Saturday, April 4, 2026


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

আঙ্গিক  


শেষ-শুরুর সন্ধিকাল অবগাহনে

অমলকৃষ্ণ রায়

যেদিনটা অতিবাহিত হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে ভেবে কী লাভ! বরং যে দিন আসছে সেটা কিভাবে ভালভাবে কাটানো যায় সেটা নিয়েই দরবার করাটা শ্রেয়। এ নিয়ে নানা মুনির নানামত থাকতেই পারে। কিন্তু কেউ যদি এ প্রসঙ্গে আমায় অন্তত প্রশ্ন করে বসে— বর্ষশেষ? নাকি শুরু নতুন দিন? কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্ব্যর্থহীনভাবে বলব, দুটোই। বর্ষশেষ আমায় নতুন বছরের দিনগুলোকে পরিকল্পনা মাফিক অতিবাহিত করার মতো সঠিক নির্দেশিকা দেবে; বিগত বছরে এটা ভুল করেছিলে, এবার কিন্তু সেরকম কিছু করে বসো না। সেভাবে দিনটা শুরু করো। নতুন বছরের প্রতিটা নতুন দিন তোমার কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠুক। একেকটা দিন তোমার কাছে যেন জীবনের উত্তরণের একেকটা পদক্ষেপ হয়ে ওঠে। নতুন বছরের দিনগুলো যেন তোমার প্রত্যাশা পূরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। গতবছরের বৈশাখের শুরুর দিনে তুমি অন্তত যা ভেবে বছরটা শুরু করেছিলে, সেটা অনুসরণ করে কতটুকু সাফল্যের ফসল ঘরে তুলতে পারলে, কতটুকুই বা তোমার প্রত্যাশাকে ছুঁতে পারেনি; আমার কাছে বর্ষশেষ মানে তারই আত্মসমীক্ষণ। আর নতুন বছরের শুরু মানে বিগতদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু বার্ষিক পরিকল্পনা; এ বছর যেন এসব কাজ ঠিকঠাক করে ফেলতে পারি। যা আশা করছি সেটা যেন এবার পূরণ হয়। ইতিহাস মানুষকে যে শিক্ষা দেয় তা হল, বিগতদিনের কৃত ভুলগুলো যেন জীবনে দ্বিতীয়বার আর না আসে। তেমনি বর্ষশেষও তাই, বিগত বছরের একটা আত্মসমীক্ষা জীবনপথকে অন্তত এক ধাপ উন্নীত করে দেয়। তাই একেকটা নতুন বছর শুরুর ক্ষেত্রে বর্ষশেষের একটা ভূমিকা থাকেই।

যে মানুষ তার জীবনটাকে চরৈবেতির মতো সারা বছর একঘেয়েমিতে কাটিয়ে দেয়, যার জীবনে যেমন আছে তার চাইতে বেশি কিছু চাওয়ার নেই পাওয়ারও নেই। কোনওদিন কোনও উচ্চাকাঙ্খা মনের মধ্যে আগে থেকে পুষে রাখে না; যদি জীবনে এমনটা হতো, যদি এরকম একটা জীবন উপভোগ করতে পারতাম। সেসব না ভেবে বরং ভাবে, যা চলছে চলুক না। বেশ তো আছি। কোনওরকমে খেয়ে-পরে দিন গুজরাতে পারলেই তো হল। সেসব মানুষের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। তাদের কাছে বর্ষশেষ আর নতুন বছরের শুরুর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। তাদের কাছে বছর কবে শেষ হবে বা হল, নতুন বছর কবে শুরু হবে সেটা নিয়ে বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। তাদের কাছে বর্ষশেষ আর নতুন বছরের শুরু বছরের আর সব দিনেই মতোই একেকটা দিনমাত্র।

যে দেশের মানুষের সুখের সংজ্ঞাটাই ভিন্ন, জীবনে ভাল থাকা মন্দ থাকার মধ্যে পার্থক্য নিরূপন করতেই জানে না। যে দেশের মানুষ জীবনের খারাপ সময়কেও ভাল সময়ের মতোই সমভাবে উপভোগ করতে জানে, তারা কখনও সংকটের আশঙ্কায় ভেঙে পড়ে না। যে দেশের মানুষ সবসময় যুদ্ধবিগ্রহ, গোলা বারুদ দেখে দেখে অভ্যস্ত, তাদের কাছে গোলা বন্দুকের শব্দ কোনও ভয়ের সঞ্চার করে না।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, কীসব উদ্ভট কাল্পনিক কথাবার্তা। বাস্তব দুনিয়ায় এমন মানুষও কি আছে, যারা কিনা মৃত্যুকে ভয় পায় না। নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে বুক চিতিয়ে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। জীবনের সুখভোগ নিয়ে কোনওরকম পূর্বপরিকল্পনা করতে জানে না এমন মানুষ আবার আছে নাকি। আমি বলব, আছে। সত্যিই আছে, কোনও আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছি না। এই ভারতবর্ষের মাটিতেই এককালে এরকম মানুষ বাস করতো। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটা সময়ে ব্যাঙালোরে যুদ্ধ হানাহানি লেগেই থাকতো। সেখানকার গ্রামের কৃষকদেরকে যুদ্ধ চলাকালীন মাঠে কৃষি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। মৃত্যুভয়ে কবে যুদ্ধ থামবে, সেজন্য পরিবার-পরিজনদের নিয়ে মাটি খুঁড়ে আত্মগোপন করে বসে থাকতো না। মাঠে কাজ করতে করতে ক্ষেতের আলে বসে বিশ্রাম নিতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় বসতো, যুদ্ধে কে জিততে পারে। কার হার শুধু সময়ের অপেক্ষা। যুদ্ধ থেমে গেলে এই ভূখণ্ড শাসনের ভার কার কাছে ন্যস্ত হবে। পূর্বের শাসকই বহাল থাকবে তো, নাকি নতুন কেউ ক্ষমতায় আসবে। নতুন শাসক ক্ষমতায় এলে কী হবে। কাজের ফাঁকে তাদের শুধুমাত্র এইটুকু ছিল কৌতূহল। বছরের পর বছর যুদ্ধ, হানাহানি চলতে চলতে ব্যাপারটা ব্যাঙালোরবাসীরা অত্যন্ত সহনশীল হয়ে উঠেছিল। 

ব্যাঙালোর ক্যাণ্টনমেণ্ট থেকে একবার ব্রিটিশ সৈনিকের গোলন্দাজ বাহিনী অনুশীলনের সময় ভুলবশত লোকালয়ে গোলা ফেলে দিয়েছিল। সেনা কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ গ্রামের মানুষদের কোনও ক্ষতি হলো কিনা সেটা দেখতে জানলো, তাদের কারও তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। অল্পের জন্য মাঠে কর্মরত কৃষকেরা সকলেই প্রাণে বেঁচে গেছে। তাদের একজন বলল, গোলন্দাজ ভদ্রলোকেরা সবসময় আমাদের মতো গ্রামের সাধারণ মানুষের দিকেই নিশানা করে থাকে। যেহেতু আমাদের কোনও ক্ষতি হয়নি, তাই আপনারা অনুশীলন চালিয়ে গেলে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। যারা অমন কথা নির্দ্ধিধায় বলতে পারে, তাদের কাছে বছরের শেষ কিংবা শুরু সবই সমান। তাদের জীবন এক বৈচিত্র্যহীন চরৈবেতিতে অভ্যস্ত। ভালমন্দ প্রত্যাশা তাদের একেবারেই নেই। সেসময় ব্যঙালোরের নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারের একাংশ যুদ্ধ, অস্ত্রচর্চাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিল। যুদ্ধ থেমে গেলেই তাদের জীবনে সংকটের ছায়া নেমে আসতো। মাইসোরের ৩য় যুদ্ধশেষে যখন সেনাবাহিনী থেকে ছাঁটাই শুরু হল, তখন অনেককে কর্মহীন হতে হয়েছিল। তখন তারা সেনাদলে কাজ না করলে সংসার কী করে চলবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। যুদ্ধ যে একটা জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, সেটা জীবনের প্রয়োজন মেটানোর মতো কোনও পেশা হতে পারে না, সেটা তারা ভাবতো না।

তবে যে যাই বলুক, আমি হলাম আপাতমস্তক একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। মারামারি, হানাহনি, অশান্তিতে কখনও পড়তে চাই না। খুব উঁচুমানের না হোক, অন্তত একটা সাদামাটা গড়পড়তা ডাল-ভাতের সুখী জীবন কাম্য। ব্যাঙালোর কৃষকপরিবারের যুবকদের মতো অবলীলায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলতে পারব না। তাতে সংসারে অভাবকে নিত্যসঙ্গী করে বেঁচে থাকতে রাজি। অথচ তাদের ঘরের ছেলেরা যুদ্ধক্ষেত্রে যাবে বলে ছোটবেলা থেকেই নাকি অস্ত্রবিদ্যা শিখতো। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে বংশানুক্রমিক সে ভাবনাটা অভ্যেসে পরিণত হয়েছিল। তরবারি তুলে ঘোরানো, বর্শা ঝাঁকানোকে ছোটবেলায় খেলাচ্ছলে অভ্যেস করে পরিণত বয়সে তারা নির্ভয়ে যুদ্ধে নেমে পড়তো। জীবনে ডরভয় বলতে বিন্দুমাত্র ছিল না। তারা কি আর আমাদের মতো বর্ষশেষ আর শুরু নিয়ে ভাবতে পারতো, মোটেও না। বেঁচে ফিরতে পারবে কিনা না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, সেটা জেনেও যুদ্ধে যেতে রাজি হয়ে যেত। তাদের কাছে সংক্রান্তি মাসপহেলার কোনও পার্থক্য ছিল না। তাদের কাছে বছরের একেকটা দিন বিশেষ কোনও দিন ছিল না। শুধুমাত্র চব্বিশ ঘণ্টার সুদীর্ঘ একটা সময়কালমাত্র। যে যাই বলুক, আমি বলব যখন যেমন, তখন তেমন। তিনশোবছর আগেকার ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পেক্ষাপটের মানুষগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিকালের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতার মানুষজনের জীবন সম্পর্কিত ভাবনার তুলনা টেনে লাভ নেই। এখনকার মানুষ সবসময় কিসে ক্ষতি কিসে লাভ সব মেপেঝেপে পা ফেলে। তাই বছরের শুরুর দিনটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

No comments:

Post a Comment