এলো যে শীতের বেলা
অনিতা নাগ
দুর্গাপূজো হয়ে গেলেই বাতাসে কেমন এক বিষন্নতার সুর বাজে। ঝুপ করে সন্ধ্যে হয়ে যায়। ঘরে ঘরে শাঁখ বেজে উঠে। সকালের শিউলি তলা তেমন করে আর ফুলে ভরে উঠে না৷ বাতাসে এক শুষ্কতা। গায়ের চামড়ায় টান ধরে। তারজন্য অবশ্য বাহারী সব লোশন, ক্রিমের ব্যবস্থা আছে। মুঠোফোনে নাম লিখে সার্চ বোতাম টিপলেই হলো। শীতের বেলায় কেমন এক বিষণ্নতা গা মাখামাখি করে থাকে। ফলের ঝুরিতে রাখা কমলালেবু গুলো শুকিয়ে যায়। খাওয়া হয় না। মনে পড়ে যায় ছাদে মাদুর পেতে মিঠে রোদ গায়ে মেখে কমলালবু খাওয়ার কথা। শীত মানেই উজ্জ্বলতা, নানান রঙের বাহার। গুড়, মোয়া, সরুচাকলী! সকালের স্কুল সেরে ফিরে হাত মুখ ধোয়া হলে মা লাল টমেটো মাথার কাঁটা দিয়ে উপরটা ফুটো ফুটো করে নুন চিনি ছড়িয়ে দিতেন। ছাদের রোদে ঘুরে ঘুরে সেই টমেটো খাওয়ার কি যে মজা ছিলো! কতো সহজ উপায়ে ভিটামিন সি খাওয়ানো হতো ভাবলে অবাক লাগে। বাবা সাইকেলে বাজার করে আসতেন। কত্তো তরকারী! মা গজগজ করতেন। একসাথে তিনরকম কপি, পালং শাক, মূলো, বীট, গাজর! এতো বাজার রাখবো কোথায়! তখন তো ফ্রীজ ছিলো না। বেতের ঝুরিতে সব সাজিয়ে রাখতেন। মা। বীট, গাজর, আলু সেদ্ধ করে বাবা স্যালড বানাতেন। খুব অপছন্দের খাওয়া। তবু মা’র বকুনির ভয়ে খেতে হতো। মা বাজারের থলে উপুর করলেই সবুজ, লাল, কমলা, কতো যে রঙের বাহার। খুব ভালো লাগতো। মা’ র যে কতো কষ্ট হতো এখন বুঝি। শীতকালে আরেকটা আকর্ষণ ছিলো সকালে আধ সেদ্ধ ডিম খেতে পাওয়ার আনন্দ। ঠাকুমা মুরগির ডিম ঢুকতে দিতেন না। শীতকাল একটা কলাই এর বাটি আলাদা করে রাখা থাকতো রান্না ঘরের কোণায়। মা জল গরম করে ঢেলে দিতেন কলাই এর বাটিতে রাখা ডিমের উপর। কিছুক্ষণ পর সেই ডিম ফাটিয়ে নুন মরিচ দিয়ে খেতাম। সে’ স্বাদ আজো ভুলিনি। আজ আর মুরগীর ডিমের বাছবিচার নেই। একার সংসারে নিয়ম নিজের মতোই চলে। কিন্তু আজ আর অমন করে ডিম খাবার ইচ্ছেই করে না। মনে মনে সেই স্বাদ আগলে রেখেছি। মা একা হাতে উনুনের আঁচে সকলের জন্য রান্না করতেন, সব গুছিয়ে রাখতেন। রান্নার কাজ সেরে খাওয়ার পাট মিটিয়ে যে সময়টুকু পেতেন তখন বসতেন উল কাঁটা নিয়ে। ছোটবেলায় আমরা কেনা সোয়েটার পরিনি কখনো। মা বানাতেন। আমাদের পাড়ায় সাহিত্যিক বিমল মিত্র থাকতেন। তার স্ত্রীর কাছে মা নতুন ডিজাইন তুলতে যেতেন। সেই নতুন ডিজাইন দিয়ে নতুন সোয়েটার বানাতেন। মা’ র কাছ থেকেই আমার উল বোনা শেখা। নানান রঙের উলে ডিজাইন দিয়ে সোয়েটার বানাতে আমারও খুব ভালো লাগে। তবে আজকাল আর হাতে বোনা সোয়েটারের চল তেমন নেই।নিত্য নতুন বাহারী সোয়েটারের মেলা দোকানে, অনলাইনে। সোয়েটারের জায়গায় এসেছে রকমারী জ্যাকেট। তখন সে'সব ছিলো না।আমি নাতির জন্য বানাই। সে বড় আনন্দ করে পড়ে। শীত মানে ছাদে গাছ ভর্তি ফুল। বাবার ছিলো ফুলের শখ। নানান রঙের গাদা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া আলো করে থাকতো। ছাদে মাদুর পেতে লেপ কম্বল রোদে দেওয়া হতো। সেই গরম লেপে গড়াগড়ি খেতাম। এখন তো ভারী লেপ গায়ে দিতে পারিনা। বাহারী কম্বল, জয়পুরী হাল্কা রজাই। কতো বাহার সে’ সব জিনিষের। শুধু শীতটা অধরা হয়ে গেছে। কলকাতায় ক'দিনই বা শীত পড়ে! একটা পাতলা চাদরেই হয়ে যায়। বাইরে বেরুলে বাহারী স্টোল জড়িয়ে নিলেই হলো। এখনছোট ব্যালকনিতে টবে যেটুকু গাছ হয়, তাতেই আমার সখের পিটুনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া গাদা। রঙটাকে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা। দু'জনের সংসারে ক'টা আর তরকারী লাগে! তারপর খাওয়ায় নানান বাধানিষেধ। তবু কড়াইশুঁটি, পিয়াজকলি, ধনেপাতার সবুজ রঙে কেমন জাদু আছে, আছে টমেটো। এপন ূবশ্য সারাবছর টমেটো পাওয়া যায়। শীতকাল মানেই ইতুপূজো, নতুন গুড়, পাটালী, নবান্ন, কড়াইশুঁটির পিঠে, কচুরী, ডালডার গন্ধ। এমন কতো যে স্মৃতি। অগ্রহায়ন মাসের রববার ইতুপূজা হয়। আজও পালন করি। ইতুকে নবান্ন দেওয়া হয়। নতুন গুড়, নতুন চাল, নতুন তরকারী, নতুন গুড়। ন’ রকম নতুন জিনিষ দিয়ে কাঁচা দুধে নবান্ন ইতু মা’ কে নিবেদন করা হতো। সেই নবান্ন প্রসাদের কি অপূর্ব স্বাদ। এইসময় বাংলায় নতুন ফষল, নতুন ধাণের সময়। সব পূজো, সব উৎসবের সাথে সামাজিক যোগসূত্র থাকে। আবহমান কাল ধরে সেই ঐতিহ্যের ধারা এগিয়ে চলেছে। যতোই পরিবর্তন আসুক, স্রিগি, জোম্যাটো থেকে যতোই লোভনীয় খাবার আসুক, পিঠে পাটিসাপটা, পায়েস আজও জনপ্রিয়। রান্নাঘরের উনুনে লোহার চাটুতে বেগুনের বোঁটা দিয়ে তেল মাখিয়ে ঠাকুমা সরুচাকলী বানাতেন। সাথে ঝোলা খেজুর গুড়। সপ’ স্বাদের ভাগ হবে না। ছেলে মেয়ে বাইরে থাকে,দোকলার সংসারে পিঠে পায়েস বানালেও তেমন হৈহৈ করে খাওয়ার কেউ নেই। তবু ঐতিহ্য আগলে রাখা। পৌষ মাসে লক্ষীপূজো হতো। নতুন ধান উঠলে লক্ষির ধান পাল্টানো হতো। ঠাকুরমশায় দাদু আসতেন পূজো করতে। মাটির লক্ষীর হাঁড়ি থেকে কুনকে, কাঠের প্যাঁচা, রূপোর গাছকৌটো বার করে কাঠের জলচৌকিতে আলপনা দিয়ে লাল বেনারসী পড়িয়ে লক্ষিকে সাজাতেন মা। চৌকাঠে চালের গুঁড়োর আলপনা, সিঁড়িতে লক্ষীর পা। পিতলের হাঁড়িতে আতপ চাল ফোটার গন্ধ! এমন কতো স্মৃতি শীতকালকে ছুঁয়ে আছে। গত কয়েকবছর শীতে কলকাতার বাইরে কাটছে। শীতকে তাই তেমন করে ধরতে পারি না। তবু শীত জড়িয়ে থাকে। শীতের ওম্ আগলে রাখি। আগলে রাখি স্মৃতিতে পরম সোহাগে।
No comments:
Post a Comment