শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে!
অনিতা নাগ
বাংলা ক্যালেনডারের শেষ পাতায় চৈত্র মাস। আর প্রথম পাতায় বৈশাখ। শেষ থেকেই শুরুর চলন শুরু। বারো মাসের তেরো পার্বন তখন শেষ। বছরের এই শেষটায় গৃহস্থের প্রিয় চৈত্র সেলের বাজার। সে বাজার সব পেয়েছির ভান্ডার নিয়ে অপেক্ষা করতো।খর চৈত্রের প্রখর তপনে পথে পথে ভিক্ষা পাত্র হাতে ঘুরে বেড়াতেন বাবা তারকনাথ এর ব্রতীরা। ‘বাবা তারকনাথের চরণের সেবা লাগি মহাদেব’, দরজায় এসে দাঁড়ালে চাল আলু আর পয়সা দেওয়া হতো তাদের। সারাদিনের ভিক্ষান্ন ফুটিয়ে সন্ধ্যের পর তাদের একান্ন খাওয়া। চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজন হতো। গাজনের ঝাঁপ হতো। এখনও গ্রামে গঞ্জে নিশ্চয় এই সব প্রথা প্রচলিত আছে। সংক্রান্তির আগের দিনটা বড্ড প্রিয় একটা দিন। সে'দিন নীল ষষ্ঠী। মা আর ঠাকুমা ‘র নীলের পূজো শেষে বরফ দেওয়া দইয়ের ঘোলের অপেক্ষা থাকতো সারাবছর। সাথে প্রসাদী ফল মিষ্টি তো আছেই। সংক্রান্তির মেলা, সে ছিলো এক উৎসব। সংক্রান্তি পেরোলে নতুন বছর। মাইকে গান হতো এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। নতুন জামা। মন্দিরে প্রার্থণা। হালখাতার লম্বা লাইন মন্দিরে মন্দিরে। বড়দের প্রণাম করে আশির্বাদ নেওয়া। ভালো রান্না। বিকেলে বাবার সাথে দোকানে দোকানে হালখাতা করতে যাওয়া। রঙিন সরবত, বাক্স ভরা মিষ্টি আর ক্যালেনডার।
জীবনের এই পর্ব পার করে প্রবাসে পাড়ি দেওয়া বিয়ের পর। সেখানে চৈত্র সেল নেই। গাজন সন্ন্যাসীদের আনাগোণা নেই। হালখাতা নেই। তবু চৈত্র শেষের ঝরাপাতার গুঞ্জরণ কানে কানে বলতো খর তপনের ঝুলি নিয়ে সে আসছে। সব দীনতা মুছিয়ে নতুন পাতায় সাজবে প্রকৃতি। জীবনও তো তেমনি এক যাপন। বারোমাসের এক আবতর্নে বাঁধা। ধরে রাখার উপায় নেই। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় নতুনকে স্বাগত জানানোর রীতি আলাদা, দিনক্ষণও আলাদা। তবু নতুনকে বরণ করে নেওয়ার ভিতরের ভাবনাটা একই। তখন তো দূরকে সহজে ছুঁয়ে ফেলার উপায় ছিলো না। নববর্ষের প্রণাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে চিঠি দেওয়া নেওয়া চলতো। বড়দের আশির্বাদ ভরা চিঠির অপেক্ষা থাকতো। রান্নাঘরে বিশেষ রান্না আর নতুন জামা কাপড় পড়া। এই ছিলো প্রবাসের নববর্ষ। বড়জোর বাঙালীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে আনন্দ করা।
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে জীবনের কতো কিছু পাল্টে গেলো। দূর এসে গেলো নাগালের মধ্যে। আত্মীয় পরিজনদের বাড়ী যাওয়ার চল বন্ধ হলো কোভিডকাল থেকে। এখন নববর্ষে আশির্বাদ আর প্রণামের আদান প্রদান হয় মুঠোফোনে। চৈত্র সেল এখনও হয়। তবে অনলাইনে বারোমাস সেল চলে। জীবন ছুটে চলেছে। সময় কোথায় দু'দন্ড দাঁড়ানোর! মুঠোফোন এখন জীবনকে বেঁধে রাখে। তবু চৈত্র অবসানে নতুন বছর আসে। হালখাতা আজও হয়। আজও দোকানে দোকানে হালখাতার নিমন্ত্রণ থাকে। রঙীন সরবতের জায়গা নিয়েছে বোতল বন্দী পছন্দের ঠান্ডা পানীয়। থাকে মিষ্টি, সাথে উপহার। কতো অঙ্কের জমা পড়লো নতুন খাতায় সেই মতো উপহার বরাদ্দ হয়। নামী রেস্টুরেন্টে বাঙালীর মহাভোজের লোভনীয় সব প্যাকেজ থাকে। হেঁসেলের আঁচে বাড়ীর সকলের জন্য পছন্দের রান্না করার মানুষগুলো সব তো পাড়ি দিয়েছে অনন্তের পথে। আর সংসার এখন প্রবীণ প্রবীণাদের বৃদ্ধাশ্রম যেনো। ছেলে মেয়েরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কাছ ছাড়া। শিক্ষা আর কর্মসংস্থান, এই দুটোই প্রধাণ কারণ। তাই মনখারাপ করার অবকাশ থাকে না। মেনে আর মানিয়ে নেওয়ার নামই তো জীবন। আজও নীলষষ্ঠী আসে। নীলের ঘরে বাতি দিয়ে সন্তানের মঙ্গল কামনা করা। বরফ দিয়ে দইয়ের ঘোল আর হয় না। নামী কম্পানির মোড়কে দইয়ের ছাঁচ, লস্যি সব পাওয়া যায়। প্রসাদ খাবার জন্য ছেলে-মেয়েদের অপেক্ষা থাকে না। সংক্রান্তির রাত পার করে পুব আকাশে নতুন সূর্যোদয়। নতুন আলোয় নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। টিভিতে নানান চ্যানেলে বৈশাখী আড্ডা। থিমের জামা কাপড় পড়া, ঘোরা, বেড়ানো, আড্ডা। এ'সবের মধ্যে খেয়াল থাকে না বসন্ত নীরবে তার জায়গা ছেড়ে দেয় গ্রীষ্মকে। প্রখর তপন তাপের অগ্নিস্নানে সূচী হয় নতুন ধরা। আম, জাম কাঁঠালের ডালি সাজিয়ে সে আসে। বেল, চামেলী, রজনীগন্ধার শুভ্র সুবাস নিয়ে সে আসে। কড়া রোদে তৃষ্ণার্ত হয় ধরণী। তবু নতুনের বার্তা নিয়ে সে আসে।
বর্ষশেষের অস্তগামী সূর্য বয়ে নিয়ে চলে বর্ষশুরুর নতুন সর্যোদয়ের বার্তা।
শেষ আর শুরু এক অপূর্ব সমাপতন।
‘অতীত নিশি গেছে চলে
চিরবিদায় বার্তা বলে...
এসো-এসো ওগো নবীন
চলে গেছে জীর্ণ মলিন
আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন
মুক্ত সমীরেখা।’
No comments:
Post a Comment