Thursday, December 4, 2025


 

শীতের উষ্ণতা

ভাশ্বতী রায়
 
   আলো ওঠার আগেই জানলার কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ঠাণ্ডা গন্ধে ঘুম ভাঙল মেঘলার। জানলা খুলতেই কুয়াশায় ঢাকা সাদা-ধূসর পৃথিবী যেন তাকে স্বাগত জানাল। দূরের মাঠে দু-একজন মানুষ ভাপ ওঠা চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, আর রাস্তার পাশের গাছগুলো শীতের পাতলা সাদা চাদরে মোড়া। আজ মেঘলার স্কুলে ছুটি। কিন্তু বিছানার উষ্ণতা ছাড়তে মন চাইছিল না। ঠিক তখনই মা ডাকলেন— “চলো, আজ নদীর ধারে ঘুরে আসি। শীতের রোদ গায়ে লাগলে ভালো লাগবে।” মেঘলার চোখে আনন্দের ঝিলিক ফুটল। বাবা গাড়ি বের করতেই জানলার ফাঁক দিয়ে কুয়াশা ভেদ করে আসা রোদের আলোর রেখা তার গালে পড়ল। সে অনুভব করল—শীত মানেই একটু নরম, একটু স্বপ্নমাখা সকাল। নদীর ধারে পৌঁছে দেখা গেল, নৌকোর ওপর জেলেরা জাল ফেলছে। সকালের ঠাণ্ডা বাতাসে নদীর জল যেন ধোঁয়া ওঠা নরম আলোয় ভরে আছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, মাঝে মাঝে ভেসে আসা পাখির ডাক। মেঘলা জুতোর ফিতে খুলে শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটতে লাগল। ঘাসের ঠাণ্ডা স্পর্শে তার পায়ে ঝিনঝিনি অনুভূতি ছড়িয়ে গেল। মা বললেন, “প্রকৃতি শীতে তার স্নিগ্ধরূপে সাজে—নরম, শান্ত, আর খুব সুন্দর।” হাঁটতে হাঁটতে মেঘলার চোখে পড়ল এক বুড়ো মানুষ আগুন জ্বালিয়ে বসে আছেন। তিনি হাসিমুখে ডাকলেন, “শীতের সকাল মানেই গরম আগুন আর গল্প। এসো, বসো।” মেঘলা লজ্জা পেলেও এগিয়ে বসে পড়ল। বুড়ো মানুষটি বলতে লাগলেন শীতের গ্রামের গল্প—খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ, পিঠে বানানোর দিনগুলো, আর শীতের রাতে আগুন পোহানোর আনন্দ। গল্প শুনতে শুনতে মেঘলার মনে হলো—শীতের অনুভূতি শুধু ঠাণ্ডা নয়; এতে আছে উষ্ণ স্মৃতি আর সরল আনন্দ। কিছুক্ষণ পরে ফেরার পথে নদীর ধারের কুয়াশা, ঠাণ্ডা বাতাস আর মাটির গন্ধ মেঘলার মনকে আরও নরম করে দিল। সে অনুভব করল—প্রতিটি শীতের দিনই আসলে নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ডায়েরিতে লিখল— “আজ শীতের সঙ্গে আমার নতুন বন্ধুত্ব হলো।” এভাবেই শীত চুপচাপ তার গল্প রেখে যায়—নরমভাবে, হৃদয়ের গভীরে

No comments:

Post a Comment