যে শীতে বৃষ্টিও ঝরে...
মৌসুমী চৌধুরী
মজা করে লিখতে ইচ্ছে করে, শীতের দাঁত নখ আমি দেখিয়াছি। তাই পৃথিবীতে কোথাও শীতের আদর খুঁজিতে যাই নাই আর।
ইঁট-কাঠ-পাথরের এই জঙ্গলে আজ হঠাৎই শীত এসে গালে আলতো টোকা মেরে ফিসফিস করে বলে যায়, "আমলকী বনগুলো তো কেটেছ হে, বহুকাল। বলো তো আজ কোথায় দাঁড়াই? দুয়ারে যে দিয়েছ কাঁটা।" আজকাল দুয়ারে সব জিনিস এসে হাজির হলেও, শীত যেন আসতে চেয়েও আসতে পারে না তাই।
আমার শীত তাই স্মৃতির শীত বা শীতের স্মৃতি। স্মৃতির বালুচরে জেগে ওঠা মান্ধাতার গল্পগাছা। শ্লেটরঙা গাঢ় কুয়াশা, আবছায়া ভোর, লাল সাইকেল, আপাদমস্তক টুপি-মোজা-লাল সোয়েটারে মোড়া কিশোরী এক আর ইংরাজির টিউশন। এছাড়া ডিমা নদীর চরে পাড়াতুতো পিকনিক, কমলালেবু, নুন কম দেওয়া মাংস। তখনও বিপিনবাবুর কারণসুধার রমরমা ততটা ছিল না, কারণ পাড়ার জ্যাঠারা। তাঁদের যে বড্ড ভয় করত পাড়ার বীর-পুঙ্গব দাদারা। আর ছিল ডিমা নদীর পাশের জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হাতির পায়ের ছাপ কিংবা বর্জ্য-পদার্থ আবিষ্কার করে শিহরিত হওয়া ...। সেইসব শীতের দিনে বেলা বাড়লে ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার ফাঁক গলে ফিকে হলুদ রোদ উঁকি দিত। অনতিদূরে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠত পাহাড়। পাহাড়কে ছু্ঁয়ে থাকা উদাত্ত আকাশটা বড় বেশি যেন নীল হয়ে উঠত, নীল অপরাজিতা ফুলের মতো! যেন কন্ঠভরা বিষ নিয়ে শুয়ে থাকতেন স্বয়ং নীলকন্ঠ। আর সাদা ফতুয়া পরা গম্ভীর মেঘেদের দল তাঁর মাথায় চূড়ো করে সাদা জটাজাল বাঁধতে ব্যস্ত । নীল সিল্যুয়েটে মেঘসইদের সে কী হা হা হি হি আহ্লাদেপনা! আপনমনে তারা গড়ে তুলত তুলোয় মোড়া মেঘবাড়ি সব। হাঁ করে চেয়ে দেখতে দেখতে, হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিত এক অবাক কিশোরী !
দীর্ঘ শীতের রাতগুলোতে কুয়াশা ঘিরে ফেলত চারপাশের ঘরবাড়িগুলো। পাড়াময় সাদা আঁচল বিছিয়ে নেচে নেচে, উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে রীতিমতো যেন উৎসবে মেতে উঠত কুয়াশার দল। আর ঘরের ভিতর লেপ কম্বলের ওমে নিজেদের ঢেকে আমরা তখন দুরুদুরু বুকে বার্ষিক পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করে চলেছি সিপাহি বিদ্রোহের কারণ কিংবা আইন অমান্য আন্দোলনের রূপরেখা। আমাদের টিনের চালে তখন টুপটাপ শিশির ঝরত। তেমনই এক শিশিরঝরা শীতে গোটা রাত জেগে পড়েছিলাম সমরেশ মজুমদারের "কালবেলা"। আর সেই সময়ই দেখতাম পাকরাশি বাড়ির সেই বিশাল আমলকী গাছটাকে। পাতা খসিয়ে কেমন যেন রিক্ত, বিষন্ন দাঁড়িয়ে থাকত ! কেন জানি না ভারী কষ্ট হত দেখে। গাছটাকে দেখলেই আমার মনে পড়ত কালবেলার "মাধবীলতা"কে। আর বড্ড ভারী হয়ে উঠত বুকটা।
নাগরিক এই জীবনে বাজারের মাঝখান দিয়ে নিত্যকার চলার পথ আমার। সে পথে যেতে যেতে চোখে পড়ে শীতের রকমারি সবজির পসরা । নাক ছু্ঁয়ে যায় নানা সবজির একটা ককটেল সুবাস। টাটকা বুনো একটা গন্ধ মনটাকে বড়ই দ্রব করে তোলে। স্মৃতির সরণি বেয়ে তক্ষুনি ছবি হয়ে ফুটে উঠতে থাকে ছোটবেলায় হাট থেকে নিয়ে আসা রঙবেরঙের তাজা সবজিগুলো। হাট থেকে এনে বাবা মেঝেতে ঢালতেন সাদা ফুলকপি, লাল টমাটো, গোলাপি রঙের মূলো, ফিকে সবুজ বাঁধাকপি, গাঢ় সবুজ সিম, কালচে বেগুনি রঙের বেগুন...মেঝের বুকে ধীরে ধীরে যেন ফুটে উঠত বিচিত্র রঙ বাহারি জগত এক। বাবা বলেছিলেন, "দেখ প্রকৃতির বৈচিত্র্য। কত বিচিত্র রঙের সমাহার। এরা কিন্তু আবার একই সূত্রে বাঁধা, এরা একই প্রকৃতিজাত যে।" কথাটা শুনে কেমন চমকে উঠেছিলাম। তখন আমার কলেজবেলা, মনে যখন তখন নানা প্রশ্ন এসে হানা দিত। সেইদিন মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এটাই কি তবে বিবিধের মাঝে মহান মিলন?
আজকাল নাগরিক শীত এসে দুয়ারে দাঁড়ায় ম্লান মুখে, আঁচলে বেঁধে আনে জয়নগরের মোয়া কিংবা বহড়ুর নলেন গুড়। হালকা উত্তুরে বাতাস ছুটে আসে, আর মনের মেঝেটাও হঠাৎই আর্দ্র হয়ে ওঠে। মাঘের সেই কোন এক হাড়-হিম-
করা শীত রাতে আমার বাবার উষ্ণ হাতখানি তীব্র শীতল হয়ে চিরতরে চলে গেছে আমার হাতখানি ছেড়ে। শীত এলে তাই বৃষ্টিও ঝরে ভিতরে আমার। আদ্যন্ত ভিজে উঠি। প্রতিটি শীত স্পর্শেরই নিজস্ব কিছু কথা থাকে, যা এক মাঘে যায় না, বার বার ফিরে ফিরে আসে।
No comments:
Post a Comment