ঝড়
তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য
চৈত্রের সন্ধ্যা, আকাশ জুড়ে মেঘ জমে অন্ধকার হয়ে আছে। একটা গা শিরশিরে হাওয়া উঠছে থেকে থেকে।যে কোনো সময় ঝমঝমিয়ে নেমে আসবে ঝড় বৃষ্টি। গত পাঁচদিনের এন্টিবায়োটিকের করা ডোজে দূর্বল হয়ে যাওয়া ছেলেটা রুগ্নতা জড়িয়ে একলা দাড়িয়ে অন্ধকার ছাদটায়। ছেলেটার এই সাতাশ বছরের জীবনটা জুড়ে শুধুই যেন অন্ধকার অনুরণিত হয়ে চলেছে। তার না পাওয়া গুলো হিসেবের দিস্তি খাতাটায় জমে চলেছে,সে আর সেগুলো কষে উঠতে পাচ্ছে না। সামাজিক ভাবে ছেলেটা দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।তার পথ দূর্বিসহ হয়ে উঠছে,সেখানে যেন থেকে থেকেই নেমে আসছে একটার পর একটা ভূমিধস।আর সেই ধস সড়িয়ে নতুন রাস্তায় বানাতে গিয়ে ফুরিয়ে আসছে সময়। এসব ভাবতে ভাবতেই ছেলেটা চশমাটা খুলে চোখ মুছতে আরম্ভ করলো। আকাশের বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে সে বৃষ্টি যেন চলে এসেছে ছেলেটার চোখে।
এবার হাওয়াটা আরো জোরদার হল, তার সঙ্গে জোরদার হল কীর্তনের আওয়াজ। ওদের এই ছোট্ট শহরটার সবচেয়ে পুরনো যে কালী বাড়িটা,সেখানেই কীর্তন চলছে সাতদিন ধরে। আজ সেখানে পদাবলি। কথিত আছে এই কীর্তনে নাকি স্বয়ং মা কালী এসে কীর্তন গেয়ে যান। এগুলো ছেলেটা তার মায়ের মুখে শুনেছে। আর তার মা আবার শুনেছে মায়ের ঠাকুমার থেকে। মায়ের ঠাকুমা নাকি ৩০ কিঃমিঃ পথ গরুর গাড়ি চেপে এই কীর্তন শুনতে আসতো।বাড়ির সকলেই গেছে এবার কীর্তনে,সে যায়নি,একটু অভিমানেই যায়় নি। তার একদম ভিড় ভালো লাগে না। ভালো লাগে না চেনা মানুষদের মুখোমুখি হতে। ঝড় উঠবে বলে হয়তো কীর্তনের আওয়াজ টা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকানি শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে একটা কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ।এ গন্ধ ছেলেটার খুব চেনা।মাংস আর চর্বি কাঠের আঁচে পুড়লে এমন গন্ধ ছাড়ে।ছেলেটা চেয়ার ছেড়ে উঠে একটু পশ্চিম দিকে চাপা গাছ আর বাণীদির বাড়ির টিনের চালের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল শ্মশানে চিতা জ্বলছে। আজ সকাল থেকে তাদের শহরে খবরটা ছড়িয়েছে। শহরের এক ড্রাগ এডিকটেড ছেলে টাকার লোভে তার মা কে খুন করেছে। হয়তো সে লাসটাই পোস্টমর্টেম হয়ে এখন শ্মশানে এসেছে। এই ভয়াবহতা সকলকে নাড়িয়ে দিয়েছে,কতোটা পৈশাচিক হলে মানুষ এতোটা নির্মম হয়ে উঠতে পাড়ে।
ছেলেটা আবার চাশমায় চোখ মুছলো আর মনে মনে বলতে লাগলো, তার এই বারবার অকৃতকার্য হওয়া, তার মেয়েলিত্ব, এগুলো তার বাবা-মা, পরিবারের লজ্জার কারণ তাই সে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে, সমাজ তাকে যদি বিদ্রূপ করে এই ভেবে। কিন্তু সমাজে কেউ যদি লজ্জার কারণ হয় তবে এইসব ব্যক্তিরা,যারা নেশার কারণে পৈশাচিক হয়ে ওঠে।এরাই তো সমাজিক দূষণ সৃষ্টিকারী। সে নয়, সে সমাজ অবাঞ্চিত নয়, সে অচ্ছুৎ নয়। ছেলেটা এবার দুহাতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল,অন্ধকার আকাশে মেঘেরা টগবগ করে ফুটছে যেন,হাওয়া দুরন্ত বেগে ছুটে চলেছে। ছেলেটা কোথা থেকে যেন একটা সাহস পেল, কেউ যেন তাকে ভরসা দিচ্ছে,লড়াই করার,সমাজকে দেখিয়ে দেওয়ার,এগিয়ে চলার। প্রকৃতি যেন বলে উঠলো, নির্গুণ বলে কিছু নেই,গুণ নিজেকেই বিকশিত করতে হবে,হবেই।এ বাণী যেন বীজমন্ত্রের মতো গেথে গেল ছেলেটার মনে। তার মনে যেন এক নতুন পথের রেখা চিহ্ন ফুটে উঠলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ঝড়টা শুরু হল প্রবল বেগ। অন্ধকার,অবসাদ,রুগ্নতা দূরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া একটা ঝড়। বিষাদ শেষে নতুনের সূচনা করা একটা ঝড়।
No comments:
Post a Comment