শেষ দিনের গন্ধ, শুরুর ভোর
অমিতাভ চক্রবর্তী
চৈত্রের শেষ বিকেল। হাওয়ায় এক অদ্ভুত গন্ধ—শুকনো পাতা, ধুলো, আর একটু ক্লান্তির। এই শহরের বাজারটা আজ অদ্ভুত রকম ব্যস্ত। সবাই যেন কিছু একটা শেষ করতে চাইছে—পুরোনো হিসেব, পুরোনো দেনা, পুরোনো বছর।
অভীক হাঁটছিল ভিড়ের মধ্যে। হাতে একটা পুরোনো খাতা—লাল কাপড়ে মোড়া। তার বাবার দোকানের খাতা। কাল পহেলা বৈশাখ। তার বাবা এই দিনটাকে খুব মানতেন। বলতেন—
“নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডার বদল নয়, মন পরিষ্কার করা।”
কিন্তু বাবা নেই তিন বছর হলো। দোকানটা এখন অভীকের, কিন্তু মনটা এখনও কোথাও আটকে আছে।
বাজারের এক কোণে ছোট্ট মন্দিরে ভিড় জমেছে। ধূপের গন্ধ, ঘণ্টার শব্দ—সব মিলিয়ে একটা নতুন শুরুর আয়োজন।
পয়লা বৈশাখের আগের দিন বলে কথা। অভীক দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে গেল না। সে খাতাটা খুলল। শেষ পাতায় লেখা—
“শুভ হালখাতা”
কিন্তু নিচে ফাঁকা।
তার বাবার হাতের লেখা থেমে গেছে সেখানেই।
হঠাৎ এক বৃদ্ধ লোক পাশ থেকে বলল—
—“লিখছ না কেন?”
অভীক একটু চমকে তাকাল।
—“কি লিখব?”
লোকটা হাসল, চোখে এক অদ্ভুত শান্তি—
—“পুরোনোটা মিটিয়ে দাও। না হলে নতুনটা শুরু হয় না।”
অভীক বলল—
—“সব কি মিটে যায়?”
লোকটা মাথা নাড়ল—
—“না। কিন্তু মেনে নেওয়া যায়।”
হাওয়াটা একটু জোরে বইল। পাতা উল্টে গেল। অভীক কলমটা বের করল। হাত কাঁপছিল। তবু লিখল,
“যারা নেই, তাদের জন্য কষ্ট থাকবে। তবু জীবন থামবে না।”
একটু থামল। তারপর লিখল—
“নতুন বছর—
আমি আবার শুরু করব।”
পরের দিন সকাল। রোদটা যেন একটু অন্যরকম। রাস্তার মোড়ে লাল-সাদা পাঞ্জাবি, শাড়ি, মিষ্টির গন্ধ—সব মিলিয়ে উৎসব। অভীক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। খাতাটা টেবিলে খোলা। প্রথম কাস্টমার ঢুকল।
অভীক হাসল—অনেকদিন পর। সে বুঝল— বর্ষ শেষ হয়নি। চৈত্র শুধু দরজাটা বন্ধ করেছে,
আর বৈশাখ এসে ধীরে ধীরে সেটা খুলে দিচ্ছে।
“বাংলা নববর্ষ আসে না শুধু নতুন দিন নিয়ে,
সে আসে—পুরোনো ভাঙার সাহস নিয়ে।”
No comments:
Post a Comment