Monday, December 22, 2025


 

শীতের সেতার

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

বিরহিনী হেমন্তের লাজুক চোখের তারা অবনত হতে হতে পুরোপুরি সময়ের পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয় একসময়।রেখে যায় কিছু অশ্রুবিন্দু,শীতের শিশির হয়ে যারা মুক্তো ছড়ায়।পরিযায়ী ডানায় ভর করে শীত এসে আসন পাতে মিঠে- কড়া হলদে রোদের ওমে ভরা আঙিনায়।ভোরের শীত যেন এক রহস্যময়ী নারী।পরতে পরতে গুপ্ত কথার কুয়াশার মসলিনে নিজেকে আবৃত করে আবছায়া এক গল্পের নায়িকা সে।কখনো কখনো দিনভর খোলা থাকে সেই রহস্য উপন্যাসের ধোঁয়াটে মলাট। খামখেয়ালি কোনো পৃষ্ঠা থেকে কখনো চুঁইয়ে পড়ে রহস্যভেদের হালকা ছবি।ছায়াময় গল্পের বুনোটকে হঠাৎ ছুঁয়ে যায় ঈষৎ উষ্ণ রোদেলা কলমের নরম পালক।ঝাপসা অবগুণ্ঠন খুলে হলুদ রঙা জামদানি জড়িয়ে শীত তখন কোনো গৃহবধূ অথবা মেটে রঙের হলুদ ছোপ তোলা শাড়িতে মাঠের এক কৃষক কন্যা ..গোলার ধানে যত্নের হাত রেখে যে প্রতীক্ষা করে আসন্ন পৌষ পার্বণের।রোদ পিঠে একটু একটু করে কমলালেবুর খোসা ছাড়ানোর দুপুরের উদযাপনে,নকশি কাঁথাটির রোদের সুখস্নানে,হাওয়ায় ভেসে আসা নলেন গুড়ের পায়েসের সুবাসের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মায়ের সুঘ্রাণে,কোমল রোদের কাছে জমাট নারকেল তেলের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে,পরিচিত স্মৃতির খামে একদা বাড়ির কোনো আত্মীয়সম কাজের মানুষের ফাটা গোড়ালির আত্মকথায় শীতের ছোট্ট বেলায় সাঁঝের ঘন্টা বেজে ওঠে কখন।ডাউন মেমোরি লেন ঘেঁষা ঝরোকার রেলিং- এর ঠান্ডা ছুঁয়ে বরফ হয়ে জমতে থাকে না বলা যত কথারা।অসীম এই শীতলতা থেকে কবোষ্ণ কোনো ঠিকানায় উত্তোরণের ছাড়পত্র অধরা রয়ে যায়।একটু উষ্ণতার আর্তিতে গাল বেয়ে ঝরে পড়া বেয়ারা জলের দাপটে পশমিনার বুকের লতাপাতায়ও শীত জমে। কুয়াশা মাখা ল্যাম্পপোস্টের নীচে শীতজয়ী স্বল্পবাসের রাতের গল্প জারি থাকে নগরে,শহরে, মফস্বল জুড়ে।ফুটপাতের জীর্ণ কম্বলে কাঁপা হাতে শীত লেখে এক দুঃসহ লড়াইয়ের করুণ অমনিবাস।তবুও শীত আসে নিয়ম করে।নিয়ে আসে কিছু রঙিন গল্পের ফুলঝুরি।উত্তরের জানালা ফিসফিস উচ্ছ্বাসে চড়ুইভাতির মৌতাতে মাতোয়ারা হয়।উল ও কাঁটার আত্মীয়তায়, সান্টাক্লজ,কেক,সখের ভ্রমণ কাহিনী সবমিলিয়ে প্রতীক্ষার শীতও অতিথি থেকে মনোরম এক আত্মীয় হয়ে ওঠে কখন..জড়িয়ে থাকে সময়ের আলোয়ান হয়ে।তারপর একসময় হাত বাড়িয়ে মধুমাসের সঙ্গে করমর্দন করে মিলিয়ে যায় আবার বৃত্তের আবর্তে।দাওয়া জুড়ে রেখে যায় কিছু প্রহেলিকা,কিছু বা রৌদ্রজ্জ্বল স্মৃতি মেদুরতাকে।

( ছবি- শৌভিক রায়)

 


 

একটি শীতের বিকেল
রেবা সরকার 

চড়াই উৎরাইয়ের পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাদা গাড়ি। 
বরফ পথ আটকে আছে
গাড়ি থেকে নেমে এসেছে পর্যটকেরা। 
আমিও নেমে পড়েছি প্রকৃতি রূপের টানে। 
এতো ভয়ংকর রূপের টান কুয়াশা-মুখ। 

        থমকে যাওয়া পথে মনে পড়ে... 
বিকেলের নরম আলো, গ্রামের রাস্তা, 
আল পথে সাইকেলের চাঁকা বসে যাওয়া, 
গদাধর নদী ছুঁয়ে পাকা ধানক্ষেত। 

মাইলের পর মাইল দুচোখ জড়িয়ে থাকা নকশিকাঁথা। 

পরিচিত শীতকাল 
উলের টুপির অন্তস্থলের উষ্ণতা

অথচ, তাকিয়ে থাকলে ভাষাহীন।


(ছবি- শৌভিক রায়)


 

কুয়াশা ঘেরা ভোর 
   রাণা চ্যাটার্জী 

এই ভাই তুই কি আজ বেরুবি! কাজ ও কলেজ কি যেতেই হবে? বাইরে কিন্তু প্রচণ্ড কুয়াশা ,কিছুই দেখা যাচ্ছে না রে ভাই ! শ্রাবন্তী ঘুম ঘুম চোখে ভাই রূপকে তুলতে এসে কথাগুলো বলল।ঘড়িতে চারটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট,ঠান্ডাটা হঠাৎ করে জাঁকিয়ে পড়েছে কিন্তু বিছানায় কই ভাই তো নেই! পা বালিশে এমন ভাবে চাদর ঢাকা দিয়ে দিদিকে বোকা বানাতে পারলে ভীষন খুশি হওয়া ভাই ততক্ষণে বাথরুমে গায়ে জল ঢালছে।দিদি আমি স্নান করে ফেলেছি ,কুয়াশা তো কি আছে যেতে আমায় হবেই রে দিদি!বাইরে দু বস্তা সবজি নাহলে পচে যাবে তো দিদি বলে থামলো ভাই রূপ।

শ্রাবন্তী দ্রুত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে গেলো ভাইয়ের জন্য দুধ গরম করতে।সেই কখন ফিরবে কলেজ থেকে,সারাদিন ঘুরে পরিশ্রম করে তাও কিনা সবে উনিশ বছরে পা দিয়েছে রূপ।ভাবলে ভীষন কষ্ট হয় শ্রাবন্তীর তবু কোনো দিশা খুঁজে পায় না।বাবাকে আমৃত্যু খুব ভোরে সবজি নিয়ে স্টেশনে যেতে দেখতো শ্রাবন্তী,রূপ তখন খুবই ছোটো তাই ওর মনে থাকা কথাও নয়। শেষের দিকে বাবার শরীরে যখন আর কুলাতো না এত পরিশ্রম,কিছুদিন ভাই যেতো বাবার সাথে।তারপর একদিন স্টেশন থেকে মুকুল কাকা,সাধু বাবু হন্তদন্ত হয়ে বাবার নিথর দেহটা বাড়ি পৌঁছে দিতে স্তব্ধ হয়ে গেছিল শ্রাবন্তী।কুয়াশা ঘেরা আঁধার ভোরে মানুষটা নাকি মাথা ঘুরে একটা গাছে ধাক্কা মেরে টাল সামলাতে না পেরে উল্টে মারা যায়!মা তো আগেই মারা গেছে,এখন পরিবারটা আরও যেন শূন্যতায় ভরে উঠলো।

প্রথমে ভাই পড়া ছেড়ে দিলেও শ্রাবন্তী অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে কলেজে ভর্তি হতেই হবে তারপর কাজ ,সংসার সামলানো।যদিও রূপ কথা রেখেছে দিদির।প্রতিদিন ভোরবেলায় সবজির বস্তা ভ্যানে টেনে প্রথম লোকাল ধরে রূপ।দমদমে ,শিয়ালদহতে ট্রেন ঢোকা মাত্র সবজির বস্তা নামানোর লোক হাজির থাকে।এই শীত ও বর্ষায় বেশি কষ্ট হলেও রূপের চোখে মুখে সংসার সামলানোর দায়িত্ব ও তারপর পড়াশোনার চাপ দিদি শ্রাবন্তীকে বিহ্বল করে তোলে।গ্রামের জাগ্রত বুড়ো শিবের কাছে শ্রাবন্তীর একটাই প্রার্থনা ভোরের কুয়াশার মতো উদ্ভুত সমস্যা বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে হাজির হলেও সূর্যের কিরণে রূপের জীবন যেন আলোকিত হয়।


(ছবি- শৌভিক রায়)


 

বাঁচতে চাই

রীতা মোদক


আমার নিভন্ত দীপের সলতে টা 
একটু উস্কে দাও
আমার চোখের চারপাশে
সবুজ পাতাগুলো কেমন জানি 
বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে.. 
আমার বিবর্ণ প্রায় গাছে,
আমার শুষ্ক মাটিতে,
একটু জল দাও...
হাড় কাঁপানো শীতের রাতে
আমার ক্ষয়িষ্ণু শরীরটা --
একটু আগুন চায়।
আমার নিভন্ত দীপে একটু তেল দাও
 আমার জীবন দীপের সলতে টা 
একটু উস্কে দাও।
আমি সবুজ হতে চাই
তোমাদের মাঝে আমি
আরো কিছুকাল বাঁচতে চাই....

(ছবি- শৌভিক রায়) 


 

শীতের দিনে 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

শীত পোশাকে শীতের বুড়ী বেড়গুমেরই গ্রামে
উত্তর মাঠ মাঠান-জুড়ে আলতো পায়ে নামে।
মাফলার আর শাল-চাদরে মানায়  না তো শীত
ময়রা মেশায় ময়দা, ছানায় বদলায় না ঋত।
শ্যামনগরের খুড়ো ব্যাচে, জয়নগরের মোয়া
দুধ-চায়েরই কাপ গুলোতে উঠছে মিঠে ধোঁয়া। 
বড়োলোকের কুকুরগুলো লেপের জামা গায়
লালি কালি কুঁকড়ে মরে, শীত কামড়ে হায়।
চালকুমড়ো কলাই ডালের বাটনা বাটে পিসি
ভাজতে পিঠে পাটিশাপটা উপুড় তেলের শিশি।
করিম মিঁয়া পাগড়ি বেঁধে নামায় রসের হাঁড়ি
পালং শাকে ডালের বড়ি খাচ্ছি কাঁড়ি কাঁড়ি।
নলেন গুড়ের পায়েস সাথে আঁদোশা মালপোয়া 
পাটিশাপটা পেটটি মোটা পেটের ভিতর খোয়া।
কড়কড়া ভাত ট্যাংরা কষা বাপের ভীষণ শীত
সলিল -কিশোর- হেমন্তেরই গাইছি কসে গীত।
ফাটা  ঠোঁটে  বরোলিনের আতর দিয়ে ঘষে
অর্পিতা আজ শেষ বয়সে মুচকি মুচকি হাসে।
প্রেমের গানে মন ভিজে তার হৃদয় জমে ক্ষীর
টুপি পরে টাক ঢেকে নিই,  দেখায় যেন বীর।
মেছো খুড়ো মাছ নিয়ে তার লাল জামাটি গায়
বুল ষাঁড় তার লেজটি তুলে সেই দিকেতেই ধায়।
নখ ভিজেছে রাত কুয়াশায় আলপথ যায় ঘেমে 
শীত পোশাকে শীত- বুড়ি ভাই এসেছে এই গ্রামে।

ছবি- শৌভিক রায় 


 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া।।

বোবা কান্নার বেদনা: প্রাণেশ পাল
প্রকাশক:  দৈনিক বজ্রকন্ঠ 


প্রাণেশ পালের ‘বোবা কান্নার বেদনা’ একটি অন্তর্মুখী ও অনুভূতিনির্ভর কাব্যগ্রন্থ, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, স্মৃতি, ব্যথা, প্রকৃতি, এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্ববোধ সুন্দরভাবে মিশে গেছে।

গ্রন্থের কবিতাগুলোতে একদিকে আছে অভ্যন্তরীণ দহন ও ক্লান্তি (যেমন নিঃশব্দের দহন, অসহায় ক্লান্ত), অন্যদিকে আছে আলো খোঁজার চেষ্টা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা (আলোকময়, আত্মসম্মান)। প্রকৃতি এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক—মেঘ, পাতা, বৃষ্টি, আলো—যে সব উপমা মানুষের মনের অবস্থাকে প্রতিফলিত করে।

ভাষা সহজ, অথচ ভাব দার্শনিক; চিত্রকল্প স্পষ্ট এবং আবেগঘন। পুরো বইটি এক ধরনের নিঃশব্দ যন্ত্রণা ও মানবিক সংবেদনশীলতার ক্রমযাত্রা, যেখানে বেদনা কেবল বিষাদ নয়—এটি আত্মজিজ্ঞাসা ও উপলব্ধির পথও।

সার্বিকভাবে, এই কাব্যগ্রন্থটি মানবজীবনের বেদনা ও আশার সূক্ষ্ম বিন্যাস—সরল ভাষায় গভীর অনুভূতির এক নীরব দলিল।

আলোচক- অমিতাভ চক্রবর্তী 

Thursday, December 4, 2025


 

মুনা 

অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


সম্পাদকের কথা 

শীতকাল কবে আসবে বলে আক্ষেপ করি না। বরং চাই শীতকাল না আসুক। আসলে শীত মানেই তো জরা, ব্যাধি, মৃত্যু। তার চাইতে বরং গাই জীবনের গান। আর বারবার ভাবি If winter comes can spring be far behind! অবশ্য আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীতকালের কদর আলাদা। কিন্তু তাতেও আজকাল ভাটা। সৌজন্যে বিশ্ব উষ্ণায়ন। কে কবে ভেবেছিল মুজনাইয়ের বয়ে যাওয়ার এই উত্তর দেশেও এভাবে একটু শীতের জন্য মাথা কুটতে হবে! গত শীতে সেভাবে ঠাণ্ডা পড়েছিল সাকুল্যে এক-দেড় সপ্তাহ। এবারে এই মাঝ-অগ্রহায়ণেও শীতের তেমন দেখা নেই। অথচ একটা সময় হু হু ঠাণ্ডায় জমে যেতে যেতে কুয়াশায় হেঁটে বেড়ানো ছিল আমাদের শীতের সেরা সময়। সবই হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে পরিবর্তনের ঠেলায়। আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবনেও একই দশা। এমন সব বদলে যাওয়া, যা মেনে নিতে কষ্ট হয়। ঠিক যেভাবে মানতে পারি না প্রকৃতির এই ভোলবদল। তবু ভাবি `দুখানি চ সুখানি চ চক্রবৎ পরিবর্তন্তে`-এর সেই ঋষিবাক্য ভুল হওয়ার নয় কখনই.....     


অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা

চিত্রা পাল, গৌতমেন্দু নন্দী, কবিতা বণিক,

শুভেন্দু নন্দী, অনিতা নাগ,  মৌসুমী চৌধুরী, 

রণিতা দত্ত,  দেবযানী ভট্টাচার্য, উদয় সাহা, 

জয়িতা সরকার, মনোমিতা চক্রবর্তী,  বটু কৃষ্ণ হালদার, 

অভিজিৎ সেন, ভাশ্বতী রায়, শাশ্বত বোস

 আকাশলীনা ঢোল, প্রতিভা পাল, মহঃ সানোয়ার 

পার্থ সারথী নন্দী, চিরঞ্জিত মন্ডল 


অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


 

কুয়াশা বনাম ক্রিকেট 
উদয় সাহা 


ভোরের কোমল অনুত্তেজনা। কিন্তু আমরা ছুঁয়েছি উত্তেজনার সিলিং। আলস্য যে নেই, তা নয়। কুয়াশা নামলে পৃথিবীর রঙ যেন অপার্থিব হয়ে যায়। একটা মায়া-ম্যাজিকের আবহ। আকাশ তখনো পুরোপুরি জাগেনি, আলো ঠিক মতো ধরেনি মাঠের ঘাসে, অথচ আমরা জেগে উঠি। ক্রিকেটের প্রতি টান আমাদের ঘুম ভাঙায়, আর সেই টানেই আমরা ছুটে যাই ভেজা পিচের দিকে—যেখানে প্রতিটি সকাল যেন নতুন করে শেখায় অধ্যবসায়ের অর্থ।

মাঠে পা রাখলেই কুয়াশার স্নিগ্ধ কার্পেট। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে জুতো ভিজে যায়। মনে হয় প্রকৃতি যেন আমাদের গ্রাউন্ডস্ ম্যান। কখনো পিচ এতটাই ভেজা থাকে যে বল হাতছাড়া হয়ে যায়, আবার কখনো পুরো সবুজে নরম কাদা এঁকে বসে থাকে এক অচেনা পথ। তবু এই ভেজা, ধূসর সকালগুলোই আমাদের সবচেয়ে কঠোর পরীক্ষা নেয়। আমরা তৈরি হই আসন্ন কঠিন লড়াইয়ের জন্য ; রোদেলা বিকেল নয়, অনিশ্চিত ভোরের সঙ্গে সখ্য  গড়ে ওঠে আমাদের। 

প্রিয় ভোর, সকালের পোশাক পরে নিতে নিতে এক নতুন বর্ণমালা তৈরি হয়। কুয়াশার ফাঁকে ফাঁকে সকালের আলো চুঁইয়ে পড়ে ব্যাটের গায়ে, বোলারের দৌড়ে তৈরি হয় হালকা কুয়াশার রেখা, উইকেটের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা শুনি বলের মৃদু থুপথাপ শব্দ—যেন মাঠ প্রতিদিন একই ছন্দে আমাদের ডাক দেয়। মাটির পিচে স্কিড করা বল, দৌড়ানোর শব্দ, মাঝে মাঝে উদ্দীপনার চিৎকার—সব মিলিয়ে ভোরের এই মাঠ হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্লাসরুম।

মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে৷ হারিয়ে গেছে হিম সকালে আমাদের সেইসব অনুশীলনের দিন। কিন্তু মনে পড়ে, ভেজা মাঠে আমাদের রিফ্লেক্স যাচাই হ'ত। কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা শিখেছি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের ফোকাস ধরে রাখা কতটা জরুরি। ভেজা পিচে স্লিপ করার ভয় থাকে, তবু প্রতিটি বল ফেস করতে গিয়ে আমরা নিজেদের আরও মজবুত করে তুলি। ভোরের ঠান্ডা আর কুয়াশার আস্তরণেও যে দৃঢ়তা জন্মায়, পরে সেই অনুভূতি আর বোধ আমাদের পরবর্তী প্রতিটি ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়। ভালো আর নিখুঁত হবার তফাত শেখায়। 

আমরা যখন অনুশীলনের শেষে, সূর্য তখন ব্রেকফাস্ট করছে আকাশে। কুয়াশা শীর্ণ। মাঠের সবুজ আরও প্রাণবন্ত। আমরা ফিরে যাই ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে, কিন্তু মন ভরপুর শক্তিতে। কারণ জানি—পরের ভোরেও একই কুয়াশা, একই ভেজা পিচ, একই মাঠ আমাদের অপেক্ষায় থাকবে। আর আমরা—আমরাও প্রস্তুত থাকব, কারণ এটাই আমাদের প্রতিদিনের সাধনা, আমরা প্রিয় নেশার পথে অবিচল। হায় প্রিয় নেশা ! 




 

অক্ষ্যাংশ যখন ৫১°উঃ
রণিতা দত্ত

শীত! উত্তরবঙ্গ। মাগো কি শীত! কলকাতা থেকে কেউ এলে ট্রেন নেমে ই মাফলার মাংকি টুপি পরে নেন। নিজের শহরের এই শীতকে একসময় থোড়াই পরোয়া করতাম। বয়সের সাথে সাথে কাবু হয়েছি ব্যাথায়।তবু শীতকে মন্দ লাগে না। এবারে তো দেখছি উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থান করে দিব্যি আছি। অথচ এই শীতে সুমেরু বৃত্তের কাছাকাছি থাকতে হবে ভেবে নেহাত একান্ত ব্যক্তিগত দায়। ছিটকে এলাম ২৭°উঃ থেকে ৫১°উঃ অক্ষাংশে। ক্রান্তীয় উপমহাদেশের উষ্ণতা ছেড়ে এসে পড়লাম উত্তর পশ্চিম ইউরোপিয় শীত প্রধান জলবায়ুর দেশে! তাও শীত এসে প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ার ঠিক প্রাগ মুহূর্তে। তখন সেপ্টেম্বরের শেষ হপ্তা। সন্ধ্যেয় ফ্রাঙ্কফ্রুট এয়ার পোর্ট থেকে বেড়িয়েছি জ্যাকেট গায়ে টুপি মাথায়। তাও শিরশিরে বেশ ঠান্ডা হাওয়া লাগছিলো। যাগ্গে গাড়িতে বা বাড়িতে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা। তাই বিছানা আর ভাত পেয়ে বেশ ঘুমিয়ে নিলাম। সকলে বলল "জেদল্যাক"। নিশ্চিত ঘুম। বিকালে বেরোলাম। 

"Autumn is a second spring
When every leaf is a flower."
                            Albert Camus





এই হেমন্তে চারদিকে দেখি রঙের বিচিত্র খেলা। গাছগাছালির শাখায় পাতায় কত যে রং! লাল, হলুদ, কমলা, তামাটে, বাদামী রংয়ের গাছেরা উঁকি দিচ্ছে! সে এক অপূর্ব দৃশ্য! এতদিন বিদেশের 'ফল' (Fall) এর ছবি দেখেছি নানা জায়গায়, বর্ণনায় পড়েছি । কিন্তু নিজের চোখে এই সাজে প্রকৃতিকে দেখার অনুভূতিটাই যেন আলাদা।এখানে ঘরবাড়ি, অফিস দোকান পসার আর গাছপালা সমানুপাতিক । এতো গাছ মেইন টাউন শিপে না দেখলে বিশ্বাস হত না। ম্যাপল পপলার, অ্যাশ গাছগুলোর পাতায় পাতায় কত রকম যে রং! চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখি। চোখ ভরে তো মন ভরে না। সময় পেরিয়ে যায়।হিমেল হাওয়াকে একটু যেন তাচ্ছিল্য ই করি এই রূপের কাছে। শীতের দিন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। ঝরে পড়ার আগে সেজেছে পর্ণমোচির দল। পাতার সবুজ ক্লোরোফিল জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ক্যারোটিনয়েডস,জ্যান্থোফিল, পিগমেন্টকে। তাই এত রংয়ের বাহার। এত রঙিন ভাবেও যে বুড়িয়ে যাওয়া যায়, তা কে জানত?




  
সব সৌন্দর্যই তো ক্ষণস্থায়ী। দেখ্ না দেখ্ করে এই রঙিন সাজ খসিয়ে দেবে গাছেরা। মাটিতে,রাস্তায়, ঘাসে কিছুদিন পড়ে থাকবে । হাওয়ার তালে নেচে নেচে ওড়াউড়ি করবে এদিক ওদিক। তারপর। একেবারে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে মাটির বুকে।

অক্টোবর চলছে। শীত এখন বেশ আরামদায়ক। বাইরে দামাল হাওয়া শুকনো ঝরা পাতাগুলো নিয়ে খেলায় মেতে থাকে। ভোরে কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা, তারপর দিব্যি রোদ। কমললেবু পাতা ডাল সহ সুপার মার্কেট ছেয়ে গেছে। এতো ফ্রেস কমলা আমাকে টানছে। 

এখানে দেখলাম কিছু মানুষ বেশ উস্কোখুস্ক, অবিন্যস্ত গোছের। জামাকাপড় ধপদুরস্ত নয়। খাপ ছাড়া আচরণ। ওরা নাকি রিফিউজি। চেনা শব্দ, অচেনা ভূ খন্ড। ভিটে ছাড়া, চলচুলো না থাকায় কিছুটা উৎশৃঙ্খল অপরিনামদর্শী। যত চুরি চামারি ছিনতাই সব নাকি ওদের ই কীর্তি কলাপ। তবু শুধু ওদের জন্য লোকজন তাদের অতিরিক্ত জামাকাপড় শীত আসার আগে ব্যাগে করে রাস্তায় রেখে আসে।একে গিভ অ্যাওয়ে বলে।




 হ্যালোউইনের আগে ই আলো জ্বলা ভূত মুখো কুমড়োই শুধু নয়, কঙ্কাল, ভূত পেত্নী অনেকেই বাড়ির সামনে সাজিয়ে রেখতে শুরু করেছে। কোথাও কঙ্কালরা পার্টি করছে, কোথাও বা ভূতেরা গাছ বসে পা দুলাচ্ছে, আবার কোথাও বা কবরের ভেতর থেকে হাত পা বাড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে। ঝিরঝির কুয়াশায় ছায়াছায়া কায়া। বেশ মজাদার ব্যাপার। যেন ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক সজ্জা। ধর্মীয় অনুষঙ্গ যাই থেকে থাক না কেন আজকাল এটা বিশুদ্ধ মজার ব্যাপার হয়েই দাঁড়িয়েছে এ' দেশে।

৩১শে অক্টোবর সন্ধের মুখে ছোট বাচ্চারা কিম্ভুত সেজে বেরিয়েছে 'ট্রিক অর ট্রিট' এ। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চকলেট সংগ্রহ করতে। বাবা মায়েরাও কম যান না। তারাও ভৌতিক সাজে । ওদের আনন্দ দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল। আশেপাশের বাড়ির লোকেরা চকলেট বোল, কুমড়োয় মিষ্টি টর্ট দিয়ে টেবিল সাজিয়ে বসেছিল ছোটদের অপেক্ষায়। চকলেট দিতে পেরে ওরাও শিশুর মত খুশি হয়ে উঠছিল। ছোটরা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি হুটোপুটি করে দৌড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল।
 
বহুদিন আগে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া বা লক্ষ্মীপুজোর পরে এভাবেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাড়ু, মোয়া খেতাম। বড়রাও সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন। সেকথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল।
ভূত চতুর্দশী। চোদ্দপুরুষের উদ্দেশ্যে বাতি।অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের শুরুতেই। ইসলাম ধর্মে সবেবরাত। হয় ওই একই সময়। সেও নাকি মৃত আত্মাদের শ্রদ্ধা জানাতে । অক্টোবর নভেম্বর মাসটাই যে কেন মৃত আত্মাদের এত পছন্দের মাস জানিনা বাপু! দেশ কাল যতই আলাদা হোক না কেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মানুষের রীতি নীতি, আনন্দ উৎসবের একটা কোথাও ভীষণ মিল থেকেই যায় এ বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল। আজকাল যত দেখছি, সেই বিশ্বাসটাই আরও দৃঢ় হচ্ছ।



দেখতে দেখতে নভেম্বর শুরু হয়েছে।ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে। পাঁচ নভেম্বর। আমার জীবনের চতুর্থ পুরুষটি (নাতি) এখন আমাকে জাগিয়ে রাখে। মাঝরাতে কখন যে ঘড়ির কাঁটাটা উল্টোবাগে ঘুরে গেছে টের পাইনি।ভোর চারটেয় মোবাইলে অ্যালার্ম। ওনার ফিডিং টাইম। উঠে দেয়াল ঘড়িতে তিনটে দেখে ভাবলাম নিঘাত ব্যাটারিটা গ্যাছে। বদলাতে হবে। বিড়বিড় করছি নিজের মনে, মেয়ে আধো ঘুমে বলল " আজ থেকে 'ডে লাইট সেভিং' অফ হয়ে গেল মা। এখন চারটে ই বাজে। খাওয়াও। তখন খেয়াল হলো। তাই তো! আজ নভেম্বরের ফার্স্ট রোব্বার ! তাকিয়ে দেখি, আমার ফোনের দেখানো সময় আর দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির সময়ের ঠিক একঘন্টা ফারাক হয়ে গেছে।

ঠিক রাত দুটোয় প্রায় সব জায়গার ঘড়ি আবার চলে গেছে রাত একটার ঘরে। । প্রায় বললাম এজন্য যে হাওয়াই, অ্যারিজোনার দ্বীপের মত কয়েকটা জায়গা ভৌগলিক অবস্থান কারণে এই সময় আগুপিছুর চক্করে ঢোকে না।

ফোন যেহেতু ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। তাই ওখানে অটোমেটিক ফোনের সময় বদলে গেছে। দেওয়ালের ঘড়িটার কাছে চেয়ার টেনে কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক করতে হলো। এই একটা দিন হয়ে গেছে চব্বিশ ঘন্টার বদলে পঁচিশ ঘন্টার। একঘন্টা কড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা!



 এদেশে যাকে বলে প্রকৃত শীত, সে আসছে। দিন একটু একটু করে দ্রুত ছোট হচ্ছে। পাশ্চাত্য দেশ 'ডে লাইট সেভিং' অফ করে দেয়।আবার স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফিরে যায়। এই স্ট্যান্ডার্ড টাইম হলো সারা পৃথিবীর যে কোন স্থানের দ্রাঘিমাংশের হিসেবে গ্রীনিচ মিন টাইমের (GMT) পরিপ্রেক্ষিতে যে সময় নির্ধারণ করে, সেটা। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইলেকট্রিসিটি আর জৈব জ্বালানী বাঁচানোর জন্য ডে লাইট সেভিং চালু হয়েছিল । এর অর্থ আর কিছুই নয়, গ্রীষ্মকালের ১৪ঘন্টা লম্বা দিনগুলোতে ঘড়ির কাঁটা একঘন্টা এগিয়ে দেওয়া । তার মানে হলো সকাল হবে একঘন্টা আগে। সকাল দশটায় অফিস শুরু হলে আসলে স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী পৌঁছাতে হবে সকাল ন'টায়। লোকজন বাড়িও ফিরে আসবে দিনের আলো থাকতে থাকতে। সূর্য তো তাঁর চলাচলের সময় বদলাবেন না। তিনি চলবেন তাঁর নিজের নিয়মে। আর পশু পাখিদের বায়োলজিকাল ক্লকও চলবে সূর্যের নিয়মে।  

এখন প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় রবিবার 'ডে লাইট সেভিং' শুরু হয়। চলে নভেম্বরের প্রথম রবিবার পর্যন্ত। ২০২৬সালের ১০ই মার্চ, রবিবার রাত দুটের সময় সব ঘড়িতে রাত তিনটে বাজবে। ডে লাইট সেভিং অন হবে। সাথে সাথে মানুষের ঘুমের সময় থেকে একঘন্টা চুপচাপ চুরি হয়ে যাবে। সেদিন দিন হবে তেইশ ঘন্টার।

পরশুদিন সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম । তখন সকাল ন'টা। তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । সাড়ে সাতটায় অন্ধকার দেখাচ্ছিল। বাইরে পারদ ছিল জিরো ডিগ্রি। বেরিয়ে দেখলাম কনকনে ঠান্ডা তো আছেই সঙ্গে উত্তুরে বাতাস বইছে। ভালোর মধ্যে এইটুকুই ঝলমলে রোদ্দুর ।ঝকঝকে নীল আকাশ। নভেম্বরের শেষে এই রোদ,ঝকঝকে আকাশ কদাচিৎ দৃশ্য মান। এখানে এখন দেখছি দু'দিন বাদে বাদেই মেঘলা আকাশ। ঝিরঝির বৃষ্টি। ঠান্ডা আরও জাঁকিয়ে পড়ছে। আলো ফোটে দেরিতে। দিনের শুরু আর শেষে ভিজিবেলিটি কম। সন্ধ্যে সাড়ে চারটায়।
ক'দিন আগের রঙ বাহারি গাছপালা আস্তে আস্তে রঙিন বসন খুলছে। যাও বা সামান্য কিছু রঙিন পাতা এখনও লেগে আছে ডাল পালায়, তারাও বাতাসের আঘাতে কেঁপে কেঁপে খসে পড়ছে। ও হেনরীর "লাস্ট লীফ" গল্পটা মনে পড়ে যচ্ছিল। কিছু কিছু গাছ তো ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ নিষ্পত্র। 




 গুটি গুটি পায়ে এসে পড়েছে শীত। রাতে ২/৩•, সূর্য্যর ডিউটি আওয়ার্স কমছে। তাও তেঁনার লেট্ এটেন্ডেন্স, আবার নতুন বউ রেখে আপিস আসার মত যাওয়ার জলদি। শুনেছিলাম ব্রেসেলসে শীতে কয়েকদিন মাত্র তুষারপাত হয়। আজ সকালে সাড়ে পাঁচটায় মেয়ে ঘুম থেকে গুঁতিয়ে তুলল। কাঁচের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি বাইরে ফিন ফিনে তুলোর মত কিছু ঝিরঝিরিয়ে পড়ছে। গাড়ি গুলোর ওপর, মাঠের ঘাসে সাদা আস্তরণ। নভেম্বরের শেষে স্নো দেখে তো সবাই বলাবলি করছে এবারে শীত জাঁকিয়ে পড়বে। ডিসেম্বর জানুয়ারি তো পড়েই রয়েছে পারদস্তম্ভ শূন্য ছাড়িয়ে মাইনাসে নামবার। সূর্য্য মুখ তবে শীতের প্রকৃতির বর্ণহীনতাকে ঢেকে দিতে মানুষের চেষ্টার কোনো খামতি নেই। 

রাস্তা ঘাট দোকান বাজার, শপিং মল সব ইতিমধ্যেই রেন ডিয়ার, ক্রিসমাস ট্রী, সান্তা ক্লজ, আর নানারকম আলোকসজ্জায় সেজে উঠছে। দোকানে দোকানে সাজানো ক্রিসমাসের হরেক রঙিন পসরা। গাড়িতে যেতে যেতে, মর্নিং ওয়াক করতে করতে চোখে পড়ে হ্যালোইনের সাজসজ্জা খুলে ফেলে লোকজন বাড়ির সামনে সাজাচ্ছে ক্রিস মাস থিমে।ঋতু আসবে যাবে বাঁচতে হবে আনন্দে।


 

যে শীতে বৃষ্টিও ঝরে...

মৌসুমী চৌধুরী 

               মজা করে লিখতে ইচ্ছে করে, শীতের দাঁত নখ আমি দেখিয়াছি। তাই পৃথিবীতে কোথাও শীতের আদর খুঁজিতে যাই নাই আর। 

          ইঁট-কাঠ-পাথরের এই জঙ্গলে আজ হঠাৎই শীত এসে গালে আলতো টোকা মেরে ফিসফিস করে বলে যায়, "আমলকী বনগুলো তো কেটেছ হে, বহুকাল। বলো তো আজ কোথায় দাঁড়াই? দুয়ারে যে দিয়েছ কাঁটা।" আজকাল দুয়ারে সব জিনিস এসে হাজির হলেও, শীত যেন আসতে চেয়েও আসতে পারে না তাই।
        আমার শীত তাই স্মৃতির শীত বা শীতের স্মৃতি। স্মৃতির বালুচরে জেগে ওঠা মান্ধাতার গল্পগাছা। শ্লেটরঙা গাঢ় কুয়াশা, আবছায়া ভোর, লাল সাইকেল, আপাদমস্তক টুপি-মোজা-লাল সোয়েটারে মোড়া কিশোরী এক আর ইংরাজির টিউশন। এছাড়া ডিমা নদীর চরে পাড়াতুতো পিকনিক, কমলালেবু, নুন কম দেওয়া মাংস। তখনও বিপিনবাবুর কারণসুধার রমরমা ততটা ছিল না, কারণ পাড়ার জ্যাঠারা। তাঁদের যে বড্ড ভয় করত পাড়ার বীর-পুঙ্গব দাদারা। আর ছিল ডিমা নদীর পাশের জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হাতির পায়ের ছাপ কিংবা বর্জ্য-পদার্থ আবিষ্কার করে শিহরিত হওয়া ...। সেইসব শীতের দিনে বেলা বাড়লে ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার ফাঁক গলে ফিকে হলুদ রোদ উঁকি দিত। অনতিদূরে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠত পাহাড়। পাহাড়কে ছু্ঁয়ে থাকা উদাত্ত আকাশটা বড় বেশি যেন নীল হয়ে উঠত, নীল অপরাজিতা ফুলের মতো! যেন কন্ঠভরা বিষ নিয়ে শুয়ে থাকতেন স্বয়ং নীলকন্ঠ। আর সাদা ফতুয়া পরা গম্ভীর মেঘেদের দল তাঁর মাথায় চূড়ো করে সাদা জটাজাল বাঁধতে ব্যস্ত । নীল সিল্যুয়েটে মেঘসইদের সে কী হা হা হি হি আহ্লাদেপনা! আপনমনে তারা গড়ে তুলত তুলোয় মোড়া মেঘবাড়ি সব। হাঁ করে চেয়ে দেখতে দেখতে, হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিত এক অবাক কিশোরী !
        দীর্ঘ শীতের রাতগুলোতে কুয়াশা ঘিরে ফেলত চারপাশের ঘরবাড়িগুলো। পাড়াময় সাদা আঁচল বিছিয়ে নেচে নেচে, উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে রীতিমতো যেন উৎসবে মেতে উঠত কুয়াশার দল। আর ঘরের ভিতর লেপ কম্বলের ওমে নিজেদের ঢেকে আমরা তখন দুরুদুরু বুকে বার্ষিক পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করে চলেছি সিপাহি বিদ্রোহের কারণ কিংবা আইন অমান্য আন্দোলনের রূপরেখা। আমাদের টিনের চালে তখন টুপটাপ শিশির ঝরত। তেমনই এক শিশিরঝরা শীতে গোটা রাত জেগে পড়েছিলাম সমরেশ মজুমদারের "কালবেলা"। আর সেই সময়ই দেখতাম পাকরাশি বাড়ির সেই বিশাল আমলকী গাছটাকে। পাতা খসিয়ে কেমন যেন রিক্ত, বিষন্ন দাঁড়িয়ে থাকত ! কেন জানি না ভারী কষ্ট হত দেখে। গাছটাকে দেখলেই আমার মনে পড়ত কালবেলার "মাধবীলতা"কে। আর বড্ড ভারী হয়ে উঠত বুকটা।
            নাগরিক এই জীবনে বাজারের মাঝখান দিয়ে নিত্যকার চলার পথ আমার। সে পথে যেতে যেতে চোখে পড়ে শীতের রকমারি সবজির পসরা । নাক ছু্ঁয়ে যায় নানা সবজির একটা ককটেল সুবাস। টাটকা বুনো একটা গন্ধ মনটাকে বড়ই দ্রব করে তোলে। স্মৃতির সরণি বেয়ে তক্ষুনি ছবি হয়ে ফুটে উঠতে থাকে ছোটবেলায় হাট থেকে নিয়ে আসা রঙবেরঙের তাজা সবজিগুলো। হাট থেকে এনে বাবা মেঝেতে ঢালতেন সাদা ফুলকপি, লাল টমাটো, গোলাপি রঙের মূলো, ফিকে সবুজ বাঁধাকপি, গাঢ় সবুজ সিম, কালচে বেগুনি রঙের বেগুন...মেঝের বুকে ধীরে ধীরে যেন ফুটে উঠত বিচিত্র রঙ বাহারি জগত এক। বাবা বলেছিলেন, "দেখ প্রকৃতির বৈচিত্র্য। কত বিচিত্র রঙের সমাহার। এরা কিন্তু আবার একই সূত্রে বাঁধা, এরা একই প্রকৃতিজাত যে।" কথাটা শুনে কেমন চমকে উঠেছিলাম। তখন আমার কলেজবেলা, মনে যখন তখন নানা প্রশ্ন এসে হানা দিত। সেইদিন মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এটাই কি তবে বিবিধের মাঝে মহান মিলন?
    আজকাল নাগরিক শীত এসে দুয়ারে দাঁড়ায় ম্লান মুখে, আঁচলে বেঁধে আনে জয়নগরের মোয়া কিংবা বহড়ুর নলেন গুড়। হালকা উত্তুরে বাতাস ছুটে আসে, আর মনের মেঝেটাও হঠাৎই আর্দ্র হয়ে ওঠে। মাঘের সেই কোন এক হাড়-হিম-
করা শীত রাতে আমার বাবার উষ্ণ হাতখানি তীব্র শীতল হয়ে চিরতরে চলে গেছে আমার হাতখানি ছেড়ে। শীত এলে তাই বৃষ্টিও ঝরে ভিতরে আমার। আদ্যন্ত ভিজে উঠি। প্রতিটি শীত স্পর্শেরই নিজস্ব কিছু কথা থাকে, যা এক মাঘে যায় না, বার বার ফিরে ফিরে আসে।


 

শীত স্মৃতির আয়না

জয়িতা সরকার

টুনিলাইট চলেছে শীতঘুমে, আগামী বছর সবগুলো জ্বলবে কি না তা নিয়ে ফি বছরের অহেতুক আলোচনা। এক্সটেনশন বক্সগুলো টুনির সঙ্গে এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকবে এই একবছর। শীতঘুম শেষে গ্রীষ্ম, বর্ষা কাটিয়ে শরতের কোন এক শিশির ভেজা সন্ধ্যেতে তোরজোড় করে বেরিয়ে দিন কয়েকের জন্য সকলকে মুখ দেখাবে ওরা। শহর জুড়েও একটা শীত নামবে কালীপুজোর ক'দিন পরেই। কয়েকটি পুজো মন্ডপে চন্দননগরের লাইটিং-এ বিষন্ন হেমন্তের ঝলমলে এক সন্ধ্যেতে প্রথম শীতের নাচন লাগল মফস্বল শহরে, হঠাৎই কেমন এক হিমশীতল অন্ধকার উৎসবকে ছুটি দিয়ে রিক্ততার বাহক হয়ে কড়া নাড়ছে দোরে দোরে।

জড়োসড়ো অবস্থায় শীতের আগমনের প্রথম অনুভূতি স্বরভঙ্গ যাকে বলে, গলা দিয়ে সপ্তসুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে,প্রাণপণ চেষ্টায় বোঝাতে চাইছি, কিন্তু আমার কন্ঠস্বর তখন জবাব দিল গোটা কালীপুজোয় ইস্টাইল খানা ভুলে গেলি? সামনে ক্লাস পরীক্ষা, এদিকে সেই প্রাচীন যুগের ছাত্রছাত্রী আমরা, গলা চড়িয়ে না পড়লে মগজে ঠিক ঢোকে না, গলা তখন শীত ঘুমের প্রস্তুতি নিতে ব্যতিব্যস্ত, এদিকে অক্ষরগুলো চোখের সামনে নেচে বেড়াচ্ছে, দিশেহারা হয়ে সদ্য আলমারি থেকে বেরিয়ে আসা লেপমুড়ি দিয়ে আমি উষ্ণতার আদর নিয়ে শীতকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শীত নিয়ে আদিখ্যেতা করার মত মানুষ যদিও আমি না। আসবি আয়, কিন্তু সঙ্গে ওই রুক্ষ্ম ত্বক, শুষ্ক চুল এসবকে সঙ্গী না করলেই হতো। স্কুল যাওয়ার সময় ঝক্কি কম, একদিকে কাঁপতে কাঁপতে স্নান সারো, তারপর ত্বকের যত্ন, সবশেষে শরীর গরম করতে ঠান্ডা সোয়েটার গায়ে চাপাও। এতকিছুর পর ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে দশটা, কিন্তু বাইরের দিকে তাকাতেই মনে হল ভোর হয়নি, কুয়াশা ঘেরা চারিদিক, একহাত দূরের কিছুও দৃশ্যমান নয়। এমন দিনে কাঁধে বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুল যাওয়ার কষ্ট যদি কর্তাব্যক্তিরা বুঝত, তবে হয়ত বাড়তি গরম- বর্ষা- শীত সবেতেই ছুটির পরব উপভোগ করত আমাদের ছোটবেলা।

শীত মানেই যত কান্ড পাড়া জুড়ে, সেসব ঘটনার ঘনঘটায় একটি শীত উপাখ্যান রচনা করা খুব কঠিন হবে না। মহাজাগতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই প্রথম বকাঝকা খেত সূর্যদেব। শীতকাল এলেই তার কদর বৃদ্ধির নামে প্রত্যাশার পারদ এমন চড়ত যে এক টুকরো রোদের জন্য এদিক ওদিক সকলের ছোটাছুটি। আহা এমন শীতের মিঠে রোদে কোথায় দু'দন্ড শান্তিতে দাঁড়িয়ে উষ্ণ চায়ে চুমুক দেব, তা নয় সকাল থেকে লেপ- কাঁথা- কম্বল কাঁধে নিয়ে সকলে ছুটে বেড়াচ্ছেন, একটু রোদ্দুর কোথায় পাবো? জানালা দিয়ে সে সব হাস্যকর দৃশ্য দেখতে দেখতে বীজগণিতের এ প্লাস বি হোল স্কোয়ার কখন যে উত্তরায়ণ দক্ষিণায়নের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, তা ধরা পড়ল মায়ের চিৎকার করা লিটমাস টেস্টে। পাড়া জুড়ে শীতের মরসুম, হাঁকডাক চলছে, তোমাদের মাঠে খুঁটি পুঁতে দু'টো বাঁশ লাগালে এই শীত বাহারিরা একটু রোদ পোহাতে পারত, আহা! তখন আমার ছোট মনে বিরাট অহংকার, সবাই কত খাতির করছে, মাঠখানা ভাগ্যিস ছিল। না হলে রোদের হাহাকারে আমরা দানশীল হতাম কেমন করে? যদিও অনুমতি দাতা মানুষটি এসবের ধারে পাশেও আসে না, এসব আমরা মাথার দুষ্টু বুদ্ধি, সবার জন্য টাইম ঠিক করে টিকিট সিস্টেম করে লেপ- কম্বলদের এন্ট্রি করানো হবে মাঠে। মা-বাবা আমার এমন শীতল প্রস্তাব শুনে আরও শীতল হয়ে বলত, মাঠ যখন তোমার হবে, তখন এসব করো। আর আমার মন ভাবত, মাঝের উঁচু ঢিবির দু'পাশে দু'খানা মাঠের মালকিন হয়ে আমি রোদ বিক্রি করছি, আর তা দিয়ে স্কুল ছুটির পর বনকুল কিনে খাচ্ছি, আহা এমন ব্যবসায়িক বুদ্ধি আর কতজনেরই বা আছে, এসব ভাবতে ভাবতে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিলাম।

শীতের শব্দ শুনলেই নস্টালজিক হতেই হবে, কয়েকটি চেনা শব্দ,  পরিচিত ছবি আর কিছু গন্ধ, আমার শীতকাল জুড়ে এখনও উত্তাপ ছড়ায় ওই লেপ জড়িয়ে হাত দু'টোকে বের করে কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে গিয়ে রস ছিটে চোখ জ্বলা অনুভূতিকে ঘিরে। মায়ের সে এককথা ওই রস চোখে গেলে নাকি চোখ ভালো থাকে, অলীক নাকি বাস্তব সে তর্কে জড়ায়নি কোনদিনই, কারণ মায়ের সঙ্গে তর্কবিদ্যায় আমি তখন শিক্ষানবিশ। কমলালেবুর গন্ধ মাখা দুপুরে হিমেল বাতাসে মিশে যেত সন্ধ্যের নলেনগুড়ের সুবাস। বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আছে বাতাসা ফ্যাক্টরি। সারাবছর সাদা বাতাসা, লাল বাতাসা তৈরি হলেও শীতকাল মানেই গুড়ের তিলা, খাঁজারা কাঁচের বয়ামে জায়গা পেত বিশেষ আথিতেয়তায়। শৈশব- কৈশোরকে ইতি জানিয়ে মাঝজীবনেও শীত সন্ধ্যের সে গন্ধ দূরত্ব মানে না, মনে হয় সেই চেনা গন্ধ পাড়াময় ভেসে বেড়াচ্ছে। গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা শব্দগুলোও শীত স্মৃতির উষ্ণতার পরিপূরক। শীত এলেই ওরা আসে, এখন অবশ্য আসে কি না সে খবর জানা হয় না। লুপ্তপ্রায় তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হয়েছে বলেই মনে হয়। প্রতি শীতেই পাড়ার কোন এক বাড়িতে নতুন লেপের প্রয়োজন পড়বেই, আর সকাল হতেই টুংটাং শব্দ করে ধোনকারের সঙ্গে দর কষাকষির শব্দগুচ্ছ কানে বাজবে, শীতের সকালে অত্যাবশক এক চেনা ছবি। আমার কথায় ওনারা একতারা বাজান। আবার সেই আমাদের মাঠ, ত্রিপল পেতে প্রায়,দু'ঘন্টা তারের সঙ্গে তুলোর সঙ্গতে তৈরি হয়ে গেল নতুন লেপ, উফফ যার জন্য তৈরি হচ্ছে সে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশি, শীতে নতুন লেপ মানে তো অমূল্য রতন পাওয়া।

হঠাৎই কোন এক শীতে আবিষ্কার হল উষ্ণতার নতুন এক উপকরণ। চেনা হাঁকডাকের শব্দ তো নয়, কানখাড়া করে শুনছি ঠিকই, কিন্তু ঠাহর করতে পারছি না। উৎসুক মনের ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক সাইকেলের পেছনে বাহারি রঙের কাঁথা বিক্রি করতে এসেছেন। তবে সেগুলো কাঁথা নয়, পোষাকি নাম বালাপোশ, পুরনো সিনথেটিক দু- তিনটে শাড়ি দিলেই বানিয়ে দেবেন শীতের উষ্ণতার নতুন বাজারি উপাদান। শহরের অলিগলি গুলোতে নতুন শব্দের অনুরণন। পুরনোকে নতুন করে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে অধীর অপেক্ষা মা- কাকিমাদের। শীত জুড়ে নলেনগুড় - ভাগ করে নেওয়া কমলালেবু- নানা রঙের ফুল- হঠাৎ কোন এক দুপুরের শেষ রোদে একবাটি কুলমাখা, এমন চেনাছবিগুলো ভিড় করে আসে আজকের একলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটাকে। উত্তাপহীন নরম রোদে উষ্ণতা খুঁজি মায়ের হাতে সোজা কাঁটা- উল্টো কাঁটা,ঘর তোলা-ঘর গোনার জটিল হিসেবে। কী নিপুণ দক্ষতায় মা বুনে চলেছে লাল-হলুদ উলের সোয়েটার, মায়ের যত্নে বোনা সোয়েটারে লেগে থাকা ওম যেন শীতের পরম প্রাপ্তি। শীত জুড়ে স্মৃতির ভিড়, রাতদুপুরে শীত যখন শান্ত- নীরব, আমি কান পেতে থাকি বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনের কোন এক দূরপাল্লার ট্রেনের হুইসিলের জন্য। শীতের সঙ্গে এই হুইসিলের গভীরতার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। শীত এলে জলশহরের চেহারা বদলায়, কুয়াশা ঘিরে ধরে আনাচে-কানাচে, সন্ধ্যে হলেই কেমন এক রহস্যে মোড়া মায়াবী আবহ জড়িয়ে ধরে শহরটাকে।

শীত এলে মনের কোলাহল বাড়ে, স্মৃতিদের আনাগোনায় উত্তাপ বাড়ে শরীর জুড়ে, ফেলে আসা মাঠের যে কোণটা ছিল ভীষণ প্রিয়, পড়ন্ত রোদে দিনের শেষ উষ্ণতারা ছুঁয়ে যেত মায়ের একগোছা খোলা চুল, কিংবা আদর করত বেবি ক্রিম মাখা আমারছোট্ট গোলাগাল মুখটাকে, সেখানে আর রোদ-বিকেল নামে কারোর যাতায়াত নেই। অট্টালিকায় হারিয়েছে শীত দুপুরের চেনা ওম। স্মৃতিরা কুঁকড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। হয়ত ঝরে যাবে শীতের পাতার মত, ধূসর হবে শীতের বাহারি ফুলেরা, মাঠের কোণটা খুঁজতে হলে অপেক্ষা করব কোন এক বসন্তের, নতুন পাতারা জায়গা পেলে জমাট বাঁধবে শীতের শিশির বিন্দুরা। 


 

 "স্নিগ্ধতা -রুক্ষতা " --বৈপরীত্য নিয়েই অনন্য... .......

গৌতমেন্দু নন্দী


শরতের নীল আকাশে বর্ষা মেঘের লুকোচুরি  খেলা চলতে চলতেই সোনালী হেমন্তের  হঠাৎ আগমন । এই হেমন্তেই  ডুয়ার্সের নির্মেঘ আকাশের কোলে কখন যেন উন্মোচিত হয় "স্লিপিং বুদ্ধ"----ডুয়ার্সের সড়ক পথে চলতে চলতে কিংবা বহুতল ভবনের ছাদ থেকে সকালের রৌদ্রস্নাত নির্মেঘ আকাশের কোলে বিস্তীর্ণ পরিসর জুড়ে দৃশ্যমানহোতে থাকে সেই "স্লিপিং বুদ্ধ" ----তুষার শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা !!চরাচরে র্শীত আগমনের নিঃশব্দ ঘোষণা এইভাবেই যেন শুরু হয়ে যায়।  






      ক্যালেন্ডারের পাতায় তখনও হেমন্তের উজ্জ্বল  উপস্থিতি। বাতাসে "নাতিশীতোষ্ণতা" র পাল্লায়  তখন ভারী হোতে শুরু করেছে শীতল অনুভূতি। আনুষ্ঠানিক ভাবে শীতের আগমন না হলেও মধ্য হেমন্তে এইভাবেই যেন শীতের শুরুর শুরু হয়ে যায়।

  হেমন্তের ভোরের আলোয় শিশির স্নাত হয়ে মাটির বুকে বিদায়বেলায় আলপনা দেয় ঝরে পড়া শিউলির দল----
      "শীতের বনে কোন্ সে কঠিন আসবে ব'লে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে...."

       শীত আর রোদের যুগলবন্দী, স্নিগ্ধতা আর  রুক্ষতার বৈপরীত্য নিয়ে শীত আসে  ঘরে বাইরে-- নদী, অরণ্যে, মাঠে, প্রান্তরে। 
   কমলা-হলুদ রং এর রোদ্দুরে পিঠ রেখে উন্মুক্ত বাড়ির ছাদে কমলা লেবুর কোয়া ছাড়াতে ছাড়াতেই অনুভূত হয় শীতের আমেজ। 
    বাজারে টাটকা শাকসবজির রং যেন বিরাট ক্যানভাসে আঁকা জলরং এর কোন আকর্ষণীয় "স্টিল লাইফ"!  






  দৃশ্য এবং "বোধ"---দুটোতেই  তার উজ্জ্বল আবির্ভাব ঘটে।----ভোরের কুয়াশা আর সকালের প্রথম রোদের স্নিগ্ধতা, মধ্যাহ্নের নিরুত্তাপ রোদ, স্বল্পায়ু  বিকেলে  সান্ধ্য-শীতল আগ্রাসন এবং নৈঃশব্দ্য রাতে
লেপ-কম্বলের কাঙ্ক্ষিত ওমের স্পর্শ সুখে নিশীথ রাত্রি যাপন----।
        সুখ আর আলস্যের আড়মোড়া ভেঙে শুরু হওয়া প্রতিটি সকালে  শীতলতা আর উষ্ণতা যেন পরস্পরের পরিপূরক। রোদ ছাড়া শীত যেমন  আদরণীয় নয় তেমনি শীত বাদ দিলে রোদ্দুরও অসহনীয়। তাই শীত সার্থক হয়ে ওঠে উষ্ণতার স্পর্শে।  শীতের সেই "ওম" নিয়েই সার্থক হয়ে ওঠে  শীতকাল।  যতোই "শীত বুড়ি" বলা হোক না কেন আসলে "শীত" হোল রোমান্স ও তারুণ্যের প্রতীক---চির রোমান্টিক!  
  
        দার্জিলিং এর "গ্লেনারিস" বা "ক্যাভেন্টাস"এর উন্মুক্ত পরিসরে দাঁড়িয়ে শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে  তুষারস্নাত দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, বা  হিমাচলের কুফরিতে প্রথম শীতে মৃদু তুষারপাতে স্নাত হওয়া কিংবা কাশ্মীরের ডাল লেকে শীতের  সূচনায় হাউসবোটের পাটাতনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ  "আইসফল"এর সম্মুখীন হওয়া --- কোন "শীত বুড়ি"র উপাখ্যান হোতে পারে না,বড়ং অনায়াসে কোন চূড়ান্ত রোমান্টিসিজমের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে যায় !





  আবার কোন কবির কলমেও এইভাবে শীত আসে

 ---------" শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব---প্রতি সন্ধ্যায় কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে -----
   আমি চুপ করে বসে থাকি---অন্ধকারে নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায় হৈ হল্লা --
তারপর হঠাৎ 
  সব মোমবাতি ভোজবাতির মতো নিবে যায় একসঙ্গে ---উৎসবের দিন হাওয়ার মতো অন্যদিকে ছুটে যায়, বাঁশির শব্দ আর কানে আসে না......
.............আমার ভালো লাগে না ---শীতকাল 
কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকবে....."




    "শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন
আমলকীর এই ডালে ডালে 
   পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে.…."

------এই রুক্ষতার মাঝেও শীতের স্নিগ্ধরূপ কিন্তু পরিস্ফুট ।


 

শীতের ডাইরী 

অভিজিৎ সেন 


                          (১)







'শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা' 
এসে গেছে। কুয়াশা, হিমেল হাওয়া, তুষার, উষ্ণ ওম বনভোজন, সবুজ শাকসব্জির বহুমাত্রিক আয়োজন,শুষ্ক হাওয়ার,পাতাঝরিয়ে রিক্ত নিঃশ্ব‌ের মতো পথের দু'ধারে দাঁড়িয়ে থাকে গাছেরা। পশু পাখি অধ্যুষিত বনেও একই দৃশ্য। শীতের তীব্রতা ও শুষ্কতা নেমেছে দুর্দমনীয় ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় দুর্ধর্ষ ভাইকিংদের মতো। সূচের মতন শীতল দংশন, নেমে আসে শরীরে,প্রকৃতির সর্বত্র। পৌষ ও মাঘ বঙ্গ প্রকৃতির নাট্যমঞ্চে শীত ঋতুর কুশিলবেরা নেমে আসে নানা রসের নাটকের পালা নিয়ে। গ্ৰীক ট্র্যাজেডির মতো পশ্চিমা ঝঞ্ঝা-- তুর্কি-বেগে কৃষকের ফসল করে গ্ৰাস। নিয়তির অভিশাপে যেন চোখের জল,ব্যাঙ্ক অথবা মহাজনের ঋণ। আত্মহত্যায় শান্ত হয় নাটকের catastrophic পর্যায়।পরিবারটি হড়পায় অকূলে ভাসে। ক্ষুধা মুখে চোখে রং মাখিয়ে নামিয়ে আনে নিষিদ্ধ পল্লীর দংশনে। কান্না এবং দহনের আর্তনাদ ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘোরে ঊর্ধ্ব আকাশে। এ যন্ত্রণা আবহমান কাল ধরেই চলেছে কৃষকের জীবনে। প্রগতি না কী চরম শিখরে-- পরিহাস দেখ বিধাতার! কৃষক কূল পড়ে আছে আজও সেই তিমিরেই ! শীতকাল কারো জীবনে 'কাল' আমরা ভেবে দেখি কি? সময় কোথায়? এ অসময়ে! 

                                   (২)





 বনভোজন,মেলা,তাল-নবমী, নবান্নের শেষ ঘ্রাণ, কমলালেবু সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের মতো নানা জাতের রসালো পিঠে-পুলি,কাশ্মিরী অথবা ভুটিয়াদের শীতের উষ্ণ পোষাকে উপভোগ করি শীতের আমেজ। চাঁদের আলো স্নিগ্ধ কিন্তু পৃষ্ঠদেশ মসৃণ নয়! তেমনি শীত কালও বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশে,সকলের কাছে সমান আবেদন রাখে না। ফুটপাতে কুকুরের মতো চট পেতে অথবা মৃত বা অসুস্থ রোগীর ফেলে দেওয়া চাদর, লেপ, তোষক জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে রাত কাটায় যারা, শীত তাদের কাছে মনোরম নয়। যন্ত্রণার! কারো সেটাও জোটে না। "বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী"-- তাই শীতের আমেজ ও ইমেজের ব্যবহার সকলের জন্য এক নয়! ঘন কুয়াশা ঢেকে রাখে দৃশ্যমান জগতকে। আমাদের সুখ-শয্যায় ওমের চাদরে জড়িয়ে শুয়ে থাকে দীর্ঘ রাত। সূর্য উত্তর গোলার্ধ ছেড়ে অভিযানে যান দক্ষিণ গোলার্ধে। গ্ৰীষ্মে যার দাবাদহে শরীর,মন ঝলসে ওঠে--শীতে তারই সান্নিধ্য পেতে চাই। তার উত্তাপকে শুষে নিই রসালো আম্রপালি আমের মতো। শীত বনভোজনের আমন্ত্রণ নিয়ে আসে মুক্ত প্রকৃতি থেকে --পরিবার, বন্ধুবান্ধব বেরিয়ে পড়ি পাহাড়ে, নদীর তীরে,উদার উন্মুক্ত সবুজ অরণ্যে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। পাহাড়ের বিশালতা,অরণ্যের সবুজ সারল্য,পাহাড়ি নদীর দুরন্ত গতি, প্রকান্ড বৃক্ষের দল শীতল জলের স্পর্শ, পাখি ও বুনো পশুদের জীবন্ত দর্শনের অলৌকিক আনন্দে--আমাদের ফাঁপা মন,শুষ্ক মন,পতিত অনুর্বর মন-ভূমি পূর্ণ হয় সবুজের ছোঁয়ায়। আমরা যেভাবে সাধারণত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি ---(১) ফেলে আসি প্লাস্টিকের বোতল, গ্লাস, পোড়া মাটির পাত্র, কাঁচের ভাঙ্গা বোতল  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখি উচ্ছিষ্ট খাবার এবং আরও কতো কী? আপনার ব্যবহারই আপনার পরিচয়, নিঃসন্দেহে !

                                (৩) ‌‌ ‌ 






শীতকালকে ভয় করে না কে? ভীম,আলেকজান্ডার আর রবীন্দ্রনাথও--- অস্ত্র আর লেখনী এখানে শান্ত, শীতের সাথে সন্ধি স্থাপনেই বেশি আগ্ৰহী। সত্যিই কী সতেজ কুয়াশার আমেজ পাচ্ছি শহরে,নগরে। ঘাসের ডগায় জমা শিশির বিন্দু দুহাতে চেটয় নিয়ে মুখে গালে আগের মতো মাখতে পারি কি নির্দ্বিধায়? না! প্রগতি,বসতি,উন্নতির যথেচ্ছাচারের ভয়াবহ ফল অ্যাসিড বৃষ্টি,দূষিত বায়ু,পারমাণবিক দূষণ যা-- ধূলো কুয়াশা একাঙ্ক্ নাটকের নাম ধুঁয়াশা (দিল্লি )। কুয়াশা, কু-আশা আজ শহরে,নগরে। কাশ্মীর, সাইবেরিয়া, টেক্সাস, ইউরোপের দেশে--বরফের বল বানিয়ে খেলা, সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া কয়েকদিনের জন্য। পরে বিরক্তি কর মনে হবে। যারা শীতবস্ত্র সংগ্রহ করতে অক্ষম--- ভিখিরি, বাস্তুচ্যুত, অসহায় বৃদ্ধ,বৃদ্ধা, পথের অনাথ শিশু--শীত এদের জীবনে শেক্সপিয়রের ট্রজ্যেডির মতো চরিত্রের ত্রুটির পথে আসে। দায়ী কে? এরা নিজে। শাসকবর্গের কোন দায়-দায়িত্ব আছে কি? শীত নির্দয় তবুও সর্ষে ফুলের রং ও গন্ধ, গৈরিক গমক্ষেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটালে,দেশও হেসে ওঠে।


 

শীতের উষ্ণতা

ভাশ্বতী রায়
 
   আলো ওঠার আগেই জানলার কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ঠাণ্ডা গন্ধে ঘুম ভাঙল মেঘলার। জানলা খুলতেই কুয়াশায় ঢাকা সাদা-ধূসর পৃথিবী যেন তাকে স্বাগত জানাল। দূরের মাঠে দু-একজন মানুষ ভাপ ওঠা চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর রাস্তার পাশের গাছগুলো শীতের পাতলা সাদা চাদরে মোড়া। আজ মেঘলার স্কুলে ছুটি। কিন্তু বিছানার উষ্ণতা ছাড়তে মন চাইছিল না। ঠিক তখনই মা ডাকলেন— “চলো, আজ নদীর ধারে ঘুরে আসি। শীতের রোদ গায়ে লাগলে ভালো লাগবে।” মেঘলার চোখে আনন্দের ঝিলিক ফুটল। বাবা গাড়ি বের করতেই জানলার ফাঁক দিয়ে কুয়াশা ভেদ করে আসা রোদের আলোর রেখা তার গালে পড়ল। সে অনুভব করল—শীত মানেই একটু নরম, একটু স্বপ্নমাখা সকাল। নদীর ধারে পৌঁছে দেখা গেল, নৌকোর ওপর জেলেরা জাল ফেলছে। সকালের ঠাণ্ডা বাতাসে নদীর জল যেন ধোঁয়া ওঠা নরম আলোয় ভরে আছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে ভেসে আসা পাখির ডাক। মেঘলা জুতোর ফিতে খুলে শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটতে লাগল। ঘাসের ঠাণ্ডা স্পর্শে তার পায়ে ঝিনঝিনি অনুভূতি ছড়িয়ে গেল। মা বললেন, “প্রকৃতি শীতে তার স্নিগ্ধরূপে সাজে—নরম, শান্ত, আর খুব সুন্দর।” হাঁটতে হাঁটতে মেঘলার চোখে পড়ল এক বুড়ো মানুষ আগুন জ্বালিয়ে বসে আছেন। তিনি হাসিমুখে ডাকলেন, “শীতের সকাল মানেই গরম আগুন আর গল্প। এসো, বসো।” মেঘলা লজ্জা পেলেও এগিয়ে বসে পড়ল। বুড়ো মানুষটি বলতে লাগলেন শীতের গ্রামের গল্প—খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ, পিঠে বানানোর দিনগুলো, আর শীতের রাতে আগুন পোহানোর আনন্দ। গল্প শুনতে শুনতে মেঘলার মনে হলো—শীতের অনুভূতি শুধু ঠাণ্ডা নয়; এতে আছে উষ্ণ স্মৃতি আর সরল আনন্দ। কিছুক্ষণ পরে ফেরার পথে নদীর ধারের কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস আর মাটির গন্ধ মেঘলার মনকে আরও নরম করে দিল। সে অনুভব করল—প্রতিটি শীতের দিনই আসলে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ডায়েরিতে লিখল— “আজ শীতের সঙ্গে আমার নতুন বন্ধুত্ব হলো।” এভাবেই শীত চুপচাপ তার গল্প রেখে যায়—নরমভাবে, হৃদয়ের গভীরে