Saturday, April 4, 2026


 

ফ্রড

অভিজিৎ সেন 

মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র স্বপ্ন । এমনকি অলীক কল্পনাকেও সত্য বলে নিত্যদিনের পোশাকের মতো মনের শরীরে পরিধান করে থাকে যেন অদৃশ্য কোন বস্তু । সে সময় যুক্তি বুদ্ধিকে রেখে দেওয়া হয় নিষ্ক্রিয় করে। মিথ্যা স্বপ্ন বারে বারে মস্তিষ্ককে আঘাত করতে থাকে,একসময় মিথ্যা বিষয়কেও সত্য ভেবে নেয় চিন্তাস্রোত। অবাস্তবকেই মন বাস্তব বলে প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। প্রতীক চৌধুরী বয়স পঞ্চাশ, পেশায় শিক্ষক। একটি ছেলে। নবম শ্রেণির ছাত্র। মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে দুকাঠা জমি কিনে একতলার ছাদ দিয়ে নব নির্মিত বাড়িতে উঠে আসে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে দিয়ে। প্রতি মাসে মাইনার সিংহভাগ অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে এসে রাতে সপ্তাহে একদিন কয়েকটি ছাত্র পড়িয়ে নিত্যদিনের যাতায়াতের গাড়ির ভাড়া ও হাত খরচের টাকাটা তুলে নেয়। 
                   
ছেলেটি লেখাপড়ায় ভালো। ছেলেটির ভবিষ্যতে যাতে লেখাপড়ার পথে আর্থিক সমস্যা বাধা হয়ে 
না দাঁড়ায় সেই বিষয়ে প্রতীক দিনরাত ভাবে। রাতে নিরিবিলিতে স্ত্রী মেঘার সঙ্গে বলে,' প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও খুব বেশি জমেনি, আর অবসরের পর পেনসন যা পাওয়া যাবে তাতে আমাদের কোন ভাবে চলে যাবে। সম্পত্তি বলতে এ বাড়িটি। ছেলেটির লেখাপড়ার খরচ কীকরে যে চালাবো ? আরতো মাত্র দুবছর চাকরি আছে । ভাবছি কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটাবো। তুমি কি বলো ?' 'আমি আর কী বলবো, আমি কী এসব বুঝি,যা করবে ভেবে চিন্তে করো। ঠগ লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বুঝেশুনে করো ।' 
                  স্কুল থেকে ফিরে বিকেলের দিকে হাঁটতে বেড়ায় নিয়মিত। ঘন্টা খানেক হেঁটে এসে চা পান পর্বের পর ছেলেকে নিয়ে বসে। ঘন্টা দুই পড়ানোর পরে সে ফ্রি। রবিবার কয়েকটি ছাত্র পড়াতে বাইরে যায় । সেদিন বাড়ি ফিরে আসে রাত দশটায়। এই তার নিত্যদিনের ছকবদ্ধ কাজের খতিয়ান। বাড়ির সিংহভাগ কাজের দায়িত্ব স্ত্রী মেঘাই পালন করে থাকে। 
        
কতো স্বপ্ন ছেলেকে ঘিরে। লেখাপড়ার জন্য চাই মেধা, শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্ৰহণের চাহিদা,চাই প্রচুর অর্থও। ছেলেটির মধ্যে সেসবই আছে। কিন্তু প্রতীকের জমানো অর্থের পরিমাণ কম। ছেলে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েই লেখাপড়া করবে। জয়েন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডাক্টার হতে চায়। এখন থেকেই সে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করে। সময়ের অপচয় করে না। ছেলের প্রবল আগ্রহের কারণে প্রতীক দিনরাত চিন্তা করে কীভাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লক্ষাধিকের বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে সৎভাবে পরিশ্রম করে? কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সে কখনোই কঠোর শ্রম করতে পারেনি। যা মাইনা পায় তাতে সংসার চলে যায়।সামাজিকতা,ঔষধের খরচ,উৎসবের বাজার, দেশের দর্শনীয় স্থানে বছরে একবার ভ্রমণ সবমিলিয়ে খুব হিসেব করেই চলে প্রতীক ও মেঘা । ইভিনিং ওয়াকের সময় বন্ধুরা বলেছিল 'কিছু টাকা শেয়ারে, কমকরে পাঁচ বছরের জন্য লগ্নি করে রাখলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায় অন্ত্যত ফিক্সড ডিপোজিটের তুলনায়। তবে এটাতেও ঝুঁকি আছে, পরিবেশ পরিস্থিতি অর্থাত্ মার্কেটের ওঠা নামার উপর নির্ভর করে। তবে দেখা গেছে দীর্ঘ সময় ধরে লগ্নি করে রাখলে লাভই হয়। তবে ভালো করে স্টাডি করে টাকা রাখা উচিৎ । অথবা পরিচিত এজেন্ট এর মাধ্যমে করা উচিৎ।' প্রতীক কয়দিন ধরেই ভাবছে সে বিষয়ে । সে সরকারি সংস্থা ছাড়া কোন বেসরকারি সংস্থায় টাকা রাখেনি আজও। পি.এফ,পি.পি.এফ ছাড়া কোথাও টাকা জমা রাখেনা । এখানেই যা আছে । আর কিছু নেই । শেয়ার মার্কেট বিষয়ে বিশেষ ধারণাও নেই। সে কয়দিন ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই হেঁটে এসেই মোবাইল নিয়ে বসে যায়। সংসার ও ছেলের দিকে নজর যেটুকু দিতেন তাও আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইলের স্ক্রিন শুধু উপরে নীচে স্ক্রল করে চলে। সেদিন একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন দেখে চোখ থেমে যায় তার উপরে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কিম। বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে দেশের কেন্দ্রীয় স্তরের নেতা,কখনো দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি। এটা দেখে প্রতীকের এই স্কিমের সত্যতা বিষয়ে কোনই সন্দেহ থাকে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও দেখলো ঠিক আছে। লেখা আছে লিঙ্কে ক্লিক করে মোবাইল নাম্বার এবং Gmail দিলেই মিনিট দশেক পরে একজন কথা বলবে। এককালীন বাইস হাজার টাকা লগ্নি করলে প্রতিদিন ষাট, মাসে দুই লক্ষের বেশি মাসিক আয় সম্ভ ! বিজ্ঞাপনের নীচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন তারা কেউ কেউ মাসে চার লক্ষের অধিকও আয় করেছেন। দুই একজন এটাকে 'ফ্রড'ও বলেছেন। সত্য আর মিথ্যার মধ্যে দোদুল্যমান প্রতীকের মন মিথ্যার মায়াজালে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়লো। এবার সে দিনরাত ভবিষ্যৎ ধনী জীবনের স্বপ্নের স্বকল্পিত আবেশের ঘোরে ঘুরে চললো। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো সাথেই আলোচনা করলোনা । এটা কী জাদু ? অল্প সময়ে অধিক টাকা কী ভাবে অর্জন সম্ভব? বিজ্ঞাপন দাতাগণ বলছেন আধুনিক এ.আই প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ং এ.আই বিদেশে ট্রেডিং করে নিশ্চিত আয় করে দেবে লগ্নিকারির হয়ে। এ.আই বর্তমান প্রযুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ। দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় চিকিৎসা বিজ্ঞান একে ব্যবহার করছে। এমন বহু যুক্তি প্রতীকের মনকে বিশ্বাসের কষ্টিপাথরে ঘষে উত্তীর্ণ হলো । প্রতীকের বিশ্বাস দৃঢ় হলো সে টাকা লগ্নি করলো। সে বুঝলো সে কোন ভুল করেনি। কিন্তু তার মনে এই ভাবনা এলোনা এই এ.আইকে ব্যবহার করে শঠ ও ঠগেরদল অসৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। এ.আই এর মাধ্যমে স্বনামধন্য নেতা শিল্পপতিদের ইলিউশন প্রতিকৃতিকে উপস্থাপনের মুন্সীয়ানায় সত্য বলে প্রচার মাধ্যমে চালিয়ে জালিয়াতের সূক্ষ্মছকের পরিকল্পিত ফাঁদ পাততে পারে। যারা বুঝতে পারে তারা সাবধান থাকে আর যারা এই রহস্যময় কুহেলিকা ভেদ করতে পারে না তারা সর্বসান্ত হয়। প্রতীকের বিশ্বাস ছিল এটা তেমন নয়। তাই আয়ের এমন সহজ ও সৎ পথ পেয়ে মনের যাবতীয় ভাবনা সব দূর হয়ে‌ যায়। ছেলের লেখাপড়া অর্থ আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা । এটাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিলো। দুর্গাপূজাটা এবার তার ভালোভাবেই পার হলো । আগামী নববর্ষের সময় তার আর্থিক অবস্থা উন্নতির চরম শিখরকে স্পর্শ করবে সেকথা যতোবার ভেবেছে ততবারই তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারির হিমালয়ের প্রথম শীর্ষদেশ ছোঁয়ার শিহরণ সমস্ত শরীর দিয়ে বয়ে যেতে লাগলো।
           
মনে মনে কতো টাকা সে আগামী পাঁচ বছরে আয় করবে তার একটি ধারণা করে নিলো। সে মনে মনে ভেবেছে, 'টাকা বেশি হলো জমি কিনে রাখবে। বই পড়তে ভালোবাসে প্রচুর টাকার বই কিনবে। যতো ঋণ আছে পরিশোধ করে দেবে। মেধাবী কিন্তু অভাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করবে। এমন কতো কী ভাবনা তার মনের মধ্যে খড়কুটোর মতো জমতে জমতে এক অলীক অট্টালিকা গড়ে চললো প্রতিদিন! অন্যদিকে সেই ফ্রডেরা তার সঙ্গে আলাপের আড়ালে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই জালিয়াতি করে জেনে নিলো, কিন্তু প্রতীক ঘূণাক্ষরেও সেটা টের পেলো না। 
                  
সন্ধ্যায় চা পান করতে করতে প্রথমে বাংলা খবর পরে হিন্দি খবর নিয়মিত শোনে। প্রতিদিন একটি ইংরেজি খবরের কাগজ রাখে, নিজেও পড়ে ছেলেকেও পড়তে হয়। পৃথিবীতে চলেছে ভয়ানক যুদ্ধ। চলছে রাশিয়া ইউক্রেনের কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ । কোন পক্ষকেই থামানো যাচ্ছে না। বারে বারে শান্তি বার্তা ব্যর্থ হচ্ছে। হামাসদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইজরায়েল গাজায় ভয়ানক ভাবে মিশাইয়া বর্ষণ করে চলেছে দিনে রাতে । ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগামে নৃশংস নারকীয় হত্যা করলো পাকিস্তান প্রেরিত আতঙ্কবাদী। ভারত গুঁড়িয়ে দিলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অবস্থিত আতঙ্কবাদীদের ক্যাম্পগুলো। দুই দিন দুদেশের মধ্যে যুদ্ধের পর পাকিস্তানের যুদ্ধ বন্ধের আবেদন পর শান্তিপ্রিয় ভারত যুদ্ধ থামালো । পৃথিবীর ধনী দেশ সমূহ নানা অছিলায় ছোট ছোট দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে রাখে, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির জন্য। খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম মতো মূল্যবান খনিজের জন্য। কেউ চায় নিজের ভূভাগের বিস্তারের জন্য। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলেও খন্ড খন্ড যুদ্ধ হয়েই চলছে। প্রতীক মনে করে মানুষের লোভ, অহংকার ও আগ্ৰাসী মনোভাব পারমাণবিক যুদ্ধ না বাঁধিয়ে দেয় । টি.ভি তে কোথাও ভালো খবর সে খুঁজে পায়না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'আমাদের তো জীবন একরকম কেটে গেলো, আমাদের ছেলেমেয়েদের কী যে হবে ? যুদ্ধের প্রভাব সারা পৃথিবীর অর্থনীতির উপর গভীর ভাবে পড়ে চলেছে। নিত্যদিনের জিনিস পত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজে অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়। কর্মক্ষম বলিষ্ঠ যুবসমাজ কাজের অভাবে আশ্রয় নেয় মাদকের মাঝে, আবার অর্থের চাহিদা মেটাতে যুক্ত হয়ে যায় বেআইনি কাজে । এমন সময় তার ছেলেটা ঘরে ঢুকে বললো 'বাবা আজ পড়াবে না ' ? 
 
                  ছেলেকে পড়ানোর পরে ফেসবুকে পরিচিত অপরিচিতের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বিশেষ ঘটনার আপডেট দিচ্ছেন ও নিচ্ছেন। বিষয়টি মনমতো হলে লাইক দিচ্ছেন, বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে যান,অরাজনৈতিক বিষয়ে কমেন্ট করেন আর শিক্ষামূলক বিষয় হলে তাকে শেয়ার করেন। বিশেষ কিছু ছবিও সেভ করে রাখছেন। এমন করতে করতে হঠাৎ একটি ফোন এলো, অজানা নম্বর‌ থেকে । কলটি রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে ভেসে এলো অবাংলাভাষী একটি লোকের গলা । তিনি পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি সেই অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার যার দায়িত্বে প্রতীকের লগ্নি করা টাকা আছে। যে তার টাকাকে বিদেশি কোম্পানিতে বিনিয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন, প্রতীকের লাভ হলে তিনি কমিশন পাবেন, কোন ছল চাতুরী এখানে নেই । It is fully Transparent and Reliable Trading । সেই লোকটি বলেছে,' আপ প্রতীক বাবু বিলকুল চিন্তা মত কিজিয়ে আপকে পয়সেকো ইতনা রিটার্ন দেঙ্গে আপকা হর তকলিপ আগে চলকে বিলকুল সমাপ্ত হো যায়েগা ।' এই কথায় পরে অবিশ্বাস করার মতো কিছু সে পেলোনা । এরপর তাকে প্রাইম ট্রেডের নামে গুগলে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিলো । একটি পাসওয়ার্ড দিলো । তারপরে তাকে নতুন পাসওয়ার্ড তৈরি করতে বললো । এটাও বললো এটা যেন প্রতীক কারো সাথে সেয়ার না করে এমনকি তার (অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার) সাথেও না । একটি কোড নম্বর দিয়ে বললো কেউ ফোন করলে কোড নম্বর টি ঠিক করে বলার পরই তবে কথা বলতে। এভাবেই তার সাথে প্রতীকের কথা চলতে থাকে মাঝে মাঝে। প্রতীক লোকটির কথায় বিশ্বাস করে নিজের সম্পর্কে সব কথা বলে, নিজের স্বপ্নের কথা বলে। নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে কথা হয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও হয়। একমাস কেটে যায় । কিন্তু প্রতীক দেখে তার টাকা কখনো পঁচিশ কখনো ত্রিরিশ হাজার হয়‌, তার বেশি না। প্রতীকের মনে খটকা লাগতে শুরু করে । লোকটি প্রতীকের কাছে আরও টাকা চায় ট্রেডের জন্য। প্রতীক বলেন, আর টাকা দেবো না, যা হওয়ার এই টাকাতেই হবে।' লোকটি তাকে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। প্রতীক রাজি হয়না। প্রতীক বুঝেছে তার টাকা বহুগুণে বৃদ্ধি তো হবেই না বরং টাকাটি তুলে নিতে হবে।
    
২০২৫ সাল । এর মধ্যে দুর্গাপূজা চলে এসেছে। লোকটি বারেবারে ফোন করে, প্রতীক কখনো ফোন ধরে বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে যায়। লোকটি একই কথা বলে। এভাবেই পুরাতন বছর চলে যায়। নতুন বছরের সূচনা হয় ২০২৬ এর হাত ধরে। বছরটি পৃথিবীর পুরানো বছরের যুদ্ধ সঙ্গে করেই যেন এসেছে। নতুন বছরে অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার আর ফোন করে না প্রতীককে। সে ভাবে এবার টাকাটা তুলে নেবো । কিন্তু স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ব্যস্ততায় সব ভুলে যায়। 
         
মাঝে প্রতীকই লোকটি যে নাম্বারগুলোতে ফোন করতো সে গুলোতে ফোন করে, যে হোয়াটসঅ্যাপ দিয়েছিল সেখানে ম্যাসেজ করে কোন উত্তর পায়না । ঠিক করে লগ্নি করা পুরো টাকাটি সে তুলে নেবে।
কয়দিন ধরেই তার বাম চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে ডাক্তার দেখায় । চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করতে হয়, চোখের পরীক্ষা করতে হবে ডাক্তার বলেন । তিনি তার জন্য  নির্দিষ্ট তারিখ নেন । সাত দিন পরে পরীক্ষাটি করবেন। তিনি একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই সবকিছু করতেন। তার স্যালারি একাউন্টও এটাই । ফ্রড কী করতে পারে শুনেছেন কিন্তু কখনো এর করুন অভিজ্ঞতা হয়নি ! প্রতীক তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে আমার টাকা না বৃদ্ধি পেলেও এরা ফ্রড নয় । 
                 
স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে ইভিনিং ওয়াকে নিত্যদিনের মতো বেড়িয়েছে। পথে যেতে যেতে অবিনাশ বললো শোন শোন আমার অফিসের একজন সহকর্মী প্রিয়তোষ মোদক মোবাইলে একটা বিজ্ঞাপন দেখে। সেখানে বলা হয় আপনি ৫০০ টাকা আমাদের নীচে দেওয়া নম্বরে মাধ্যমে ডিপোজিট করলে এক ঘন্টার মধ্যে এ.আই তাকে দ্বিগুণ করবে। সত্যিই তাই হলো। সেই লোভে সে পঞ্চাশ হাজার টাকা একেবারে লগ্নি করলো । এক ঘণ্টা করে করে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলো, দুদিন পরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লক্ষ টাকা ফ্রড হয়ে গেছে। তারপরে সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করা, ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে আবেদন পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্টকে হোল্ড করে রাখা এবং তিনি তিন দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে এ.নো.সি নেওয়া, শেষে উকিলের দ্বারস্থ হতে হওয়া । এসব কথা শুনে প্রতীক বললো,' আমার পুলিশ আদালতে ভীষণ ভয় । একবার এদের পাল্লায় পড়লে আর রক্ষে নেই। এদের থেকে শতসহস্র হস্ত আমি দূরে থাকতে ভালোবাসি। ইদানিং ব্যাঙ্কে কোন কাজ নিয়ে গেলে সেদিনটি সেখানেই কেটে যায়। মেলার মতো ভীড় সেখানে প্রতিদিন। ওদের কাজের চাপ বেড়েছে। ইদানিং এস.আই.আর এর কাজে বহু কর্মী নিযুক্ত থাকায় কাজ খুব ধীর গতিতে চলছে ।' বাড়ির কাছে এসে বন্ধুদের বললো,'আগামীকাল বিকালে চোখের ডাক্তার দেখাতে যাবো হাঁটতে যাবো না।' 'ঠিক আছে' বলে সবাই চলে গেলো।

                     প্রতীক বাড়িতে ঢুকবে এমন সময় তার পাশের বাড়ির ছেলে চিত্রাঙ্কন চক্রবর্তী সামনে এসে দাঁড়ালো,পরনে  উকিলের পোশাক । প্রতীক দেখে বললো কবে ওকালতি পাশ করলি । খুব ভালো হয়েছে। তোর বাবা আর তুই দুজনেই উকিল । ভালোই হলো ।' প্রতীক মনে মনে ভাবছে 'ভগবান না
করুক তাকে যেন কখনো আইন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়'।
            
বাড়িতে ঢুকে হাত পা ধুয়ে চা পানের পরে ডাক্তারকে দেখানো আগের প্রেসক্রিপশন ওষুধ একটি জায়গায় জড়ো করলো। মাসের শেষের দিক। অ্যাকাউন্টে দশ-বারো হাজার টাকা ছিল। সেদিন কিছু বাজার করেছিল।একবার ভাবলো দেখি কতো টাকা আছে ?' yono অ্যাপটি ওপেন করেই চক্ষু চড়কগাছ। তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা উধাও। তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকায় সেখানে থেকেও অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার নামক ফ্রড ব্যক্তিটি এবং তার দল তার মোবাইল হ্যাক করে টাকা চুরি করে নেয়। প্রায় এক লাখের মতো টাকা চুরি হয়ে যায়।তার স্বপ্ন মুহূর্তে কাঁচের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে রঙ্গিন ভবিষ্যৎ জীবনের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তার জীবনে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সময়। মাথাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে। জীবনে সে এতোটা অসহায় বোধ করেনি। প্রথমে এ.টি.ম লেনদেনকে ব্যাঙ্কের টোলফ্রি নম্বরে ফোন করে বন্ধ করেন । সকাল হতেই সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করেন । ব্যাংকে যোগাযোগ করেন। নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করে, পুরনো অ্যাকাউন্টটি হোল্ড করে রাখেন। কারণ এটাতেই তার স্যালারি ক্রডিট হয়ে থাকে। কয়দিন পরে সাইবার ক্রাইমের অফিস থেকে তাকে ফোন 
করা হয় বলা হয় তার টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তবে আদালতে তাকে অভিযোগের প্রমাণ পত্রটি সহ উকিল সহ নিজেকে হাজির হতে হবে। হারানো টাকার কথা চিন্তা করে সন্ধ্যার সময় ছিন্নমূল,সর্বহারা মৃতপ্রায় মানুষের মতো পাশের বাড়ির চিত্রাঙ্কন উকিলের বাবা উকিল চিন্ময় চক্রবর্তী মহাশয়ের চেম্বারের বন্ধ দরজায় এসে টোকা দিয়ে বললো, 'কাকু আমি প্রতীক দরজাটা খোলো তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।' আর অবিনাশের সেই সহকর্মীর কথাই তার মনের মধ্যে ফুটন্ত জলের মতো ওঠানামা করতে লাগলো ।

No comments:

Post a Comment