Saturday, April 4, 2026


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভাবনা 



আগমন
রেবা সরকার


বাবা বলেই খালাস-- সামনে সংক্রান্তি ঘর দোর একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবি। লোকজন আসবে নতুন বছরের দিনে। ঝুল জাল ময়লা কোথাও যেন না থাকে। বিশাল বাড়ি অনেকগুলো ঘর। হাতে দু দিন বাকি। নাওয়া খাওয়া শোয়া বাদ দিলেও কাজ শেষ হবে না। আর কেউ হাত লাগাবে না। ভাইরা অপদার্থ, লাট সাহেব এক একটা। কাজে বাধা দেবে, আর নোংরা ছড়াবে আর বলবে এ দিকটা কর ও দিকটা কর, বাবা বলে গেছে।

বাবার আমি 'পুরাতন ভৃত্য'-- শুধু পায় বেত না পায় বেতন। বুঝেছি আমার ওপর বাবার রাগের কারণ, ওই উত্তর পূবের কদম গাছটা কাটতে না করেছিলাম। বাবার ইচ্ছে ছিল কাটার। জন্ম ইস্তক দেখে এসেছি গাছটাকে, পাখির কিচিমিচি, বর্ষায় কদম ফুলে ভরে যায়। একা থাকলে পাখিদের সাথে আমার নিদারুন সখ্যতা, কত কথা হয়। কদমের রোম গায়ে ঝরে পড়লে গা শিউরে শিউরে ওঠে। গাছ পাখির সাথে কথা বলি কেউ টের পায় না, আমাদের ব্যাপার। ঘরদোর সাফাই বছর শেষের নতুন কিছু নয়, প্রতি বছর হয়ে থাকে, ঠেলা আমাকে সামলাতে হয়। আমি একা ব্যস্ত এরকমটা না, কুন্তী পিসিকে নিয়ে মা লড়ে যাচ্ছে-- উঠোন নিকানো, রান্নাঘর নিকানো, গোয়াল ঘর সাফাই খড়ি সাজিয়ে রাখা এরকম অনেক কাজ প্রাণপণে সারতে হবে আজকালের মধ্যে। শীতের ঝরাপাতা শুকনো ডালপালা এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সব ঝেঁটিয়ে একত্র করে দূরের কোণায় রাখা হবে, ঝড় বৃষ্টি না এলে মঙ্গল। সব এলিয়ে যাবে তাহলে।

বাবা প্রতিবার বছর শেষ হবার আগেই একটা করে লাল পঞ্জিকা নিয়ে আসে গঞ্জ থেকে। সেই বেনীমাধব শীলের মুখ, লাল মলাট। উৎসুক হয়ে থাকি নতুন বছর শুরু হয়ে গেল । উল্টে পাল্টে দেখি অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ, উপনয়ন, পুজো নির্ঘণ্ট, তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ,বশীকরণ, সুপরামর্শ। কেউ পাতা উল্টে দেখে না। ধুলো জমে যাবে তারপর পুরানো বেনীমাধবের ওপর স্থান হবে।

কাল সংক্রান্তি বিকেল যাব কয়াখাতায়। গাজনের মেলা বসবে, গরম জিলিপি খাওয়া হবে। ভাই আর আমি। যা মজা হবে না। বাবা হাতখরচা বাবদ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বলবে, একদম এদিক ওদিক যাবি না। ভাইকে নজরে রাখবি। বাবা চালাক। ভাইকে পাঠাচ্ছে আমার ওপর নজর রাখতে সব বুঝি। চড়কের সন্ন্যাসীদের ভিড় থাকে,ছাই মেখে বসে থাকে। ওদের মধ্যে কয়েক জন পিঠে বড়শি গেঁথে ঘুরতে থাকবে। দেখে ভয় করে আবার ভালো লাগে। জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া আরেকটা রোমাঞ্চকর দৃশ্য।
বাবা নিজে যাবে আলিপুরে ( দুয়ারে)। সবার জন্য জামা কাপড় কিনতে। তার পছন্দেই আমাদের পছন্দ । অবশ্য খুব খারাপ আনে না। মার জন্য শাড়ি সায়া ব্লাউজ, আমার জন্য তাই। ভাই পাবে ডিজাইন করা জামা প্যান্ট। নিকটাত্মীয়ারা শাড়ি। জন মজুর খাটা কামলা একটা করে সাদা ধুতি গেঞ্জি। চৈত্র  মাসে দাম কম হয়। স্টক খালি করার তাড়া থাকে দোকানীর। বাবা এই মওকা ছাড়ে না। অটো ভরে বাবা অনেক কিছু আনে চাল ডাল তেল লবন মশলাপাতি তরি তরকারি অন্য গৃহস্থালি। সাথে বান্ডিল করা ফুলের প্যাকেট, গৃহ দেবতা গোপালের পুজো হবে কালকে। গোরুরাও একটা করে বড়ো মালা পাবে। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে শাড়ির প্যাকেট ধরিয়ে দেয়, পছন্দ হয়েছে? চটপট সবুজ রঙের শাড়িটা হাতে নিয়ে বলি, হ্যাঁ। কদম গাছে দুটো টিয়াকে বসতে দেখেছি মাঝে মাঝে।

সবার জামা কাপড় ছাটাই বাছাইর পর বাবার সাথে মার অবধারিত তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যায়, তোমার জামা কাপড় কোথায়। বাবা রক্ষণাত্মক খেলতে থাকে,ধুতি গেঞ্জি এনেছি। ভালো দামী ফতুয়া পাইনি। পরে কিনে নেব। বাবার ধুতি সকলের থেকে আলাদা কিছু নয়।

পরের দিন মানে নতুন বছরের সন্ধেবেলা  বেশি আকর্ষণীয় আমার কাছে। গঞ্জের বাজারে বাবা আমাকে সাথে নেয়। হালখাতার অনুষ্ঠান। বড়ো লম্বা খাতায় হলুদ সহকারে মঙ্গল চিন্হ আঁকা। সোনার দোকানে সিদ্ধিদাতা গণেশ পুজোর আয়োজন। জুতো খুলে প্রবেশ। বড়সড় মিষ্টির প্যাকেট আর একটা ভারি ক্যালেন্ডার ধরিয়ে দেয় সদা স্মিত হাসি বিনয়ী মালিক। বাবা হাজার টাকা ধরিয়ে দেয় মালিক লাল খাতায় লিখে রাখে। আমি জানি বাবা তার বৌয়ের জন্য পরে কিনবে আর তার বৌ মেয়ের জন্য জমিয়ে রাখবে। আমার দিকে আঙুল তুলে বলে ওরে একটা মিষ্টান্নের প্যাকেট দাও। কর্মচারি আমাকে একটা ছোট প্যাকেট দেয়। এইখানে বইয়া খাইয়া লও। গত বছর খাইছিলা। এত মনে রেখেছে, অভিভূত হয়ে যাই। খাবার শেষে আর দু তিনটে দোকান ঘুরে ক্যালেন্ডার মিষ্টি হাতে করে ফিরে আসি। বাবা আমাকে ভালবাসে, বাবার জন্য গর্ব হয়।  নিজেকে ধন্য মনে হয়।

No comments:

Post a Comment