Thursday, December 4, 2025


 

শীতের ডাইরী 

অভিজিৎ সেন 


                          (১)







'শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা' 
এসে গেছে। কুয়াশা, হিমেল হাওয়া, তুষার, উষ্ণ ওম বনভোজন, সবুজ শাকসব্জির বহুমাত্রিক আয়োজন,শুষ্ক হাওয়ার,পাতাঝরিয়ে রিক্ত নিঃশ্ব‌ের মতো পথের দু'ধারে দাঁড়িয়ে থাকে গাছেরা। পশু পাখি অধ্যুষিত বনেও একই দৃশ্য। শীতের তীব্রতা ও শুষ্কতা নেমেছে দুর্দমনীয় ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় দুর্ধর্ষ ভাইকিংদের মতো। সূচের মতন শীতল দংশন, নেমে আসে শরীরে,প্রকৃতির সর্বত্র। পৌষ ও মাঘ বঙ্গ প্রকৃতির নাট্যমঞ্চে শীত ঋতুর কুশিলবেরা নেমে আসে নানা রসের নাটকের পালা নিয়ে। গ্ৰীক ট্র্যাজেডির মতো পশ্চিমা ঝঞ্ঝা-- তুর্কি-বেগে কৃষকের ফসল করে গ্ৰাস। নিয়তির অভিশাপে যেন চোখের জল,ব্যাঙ্ক অথবা মহাজনের ঋণ। আত্মহত্যায় শান্ত হয় নাটকের catastrophic পর্যায়।পরিবারটি হড়পায় অকূলে ভাসে। ক্ষুধা মুখে চোখে রং মাখিয়ে নামিয়ে আনে নিষিদ্ধ পল্লীর দংশনে। কান্না এবং দহনের আর্তনাদ ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘোরে ঊর্ধ্ব আকাশে। এ যন্ত্রণা আবহমান কাল ধরেই চলেছে কৃষকের জীবনে। প্রগতি না কী চরম শিখরে-- পরিহাস দেখ বিধাতার! কৃষক কূল পড়ে আছে আজও সেই তিমিরেই ! শীতকাল কারো জীবনে 'কাল' আমরা ভেবে দেখি কি? সময় কোথায়? এ অসময়ে! 

                                   (২)





 বনভোজন,মেলা,তাল-নবমী, নবান্নের শেষ ঘ্রাণ, কমলালেবু সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের মতো নানা জাতের রসালো পিঠে-পুলি,কাশ্মিরী অথবা ভুটিয়াদের শীতের উষ্ণ পোষাকে উপভোগ করি শীতের আমেজ। চাঁদের আলো স্নিগ্ধ কিন্তু পৃষ্ঠদেশ মসৃণ নয়! তেমনি শীত কালও বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশে,সকলের কাছে সমান আবেদন রাখে না। ফুটপাতে কুকুরের মতো চট পেতে অথবা মৃত বা অসুস্থ রোগীর ফেলে দেওয়া চাদর, লেপ, তোষক জড়িয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে রাত কাটায় যারা, শীত তাদের কাছে মনোরম নয়। যন্ত্রণার! কারো সেটাও জোটে না। "বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী"-- তাই শীতের আমেজ ও ইমেজের ব্যবহার সকলের জন্য এক নয়! ঘন কুয়াশা ঢেকে রাখে দৃশ্যমান জগতকে। আমাদের সুখ-শয্যায় ওমের চাদরে জড়িয়ে শুয়ে থাকে দীর্ঘ রাত। সূর্য উত্তর গোলার্ধ ছেড়ে অভিযানে যান দক্ষিণ গোলার্ধে। গ্ৰীষ্মে যার দাবাদহে শরীর,মন ঝলসে ওঠে--শীতে তারই সান্নিধ্য পেতে চাই। তার উত্তাপকে শুষে নিই রসালো আম্রপালি আমের মতো। শীত বনভোজনের আমন্ত্রণ নিয়ে আসে মুক্ত প্রকৃতি থেকে --পরিবার, বন্ধুবান্ধব বেরিয়ে পড়ি পাহাড়ে, নদীর তীরে,উদার উন্মুক্ত সবুজ অরণ্যে মুক্ত বিহঙ্গের মতো। পাহাড়ের বিশালতা,অরণ্যের সবুজ সারল্য,পাহাড়ি নদীর দুরন্ত গতি, প্রকান্ড বৃক্ষের দল শীতল জলের স্পর্শ, পাখি ও বুনো পশুদের জীবন্ত দর্শনের অলৌকিক আনন্দে--আমাদের ফাঁপা মন,শুষ্ক মন,পতিত অনুর্বর মন-ভূমি পূর্ণ হয় সবুজের ছোঁয়ায়। আমরা যেভাবে সাধারণত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি ---(১) ফেলে আসি প্লাস্টিকের বোতল, গ্লাস, পোড়া মাটির পাত্র, কাঁচের ভাঙ্গা বোতল  ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখি উচ্ছিষ্ট খাবার এবং আরও কতো কী? আপনার ব্যবহারই আপনার পরিচয়, নিঃসন্দেহে !

                                (৩) ‌‌ ‌ 






শীতকালকে ভয় করে না কে? ভীম,আলেকজান্ডার আর রবীন্দ্রনাথও--- অস্ত্র আর লেখনী এখানে শান্ত, শীতের সাথে সন্ধি স্থাপনেই বেশি আগ্ৰহী। সত্যিই কী সতেজ কুয়াশার আমেজ পাচ্ছি শহরে,নগরে। ঘাসের ডগায় জমা শিশির বিন্দু দুহাতে চেটয় নিয়ে মুখে গালে আগের মতো মাখতে পারি কি নির্দ্বিধায়? না! প্রগতি,বসতি,উন্নতির যথেচ্ছাচারের ভয়াবহ ফল অ্যাসিড বৃষ্টি,দূষিত বায়ু,পারমাণবিক দূষণ যা-- ধূলো কুয়াশা একাঙ্ক্ নাটকের নাম ধুঁয়াশা (দিল্লি )। কুয়াশা, কু-আশা আজ শহরে,নগরে। কাশ্মীর, সাইবেরিয়া, টেক্সাস, ইউরোপের দেশে--বরফের বল বানিয়ে খেলা, সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া কয়েকদিনের জন্য। পরে বিরক্তি কর মনে হবে। যারা শীতবস্ত্র সংগ্রহ করতে অক্ষম--- ভিখিরি, বাস্তুচ্যুত, অসহায় বৃদ্ধ,বৃদ্ধা, পথের অনাথ শিশু--শীত এদের জীবনে শেক্সপিয়রের ট্রজ্যেডির মতো চরিত্রের ত্রুটির পথে আসে। দায়ী কে? এরা নিজে। শাসকবর্গের কোন দায়-দায়িত্ব আছে কি? শীত নির্দয় তবুও সর্ষে ফুলের রং ও গন্ধ, গৈরিক গমক্ষেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটালে,দেশও হেসে ওঠে।

No comments:

Post a Comment