স্নেহের উত্তাপ
কবিতা বণিক
আলমারির নীচে রাখা লেপটা চোখে পড়ল। বেশ অনেক বছর আমরা কম্বলে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। ফলে সে এতদিন নির্জীবের মতই পড়েছিল। আলমারির পাল্লা খুলে মাটিতে বসে পড়েছিলাম গোছাব বলে। সে যেন তার মায়াময় দুহাত বাড়িয়ে দিল। কি সোহাগ! কতদিন এই সোহাগ পেতেই ভুলে গেছি। অজান্তেই সারা শরীর জুড়ে যেন ফিরে পেলাম কত হারিয়ে যাওয়া স্নেহস্পর্শ, বর্ণ, কত না প্রাণভরা আশীর্বাদ যা আমার অঙ্গে অঙ্গে শীতের মিঠে সোনালী রোদ্দুরের মোহময়ী স্পর্শের মত নরম, কোমল ও দিব্যভাবে ভরপুর। সে কত বছর আগের কথা! আজও এমনই নরম স্নেহময়ী হয়েই সে আছে। মা-বাবার স্নেহাশীর্বাদ যেন আজও সেই বহন করছে। আঃ কি সুখ। কি আনন্দ! আজ সত্যই মনে হল শীত এসেছে আমারই জন্য। হ্যাঁ আমারই জন্য। কেমন করে মাঝের কয়েকটা বছর তার খেয়াল রাখিনি। লেপের গায়ে হাত বুলিয়ে মনে হয় যা আছে তা তো আছে। আরও পাই …. তবুও শান্তি তবুও আনন্দ। প্রথম যৌবনের আনন্দের সোনার কুচিগুলো মনের মণিকোঠায় চিক চিক করে উঠল। যদিও সব কালের অতল তলে হারিয়ে গেছে। মনকে বলি, কিছুই কি নেই বাকি? আছে! স্মৃতির সরণী বেয়ে কতদূর হাঁটলাম সময়টা হিসেব করিনি। ফিরে এলাম প্রতিবেশীর শঙ্খধ্বনিতে, সেই মনের আঙিনায় ধূসর হয়ে যাওয়া যুগ হতে। জানলায় দেখি জ্যোৎস্নার চাঁদের নরম আলোয় স্বর্গীয় সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। মনটা বলছে ভালোবাসার এই আশীর্বাদ মায়াভরা জ্যোৎস্নার মতো বাবার স্নেহ লেগে থাক আমার গায়ে পিঠে। মায়ের খোঁপার চাঁপা ফুলের গন্ধের সাথে স্নেহচুম্বন থাক মিশে। এ শুধু লেপ নয় পুরো সংসারটাকে তাদের স্নেহাশীর্বাদের ওমে জড়িয়ে রাখার নাম। তাদের ওমের এই স্পর্শ আমাকে ছোটবেলার শেখানো কথাগুলো মনে করিয়ে দিল। “ক্ষমা করো”“ভালোবাসো” সেই কথাগুলোর অনুরণন শুনতে পেলাম। বাবা বলেছিলেন – “ মানুষ নিয়েই তো ঘর সংসার। সবাইকে আপন করে কাছে টেনে নেওয়াই একটা সুন্দর জীবন। এই রকম সব সংসার নিয়েই সমাজ।” সেদিন অত কথা হয়ত ঠিক বুঝিনি। আজ এই লেপের ওমে মনে হচ্ছে আমরা সবাই ঢুকেছি এই লেপের ওমের ভিতর। আঃ কি তৃপ্তি! কি শান্তি! আমরা সবাই সবার।
চাঁদের মধ্যে মনে হচ্ছে ওই তো মা-বাবা হাসছেন। জ্যোৎস্নার আলোয় ঘর ভরে উঠেছে। লাইট জ্বালা হয়নি। লেপটাকে জড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। নিজের মনে গাইতে লাগলাম—
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।।
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।।
No comments:
Post a Comment