনমেণ্ট থেকে একবার ব্রিটিশ সৈনিকের গোলন্দাজ বাহিনী অনুশীলনের সময় ভুলবশত লোকালয়ে গোলা ফেলে দিয়েছিল। সেনা কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ গ্রামের মানুষদের কোনও ক্ষতি হলো কিনা সেটা দেখতে জানলো, তাদের কারও তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। অল্পের জন্য মাঠে কর্মরত কৃষকেরা সকলেই প্রাণে বেঁচে গেছে। তাদের একজন বলল, গোলন্দাজ ভদ্রলোকেরা সবসময় আমাদের মতো গ্রামের সাধারণ মানুষের দিকেই নিশানা করে থাকে। যেহেতু আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি, তাই আপনারা অনুশীলন চালিয়ে গেলে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। যারা অমন কথা নির্দ্ধিধায় বলতে পারে, তাদের কাছে বছরের শেষ কিংবা শুরু সবই সমান। তাদের জীবন এক বৈচিত্র্যহীন চরৈবেতিতে অভ্যস্ত। ভালমন্দ প্রত্যাশা তাদের একেবারেই নেই। সেসময় ব্যঙালোরের নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারের একাংশ যুদ্ধ, অস্ত্রচর্চাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিল। যুদ্ধ থেমে গেলেই তাদের জীবনে সংকটের ছায়া নেমে আসতো। মাইসোরের ৩য় যুদ্ধশেষে যখন সেনাবাহিনী থেকে ছাঁটাই শুরু হল, তখন অনেককে কর্মহীন হতে হয়েছিল। তখন তারা সেনাদলে কাজ না করলে সংসার কী করে চলবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। যুদ্ধ যে একটা জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, সেটা জীবনের প্রয়োজন মেটানোর মতো কোনও পেশা হতে পারে না, সেটা তারা ভাবতো না।

তবে যে যাই বলুক, আমি হলাম আপাতমস্তক একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। মারামারি, হানাহনি, অশান্তিতে কখনও পড়তে চাই না। খুব উঁচুমানের না হোক, অন্তত একটা সাদামাটা গড়পড়তা ডাল-ভাতের সুখী জীবন কাম্য। ব্যাঙালোর কৃষকপরিবারের যুবকদের মতো অবলীলায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলতে পারব না। তাতে সংসারে অভাবকে নিত্যসঙ্গী করে বেঁচে থাকতে রাজি। অথচ তাদের ঘরের ছেলেরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাবে বলে ছোটবেলা থেকেই নাকি অস্ত্রবিদ্যা শিখতো। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বংশানুক্রমিক সে ভাবনাটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। তরবারি তুলে ঘোরানো, বর্শা ঝাঁকানোকে ছোটবেলায় খেলাচ্ছলে অভ্যেস করে পরিণত বয়সে তারা নির্ভয়ে যুদ্ধে নেমে পড়তো। জীবনে ডরভয় বলতে বিন্দুমাত্র ছিল না। তারা কি আর আমাদের মতো বর্ষশেষ আর শুরু নিয়ে ভাবতে পারতো, মোটেও না। বেঁচে ফিরতে পারবে কিনা না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, সেটা জেনেও যুদ্ধে যেতে রাজি হয়ে যেত। তাদের কাছে সংক্রান্তি মাসপহেলার কোনও পার্থক্য ছিল না। তাদের কাছে বছরের একেকটা দিন বিশেষ কোনও দিন ছিল না। শুধুমাত্র চব্বিশ ঘণ্টার সুদীর্ঘ একটা সময়কালমাত্র। যে যাই বলুক, আমি বলব যখন যেমন, তখন তেমন। তিনশোবছর আগেকার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পেক্ষাপটের মানুষগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিকালের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতার মানুষজনের জীবন সম্পর্কিত ভাবনার তুলনা টেনে লাভ নেই। এখনকার মানুষ সবসময় কিসে ক্ষতি কিসে লাভ সব মেপেঝেপে পা ফেলে। তাই বছরের শুরুর দিনটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।


 

ধুম

শ্যামলী সেনগুপ্ত 


রাত নিশুতি হলে শহর
সিনেমার মতো হয়ে যায়।
আইনক্স, সিনেমাজ, মাল্টিপ্লেক্স
হয়ে যায় তুফানি জনপদ
খুল্লমখুল্লা সব জুয়া ও যৌনতা
গুমখুন, নিষিদ্ধ পাচার 
ডান্স বারে উদোম হুলাহুলা
কড়ি ফেলে তেল মাখা নিশুত 
রাস্তার ধারে ধারে কুকুর কুণ্ডলী 
ঝক্ কালো রাস্তায় 
প্রাচীন গাছের আবছায়া
হাঁটা পথে সোনাঝুরি, অমলতাস 
রূপকথা চুপকথা বোনে
চাঁদ ও কৃষ্ণপক্ষের কালো
প্রাচীন প্রাসাদের চকমিলানো  
চণ্ডীমণ্ডপ...বৃদ্ধের মতো 
মাতে মৌতাতে
হুক্কাবার বন্ধ হবে 
পুইয়ে আসা ভোরে।

এখন নিশুত ধুম 
আড়ালে আবডালে।


সৃষ্টির বৃষ্টি 

বেলা দে


উড়ে গেছে ঝরাপাতা 
যেতে যেতে বলে গেছে বৃষ্টির কানে
কিছু গোপনীয় কথা,
আমি তো চলেছি বন্ধু 
এবার তোমার রাস্তা পরিষ্কার 
এ ধরায় নেমে আস আবার।
সাপটে নাও যতেক প্রবীণ 
তোমার ধারা জলের স্নানে
আবার আসুক নবীন। 
ভরে উঠুক আম্রকানন
মুকুলিত যৌবনের ঔরসে,
বাহক ভ্রমরের ঠোঁটে 
ফুলেদের পরাগ মিলন সুখ,
বৃষ্টি তোমার মহত্তর সৃষ্টি 
   বারবার আসুক।



আবহাওয়া হাওয়ায় হাওয়া 

কল্যাণী লাহিড়ী


খুব আস্তে সাঁতার, রিদম যেন না বাড়ে
নিক্তিতে মেপে নাও! নদীর মরসুম শুরু
নিকানো হাতে আলপনা, ঝাড় নয়নতারা 
গাছ কোটরে পাখি ছানা রোদ নিচ্ছে, শান্ত 
দাওয়ায় বিমূর্ত মূর্তরা আড়াল হাসির পসরা 
সাজিয়ে বসে, সুতলিবিদ্ধ পুতুল মোয়া হাতে 
নাচে ঘোর, চৈত্রের হাওয়ায়!

নদীপাড়ে মাছেরা আবার জাল ছিঁড়ে নদীতেই 
মিশে যায় ঝাঁক বেঁধে পেয়ে যায় মরসুমি 
আবহাওয়া হাওয়ায় হাওয়ায়। 



অচিন ব্যথা
অশোক কুমার ঠাকুর 


বর্ষ যখন শেষ হয়,
বর্ষ যখন শুরু
বুকের ভিতর ঠাডা,
তখন
মেঘের গুরু গুরু।

দুশ্চিন্তায় কাটে দিন
বছর গেল দুঃখে
অচিন ব্যথা, ব্যথায়
তখন
আমার বাম বুকে।




  শিল্পী - অশোক কুমার ঠাকুর 


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভাবনা 



আগমন
রেবা সরকার


বাবা বলেই খালাস-- সামনে সংক্রান্তি ঘর দোর একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবি। লোকজন আসবে নতুন বছরের দিনে। ঝুল জাল ময়লা কোথাও যেন না থাকে। বিশাল বাড়ি অনেকগুলো ঘর। হাতে দু দিন বাকি। নাওয়া খাওয়া শোয়া বাদ দিলেও কাজ শেষ হবে না। আর কেউ হাত লাগাবে না। ভাইরা অপদার্থ, লাট সাহেব এক একটা। কাজে বাধা দেবে, আর নোংরা ছড়াবে আর বলবে এ দিকটা কর ও দিকটা কর, বাবা বলে গেছে।

বাবার আমি 'পুরাতন ভৃত্য'-- শুধু পায় বেত না পায় বেতন। বুঝেছি আমার ওপর বাবার রাগের কারণ, ওই উত্তর পূবের কদম গাছটা কাটতে না করেছিলাম। বাবার ইচ্ছে ছিল কাটার। জন্ম ইস্তক দেখে এসেছি গাছটাকে, পাখির কিচিমিচি, বর্ষায় কদম ফুলে ভরে যায়। একা থাকলে পাখিদের সাথে আমার নিদারুন সখ্যতা, কত কথা হয়। কদমের রোম গায়ে ঝরে পড়লে গা শিউরে শিউরে ওঠে। গাছ পাখির সাথে কথা বলি কেউ টের পায় না, আমাদের ব্যাপার। ঘরদোর সাফাই বছর শেষের নতুন কিছু নয়, প্রতি বছর হয়ে থাকে, ঠেলা আমাকে সামলাতে হয়। আমি একা ব্যস্ত এরকমটা না, কুন্তী পিসিকে নিয়ে মা লড়ে যাচ্ছে-- উঠোন নিকানো, রান্নাঘর নিকানো, গোয়াল ঘর সাফাই খড়ি সাজিয়ে রাখা এরকম অনেক কাজ প্রাণপণে সারতে হবে আজকালের মধ্যে। শীতের ঝরাপাতা শুকনো ডালপালা এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সব ঝেঁটিয়ে একত্র করে দূরের কোণায় রাখা হবে, ঝড় বৃষ্টি না এলে মঙ্গল। সব এলিয়ে যাবে তাহলে।

বাবা প্রতিবার বছর শেষ হবার আগেই একটা করে লাল পঞ্জিকা নিয়ে আসে গঞ্জ থেকে। সেই বেনীমাধব শীলের মুখ, লাল মলাট। উৎসুক হয়ে থাকি নতুন বছর শুরু হয়ে গেল । উল্টে পাল্টে দেখি অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ, উপনয়ন, পুজো নির্ঘণ্ট, তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ,বশীকরণ, সুপরামর্শ। কেউ পাতা উল্টে দেখে না। ধুলো জমে যাবে তারপর পুরানো বেনীমাধবের ওপর স্থান হবে।

কাল সংক্রান্তি বিকেল যাব কয়াখাতায়। গাজনের মেলা বসবে, গরম জিলিপি খাওয়া হবে। ভাই আর আমি। যা মজা হবে না। বাবা হাতখরচা বাবদ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলবে, একদম এদিক ওদিক যাবি না। ভাইকে নজরে রাখবি। বাবা চালাক। ভাইকে পাঠাচ্ছে আমার ওপর নজর রাখতে সব বুঝি। চড়কের সন্ন্যাসীদের ভিড় থাকে,ছাই মেখে বসে থাকে। ওদের মধ্যে কয়েক জন পিঠে বড়শি গেঁথে ঘুরতে থাকবে। দেখে ভয় করে আবার ভালো লাগে। জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া আরেকটা রোমাঞ্চকর দৃশ্য।
বাবা নিজে যাবে আলিপুরে ( দুয়ারে)। সবার জন্য জামা কাপড় কিনতে। তার পছন্দেই আমাদের পছন্দ । অবশ্য খুব খারাপ আনে না। মার জন্য শাড়ি সায়া ব্লাউজ, আমার জন্য তাই। ভাই পাবে ডিজাইন করা জামা প্যান্ট। নিকটাত্মীয়ারা শাড়ি। জন মজুর খাটা কামলা একটা করে সাদা ধুতি গেঞ্জি। চৈত্র  মাসে দাম কম হয়। স্টক খালি করার তাড়া থাকে দোকানীর। বাবা এই মওকা ছাড়ে না। অটো ভরে বাবা অনেক কিছু আনে চাল ডাল তেল লবন মশলাপাতি তরি তরকারি অন্য গৃহস্থালি। সাথে বান্ডিল করা ফুলের প্যাকেট, গৃহ দেবতা গোপালের পুজো হবে কালকে। গোরুরাও একটা করে বড়ো মালা পাবে। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে শাড়ির প্যাকেট ধরিয়ে দেয়, পছন্দ হয়েছে? চটপট সবুজ রঙের শাড়িটা হাতে নিয়ে বলি, হ্যাঁ। কদম গাছে দুটো টিয়াকে বসতে দেখেছি মাঝে মাঝে।

সবার জামা কাপড় ছাটাই বাছাইর পর বাবার সাথে মার অবধারিত তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যায়, তোমার জামা কাপড় কোথায়। বাবা রক্ষণাত্মক খেলতে থাকে,ধুতি গেঞ্জি এনেছি। ভালো দামী ফতুয়া পাইনি। পরে কিনে নেব। বাবার ধুতি সকলের থেকে আলাদা কিছু নয়।

পরের দিন মানে নতুন বছরের সন্ধেবেলা  বেশি আকর্ষণীয় আমার কাছে। গঞ্জের বাজারে বাবা আমাকে সাথে নেয়। হালখাতার অনুষ্ঠান। বড়ো লম্বা খাতায় হলুদ সহকারে মঙ্গল চিন্হ আঁকা। সোনার দোকানে সিদ্ধিদাতা গণেশ পুজোর আয়োজন। জুতো খুলে প্রবেশ। বড়সড় মিষ্টির প্যাকেট আর একটা ভারি ক্যালেন্ডার ধরিয়ে দেয় সদা স্মিত হাসি বিনয়ী মালিক। বাবা হাজার টাকা ধরিয়ে দেয় মালিক লাল খাতায় লিখে রাখে। আমি জানি বাবা তার বৌয়ের জন্য পরে কিনবে আর তার বৌ মেয়ের জন্য জমিয়ে রাখবে। আমার দিকে আঙুল তুলে বলে ওরে একটা মিষ্টান্নের প্যাকেট দাও। কর্মচারি আমাকে একটা ছোট প্যাকেট দেয়। এইখানে বইয়া খাইয়া লও। গত বছর খাইছিলা। এত মনে রেখেছে, অভিভূত হয়ে যাই। খাবার শেষে আর দু তিনটে দোকান ঘুরে ক্যালেন্ডার মিষ্টি হাতে করে ফিরে আসি। বাবা আমাকে ভালবাসে, বাবার জন্য গর্ব হয়।  নিজেকে ধন্য মনে হয়।


 

শেষ  নাহি যে শেষ  কথা কে বলবে! 

অনিতা নাগ 


বাংলা ক্যালেনডারের শেষ পাতায় চৈত্র মাস। আর প্রথম পাতায় বৈশাখ। শেষ  থেকেই শুরুর চলন শুরু।  বারো মাসের তেরো পার্বন তখন শেষ।  বছরের এই শেষটায় গৃহস্থের প্রিয় চৈত্র সেলের বাজার। সে বাজার সব পেয়েছির ভান্ডার নিয়ে অপেক্ষা করতো।খর চৈত্রের প্রখর তপনে পথে পথে ভিক্ষা পাত্র হাতে ঘুরে বেড়াতেন বাবা তারকনাথ এর ব্রতীরা। ‘বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগি মহাদেব’, দরজায় এসে দাঁড়ালে চাল আলু আর পয়সা দেওয়া হতো তাদের। সারাদিনের ভিক্ষান্ন ফুটিয়ে সন্ধ্যের পর তাদের একান্ন খাওয়া। চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজন হতো। গাজনের ঝাঁপ হতো। এখনও গ্রামে গঞ্জে নিশ্চয় এই সব প্রথা প্রচলিত আছে। সংক্রান্তির আগের দিনটা বড্ড প্রিয় একটা দিন। সে'দিন  নীল ষষ্ঠী। মা আর ঠাকুমা ‘র নীলের পূজো শেষে বরফ দেওয়া দইয়ের ঘোলের অপেক্ষা  থাকতো সারাবছর। সাথে  প্রসাদী ফল মিষ্টি তো আছেই।  সংক্রান্তির মেলা,  সে  ছিলো এক উৎসব। সংক্রান্তি পেরোলে নতুন বছর। মাইকে গান হতো এসো হে বৈশাখ,  এসো এসো।  নতুন জামা। মন্দিরে প্রার্থণা। হালখাতার লম্বা লাইন মন্দিরে মন্দিরে। বড়দের প্রণাম করে আশির্বাদ নেওয়া। ভালো রান্না। বিকেলে বাবার সাথে দোকানে দোকানে  হালখাতা করতে যাওয়া। রঙিন সরবত, বাক্স ভরা মিষ্টি আর ক্যালেনডার। 

জীবনের এই পর্ব পার করে প্রবাসে পাড়ি দেওয়া বিয়ের পর। সেখানে চৈত্র সেল নেই।  গাজন সন্ন্যাসীদের আনাগোণা নেই।  হালখাতা নেই।   তবু চৈত্র শেষের ঝরাপাতার গুঞ্জরণ কানে কানে বলতো খর তপনের ঝুলি নিয়ে সে আসছে। সব দীনতা মুছিয়ে নতুন পাতায় সাজবে প্রকৃতি। জীবনও তো তেমনি এক যাপন।  বারোমাসের এক আবতর্নে বাঁধা। ধরে রাখার উপায় নেই। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় নতুনকে স্বাগত জানানোর রীতি আলাদা, দিনক্ষণও আলাদা। তবু নতুনকে বরণ করে নেওয়ার ভিতরের ভাবনাটা একই। তখন তো দূরকে সহজে ছুঁয়ে ফেলার উপায় ছিলো না। নববর্ষের প্রণাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি দেওয়া নেওয়া চলতো। বড়দের আশির্বাদ ভরা চিঠির অপেক্ষা থাকতো।  রান্নাঘরে বিশেষ রান্না আর নতুন জামা কাপড় পড়া। এই ছিলো প্রবাসের নববর্ষ।  বড়জোর বাঙালীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে আনন্দ করা। 

সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে জীবনের কতো কিছু পাল্টে গেলো। দূর এসে গেলো নাগালের মধ্যে।  আত্মীয় পরিজনদের বাড়ী যাওয়ার চল বন্ধ হলো কোভিডকাল থেকে। এখন নববর্ষে আশির্বাদ আর প্রণামের আদান প্রদান হয় মুঠোফোনে।  চৈত্র সেল এখনও হয়। তবে অনলাইনে  বারোমাস সেল চলে। জীবন ছুটে চলেছে। সময় কোথায় দু'দন্ড দাঁড়ানোর! মুঠোফোন এখন জীবনকে বেঁধে রাখে। তবু চৈত্র অবসানে নতুন বছর আসে। হালখাতা আজও হয়। আজও দোকানে দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রণ থাকে।  রঙীন সরবতের জায়গা নিয়েছে  বোতল বন্দী পছন্দের ঠান্ডা পানীয়। থাকে মিষ্টি,  সাথে উপহার। কতো অঙ্কের  জমা পড়লো নতুন খাতায় সেই মতো উপহার বরাদ্দ হয়। নামী রেস্টুরেন্টে বাঙালীর মহাভোজের লোভনীয় সব প্যাকেজ থাকে। হেঁসেলের আঁচে বাড়ীর সকলের জন্য পছন্দের রান্না করার মানুষগুলো সব তো পাড়ি দিয়েছে অনন্তের পথে। আর সংসার এখন প্রবীণ প্রবীণাদের বৃদ্ধাশ্রম যেনো। ছেলে মেয়েরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কাছ ছাড়া।  শিক্ষা আর কর্মসংস্থান, এই দুটোই প্রধাণ কারণ। তাই মনখারাপ করার অবকাশ থাকে না। মেনে আর মানিয়ে নেওয়ার নামই তো জীবন। আজও নীলষষ্ঠী আসে। নীলের ঘরে বাতি দিয়ে সন্তানের মঙ্গল কামনা করা। বরফ দিয়ে দইয়ের ঘোল আর হয় না। নামী কম্পানির মোড়কে দইয়ের ছাঁচ, লস্যি সব পাওয়া যায়। প্রসাদ খাবার জন্য ছেলে-মেয়েদের অপেক্ষা থাকে না। সংক্রান্তির রাত পার করে পুব আকাশে নতুন সূর্যোদয়। নতুন আলোয় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। টিভিতে নানান চ্যানেলে বৈশাখী আড্ডা। থিমের জামা কাপড় পড়া, ঘোরা, বেড়ানো, আড্ডা। এ'সবের মধ্যে খেয়াল থাকে না বসন্ত নীরবে তার জায়গা ছেড়ে দেয় গ্রীষ্মকে। প্রখর তপন তাপের অগ্নিস্নানে সূচী হয় নতুন ধরা। আম, জাম কাঁঠালের ডালি সাজিয়ে সে আসে। বেল, চামেলী, রজনীগন্ধার শুভ্র সুবাস নিয়ে সে আসে। কড়া রোদে তৃষ্ণার্ত হয় ধরণী। তবু নতুনের বার্তা নিয়ে সে আসে। 

বর্ষশেষের অস্তগামী সূর্য বয়ে নিয়ে চলে বর্ষশুরুর নতুন সর্যোদয়ের বার্তা।
শেষ আর শুরু এক অপূর্ব  সমাপতন। 

‘অতীত নিশি গেছে চলে
চিরবিদায় বার্তা বলে...
এসো-এসো ওগো নবীন
চলে গেছে জীর্ণ মলিন
আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন
মুক্ত সমীরেখা।’


 

নতুন প্রভাত জাগো 

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 


"না না যেও না, ও শেষ পাতা গো শাখায় তুমি থাকো।"

 পাতা ঝরা বিদায়ের সূচক। কালের নিয়মে পুরনোকে বিদায় দিতেই হবে। একথা কেবলমাত্র প্রকৃতির ক্ষেত্রেই নয়। মানুষের জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য।  বসন্তের শেষে পাতাটি  ঝরে পড়বার মধ্যে দিয়ে সারা বছরের সুখ-দুঃখ,  চাওয়া - পাওয়া,  না পাওয়া কাহিনির চালচিত্র রচিত হয়। শেষ পাতা জানান দেয় যে প্রকৃতি নি:স্ব হতে চলেছে। কিন্তু সে একথাও নিরবে বলে যায়, খুব শীঘ্রই নতুন নতুন আশার বাণী বয়ে নিয়ে আসবে সবুজ কিশলয়। বর্ষশেষকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এটা আয়ুর পশ্চিম পথ। জীবনকে মহিমান্বিত করবার এবং নতুনকে স্বাগত জানানোর উৎকৃষ্ট সময়। আত্ম- সমীক্ষা এবং সারা বছরের শ্রেষ্ঠ সময়কে উৎযাপন করার মতো এত ভালো ক্ষণ আর হয় না। বর্ষশেষ কখনোই দু:খের নয় বরং  সেই মধুর ক্ষণ যা আমাদের  স্মৃতিরোমন্থনের সুযোগ এনে দেয়। অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যে ধারাবাহিকতা, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক অন্তিম লগ্ন।

শাস্ত্রে বলা হয়েছে " শাঙ্ক্য সমান জ্ঞানম নাস্তি, যোগ সমান বলম নাস্তি "।  বর্ষশেষ ভুল শুধরে নেওয়ার সেই  অবসর যা নিজের ভিতরের জ্ঞানকে উপলব্ধি করে, যোগ বা অভ্যাস দিয়ে নিজেকে গড়ে নেওয়ার এক উৎকৃষ্ট সময়। 

সারাবছর ধরে প্রকৃতি পত্র- পুস্প- পল্লবে সেজে ওঠে। একটা গোটা মোমবাতি সারারাত ধরে জ্বলে জ্বলে নি:শেষ হওয়ার আগে দপ করে আবারও জ্বলে উঠে নিভে যায়। আনন্দ, হাসি, কান্নার মধ্যে দিয়ে  বেজে ওঠে গাজনের ঢাক, সেজে ওঠে নতুন। নতুন সূর্যের আলোয় দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নতুন আশা আকাঙ্খার পসরা নিয়ে  সেজে ওঠে  পয়লা বৈশাখের মহা মিলন মেলা।


 

শেষ থেকেই শুরু

  কবিতা বণিক

চারাগাছ অঙ্কুরিত হয় একটা বীজকে ধ্বংস করে। সৃজন, পালন ও ধ্বংস্। এটি মহাবিশ্বের চিরন্তন চক্র। এটি জীবের কর্মফল ভোগ এবং মোক্ষ লাভের সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি, স্হিতি, লয় চলছে। কোন সৃজনই চিরন্তন নয়। মহাপ্রলয়ের সময় ব্রহ্মার ও মৃত‍্যু ঘটে। অর্থাৎ জন্ম হলে তার বিনাশ হবেই। একঘেয়েমি চলে আসে, ক্ষয়িষ্ণু হয়ে যায়, তাই তো নুতনের সৃষ্টি। সৃষ্টির সাথে সাথে তার ওপর সময় প্রভাব বিস্তার করে, তার আয়ূ নষ্ট করে। লয় বা ধ্বংসের মাধ‍্যমেই পুরোন ক্ষয়ে যাওয়া জিনিস থেকে নুতন ভাবে সৃষ্টির পথে এগিয়ে যায়।
আমরা গল্প,কাহিনীর শুরু করি, মাঝে কত কথা, জটিলতা, বিপদ তারপর শেষ হয়। সবটাই একসাথে উপলব্ধি করি। শুরু হয়েছিল বলেই তো তার শেষ হল। এই শেষের মধ‍্যও লুকিয়ে থাকে কোন নুতন সম্ভাবনা, নুতন রচনা, নুতন গল্প। জীবনের ধারা এমনি বয়ে চলে। কবির কথায়। “ তোমার হল শুরু আমার হল সারা। তোমায় আমায় মিলে এমনি বহে ধারা।” বাড়িতে কোন অতি বৃদ্ধের মৃত‍্যু এবং নবজাতকের আগমন। এখানে শেষ বা মৃত‍্যু যেমন কাম‍্য, একেই বলে ধ্বংস। ভারসাম‍্য বজায় রাখতে ও ধ্বংসের প্রয়োজন। খাদ‍্য-খাদক সম্পর্কে ও জানি এতে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় থাকে। পচা কাঠেও অঙ্কুরোদগম হয়। এখানে ধ্বংসের মধ‍্যেই সৃষ্টি। ধ্বংস আপাত দৃষ্টিতে যন্ত্রণা দায়ক হলেও সৃষ্টির আনন্দে ভরপুর থাকে। যত প্রলয়, মহাপ্রলয়, যুদ্ধ হয়েছে তা সবই শান্তি ও নুতনের সূচনার জন‍্য। মধু- কৈটভ, মহিষাসুর, শুম্ভ- নিশুম্ভ, হিরণ‍্যকশিপু, শিশুপাল, জরাসন্ধ, কংস, দুর্যোধন, দুঃশাসন, ( কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল অন‍্যায়, পাপ থেকে সমাজকে রক্ষার জন‍্য।) সব ধ্বংস না হলে শান্তি অর্থাৎ প্রহ্লাদ, ধ্রুব, শ্রীকৃষ্ণ, পরীক্ষিত ইত্যাদি তাদের শুভ চেতনার প্রতিষ্ঠা হত না। এই চক্রাকারে আবর্তিত সৃষ্টি, স্হিতি ও লয় সবটাই একে অপরের সাথে সম্পর্ক যুক্ত। শুরু হলে তার শেষ হবে আবার এই শেষ থেকেই নুতনের শুরু হয়।


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

গল্প   


ছবিগুলো 

মৌসুমী চৌধুরী

 সেই ছবিটা আজও ঋভুর কাছে বার বার ফিরে ফিরে আসে। জল আয়নায় স্থির চোখে চেয়ে আছে তারা। তাদের পরনে সবুজ শার্ট আর গোলাপী ওড়না। দামাল হাওয়ায় গোলাপী ওড়নাটি পতপত করে উড়ছে। সবুজাভ স্বচ্ছতোয়া জলে কাঁপছে তাদের ঘনিষ্ঠ অবয়ব। ঝুল বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখতে পাচ্ছে ঋভু। তাদের উচ্ছ্বল হাসি গুঁড়ো গুঁড়ো আনন্দ টনিক হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বসন্ত বাতাসে। ঋভুর ভিতরটা আনন্দে টইটম্বুর হয়ে উঠছে। 

জল আয়নায় চোখাচোখি হচ্ছে ফুলবতী এক রুদ্রপলাশ আর ঝাকড়া শিরীষের। বড়ই আহ্লাদে মাথা নাড়ছে তারা বন্ধু বাতাসে। ঋভুর ভিতরটা বড় আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠছে। শিরীষ গাছের পাতার আড়াল থেকে একটা কোকিল গলা ফাটিয়ে নাছোড় ডেকে চলেছে। বড় আবেশে চোখ বুজে আসছে ঋভুর। ছবিগুলো বড় টাটকা।

     সেদিন ওদের বিজয়োল্লাস থেকে ছুটে আসা বোমায় তার চোখের আলো চিরতরে মুছে যাবার আগে ঋভু দেখেছিল ছেলেটির প্রেমিক ঠোঁট খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে মেয়েটির নরম গোলাপী ঠোঁটের দিকে... 

 সেই ছবিগুলো আজও বড় টাটকা!



শেষ গরাস

লীনা রায়


 
নার্সিংহোম থেকে বডি হ্যান্ড ওভার করল বেলা দুটোয়। সেখান থেকে মেডিক্যাল কলেজে। কাগজপত্রে সই সাবুদ করে ওদের হাতে রিনিকে তুলে দেয় সব্যসাচী। যদিও ওখানে রিনির পরিচয় ছিল বডি বলে। আজ সকালেও ওকে রিনি বলেই ডেকেছে সব্য। দুপুরও পেরোয়নি। এরই মধ্যেই তার নাম হারিয়ে গেছে। রিনির হাতটা শেষবারের মতো নিজের হাতে নিয়েছিল। কী অসম্ভব ঠান্ডা! কেঁপে উঠেছিল সব্য।

 রিনির চলে যাবার খবর বিশ্ব সবাইকে জানিয়েছিল। কারণ বিশ্ব ওর আত্মীয় স্বজন প্রায় সবাইকে চেনে। মেহুলকে ও নিজে ফোন করেছিল। পর পর তিনবার ফোন করেও কথা হয়নি। বুঝেছিল ছেলে তখন গভীর ঘুমে।

একে একে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী অনেকেই নার্সিংহোমে চলে আসে। খুব স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছে সব্য। সবার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ভেতরের ভাঙ্গন বুঝতে দেয়নি।

সব কাজ মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত হয়েছিল বেশ। অনেকে এসেছিল সঙ্গে। কিছুক্ষন থেকে একে একে সবাই চলে যাবার পর সব্য বাথরুমে যায়। অনেকক্ষন সময় নিয়ে চান করে। চান সেরে ঘরে ঢুকতেই মেহুলের ফোন আসে। নিজেকে শান্ত রেখে সারাদিনের সব ঘটনা ছেলেকে বলে। কথা বলতে বলতে বুঝতে পারে ছেলে কাঁদছে। সব্য ফোন কেটে বালিশে মাথা রাখে।

প্রতিদিনের মতো গতকালও সব্য মর্নিং ওয়াক সেরে ফেরার সময় দুধ, ডিম, পাউরুটি এনেছে। বাড়ি ফিরে রিনির সঙ্গে বসে চা খেয়েছে। খবরের কাগজ পড়েছে। একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করেছে। এরপর রিনি রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর সব্য যায় ওষুধের দোকানে।

ওষুধ কিনে, একটু গল্প করে ঘন্টা খানেক বাদে বাড়ি ফিরে আসে। চাবি সঙ্গেই ছিল। ঘরে ঢুকেই দেখে বসার ঘরের সোফার পাশে রিনি পড়ে আছে। জ্ঞান নেই।

বিশ্বকে ফোন করে ডাকে সব্য। রিনিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসার সুযোগটুকুও পাওয়া যায় না। মেডিক্যালে রিনির দেহ তুলে দেবার সময় ওর বরফ ঠান্ডা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েছিল সব্য। মনে মনে প্রশ্ন করেছিল, “এত তাড়া কিসের?”

সারা রাত দু' চোখের পাতা এক করতে পারেনি। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে ভোরের আবছা আলো। সব্য শুয়েই থাকে। আজ কোন কিছুর তাড়া নেই। সকাল হয়েছে। পর্দার ফাঁক গলে এক ফালি কাঁচা হলুদ রোদ সব্যর গায়ে এসে পড়েছে। সব্য শুয়েই থাকে। বেলা বাড়ে। রোদের রং বদলে এখন গাঢ় হলুদ। শরীরটাকে মনে হচ্ছে বড্ড ভারি। তবুও ওঠে সব্য, উঠতে হয়।

স্নান সেরে নেয়। গতকাল ব্রেকফাস্ট করার পর আর কিছুই মুখে তোলেনি। মাথায় জল পড়তেই খিদে বোধ হয়। ফ্রিজ খুলে দেখে পনিরের তরকারি আছে। রাতের জন্য হয়ত করে রেখেছিল রিনি। খাবার গরম করে খেতে বসে। রিনির রান্না করা শেষ খাবার। এক টুকরো পনীর মুখে দেয় সব্য। জিভের প্রতিটি অংশে স্বাদটাকে অনুভব করতে চায়। এক একটা পনীরের টুকরোর সঙ্গে ত্রিশ বছরের একটা সংসার যেন একটু একটু করে ফুরিয়ে আসছিল। পনিরের বাটিটাকে দু' হাতে শক্ত করে চেপে ধরে অস্ফুটে বলে, ‘এত তাড়া কিসের ছিল রিনি?’ আর কিছু বলতে পারে না। তীব্র কান্নার দমকে বাকি কথাগুলো হারিয়ে যায়।


 

শেষ দিনের গন্ধ, শুরুর ভোর 

অমিতাভ চক্রবর্তী 


চৈত্রের শেষ বিকেল। হাওয়ায় এক অদ্ভুত গন্ধ—শুকনো পাতা, ধুলো, আর একটু ক্লান্তির। এই শহরের বাজারটা আজ অদ্ভুত রকম ব্যস্ত। সবাই যেন কিছু একটা শেষ করতে চাইছে—পুরোনো হিসেব, পুরোনো দেনা, পুরোনো বছর।

অভীক হাঁটছিল ভিড়ের মধ্যে। হাতে একটা পুরোনো খাতা—লাল কাপড়ে মোড়া। তার বাবার দোকানের খাতা। কাল পহেলা বৈশাখ। তার বাবা এই দিনটাকে খুব মানতেন। বলতেন—
“নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডার বদল নয়, মন পরিষ্কার করা।”

কিন্তু বাবা নেই তিন বছর হলো। দোকানটা এখন অভীকের, কিন্তু মনটা এখনও কোথাও আটকে আছে।
বাজারের এক কোণে ছোট্ট মন্দিরে ভিড় জমেছে। ধূপের গন্ধ, ঘণ্টার শব্দ—সব মিলিয়ে একটা নতুন শুরুর আয়োজন।

পয়লা বৈশাখের আগের দিন বলে কথা। অভীক দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে গেল না। সে খাতাটা খুলল। শেষ পাতায় লেখা—
“শুভ হালখাতা”
কিন্তু নিচে ফাঁকা।
তার বাবার হাতের লেখা থেমে গেছে সেখানেই।

হঠাৎ এক বৃদ্ধ লোক পাশ থেকে বলল—
—“লিখছ না কেন?”
অভীক একটু চমকে তাকাল।
—“কি লিখব?”
লোকটা হাসল, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি—
—“পুরোনোটা মিটিয়ে দাও। না হলে নতুনটা শুরু হয় না।”
অভীক বলল—
—“সব কি মিটে যায়?”
লোকটা মাথা নাড়ল—
—“না। কিন্তু মেনে নেওয়া যায়।”

হাওয়াটা একটু জোরে বইল। পাতা উল্টে গেল। অভীক কলমটা বের করল। হাত কাঁপছিল। তবু লিখল,
“যারা নেই, তাদের জন্য কষ্ট থাকবে। তবু জীবন থামবে না।”

একটু থামল। তারপর লিখল—
“নতুন বছর—
আমি আবার শুরু করব।”

পরের দিন সকাল। রোদটা যেন একটু অন্যরকম। রাস্তার মোড়ে লাল-সাদা পাঞ্জাবি, শাড়ি, মিষ্টির গন্ধ—সব মিলিয়ে উৎসব। অভীক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। খাতাটা টেবিলে খোলা। প্রথম কাস্টমার ঢুকল।
অভীক হাসল—অনেকদিন পর। সে বুঝল— বর্ষ শেষ হয়নি। চৈত্র শুধু দরজাটা বন্ধ করেছে,
আর বৈশাখ এসে ধীরে ধীরে সেটা খুলে দিচ্ছে।

“বাংলা নববর্ষ আসে না শুধু নতুন দিন নিয়ে,
সে আসে—পুরোনো ভাঙার সাহস নিয়ে।”


 

নব দিগন্তের শুভ সূচনা

শুভেন্দু নন্দী 


এ পৃথিবীতে তো কত কিছুই ঘটে যাচ্ছে। কালের নিয়মে একটা বছর আসে। আবার তার বিদায় লগ্ন হয় উপস্থিত। আবার নতুন বছরের আগমন, জানায় সবাই তাকে স্বাগতম। বছর ঘিরে অনেক প্রত্যাশা,সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতেই বছরের পর বছর কেটে যায়। একটা সংসার, একটা পরিবারের কথা চিন্তা করে অলোক এই মুহূর্তে।মধ্যবিত্ত পরিবার।  তার একজন সদস্য স্বর্ণেন্দু। গান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে সে। 

  এ পাড়ায় মাঝে মাঝেই আসে অলোক চায়ের দোকানে। নয়নবাবু প্রোমোটারিং ব্যবসা করে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছেন এ পাড়ায় নারায়ণগঞ্জে। সাবেকি আমলের একতলা বাড়ি আর নেই বললেই চলে। জনা তিনেক ছেলেকে কোচিং পড়ায় অলোক ফ্র্রিতে।  আসে সপ্তাহে তিন দিন। আর চায়ের দোকানে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আড্ডা, গল্পগুজব। চারিদিকে তরতর করে উঠেছে বেশ কয়েকটা বহুতল ফ্ল্যাট। এতো পরিবর্তন?
-একী? স্বর্ণেন্দু তুই? আজ তো রবিবার। তোর ক্লাবে যাওয়ার দিন? অর্কেস্ট্রশনের ভালো করে তালিম নিচ্ছিস তো?
- হ্যাঁ। সব ধরনের ইনস্ট্রুমেন্ট প্রায় ওখানে আছে, অলোকদা। সত্যি, ছেলেগুলো বেশ ভালো। সবই তো তোমার দয়ায়। গান - কী ভাবে অঙ্গভঙ্গি করে এবং মাউথপিসে মুখ রেখে করতে হবে -সব ওরা আমাকে যত্ন করে শেখায়।
-বুঝলি, তোর গলায় সুর আছে, গান আছে। তাল, ছন্দ -সবই আছে। শুধু একটু রেওয়াজ করতে হবে নিয়মিত। ভালো কথা, চাকরির পরীক্ষা দেবার কথা ভাবছিস কী? অবশ্যই সুযোগ পেলে দিবি। তোকে পরীক্ষার নোটিফিকেশন করলেই জানিয়ে দেবো, কেমন। গাইড বুকও দেবার চেষ্টা করবো।
- কত আর করবে তুমি, দাদা?
আরে! গান আর চাকরির চেষ্টা দুটোই তোকে করতে হবে। তবে বুঝলি, একটা সিনেমা দেখেছিলাম তা বেশ কয়েক বছর আগে। একটা impressive dialogue ছিলো ওতে।
একজন ভিখারী আর একজন ভিখারীকে বলছিলো "আপনি গান জানেন? তাহলে কিন্তু 
জর্জ ম্যাজিস্ট্রেট থেকেও বেশী উপার্জন করতে পারবেন।
- "ওগুলো সিনেমাতেই সম্ভব। বাস্তবে তার কোনও ভিত্তি নেই।" স্বর্ণেন্দু বলে উঠলো। 

ভাবতে লাগলো সে দুবছরতো  ইতিমধ্যেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বছরও তো প্রায় শেষ হয়ে এলো।  অলোকদার  কথাটার মধ্যেও তো যুক্তি আছে। ইদানীং একটা ব্যাপারে সে খুবই চিন্তিত।  ভাড়া বাড়িতে থাকে তারা। একতলা । ছাদে ফাটল। দেওয়াল জরাজীর্ন। পুরনো বাড়ি। মেরামত করার একেবারে ইচ্ছে নেই হয়তো বাড়িওয়ালার। ভাড়া খুবই কম। পাশেই থাকেন পরিবার নিয়ে। প্রোমোটারবাবু তাঁকে Influence করার চেষ্টা করছেন  ঘন ঘন ।  বাড়িটাকে ভেঙ্গে চূড়ে renovation করে একটা নতুন  বহুতল বিশিষ্ট  ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করার  মতলব করছেন।  যদি তাই হয়, তবে তারা তো সমুহ বিপদে পড়বে। .....
অলোকের সাথে স্বপ্নেন্দুর দেখা হওয়াটাও যেন একটা স্বপ্নের মত।

....... একটা একতলা বাড়ির কাছে গিয়ে অলোক থামলো। ঘরের ভেতর থেকে একটা গান ভেসে উঠলো। কে যেন গাইছে - বেশ খাসা গলা তো?
এইভাবেই তার ও তার পরিবারের পরিচয় ও পরে ঘনিষ্টতা। আর ক্লাবের সাথে যোগাযোগ করা আর সেখানেই তার তালিম নেওয়া। সবটুকুর দায়িত্ব অলোকের । ক্লাবের সাথে তার ভালোরকম পরিচয় ছিলো। কিছুটা monetary assistance -এ - পুরোটা bear করতো ও নিজে। বাবা সরকারী চাকুরে। তাই আর্থিক স্বচ্ছন্দ ছিলো তাদের পরিবারে।

ইতিমধ্যে পাড়ার একটা নামজাদা ক্লাবের  রজত জয়ন্তী উৎসবে যাবার আমন্ত্রণ পেলো অলোক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে এক বহিরাগত কন্ঠশিল্পীর দলবল নিয়ে আসার কথা ঐ অনুষ্ঠানে। ক্লাবের সম্পাদক তার বিশেষ বন্ধু।  বিরাট একটা ড্রামাটিক হল সুন্দর করে সাজানো। সংস্কৃতি প্রিয় প্রচুর মানুষের ভীড় হলটিতে। বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করার জন্য হলঘরে যখন প্রবেশ করতে উদ্যত হোলো অলোক, তখন রাত্রি নটা বেজে গ্যাছে। প্রচন্ড চিৎকার,চেঁচামেচি চলছিলো তখন সমবেত দর্শকদের ক্লাব কর্তৃপক্ষের একটি ঘোষণায়। যা হোলো - একটা দুর্ঘর্টনায় কম-বেশী সকলেই আহত, তাই  বহিরাগতদের সংগীতানুষ্ঠান বাধ্য হয়েই বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আর এর দুভার্গ্যজনক ঘটনার জন্য তারা খুবই দুঃখিত। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন অলোক মাউথপিসে ঘটনার জন্য আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ করে সমবেত দর্শকদের কাছে একটা বিনীত প্রস্তাব রাখে যে, তাদের পাড়ায় একজন প্রতিভাসম্পন্ন কন্ঠশিল্পী আছেন, যাঁর গান তিনি নিজে শুনেছেন, তাঁকে একবার এই স্টেজে দয়া করে পারফর্ম করার সূযোগ দিন- আশা করি তিনি আপনাদের নিরাশ করবেননা। হলে কিছুক্ষণ গুঞ্জন শুরু হোলো। তারপর পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হোলো। স্বর্ণেন্দুর সাথে ইতিমধ্যেই যোগাযোগ করেছে অলোক। প্রথমটা ইতস্তঃত করলেও পরে সম্মতি জানিয়ে তার দল নিয়ে স্বর্ণেন্দু সোজাসুজি স্টেজে এসে পৌঁছেছিলো।
- এ কি করলি তুই? বন্ধুর আকুল প্রশ্ন, - আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা রে"
- তুই শুধু দেখে যা" অলোক তাকে আশ্বস্ত করলো।
স্বর্ণেন্দুর বিভিন্ন ধরণের গানের পরিবেশনায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উত্তেজিত দর্শক " বাঃ , অসাধারণ"ইত্যাদিতে তাঁদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মুহুর্মুহু করতালিতে তাকে অভিনন্দিত করলেন।
তারপর সংবাদপত্রে, প্রেস ফটোগ্রাফারের ভীড়ে, তার সাক্ষাৎকারে উচ্ছ্বসিত প্রসংশার ঢেউ বয়ে গেলো। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলো স্বর্ণেন্দু।
এরপর মাসাধিক কাল কেটে গেছে। অলোক চাকরী পাবার সুবাদে ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে।  এর মধ্যে এক লম্বা ছুটি নিয়ে ফিরেছে বাড়িতে। চাকরিটা পেয়েছে সময়মত। আর মাত্র একটি মাস বাকী বাবার অবসর গ্রহণের।  বাধা মাইনের সরকারী চাকরী করেন তিনি। পুরণো বন্ধুদের সাথে গল্পগুজবের পরে স্বর্ণেন্দুদের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা মেলালো। বাড়ির একেবারে কাছাকাছি আসতেই একজন তাকে প্রশ্ন করলেন" কাকে খুঁজছেন? স্বর্ণেন্দুকে?"
- ওতো এখন দু-হাত দিয়ে টাকা ইনকাম করে যাচ্ছ।  যত্রতত্র গানের প্রোগ্রাম- শহরে,গ্রামে-গঞ্জে, বাইরে।আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন। আর কয়েক ঘন্টা পরেই তো দলবল নিয়ে কলকাতায় যাবার প্রোগ্রাম আছে। ভীষণ ব্যস্ত এখন ও।  আমাদের এই ফ্ল্যাটবাসী এই তো কিছু দিন আগে তাকে সম্বর্ধনা দিলো। আর খানিক পরে হাসতে হাসতে বলে উঠলো" আমিও তাতে সামিল হয়েছিলাম। ঐ যে দেখছেন নতুন তিনতলা ফ্ল্যাট !
চলে গিয়েছে ওখানে এই পুরণো ভাড়া বাড়ি ছেড়ে।"  অলোকের হঠাৎ মনে পড়ে গেলো বেশ কিছুদিন আগেও ঐ বাড়িটা under construction দেখে ছিলো। প্রোমোটার নয়নবাবুর কাছ থেকেই 
তাহলে .........? "অর্থকৌলিন্যের অহমিকায় এই  পাড়ার সকল ফ্ল্যাটবাসী আমাদের অনুকম্পার চোখে দেখে। আমাদের  আর্থিক দুরবস্থা,বাবার স্বল্প বেতন  জরাজীর্ন, স্যাঁতস্যাঁতে ভাড়াবাড়িতে থাকা,দমবন্ধ করা ও অসহ্য পরিবেশ। 
 তাই একটু হীনমন্যতায় ভুগি। ওদের সাথে কথা বলতে, মিশতে সংকোচবোধ হয়" স্বর্ণেন্দু মাঝে মাঝেই অনুযোগ করতো আর  দীর্ঘশ্বাস ফেলতো"
"আর আজ? ওঁরাই তাদের একান্তই আপন। সত্যিই বিচিত্র এই দুনিয়া" অলোক এই বিরাট পরিবর্তন আজ লক্ষ্য করে কথাগুলো মনে মনে অজান্তেই বলে ওঠে।
বাড়িতে প্রবেশ করে সবার সাথে দেখা করলো অলোক। স্বর্ণেন্দুর সাথে, ওর বাবা-মা, বোনের সাথে কিছুক্ষণ সুন্দর সময় কাটানোর পর ও ছোট বোনকে একটা গোয়েন্দা বই উপহার দিয়ে অতঃপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মন্থর গতিতে বাড়ির পানে চলতে লাগলো। ঐ নির্দ্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতেই স্বর্ণেন্দুর ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়ালোগ তাহোলে শেষে অদ্ভূতভাবে ফলে গ্যাছে। অথচ সবটাই ছিলো unpredictable. বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ  করলো অলোক আর ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালো ।


 

ঝড় 

তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য


চৈত্রের সন্ধ্যা, আকাশ জুড়ে মেঘ জমে অন্ধকার হয়ে আছে। একটা গা শিরশিরে হাওয়া উঠছে থেকে থেকে।যে কোনো সময় ঝমঝমিয়ে নেমে আসবে ঝড় বৃষ্টি। গত পাঁচদিনের এন্টিবায়োটিকের করা ডোজে দূর্বল হয়ে যাওয়া ছেলেটা রুগ্নতা জড়িয়ে একলা দাড়িয়ে অন্ধকার ছাদটায়। ছেলেটার এই সাতাশ বছরের  জীবনটা জুড়ে শুধুই যেন অন্ধকার অনুরণিত হয়ে চলেছে। তার না পাওয়া গুলো হিসেবের দিস্তি খাতাটায় জমে চলেছে,সে আর সেগুলো কষে উঠতে পাচ্ছে না। সামাজিক ভাবে ছেলেটা দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।তার পথ দূর্বিসহ হয়ে উঠছে,সেখানে যেন থেকে থেকেই নেমে আসছে একটার পর একটা ভূমিধস।আর সেই ধস সড়িয়ে নতুন রাস্তায় বানাতে গিয়ে ফুরিয়ে আসছে সময়। এসব ভাবতে ভাবতেই ছেলেটা চশমাটা খুলে চোখ মুছতে আরম্ভ করলো। আকাশের বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে সে বৃষ্টি যেন চলে এসেছে ছেলেটার চোখে।

এবার হাওয়াটা আরো জোরদার হল, তার সঙ্গে জোরদার হল কীর্তনের আওয়াজ। ওদের এই ছোট্ট শহরটার সবচেয়ে পুরনো যে কালী বাড়িটা,সেখানেই কীর্তন চলছে সাতদিন ধরে। আজ সেখানে পদাবলি। কথিত আছে এই কীর্তনে নাকি স্বয়ং মা কালী এসে কীর্তন গেয়ে যান। এগুলো ছেলেটা তার মায়ের মুখে শুনেছে। আর তার মা আবার শুনেছে মায়ের ঠাকুমার থেকে। মায়ের ঠাকুমা নাকি ৩০ কিঃমিঃ পথ গরুর গাড়ি চেপে এই কীর্তন শুনতে আসতো।বাড়ির সকলেই গেছে এবার কীর্তনে,সে যায়নি,একটু অভিমানেই যায়় নি। তার একদম ভিড় ভালো লাগে না। ভালো লাগে না চেনা মানুষদের মুখোমুখি হতে। ঝড় উঠবে বলে হয়তো কীর্তনের আওয়াজ টা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকানি শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে একটা কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ।এ গন্ধ ছেলেটার খুব চেনা।মাংস আর চর্বি কাঠের আঁচে পুড়লে এমন গন্ধ ছাড়ে।ছেলেটা চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু পশ্চিম দিকে চাপা গাছ আর বাণীদির বাড়ির টিনের চালের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল শ্মশানে চিতা জ্বলছে। জ সকাল থেকে তাদের শহরে খবরটা ছড়িয়েছে। শহরের এক ড্রাগ এডিকটেড ছেলে টাকার লোভে তার মা কে খুন করেছে। হয়তো সে লাসটাই পোস্টমর্টেম হয়ে এখন শ্মশানে এসেছে। এই ভয়াবহতা সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে,কতোটা পৈশাচিক হলে মানুষ এতোটা নির্মম হয়ে উঠতে পাড়ে।

ছেলেটা আবার চাশমায় চোখ মুছলো আর মনে মনে বলতে লাগলো, তার এই বারবার অকৃতকার্য হওয়া, তার মেয়েলিত্ব, এগুলো তার বাবা-মা, পরিবারের লজ্জার কারণ তাই সে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে, সমাজ তাকে যদি বিদ্রূপ করে এই ভেবে। কিন্তু সমাজে কেউ যদি লজ্জার কারণ হয় তবে এইসব ব্যক্তিরা,যারা নেশার কারণে পৈশাচিক হয়ে ওঠে।এরাই তো সমাজিক দূষণ সৃষ্টিকারী। সে নয়, সে সমাজ অবাঞ্চিত নয়, সে অচ্ছুৎ নয়। ছেলেটা এবার দুহাতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল,অন্ধকার আকাশে মেঘেরা টগবগ করে ফুটছে যেন,হাওয়া দুরন্ত বেগে ছুটে চলেছে। ছেলেটা কোথা থেকে যেন একটা সাহস পেল, কেউ যেন তাকে ভরসা দিচ্ছে,লড়াই করার,সমাজকে দেখিয়ে দেওয়ার,এগিয়ে চলার। প্রকৃতি যেন বলে উঠলো, নির্গুণ বলে কিছু নেই,গুণ নিজেকেই বিকশিত করতে হবে,হবেই।এ বাণী যেন বীজমন্ত্রের মতো গেথে গেল ছেলেটার মনে। তার মনে যেন এক নতুন পথের রেখা চিহ্ন ফুটে উঠলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টা শুরু হল প্রবল বেগ। অন্ধকার,অবসাদ,রুগ্নতা দূরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া একটা ঝড়। বিষাদ শেষে নতুনের সূচনা করা একটা ঝড়।


 

ফ্রড

অভিজিৎ সেন 

মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র স্বপ্ন । এমনকি অলীক কল্পনাকেও সত্য বলে নিত্যদিনের পোশাকের মতো মনের শরীরে পরিধান করে থাকে যেন অদৃশ্য কোন বস্তু । সে সময় যুক্তি বুদ্ধিকে রেখে দেওয়া হয় নিষ্ক্রিয় করে। মিথ্যা স্বপ্ন বারে বারে মস্তিষ্ককে আঘাত করতে থাকে,একসময় মিথ্যা বিষয়কেও সত্য ভেবে নেয় চিন্তাস্রোত। অবাস্তবকেই মন বাস্তব বলে প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। প্রতীক চৌধুরী বয়স পঞ্চাশ, পেশায় শিক্ষক। একটি ছেলে। নবম শ্রেণির ছাত্র। মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে দুকাঠা জমি কিনে একতলার ছাদ দিয়ে নব নির্মিত বাড়িতে উঠে আসে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে দিয়ে। প্রতি মাসে মাইনার সিংহভাগ অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে এসে রাতে সপ্তাহে একদিন কয়েকটি ছাত্র পড়িয়ে নিত্যদিনের যাতায়াতের গাড়ির ভাড়া ও হাত খরচের টাকাটা তুলে নেয়। 
                   
ছেলেটি লেখাপড়ায় ভালো। ছেলেটির ভবিষ্যতে যাতে লেখাপড়ার পথে আর্থিক সমস্যা বাধা হয়ে 
না দাঁড়ায় সেই বিষয়ে প্রতীক দিনরাত ভাবে। রাতে নিরিবিলিতে স্ত্রী মেঘার সঙ্গে বলে,' প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও খুব বেশি জমেনি, আর অবসরের পর পেনসন যা পাওয়া যাবে তাতে আমাদের কোন ভাবে চলে যাবে। সম্পত্তি বলতে এ বাড়িটি। ছেলেটির লেখাপড়ার খরচ কীকরে যে চালাবো ? আরতো মাত্র দুবছর চাকরি আছে । ভাবছি কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটাবো। তুমি কি বলো ?' 'আমি আর কী বলবো, আমি কী এসব বুঝি,যা করবে ভেবে চিন্তে করো। ঠগ লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বুঝেশুনে করো ।' 
                  স্কুল থেকে ফিরে বিকেলের দিকে হাঁটতে বেড়ায় নিয়মিত। ঘন্টা খানেক হেঁটে এসে চা পান পর্বের পর ছেলেকে নিয়ে বসে। ঘন্টা দুই পড়ানোর পরে সে ফ্রি। রবিবার কয়েকটি ছাত্র পড়াতে বাইরে যায় । সেদিন বাড়ি ফিরে আসে রাত দশটায়। এই তার নিত্যদিনের ছকবদ্ধ কাজের খতিয়ান। বাড়ির সিংহভাগ কাজের দায়িত্ব স্ত্রী মেঘাই পালন করে থাকে। 
        
কতো স্বপ্ন ছেলেকে ঘিরে। লেখাপড়ার জন্য চাই মেধা, শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্ৰহণের চাহিদা,চাই প্রচুর অর্থও। ছেলেটির মধ্যে সেসবই আছে। কিন্তু প্রতীকের জমানো অর্থের পরিমাণ কম। ছেলে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েই লেখাপড়া করবে। জয়েন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডাক্টার হতে চায়। এখন থেকেই সে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করে। সময়ের অপচয় করে না। ছেলের প্রবল আগ্রহের কারণে প্রতীক দিনরাত চিন্তা করে কীভাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লক্ষাধিকের বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে সৎভাবে পরিশ্রম করে? কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সে কখনোই কঠোর শ্রম করতে পারেনি। যা মাইনা পায় তাতে সংসার চলে যায়।সামাজিকতা,ঔষধের খরচ,উৎসবের বাজার, দেশের দর্শনীয় স্থানে বছরে একবার ভ্রমণ সবমিলিয়ে খুব হিসেব করেই চলে প্রতীক ও মেঘা । ইভিনিং ওয়াকের সময় বন্ধুরা বলেছিল 'কিছু টাকা শেয়ারে, কমকরে পাঁচ বছরের জন্য লগ্নি করে রাখলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায় অন্ত্যত ফিক্সড ডিপোজিটের তুলনায়। তবে এটাতেও ঝুঁকি আছে, পরিবেশ পরিস্থিতি অর্থাত্ মার্কেটের ওঠা নামার উপর নির্ভর করে। তবে দেখা গেছে দীর্ঘ সময় ধরে লগ্নি করে রাখলে লাভই হয়। তবে ভালো করে স্টাডি করে টাকা রাখা উচিৎ । অথবা পরিচিত এজেন্ট এর মাধ্যমে করা উচিৎ।' প্রতীক কয়দিন ধরেই ভাবছে সে বিষয়ে । সে সরকারি সংস্থা ছাড়া কোন বেসরকারি সংস্থায় টাকা রাখেনি আজও। পি.এফ,পি.পি.এফ ছাড়া কোথাও টাকা জমা রাখেনা । এখানেই যা আছে । আর কিছু নেই । শেয়ার মার্কেট বিষয়ে বিশেষ ধারণাও নেই। সে কয়দিন ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই হেঁটে এসেই মোবাইল নিয়ে বসে যায়। সংসার ও ছেলের দিকে নজর যেটুকু দিতেন তাও আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইলের স্ক্রিন শুধু উপরে নীচে স্ক্রল করে চলে। সেদিন একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন দেখে চোখ থেমে যায় তার উপরে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কিম। বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে দেশের কেন্দ্রীয় স্তরের নেতা,কখনো দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি। এটা দেখে প্রতীকের এই স্কিমের সত্যতা বিষয়ে কোনই সন্দেহ থাকে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও দেখলো ঠিক আছে। লেখা আছে লিঙ্কে ক্লিক করে মোবাইল নাম্বার এবং Gmail দিলেই মিনিট দশেক পরে একজন কথা বলবে। এককালীন বাইস হাজার টাকা লগ্নি করলে প্রতিদিন ষাট, মাসে দুই লক্ষের বেশি মাসিক আয় সম্ভ ! বিজ্ঞাপনের নীচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন তারা কেউ কেউ মাসে চার লক্ষের অধিকও আয় করেছেন। দুই একজন এটাকে 'ফ্রড'ও বলেছেন। সত্য আর মিথ্যার মধ্যে দোদুল্যমান প্রতীকের মন মিথ্যার মায়াজালে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়লো। এবার সে দিনরাত ভবিষ্যৎ ধনী জীবনের স্বপ্নের স্বকল্পিত আবেশের ঘোরে ঘুরে চললো। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো সাথেই আলোচনা করলোনা । এটা কী জাদু ? অল্প সময়ে অধিক টাকা কী ভাবে অর্জন সম্ভব? বিজ্ঞাপন দাতাগণ বলছেন আধুনিক এ.আই প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ং এ.আই বিদেশে ট্রেডিং করে নিশ্চিত আয় করে দেবে লগ্নিকারির হয়ে। এ.আই বর্তমান প্রযুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ। দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় চিকিৎসা বিজ্ঞান একে ব্যবহার করছে। এমন বহু যুক্তি প্রতীকের মনকে বিশ্বাসের কষ্টিপাথরে ঘষে উত্তীর্ণ হলো । প্রতীকের বিশ্বাস দৃঢ় হলো সে টাকা লগ্নি করলো। সে বুঝলো সে কোন ভুল করেনি। কিন্তু তার মনে এই ভাবনা এলোনা এই এ.আইকে ব্যবহার করে শঠ ও ঠগেরদল অসৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। এ.আই এর মাধ্যমে স্বনামধন্য নেতা শিল্পপতিদের ইলিউশন প্রতিকৃতিকে উপস্থাপনের মুন্সীয়ানায় সত্য বলে প্রচার মাধ্যমে চালিয়ে জালিয়াতের সূক্ষ্মছকের পরিকল্পিত ফাঁদ পাততে পারে। যারা বুঝতে পারে তারা সাবধান থাকে আর যারা এই রহস্যময় কুহেলিকা ভেদ করতে পারে না তারা সর্বসান্ত হয়। প্রতীকের বিশ্বাস ছিল এটা তেমন নয়। তাই আয়ের এমন সহজ ও সৎ পথ পেয়ে মনের যাবতীয় ভাবনা সব দূর হয়ে‌ যায়। ছেলের লেখাপড়া অর্থ আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা । এটাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিলো। দুর্গাপূজাটা এবার তার ভালোভাবেই পার হলো । আগামী নববর্ষের সময় তার আর্থিক অবস্থা উন্নতির চরম শিখরকে স্পর্শ করবে সেকথা যতোবার ভেবেছে ততবারই তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারির হিমালয়ের প্রথম শীর্ষদেশ ছোঁয়ার শিহরণ সমস্ত শরীর দিয়ে বয়ে যেতে লাগলো।
           
মনে মনে কতো টাকা সে আগামী পাঁচ বছরে আয় করবে তার একটি ধারণা করে নিলো। সে মনে মনে ভেবেছে, 'টাকা বেশি হলো জমি কিনে রাখবে। বই পড়তে ভালোবাসে প্রচুর টাকার বই কিনবে। যতো ঋণ আছে পরিশোধ করে দেবে। মেধাবী কিন্তু অভাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করবে। এমন কতো কী ভাবনা তার মনের মধ্যে খড়কুটোর মতো জমতে জমতে এক অলীক অট্টালিকা গড়ে চললো প্রতিদিন! অন্যদিকে সেই ফ্রডেরা তার সঙ্গে আলাপের আড়ালে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই জালিয়াতি করে জেনে নিলো, কিন্তু প্রতীক ঘূণাক্ষরেও সেটা টের পেলো না। 
                  
সন্ধ্যায় চা পান করতে করতে প্রথমে বাংলা খবর পরে হিন্দি খবর নিয়মিত শোনে। প্রতিদিন একটি ইংরেজি খবরের কাগজ রাখে, নিজেও পড়ে ছেলেকেও পড়তে হয়। পৃথিবীতে চলেছে ভয়ানক যুদ্ধ। চলছে রাশিয়া ইউক্রেনের কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ । কোন পক্ষকেই থামানো যাচ্ছে না। বারে বারে শান্তি বার্তা ব্যর্থ হচ্ছে। হামাসদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইজরায়েল গাজায় ভয়ানক ভাবে মিশাইয়া বর্ষণ করে চলেছে দিনে রাতে । ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগামে নৃশংস নারকীয় হত্যা করলো পাকিস্তান প্রেরিত আতঙ্কবাদী। ভারত গুঁড়িয়ে দিলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অবস্থিত আতঙ্কবাদীদের ক্যাম্পগুলো। দুই দিন দুদেশের মধ্যে যুদ্ধের পর পাকিস্তানের যুদ্ধ বন্ধের আবেদন পর শান্তিপ্রিয় ভারত যুদ্ধ থামালো । পৃথিবীর ধনী দেশ সমূহ নানা অছিলায় ছোট ছোট দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে রাখে, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির জন্য। খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম মতো মূল্যবান খনিজের জন্য। কেউ চায় নিজের ভূভাগের বিস্তারের জন্য। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলেও খন্ড খন্ড যুদ্ধ হয়েই চলছে। প্রতীক মনে করে মানুষের লোভ, অহংকার ও আগ্ৰাসী মনোভাব পারমাণবিক যুদ্ধ না বাঁধিয়ে দেয় । টি.ভি তে কোথাও ভালো খবর সে খুঁজে পায়না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'আমাদের তো জীবন একরকম কেটে গেলো, আমাদের ছেলেমেয়েদের কী যে হবে ? যুদ্ধের প্রভাব সারা পৃথিবীর অর্থনীতির উপর গভীর ভাবে পড়ে চলেছে। নিত্যদিনের জিনিস পত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজে অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়। কর্মক্ষম বলিষ্ঠ যুবসমাজ কাজের অভাবে আশ্রয় নেয় মাদকের মাঝে, আবার অর্থের চাহিদা মেটাতে যুক্ত হয়ে যায় বেআইনি কাজে । এমন সময় তার ছেলেটা ঘরে ঢুকে বললো 'বাবা আজ পড়াবে না ' ? 
 
                  ছেলেকে পড়ানোর পরে ফেসবুকে পরিচিত অপরিচিতের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বিশেষ ঘটনার আপডেট দিচ্ছেন ও নিচ্ছেন। বিষয়টি মনমতো হলে লাইক দিচ্ছেন, বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে যান,অরাজনৈতিক বিষয়ে কমেন্ট করেন আর শিক্ষামূলক বিষয় হলে তাকে শেয়ার করেন। বিশেষ কিছু ছবিও সেভ করে রাখছেন। এমন করতে করতে হঠাৎ একটি ফোন এলো, অজানা নম্বর‌ থেকে । কলটি রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে ভেসে এলো অবাংলাভাষী একটি লোকের গলা । তিনি পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি সেই অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার যার দায়িত্বে প্রতীকের লগ্নি করা টাকা আছে। যে তার টাকাকে বিদেশি কোম্পানিতে বিনিয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন, প্রতীকের লাভ হলে তিনি কমিশন পাবেন, কোন ছল চাতুরী এখানে নেই । It is fully Transparent and Reliable Trading । সেই লোকটি বলেছে,' আপ প্রতীক বাবু বিলকুল চিন্তা মত কিজিয়ে আপকে পয়সেকো ইতনা রিটার্ন দেঙ্গে আপকা হর তকলিপ আগে চলকে বিলকুল সমাপ্ত হো যায়েগা ।' এই কথায় পরে অবিশ্বাস করার মতো কিছু সে পেলোনা । এরপর তাকে প্রাইম ট্রেডের নামে গুগলে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিলো । একটি পাসওয়ার্ড দিলো । তারপরে তাকে নতুন পাসওয়ার্ড তৈরি করতে বললো । এটাও বললো এটা যেন প্রতীক কারো সাথে সেয়ার না করে এমনকি তার (অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার) সাথেও না । একটি কোড নম্বর দিয়ে বললো কেউ ফোন করলে কোড নম্বর টি ঠিক করে বলার পরই তবে কথা বলতে। এভাবেই তার সাথে প্রতীকের কথা চলতে থাকে মাঝে মাঝে। প্রতীক লোকটির কথায় বিশ্বাস করে নিজের সম্পর্কে সব কথা বলে, নিজের স্বপ্নের কথা বলে। নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে কথা হয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও হয়। একমাস কেটে যায় । কিন্তু প্রতীক দেখে তার টাকা কখনো পঁচিশ কখনো ত্রিরিশ হাজার হয়‌, তার বেশি না। প্রতীকের মনে খটকা লাগতে শুরু করে । লোকটি প্রতীকের কাছে আরও টাকা চায় ট্রেডের জন্য। প্রতীক বলেন, আর টাকা দেবো না, যা হওয়ার এই টাকাতেই হবে।' লোকটি তাকে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। প্রতীক রাজি হয়না। প্রতীক বুঝেছে তার টাকা বহুগুণে বৃদ্ধি তো হবেই না বরং টাকাটি তুলে নিতে হবে।
    
২০২৫ সাল । এর মধ্যে দুর্গাপূজা চলে এসেছে। লোকটি বারেবারে ফোন করে, প্রতীক কখনো ফোন ধরে বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে যায়। লোকটি একই কথা বলে। এভাবেই পুরাতন বছর চলে যায়। নতুন বছরের সূচনা হয় ২০২৬ এর হাত ধরে। বছরটি পৃথিবীর পুরানো বছরের যুদ্ধ সঙ্গে করেই যেন এসেছে। নতুন বছরে অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার আর ফোন করে না প্রতীককে। সে ভাবে এবার টাকাটা তুলে নেবো । কিন্তু স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ব্যস্ততায় সব ভুলে যায়। 
         
মাঝে প্রতীকই লোকটি যে নাম্বারগুলোতে ফোন করতো সে গুলোতে ফোন করে, যে হোয়াটসঅ্যাপ দিয়েছিল সেখানে ম্যাসেজ করে কোন উত্তর পায়না । ঠিক করে লগ্নি করা পুরো টাকাটি সে তুলে নেবে।
কয়দিন ধরেই তার বাম চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে ডাক্তার দেখায় । চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করতে হয়, চোখের পরীক্ষা করতে হবে ডাক্তার বলেন । তিনি তার জন্য  নির্দিষ্ট তারিখ নেন । সাত দিন পরে পরীক্ষাটি করবেন। তিনি একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই সবকিছু করতেন। তার স্যালারি একাউন্টও এটাই । ফ্রড কী করতে পারে শুনেছেন কিন্তু কখনো এর করুন অভিজ্ঞতা হয়নি ! প্রতীক তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে আমার টাকা না বৃদ্ধি পেলেও এরা ফ্রড নয় । 
                 
স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে ইভিনিং ওয়াকে নিত্যদিনের মতো বেড়িয়েছে। পথে যেতে যেতে অবিনাশ বললো শোন শোন আমার অফিসের একজন সহকর্মী প্রিয়তোষ মোদক মোবাইলে একটা বিজ্ঞাপন দেখে। সেখানে বলা হয় আপনি ৫০০ টাকা আমাদের নীচে দেওয়া নম্বরে মাধ্যমে ডিপোজিট করলে এক ঘন্টার মধ্যে এ.আই তাকে দ্বিগুণ করবে। সত্যিই তাই হলো। সেই লোভে সে পঞ্চাশ হাজার টাকা একেবারে লগ্নি করলো । এক ঘণ্টা করে করে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলো, দুদিন পরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লক্ষ টাকা ফ্রড হয়ে গেছে। তারপরে সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করা, ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে আবেদন পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্টকে হোল্ড করে রাখা এবং তিনি তিন দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে এ.নো.সি নেওয়া, শেষে উকিলের দ্বারস্থ হতে হওয়া । এসব কথা শুনে প্রতীক বললো,' আমার পুলিশ আদালতে ভীষণ ভয় । একবার এদের পাল্লায় পড়লে আর রক্ষে নেই। এদের থেকে শতসহস্র হস্ত আমি দূরে থাকতে ভালোবাসি। ইদানিং ব্যাঙ্কে কোন কাজ নিয়ে গেলে সেদিনটি সেখানেই কেটে যায়। মেলার মতো ভীড় সেখানে প্রতিদিন। ওদের কাজের চাপ বেড়েছে। ইদানিং এস.আই.আর এর কাজে বহু কর্মী নিযুক্ত থাকায় কাজ খুব ধীর গতিতে চলছে ।' বাড়ির কাছে এসে বন্ধুদের বললো,'আগামীকাল বিকালে চোখের ডাক্তার দেখাতে যাবো হাঁটতে যাবো না।' 'ঠিক আছে' বলে সবাই চলে গেলো।

                     প্রতীক বাড়িতে ঢুকবে এমন সময় তার পাশের বাড়ির ছেলে চিত্রাঙ্কন চক্রবর্তী সামনে এসে দাঁড়ালো,পরনে  উকিলের পোশাক । প্রতীক দেখে বললো কবে ওকালতি পাশ করলি । খুব ভালো হয়েছে। তোর বাবা আর তুই দুজনেই উকিল । ভালোই হলো ।' প্রতীক মনে মনে ভাবছে 'ভগবান না
করুক তাকে যেন কখনো আইন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়'।
            
বাড়িতে ঢুকে হাত পা ধুয়ে চা পানের পরে ডাক্তারকে দেখানো আগের প্রেসক্রিপশন ওষুধ একটি জায়গায় জড়ো করলো। মাসের শেষের দিক। অ্যাকাউন্টে দশ-বারো হাজার টাকা ছিল। সেদিন কিছু বাজার করেছিল।একবার ভাবলো দেখি কতো টাকা আছে ?' yono অ্যাপটি ওপেন করেই চক্ষু চড়কগাছ। তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা উধাও। তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকায় সেখানে থেকেও অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার নামক ফ্রড ব্যক্তিটি এবং তার দল তার মোবাইল হ্যাক করে টাকা চুরি করে নেয়। প্রায় এক লাখের মতো টাকা চুরি হয়ে যায়।তার স্বপ্ন মুহূর্তে কাঁচের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে রঙ্গিন ভবিষ্যৎ জীবনের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তার জীবনে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সময়। মাথাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে। জীবনে সে এতোটা অসহায় বোধ করেনি। প্রথমে এ.টি.ম লেনদেনকে ব্যাঙ্কের টোলফ্রি নম্বরে ফোন করে বন্ধ করেন । সকাল হতেই সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করেন । ব্যাংকে যোগাযোগ করেন। নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করে, পুরনো অ্যাকাউন্টটি হোল্ড করে রাখেন। কারণ এটাতেই তার স্যালারি ক্রডিট হয়ে থাকে। কয়দিন পরে সাইবার ক্রাইমের অফিস থেকে তাকে ফোন 
করা হয় বলা হয় তার টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তবে আদালতে তাকে অভিযোগের প্রমাণ পত্রটি সহ উকিল সহ নিজেকে হাজির হতে হবে। হারানো টাকার কথা চিন্তা করে সন্ধ্যার সময় ছিন্নমূল,সর্বহারা মৃতপ্রায় মানুষের মতো পাশের বাড়ির চিত্রাঙ্কন উকিলের বাবা উকিল চিন্ময় চক্রবর্তী মহাশয়ের চেম্বারের বন্ধ দরজায় এসে টোকা দিয়ে বললো, 'কাকু আমি প্রতীক দরজাটা খোলো তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।' আর অবিনাশের সেই সহকর্মীর কথাই তার মনের মধ্যে ফুটন্ত জলের মতো ওঠানামা করতে লাগলো ।