কুয়াশা ঘেরা ভোর
রাণা চ্যাটার্জী
এই ভাই তুই কি আজ বেরুবি! কাজ ও কলেজ কি যেতেই হবে? বাইরে কিন্তু প্রচণ্ড কুয়াশা ,কিছুই দেখা যাচ্ছে না রে ভাই ! শ্রাবন্তী ঘুম ঘুম চোখে ভাই রূপকে তুলতে এসে কথাগুলো বলল।ঘড়িতে চারটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট,ঠান্ডাটা হঠাৎ করে জাঁকিয়ে পড়েছে কিন্তু বিছানায় কই ভাই তো নেই! পা বালিশে এমন ভাবে চাদর ঢাকা দিয়ে দিদিকে বোকা বানাতে পারলে ভীষন খুশি হওয়া ভাই ততক্ষণে বাথরুমে গায়ে জল ঢালছে।দিদি আমি স্নান করে ফেলেছি ,কুয়াশা তো কি আছে যেতে আমায় হবেই রে দিদি!বাইরে দু বস্তা সবজি নাহলে পচে যাবে তো দিদি বলে থামলো ভাই রূপ।
শ্রাবন্তী দ্রুত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে গেলো ভাইয়ের জন্য দুধ গরম করতে।সেই কখন ফিরবে কলেজ থেকে,সারাদিন ঘুরে পরিশ্রম করে তাও কিনা সবে উনিশ বছরে পা দিয়েছে রূপ।ভাবলে ভীষন কষ্ট হয় শ্রাবন্তীর তবু কোনো দিশা খুঁজে পায় না।বাবাকে আমৃত্যু খুব ভোরে সবজি নিয়ে স্টেশনে যেতে দেখতো শ্রাবন্তী,রূপ তখন খুবই ছোটো তাই ওর মনে থাকা কথাও নয়। শেষের দিকে বাবার শরীরে যখন আর কুলাতো না এত পরিশ্রম,কিছুদিন ভাই যেতো বাবার সাথে।তারপর একদিন স্টেশন থেকে মুকুল কাকা,সাধু বাবু হন্তদন্ত হয়ে বাবার নিথর দেহটা বাড়ি পৌঁছে দিতে স্তব্ধ হয়ে গেছিল শ্রাবন্তী।কুয়াশা ঘেরা আঁধার ভোরে মানুষটা নাকি মাথা ঘুরে একটা গাছে ধাক্কা মেরে টাল সামলাতে না পেরে উল্টে মারা যায়!মা তো আগেই মারা গেছে,এখন পরিবারটা আরও যেন শূন্যতায় ভরে উঠলো।
প্রথমে ভাই পড়া ছেড়ে দিলেও শ্রাবন্তী অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে কলেজে ভর্তি হতেই হবে তারপর কাজ ,সংসার সামলানো।যদিও রূপ কথা রেখেছে দিদির।প্রতিদিন ভোরবেলায় সবজির বস্তা ভ্যানে টেনে প্রথম লোকাল ধরে রূপ।দমদমে ,শিয়ালদহতে ট্রেন ঢোকা মাত্র সবজির বস্তা নামানোর লোক হাজির থাকে।এই শীত ও বর্ষায় বেশি কষ্ট হলেও রূপের চোখে মুখে সংসার সামলানোর দায়িত্ব ও তারপর পড়াশোনার চাপ দিদি শ্রাবন্তীকে বিহ্বল করে তোলে।গ্রামের জাগ্রত বুড়ো শিবের কাছে শ্রাবন্তীর একটাই প্রার্থনা ভোরের কুয়াশার মতো উদ্ভুত সমস্যা বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে হাজির হলেও সূর্যের কিরণে রূপের জীবন যেন আলোকিত হয়।
(ছবি- শৌভিক রায়)
No comments:
Post a Comment