Thursday, December 4, 2025


 


শীত

চিরঞ্জিত মন্ডল 

শীত আসে বাতাসের নিশ্বাসে ভেসে, ধুলোর ওপর নীলচে আলো ছড়িয়ে। মনে হয়, রাতের নিস্তব্ধতার গহীন থেকে কেউ একজন আলতো করে পৃথিবীর কোল ঘেঁষে হেঁটে গেছে, রেখে গেছে ঠান্ডার স্বচ্ছ অক্ষর। ভোরবেলা জানলার কাচে জমে ওঠা শিশির যেন প্রকৃতির লেখা অচেনা কবিতাখানি, যাকে বুঝতে হলে হৃদয়ের ভেতর একটু নীরবতা রাখতে হয়।

শীতের সকাল অন্যরকম। কুয়াশা ঝুলে থাকে মাটির খুব কাছাকাছি—একটা অর্ধস্বপ্নের মতো। দূর থেকে ভেসে আসে গ্রামের মুরগির ডাকার কর্কশ সুর, কিন্তু সেই সুরও কুয়াশার তুলোর ভেতর মিশে নরম হয়ে যায়। পথঘাট, গাছের ডাল, মানুষের মুখ—সব যেন সাদা ধোঁয়ার চাদরে একাকার। কাকের কালো ডানায় শীতরঙা আলো পড়লে মনে হয় পুরোনো কোনো জলরঙের ছবির ওপর ধুলোবালি জমে আছে। শিশিরভেজা ঘাসে পা রাখলে শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে ধাতব ঠান্ডা; অথচ এই ঠান্ডাতেই আছে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা, যেন শীত প্রকৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে নিঃশব্দ তুলি চালিয়ে।

দুপুরের রোদ শীতের সবচেয়ে কোমল মুখ। রোদ যেন আলো নয়, আদিম কোনো উষ্ণতার ফিসফিস। বারান্দায় বসে ধূসর আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় সূর্য হাত বাড়িয়ে মানুষের কাঁধে হাত রাখছে। মাটিতে শুকোতে দেওয়া ধানের গাদায় রোদের নরম কমলা আভা পড়ে যেন দিনের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো উৎসব ফুটে ওঠে। শিম, মুলা, ফুলকপির সব্জিবাজারে এই রোদের গন্ধ মিশে থাকে—খসখসে, অথচ জীবন্ত।






শীতের বিকেল নরম রঙে আঁকা। কীর্তনখোলের দূরাগত শব্দ ভেসে আসে, মাঠে ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি, আর আকাশে ঘুড়ির ধাতব রঙ—সব মিলিয়ে এই সময়টা ঠিক যেন কোনো পুরোনো গল্পের পাতা। বিকেলের আলোয় নদীর জলে ঝিলিক ওঠে—মাঝেমাঝে মনে হয়, নদীর বুকে যেন শীতের অক্ষর ভেসে থাকে। পাখিরা যখন দল বেঁধে বাসায় ফেরে, তাদের ডানার সুরে শীতের অন্তিম আলোটা নরম হয়ে আসে।

রাত ঘনিয়ে এলে শীতের আসল মুখ উন্মোচিত হয়। আকাশের তারাগুলো কাছে নেমে এসে ঝরঝর করে ঝিকমিক করে। দূরের গ্রাম থেকে ভেসে আসে পিঠে-পুলির গন্ধ, আলো-আঁধারের মধ্যে ওঠে ধোঁয়া। কম্বলের তলা থেকে পৃথিবীর শব্দগুলি দূরবর্তী মনে হয়, যেন সমস্ত কলরোল শীত চুরি করে নিয়ে গেছে। তবু এই গভীর নীরবতার মধ্যেও আছে অদ্ভুত এক আরাম, এক অনুচ্চারিত উষ্ণতা। শীতের রাত যেন ঘুমন্ত পৃথিবীর নিঃশ্বাস।

কিন্তু শীত শুধু কবিতা নয়। কঠোর ওঠানামার সিঁড়ি বেয়ে সে পৌঁছে যায় পথশিশুর জীর্ণ চাদরের ভাঁজে, খড়কুটো আগুনের তাপে উষ্ণ হতে চাওয়া অতিশ্রমিকের হাতে। শীতের কামড় যে কতটা তীক্ষ্ণ হতে পারে, তা জানে সেই মানুষরা, যাদের কাছে শীতের রূপ মানেই সংগ্রামের প্রতিদিনের অভিধান। শীতের সৌন্দর্য যেমন সম্পূর্ণ, তার এই কঠোরতাও তেমনই সত্য।

তবু শীতের আলতো ছোঁয়ায় মানুষ একটু থামে, একটু ভেবে ওঠে। হৃদয়ের গোপন অঙ্গনে জমে থাকা ধুলোবালি ঝরঝর করে নেমে যায়। প্রকৃতি যখন কুয়াশার পাতায় তার নিঃশব্দ কবিতা লেখে, মানুষ তখন তার নিজের ভেতরের চুপ করে থাকা আলোটা খুঁজে পায়। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শীত হয়ে ওঠে শুধু ঋতু নয়—একটি অনুভূতি, একটি স্মৃতি, একটি অব্যক্ত সৌন্দর্য, যা হৃদয়ে রয়ে যায় নিঃশব্দ কাব্যের মতো।

No comments:

Post a Comment