Thursday, December 4, 2025


 

আদুরেমনা শীত ও নস্টালজিয়া খেজুর গাছ

বটু কৃষ্ণ হালদার

কালের নিয়মে এই ভারতবর্ষে ঋতুচক্রের আবহে পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই ঋতু গুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হলো আদুরে মেনা শীত। সোনালী আলোর পরশ রেখার ডানায় ভর করে হেমন্তের কাঁধে ভর করে শীতের আগমন হয়। শীত মানে মায়ের হাতে নিখুত বুননে নকশী কাঁথার স্পর্শ। বিছানা ছেড়ে উঠি উঠি করতে কখন যে সূর্য আপন কক্ষ পথ ঘুরে মাঝ বরাবর উঁকি দেয় তা বুঝতেই পারিনা। নব কিশলয়ের কল্লোলের কোল হতে টপটপ করে ঝরে পড়ে শিশির বিন্দু। কচি ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু রাঙা চরণ ছুঁয়ে আলপনা এঁকে যায়।

সাদা কাশফুল যেমন জানান দেয় শরৎকাল এসেছে, ঘরের মেয়ে উমা আসবে বাপের বাড়ি, ঠিক তেমনই সোনালী পাকা ধানের খেত গাঁদা, ডালিয়া,সূর্যমুখী,গোলাপের রঙ্গিন পাখনার উপর ভর করে আদুরেমনা শীতের আগমন ঘটে। শীত মানে নলেন গুড়।"খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধ নন্দ", গানটি বেশ জনপ্রিয়। ঠিক তেমনি নলেন গুড় বাংলার মানুষের কাছে অতি প্রিয় এক প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। চারিদিকে ঘন কুয়াশার প্রাচীর, তারই মাঝে খেজুর গাছে ঝুলে থাকে রসের হাড়ি।গ্রামের মানুষরা খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহায়,সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতে থাকে।দূর হতে ভেসে আসে তার মিষ্টি সুগন্ধ।

শীতকাল আসতেই মনে পড়ে যায় পিঠে পুলি পায়েস এর কথা। শীতকাল মানেই খেজুর-গাছের-রস ও নলেন গুড়। বারবার শহুরে মানুষ এই খেজুর-গাছের-রস বা নলেন গুড়ের টানে গ্রামে ফিরে গেছেন।নলেন গুড় বা খেজুর গাছ থেকে রস তৈরির কিছু পদ্ধতি আছে। তার জন্য কয়েকটি উপকরণ দরকার হয় তা হল হেঁসোদা, বালি,হেঁসোদা শান দেবার জায়গা(যা কাঠ দিয়ে তৈরি হয়), মাটির ভাঁড় বা কলসি, বাঁশের তৈরি নলি,কাছি( পাটের তৈরি দড়ি)। শীত শুরু হওয়ার আগেই মানুষজন তাদের খেজুর গাpছ গুলো তে কেটে পরিস্কার করে(গাছের একপাশ)। তারপর বেশ কিছুদিন সেই জায়গা শুকোতে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর সে শুকনো জায়গায় নতুন করে কেটে নলি পুঁতে দেওয়া হয়।গাছের থেকে রস মাটির ভাঁড় ভরে ওঠে। বিকালে গাছ কাটা হয় আর পরের দিন সকালে সেইবার গাছ থেকে নামিয়ে এনে রস উনানে জাল দিয়ে খেজুরের গুড় তৈরি করা হয়। যেখানে রস জ্বাল দেয়া হয় সেখান থেকে দারুন সুগন্ধ ওঠে। সেই গন্ধে চারিদিক মম করে।আসল খেজুরের গুড় দিয়ে মোয়া,পাটালি আরো অনেক কিছু তৈরি হয়।

এই শীত কৃষক পরিবারে আনন্দের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। মা লক্ষ্মীর আশীষ সোনালী ফসল মাঠ থেকে ঘরে ফেরার পালা। তবে কথায় আছে কারো" পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ"। শীতের সুখকর অনুভূতি মাঝেও দুঃখের বার্তা বয়ে আসে হতদরিদ্র পরিবার গুলির মাঝে।কলকাতার ফুটপাতবাসী সহ এমন বহু পরিবার আছে যাদের কাছে লেপ-কম্বলের সুখকর বিছানা শুধু স্বপ্ন। যাদের হাড় হিম করা রাত কাটে পাতলা কাপড় গায়ে দিয়ে, নয় তো  খড় কুটো গাছের ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, তারই পাশে বসে বসে কেটে যায় অগণিত কত রাত। অপেক্ষা করে সূর্যের প্রখর উষ্ণতার জন্য, সূর্য তাদের কাছে এক সুখের জগত। শীতের বিদায়ের অপেক্ষায় মগ্ন থাকে, এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়।

No comments:

Post a Comment