Saturday, April 4, 2026


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

বেড়ানো  


বসন্ত দুপুরে বড়দীঘি টি এসেস্টে

জয়িতা সরকার




সবুজ গালিচা, পাখিদের কলতান, বৃষ্টিভেজা সকাল কিংবা বসন্তের বিকেলে একটু উষ্ণতার চুমুক, এমন অনুভূতির স্পর্শগুলোই রোজনামচায় ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে তরাই - ডুয়ার্সের কোন চা বাগানের পুরাতনী গন্ধে। চা বাগিচা ঘিরে পর্যটন নর্থ বেঙ্গল ট্যুরিজমে নতুন সংযোজন, যা টি- ট্যুরিজম হিসেবে ইতিমধ্যেই খানিকটা পরিচিতি পেয়েছে ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের কাছে। চা বাগানের মাঝে বিরাট বাংলো, যার প্রতিটি কোণে আজও ঔপনিবেশিকতার ছোঁয়া। ব্রিটিশ শাসনে দার্জিলিং থেকে ডুয়ার্সের বিস্তর জমিতে তৈরি হওয়া বাগানগুলি চা-শিল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সেই উনিশ শতক থেকে। বর্তমানে নতুন রূপে,ভিন্ন আঙ্গিকে পর্যটন মানচিত্রে নিজেকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে ব্রিটিশদের তৈরি চা বাগান আর পুরাতন আভিজাত্যে মোড়া বাংলোগুলি।


সাজসজ্জার প্রতিটি কোণে ঔপনিবেশিকতার পাশাপাশি দেশীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন চোখে পড়বে, এমনই একটি বাংলোর উদ্দেশ্যে আমাদের ঝটিকা সফর। গরুমারার জঙ্গলের ফাগুন হাওয়া গায়ে মাখিয়ে বেশ বেলার দিকে পৌঁছলাম বড়দীঘি চা বাগানের টি বাংলোতে। চা বাগানের মাঝবরাবর মাটির রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা পথ যেতেই সাদা বাংলোটি প্রাচীণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৮৯১ সালে তৈরি হওয়া বড়দীঘি এসেস্ট এবং পরবর্তীতে তৈরি টি-বাংলো বর্তমানে টি-ট্যুরিজমের অন্যতম। প্রবেশপথের দু'পাশে গাছের সারি, আর বাহারি বোগেনভিলিয়ারা আপনাকে সযত্নে আপন করে নেবে। বসন্তবেলায় পুরো বাংলো জুড়ে ফুলেদের আনাগোনা। মরসুমি ফুল - পাতাবাহার - বড় গাছেদের সহাবস্থানে বাংলোর সৌন্দর্যে অনুঘটকের কাজ করেছে তা বলাই বাহুল্য। বাংলো জুড়ে অ্যান্টিকের সম্ভার, গাড়ি থেকে টেলিফোন, ক্যামেরা থেকে শো-পিজ, সবকিছুতেই যেন একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া। দ্বিতল বাংলোর ওপরের অংশে রয়েছে রাত্রিবাসের সুবিধে। নির্জনতা ঘিরে থাকা এই চা- বাংলো অবশ্যই একরাতের সেরা ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলোতে প্রবেশ করতেই নীচতলায় থাকা বিরাট বারান্দা মন কাড়বে সহজেই, প্রতিটি কোণার সাজসজ্জায় যে আলাদা করে নজরদারি আছে তা সুস্পষ্ট। আধুনিকতার মিশেল রয়েছে তা বোঝা যায় সুইমিংপুলের দিকে তাকালেই। আমরা খানিকটা সময় সেখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম বারান্দায়, আড্ডা গল্পে জমজমাট দুপুর। দায়িত্বে থাকা কর্মীরা আগেই খাবারের অর্ডার নিয়ে গিয়েছিল, লাঞ্চ এলো বেশ অনেকটা সময় পর। নিজেদের পছন্দ মত খাবার খেয়ে আমরা আবার আড্ডা জমালাম সামনের ফুলঘেরা বাগানে। বিকেল হতেই বাড়ি ফেরার তাড়া, বড়দীঘি টি-বাংলোর পেছনে সবুজ চা গালিচায় পড়ন্ত বিকেলের সূর্য, পাখিদের ঘরে ফেরার গান, আমরা বাংলোকে পেছনে ফেলে গেটের দিকে এগোতেই পথ আটকালো ময়ূর, রাস্তা পারাপার করছে সে, আবার খানিকটা এগিয়ে আসতেই আরও একটি, এভাবে পনের মিনিটে সাতখানা ময়ূর দর্শন। চা বাগানের মাটির রাস্তা ছেড়ে আমরা পাকা রাস্তায় উঠলাম।


বড়দীঘি টি- বাংলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া টি-ট্যুরিজমের তালিকায় রয়েছে টি-ফ্যাক্টরি পরিদর্শন থেকে নদীর ধারে সান্ধ্য ভ্রমণ। গরুমারা চাপরামারি সাফারি থেকে বার্ড ওয়াচিং, সবটা মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের পরিচিত পাহাড় নদী ভ্রমণের মাঝে নতুনের ছোঁয়া এই টি- ট্যুরিজম। চা বাগানের নৈঃশব্দের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা কিংবা খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা এমন সব সবুজেরা ছড়িয়ে আছে তরাই থেকে ডুয়ার্সের আনাচে-কানাচে। নিরালা- নিস্তব্ধতা প্রিয় মানুষেরা অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারেন দু-একদিন,মালবাজার কিংবা জলপাইগুড়ি থেকে অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যায় বড়দীঘি টি- বাংলোতে। রাত্রি যাপন করতে না চাইলে আমাদের মত একটা দুপুর কাটিয়ে গরুমারায় বিকেলের সাফারি শেষে ফিরে যেতে পারেন সহজেই। জঙ্গল আর সবুজঘেরা চা বাগানের মাঝে একটা দুপুর কিংবা সারাদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার সেরা ঠিকানা হতে পারে বড়দীঘির টি-বাংলো।



No comments:

Post a Comment