শেষ গরাস
লীনা রায়
নার্সিংহোম থেকে বডি হ্যান্ড ওভার করল বেলা দুটোয়। সেখান থেকে মেডিক্যাল কলেজে। কাগজপত্রে সই সাবুদ করে ওদের হাতে রিনিকে তুলে দেয় সব্যসাচী। যদিও ওখানে রিনির পরিচয় ছিল বডি বলে। আজ সকালেও ওকে রিনি বলেই ডেকেছে সব্য। দুপুরও পেরোয়নি। এরই মধ্যেই তার নাম হারিয়ে গেছে। রিনির হাতটা শেষবারের মতো নিজের হাতে নিয়েছিল। কী অসম্ভব ঠান্ডা! কেঁপে উঠেছিল সব্য।
রিনির চলে যাবার খবর বিশ্ব সবাইকে জানিয়েছিল। কারণ বিশ্ব ওর আত্মীয় স্বজন প্রায় সবাইকে চেনে। মেহুলকে ও নিজে ফোন করেছিল। পর পর তিনবার ফোন করেও কথা হয়নি। বুঝেছিল ছেলে তখন গভীর ঘুমে।
একে একে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী অনেকেই নার্সিংহোমে চলে আসে। খুব স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছে সব্য। সবার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ভেতরের ভাঙ্গন বুঝতে দেয়নি।
সব কাজ মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত হয়েছিল বেশ। অনেকে এসেছিল সঙ্গে। কিছুক্ষন থেকে একে একে সবাই চলে যাবার পর সব্য বাথরুমে যায়। অনেকক্ষন সময় নিয়ে চান করে। চান সেরে ঘরে ঢুকতেই মেহুলের ফোন আসে। নিজেকে শান্ত রেখে সারাদিনের সব ঘটনা ছেলেকে বলে। কথা বলতে বলতে বুঝতে পারে ছেলে কাঁদছে। সব্য ফোন কেটে বালিশে মাথা রাখে।
প্রতিদিনের মতো গতকালও সব্য মর্নিং ওয়াক সেরে ফেরার সময় দুধ, ডিম, পাউরুটি এনেছে। বাড়ি ফিরে রিনির সঙ্গে বসে চা খেয়েছে। খবরের কাগজ পড়েছে। একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করেছে। এরপর রিনি রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর সব্য যায় ওষুধের দোকানে।
ওষুধ কিনে, একটু গল্প করে ঘন্টা খানেক বাদে বাড়ি ফিরে আসে। চাবি সঙ্গেই ছিল। ঘরে ঢুকেই দেখে বসার ঘরের সোফার পাশে রিনি পড়ে আছে। জ্ঞান নেই।
বিশ্বকে ফোন করে ডাকে সব্য। রিনিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসার সুযোগটুকুও পাওয়া যায় না। মেডিক্যালে রিনির দেহ তুলে দেবার সময় ওর বরফ ঠান্ডা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েছিল সব্য। মনে মনে প্রশ্ন করেছিল, “এত তাড়া কিসের?”
সারা রাত দু' চোখের পাতা এক করতে পারেনি। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে ভোরের আবছা আলো। সব্য শুয়েই থাকে। আজ কোন কিছুর তাড়া নেই। সকাল হয়েছে। পর্দার ফাঁক গলে এক ফালি কাঁচা হলুদ রোদ সব্যর গায়ে এসে পড়েছে। সব্য শুয়েই থাকে। বেলা বাড়ে। রোদের রং বদলে এখন গাঢ় হলুদ। শরীরটাকে মনে হচ্ছে বড্ড ভারি। তবুও ওঠে সব্য, উঠতে হয়।
স্নান সেরে নেয়। গতকাল ব্রেকফাস্ট করার পর আর কিছুই মুখে তোলেনি। মাথায় জল পড়তেই খিদে বোধ হয়। ফ্রিজ খুলে দেখে পনিরের তরকারি আছে। রাতের জন্য হয়ত করে রেখেছিল রিনি। খাবার গরম করে খেতে বসে। রিনির রান্না করা শেষ খাবার। এক টুকরো পনীর মুখে দেয় সব্য। জিভের প্রতিটি অংশে স্বাদটাকে অনুভব করতে চায়। এক একটা পনীরের টুকরোর সঙ্গে ত্রিশ বছরের একটা সংসার যেন একটু একটু করে ফুরিয়ে আসছিল। পনিরের বাটিটাকে দু' হাতে শক্ত করে চেপে ধরে অস্ফুটে বলে, ‘এত তাড়া কিসের ছিল রিনি?’ আর কিছু বলতে পারে না। তীব্র কান্নার দমকে বাকি কথাগুলো হারিয়ে যায়।
No comments:
Post a Comment