শীত স্মৃতির আয়না
জয়িতা সরকার
টুনিলাইট চলেছে শীতঘুমে, আগামী বছর সবগুলো জ্বলবে কি না তা নিয়ে ফি বছরের অহেতুক আলোচনা। এক্সটেনশন বক্সগুলো টুনির সঙ্গে এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকবে এই একবছর। শীতঘুম শেষে গ্রীষ্ম, বর্ষা কাটিয়ে শরতের কোন এক শিশির ভেজা সন্ধ্যেতে তোরজোড় করে বেরিয়ে দিন কয়েকের জন্য সকলকে মুখ দেখাবে ওরা। শহর জুড়েও একটা শীত নামবে কালীপুজোর ক'দিন পরেই। কয়েকটি পুজো মন্ডপে চন্দননগরের লাইটিং-এ বিষন্ন হেমন্তের ঝলমলে এক সন্ধ্যেতে প্রথম শীতের নাচন লাগল মফস্বল শহরে, হঠাৎই কেমন এক হিমশীতল অন্ধকার উৎসবকে ছুটি দিয়ে রিক্ততার বাহক হয়ে কড়া নাড়ছে দোরে দোরে।
জড়োসড়ো অবস্থায় শীতের আগমনের প্রথম অনুভূতি স্বরভঙ্গ যাকে বলে, গলা দিয়ে সপ্তসুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে,প্রাণপণ চেষ্টায় বোঝাতে চাইছি, কিন্তু আমার কন্ঠস্বর তখন জবাব দিল গোটা কালীপুজোয় ইস্টাইল খানা ভুলে গেলি? সামনে ক্লাস পরীক্ষা, এদিকে সেই প্রাচীন যুগের ছাত্রছাত্রী আমরা, গলা চড়িয়ে না পড়লে মগজে ঠিক ঢোকে না, গলা তখন শীত ঘুমের প্রস্তুতি নিতে ব্যতিব্যস্ত, এদিকে অক্ষরগুলো চোখের সামনে নেচে বেড়াচ্ছে, দিশেহারা হয়ে সদ্য আলমারি থেকে বেরিয়ে আসা লেপমুড়ি দিয়ে আমি উষ্ণতার আদর নিয়ে শীতকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শীত নিয়ে আদিখ্যেতা করার মত মানুষ যদিও আমি না। আসবি আয়, কিন্তু সঙ্গে ওই রুক্ষ্ম ত্বক, শুষ্ক চুল এসবকে সঙ্গী না করলেই হতো। স্কুল যাওয়ার সময় ঝক্কি কম, একদিকে কাঁপতে কাঁপতে স্নান সারো, তারপর ত্বকের যত্ন, সবশেষে শরীর গরম করতে ঠান্ডা সোয়েটার গায়ে চাপাও। এতকিছুর পর ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে দশটা, কিন্তু বাইরের দিকে তাকাতেই মনে হল ভোর হয়নি, কুয়াশা ঘেরা চারিদিক, একহাত দূরের কিছুও দৃশ্যমান নয়। এমন দিনে কাঁধে বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুল যাওয়ার কষ্ট যদি কর্তাব্যক্তিরা বুঝত, তবে হয়ত বাড়তি গরম- বর্ষা- শীত সবেতেই ছুটির পরব উপভোগ করত আমাদের ছোটবেলা।
শীত মানেই যত কান্ড পাড়া জুড়ে, সেসব ঘটনার ঘনঘটায় একটি শীত উপাখ্যান রচনা করা খুব কঠিন হবে না। মহাজাগতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই প্রথম বকাঝকা খেত সূর্যদেব। শীতকাল এলেই তার কদর বৃদ্ধির নামে প্রত্যাশার পারদ এমন চড়ত যে এক টুকরো রোদের জন্য এদিক ওদিক সকলের ছোটাছুটি। আহা এমন শীতের মিঠে রোদে কোথায় দু'দন্ড শান্তিতে দাঁড়িয়ে উষ্ণ চায়ে চুমুক দেব, তা নয় সকাল থেকে লেপ- কাঁথা- কম্বল কাঁধে নিয়ে সকলে ছুটে বেড়াচ্ছেন, একটু রোদ্দুর কোথায় পাবো? জানালা দিয়ে সে সব হাস্যকর দৃশ্য দেখতে দেখতে বীজগণিতের এ প্লাস বি হোল স্কোয়ার কখন যে উত্তরায়ণ দক্ষিণায়নের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, তা ধরা পড়ল মায়ের চিৎকার করা লিটমাস টেস্টে। পাড়া জুড়ে শীতের মরসুম, হাঁকডাক চলছে, তোমাদের মাঠে খুঁটি পুঁতে দু'টো বাঁশ লাগালে এই শীত বাহারিরা একটু রোদ পোহাতে পারত, আহা! তখন আমার ছোট মনে বিরাট অহংকার, সবাই কত খাতির করছে, মাঠখানা ভাগ্যিস ছিল। না হলে রোদের হাহাকারে আমরা দানশীল হতাম কেমন করে? যদিও অনুমতি দাতা মানুষটি এসবের ধারে পাশেও আসে না, এসব আমরা মাথার দুষ্টু বুদ্ধি, সবার জন্য টাইম ঠিক করে টিকিট সিস্টেম করে লেপ- কম্বলদের এন্ট্রি করানো হবে মাঠে। মা-বাবা আমার এমন শীতল প্রস্তাব শুনে আরও শীতল হয়ে বলত, মাঠ যখন তোমার হবে, তখন এসব করো। আর আমার মন ভাবত, মাঝের উঁচু ঢিবির দু'পাশে দু'খানা মাঠের মালকিন হয়ে আমি রোদ বিক্রি করছি, আর তা দিয়ে স্কুল ছুটির পর বনকুল কিনে খাচ্ছি, আহা এমন ব্যবসায়িক বুদ্ধি আর কতজনেরই বা আছে, এসব ভাবতে ভাবতে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিলাম।
শীতের শব্দ শুনলেই নস্টালজিক হতেই হবে, কয়েকটি চেনা শব্দ, পরিচিত ছবি আর কিছু গন্ধ, আমার শীতকাল জুড়ে এখনও উত্তাপ ছড়ায় ওই লেপ জড়িয়ে হাত দু'টোকে বের করে কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে গিয়ে রস ছিটে চোখ জ্বলা অনুভূতিকে ঘিরে। মায়ের সে এককথা ওই রস চোখে গেলে নাকি চোখ ভালো থাকে, অলীক নাকি বাস্তব সে তর্কে জড়ায়নি কোনদিনই, কারণ মায়ের সঙ্গে তর্কবিদ্যায় আমি তখন শিক্ষানবিশ। কমলালেবুর গন্ধ মাখা দুপুরে হিমেল বাতাসে মিশে যেত সন্ধ্যের নলেনগুড়ের সুবাস। বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আছে বাতাসা ফ্যাক্টরি। সারাবছর সাদা বাতাসা, লাল বাতাসা তৈরি হলেও শীতকাল মানেই গুড়ের তিলা, খাঁজারা কাঁচের বয়ামে জায়গা পেত বিশেষ আথিতেয়তায়। শৈশব- কৈশোরকে ইতি জানিয়ে মাঝজীবনেও শীত সন্ধ্যের সে গন্ধ দূরত্ব মানে না, মনে হয় সেই চেনা গন্ধ পাড়াময় ভেসে বেড়াচ্ছে। গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা শব্দগুলোও শীত স্মৃতির উষ্ণতার পরিপূরক। শীত এলেই ওরা আসে, এখন অবশ্য আসে কি না সে খবর জানা হয় না। লুপ্তপ্রায় তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হয়েছে বলেই মনে হয়। প্রতি শীতেই পাড়ার কোন এক বাড়িতে নতুন লেপের প্রয়োজন পড়বেই, আর সকাল হতেই টুংটাং শব্দ করে ধোনকারের সঙ্গে দর কষাকষির শব্দগুচ্ছ কানে বাজবে, শীতের সকালে অত্যাবশক এক চেনা ছবি। আমার কথায় ওনারা একতারা বাজান। আবার সেই আমাদের মাঠ, ত্রিপল পেতে প্রায়,দু'ঘন্টা তারের সঙ্গে তুলোর সঙ্গতে তৈরি হয়ে গেল নতুন লেপ, উফফ যার জন্য তৈরি হচ্ছে সে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশি, শীতে নতুন লেপ মানে তো অমূল্য রতন পাওয়া।
হঠাৎই কোন এক শীতে আবিষ্কার হল উষ্ণতার নতুন এক উপকরণ। চেনা হাঁকডাকের শব্দ তো নয়, কানখাড়া করে শুনছি ঠিকই, কিন্তু ঠাহর করতে পারছি না। উৎসুক মনের ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক সাইকেলের পেছনে বাহারি রঙের কাঁথা বিক্রি করতে এসেছেন। তবে সেগুলো কাঁথা নয়, পোষাকি নাম বালাপোশ, পুরনো সিনথেটিক দু- তিনটে শাড়ি দিলেই বানিয়ে দেবেন শীতের উষ্ণতার নতুন বাজারি উপাদান। শহরের অলিগলি গুলোতে নতুন শব্দের অনুরণন। পুরনোকে নতুন করে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে অধীর অপেক্ষা মা- কাকিমাদের। শীত জুড়ে নলেনগুড় - ভাগ করে নেওয়া কমলালেবু- নানা রঙের ফুল- হঠাৎ কোন এক দুপুরের শেষ রোদে একবাটি কুলমাখা, এমন চেনাছবিগুলো ভিড় করে আসে আজকের একলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটাকে। উত্তাপহীন নরম রোদে উষ্ণতা খুঁজি মায়ের হাতে সোজা কাঁটা- উল্টো কাঁটা,ঘর তোলা-ঘর গোনার জটিল হিসেবে। কী নিপুণ দক্ষতায় মা বুনে চলেছে লাল-হলুদ উলের সোয়েটার, মায়ের যত্নে বোনা সোয়েটারে লেগে থাকা ওম যেন শীতের পরম প্রাপ্তি। শীত জুড়ে স্মৃতির ভিড়, রাতদুপুরে শীত যখন শান্ত- নীরব, আমি কান পেতে থাকি বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনের কোন এক দূরপাল্লার ট্রেনের হুইসিলের জন্য। শীতের সঙ্গে এই হুইসিলের গভীরতার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। শীত এলে জলশহরের চেহারা বদলায়, কুয়াশা ঘিরে ধরে আনাচে-কানাচে, সন্ধ্যে হলেই কেমন এক রহস্যে মোড়া মায়াবী আবহ জড়িয়ে ধরে শহরটাকে।
শীত এলে মনের কোলাহল বাড়ে, স্মৃতিদের আনাগোনায় উত্তাপ বাড়ে শরীর জুড়ে, ফেলে আসা মাঠের যে কোণটা ছিল ভীষণ প্রিয়, পড়ন্ত রোদে দিনের শেষ উষ্ণতারা ছুঁয়ে যেত মায়ের একগোছা খোলা চুল, কিংবা আদর করত বেবি ক্রিম মাখা আমারছোট্ট গোলাগাল মুখটাকে, সেখানে আর রোদ-বিকেল নামে কারোর যাতায়াত নেই। অট্টালিকায় হারিয়েছে শীত দুপুরের চেনা ওম। স্মৃতিরা কুঁকড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। হয়ত ঝরে যাবে শীতের পাতার মত, ধূসর হবে শীতের বাহারি ফুলেরা, মাঠের কোণটা খুঁজতে হলে অপেক্ষা করব কোন এক বসন্তের, নতুন পাতারা জায়গা পেলে জমাট বাঁধবে শীতের শিশির বিন্দুরা।