বিশেষ বাছাই প্রবন্ধ
বাংলার ক্লান্তিহরা শীতল পাটির কথা
কবিতা বণিক
চন্দনেরই গন্ধ ভরা/ শীতল পারা ক্লান্তি হরা।
যেখানে তার অঙ্গ রাখি/ সেইখানেতে শীতল পাটি।।
ছন্দের যাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা এই কবিতা বাংলার মাটিকে নিপুণ কারুকাজের শীতল পাটির সাথে তুলনা করেছেন। শীতল পাটির বৈশিষ্ট্য, বাঙালিয়ানাকে যেমন বোঝায় তেমনি বাঙালির শিল্প ও পরিচয় বহন করে। ঘরে শীতল পাটি থাকা অর্থ বাঙালিয়ানার প্রতীক।
শীতল পাটির নামের সাথে জুড়ে আছে শীতলতা। শ্রী চৈতন্য দেবও শীতল পাটি ব্যবহার করেছেন। সহজ, গুণমানে সমৃদ্ধ, প্রাকৃতিক এই শীতল পাটি অতি সাধারণ থেকে রাজা মহারাজারাও ব্যবহার করতেন। এ থেকে বোঝা যায় হাজার বছরের সনাতনী ইতিহাসের ওপর এই শিল্পের ভিত্তি ও পুরোন হস্তশিল্প সমৃদ্ধ বাংলার শীতল পাটি। এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ও জীবন যাপনেরও জীবন্ত প্রতীক। হস্ত শিল্পের ঐতিহ্য হিসেবেও সংরক্ষণ করা হয়। আমাদের ঘর সাজানোর শৌখিন সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হয়। অতিথি আপ্যায়নে, শোয়ার জন্যে, বসার জন্যে ব্যবহার হয় শীতল পাটি। আজকাল আরও বিভিন্ন ভাবে শৌখিনতায়, ঘর ঠান্ডা রাখতে সিলিংএ , দেওয়ালে, মেঝেতে, বিছানায় পাতা হয়। এখন নানা রকম উপহার সামগ্রী, শৌখিন ব্যাগ ইত্যাদি তৈরি হয় শীতল পাটির সাথে জুট সেলাই করে। খুব গরমে ঘর ঠান্ডা হয়। আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মুগ্ধ হয়েছিলেন শীতল পাটির সৌন্দর্যে ও গুণ মানে। রবীন্দ্র নাথের গাড়িকে ঠান্ডা রাখতে এক জাপানি শিল্পী শীতল পাটি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের উদয়ন বাডিটিকেও শীতল পাটি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলার ঘরে অতিথিকে কি কি সেরা জিনিস দিয়ে আপ্যায়ণ করবে তা ছড়া কেটে বাংলার মেয়েরা বলতেন। ঘুমপাড়ানি গানের সাথেও ঘুমের মাসি, ঘুমের পিসিকে সেরা সেরা জিনিস দেওয়ার কথা বলা হয়। এখানেও অবশ্যই আরামদায়ক ঘুমের জন্য শীতল পাটির কথা বলা হয়-
ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি, ঘুমের বাড়ি যেও।
বাটা ভরে পান দেব, গাল ভরে খেও।
শান বাঁধানো ঘাট দেব, বেসন মেখে নেয়ো।
শীতল পাটি পেড়ে দেব, পড়ে ঘুম যেয়ো।।
আগেকার দিনে মায়েরা বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্যে বাচ্চাদের শীতল পাটিতে শোয়াতেন। শীতল পাটিতে সাপ ওঠে না। খুব মসৃন ও চকচকে হওয়ার কারণে।
তিন রকম বুনোটের শীতল পাটি পাই। খুব মিহি নরম ও হাল্কা ঠান্ডা স্পর্শের শীতল পাটির দামও বেশি। কারণ চাদরের মতো নরম ও নানা ডিজাইনের বোনা এই পাটির দেশ বিদেশে খুব চাহিদা। সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে মুর্শিদকুলি খাঁ শীতল পাটি উপহার দিয়েছিলেন। রাণী ভিক্টোরিয়ারও খুব পছন্দের ছিল শীতল পাটি। রাণীর কাছেও এই উচ্চ গুণমানের শীতল পাটি পৌঁছেছিল। এ থেকে বোঝা যায় এই শীতল পাটি মাটির বাড়িতেও এনে দিত রাজকীয় স্বস্তি। বাংলার গরমে স্নিগ্ধতা এনে দিত শীতল পাটি। এটি বাংলার লোক সংস্কৃতির একটা অংশ। শুধু ব্যবহারেই নয়, অতিথি আপ্যায়নে, উপহারে, বিয়ের তত্বে যে কোন শুভ কাজে বাঙালির শীতল পাটি চাই। গরমে এই পাটির বিশেষ ভাবে ব্যবহার হয়। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই পাটি যেমন পরিবেশ বান্ধব, হালকা, বহন যোগ্য, মসৃণ, ঠাণ্ডা। এই পাটিতে বসলে বা শুলে ঠাণ্ডা অনুভব হয়। ঠাণ্ডা আমেজ আনে বলেই এর নাম শীতল পাটি। নান্দনিক এই কারুশিল্প সারা ভারতে ও বিদেশে এত সম্মান অর্জন করেছে ও পরিবেশ বান্ধব বলেই ২০১৭ সালে ইউনেস্কো বাংলাদেশের সিলেটের শীতল পার্টিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।
বৃটিশ আমলে সিলেটের বালাগঞ্জে শীতল পাটির খুব বড় বাজার ছিল। এখানে রাজনগরে হাজার হাজার কারিগর ছিল। বালাগঞ্জ কে আজও শীতল পাটির গ্রাম বলা হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নদীর ধারে বা স্যাতস্যাতে জায়গায় প্রাকৃতিক ভাবেই মুরতা চাষ হত। বালাগঞ্জের – কাশীপুর, পৈলমপুর, সিঙরা কোনা, হামচাপুর, বাঁধাপুর, রূপাপুর, মাকরামি, তেঘড়ি, জামপুর প্রভৃতি গ্রামে মুরতা চাষ হতো। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত তুলাপুর গ্রামের একদিকে কুশিয়ারা নদী অন্যদিকে সবুজের ফসলি প্রান্তর। বালাগঞ্জ উপজেলার তুলাপুর গ্রাম শীতল পাটি বুননের আদি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মুরতা গাছ থেকেই এখানকার কারিগররা খুব ভালো মানের শীতল পাটি তৈরী করেন। বিছানার চাদরের মতো যেমন ডিজাইন তেমনি ভাজ করে রাখা যায়। পাটির যে সুতা বা বেতা বলে তা কিছু কিছু রঙ করা হয়। ডিজাইন তৈরির জন্য। কারিগররা যে সব পাটি বোনেন সবচেয়ে ভালো পাটি তৈরি করতে কখনও ৬ মাস, ৩/৪ মাস, ১ মাস, ১৫ দিন লাগে। রঙ করা বেতা দিয়ে পাটিতে খুব সুন্দর ভাবে বোনা হয় গাছের সারি, অনেক পদ্ম ফুল, কোনটাতে তাজমহল, কোনটাতে পাশা খেলার ছক তৈরি করা। যাতে পাটিতে বসেই গুটি দিয়ে পাশা খেলতে পারবেন। এই পাটি গুলোকে মাঝে মাঝে হালকা জলে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছলে রঙে চমক আসে। ১ লক্ষ টাকার পার্টিও আছে। যা বিদেশে পুরস্কৃত হয়েছে। সিলেটের মৌলভী বাজারের শীতল পাটি শিল্পী হরেন্দ্র কুমার দাস জানালেন তাদের বংশপরম্পরায় শীতল পাটি শিল্পের কাজ তারা করে আসছেন। বাংলাদেশের সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে প্রচুর মেলা করেছেন। বিদেশেও সরকারি উদ্যোগে গিয়েছেন জাপানে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। শীতল পাটির চাহিদাও আছে। কিন্তু এখন সেভাবে কারিগর নেই। কারণ ছেলেমেয়েরা অন্য কাজ করেই আনন্দ পায়।
টাঙ্গাইলের শীতল পাটিও খুব ভালো মানের।কালিঘাটি, ঘাটাল, দোলদোয়া ইত্যাদির পঞ্চাশটির মতো গ্রামে এখনও শীতল পাটির প্রচুর কারিগর রয়েছেন। তারা পটিয়াল নামে পরিচিত। রংপুর, বগুড়া, বড়িশাল, কুমিল্লা, লক্ষীপুর এমনই অনেক জায়গায় এই পাটি শিল্পের কাজ হয়।
বড়িশালের ঝালকাঠির ব্রান্ড পণ্য হচ্ছে পেয়ারা ও শীতল পাটি। ঝালকাঠির- রাজাপুর, নলসিটি, সদর উপজেলা এমন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে ঝালকাঠি। এই গ্রামগুলোকে বলা হয় কাঠি গ্রাম। সেখানে এই ব্রান্ড নিয়ে একটা ছড়া বলে। পেয়ারা আর শীতলপাটি / এই নিয়ে ঝালকাঠি। এই গ্রামের অধিবাসী বলাই চন্দ্র পাটিকর বললেন- আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত এই শিল্পটি বাংলার অহংকার। আমরা চাই এই শিল্পটি তার অস্তিত্ব নিয়ে দেশের ঐতিহ্য রক্ষা করবে। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এগিয়ে আসবে। কারন আক্ষেপের সুরে দূষণ যুক্ত প্লাস্টিক পাটিতেই বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। আর আমরা পরিবেশ বান্ধব ভালো শিল্পটাই হারিয়ে ফেলছি। এখানে আশিটা পরিবারের প্রত্যেকেই শৈশব থেকেই পাটি শিল্পের সাথে যুক্ত। পাটিতেই রুজি রোজগার। তাই বিয়েও হয় কারিগর পরিবার দেখে। অভিনব ব্যাপার হল এই কয়েকটা পরিবারের মধ্যই এদের বিবাহ হয়। যাতে শিল্পটা নষ্ট না হয়ে যায়।
(এই পাটি যিনি বুনেছেন তার অক্ষর পরিচিতি নেই।
অথচ এমন নিপুণ হাতে বুনেছেন এ যেন সোনার কাঠি দিয়ে রূপকথার গল্প লেখা)
১৯৫৬ সালে ব্রজবাসী ধর নামে এক শীতল পাটি শিল্পী বাংলাদেশের টাঙ্গাইল থেকে কোচবিহার আসেন। তখনই কোচবিহারে শীতলপাটি শিল্পের শুভ সূচনা হয়। ১৯৭০ সালের পর থেকে শীতলপাটি শিল্পীরা আসতে শুরু করেন। শীতল পাটি শিল্পকে উচ্চ মাত্রায় নিয়ে গিয়েছেন সুকুমার দাস, গৌরাঙ্গ দাস এমনই কিছু মানুষ।
১৯৮০-৮২ সালে বেত কাটা আন্দোলন শুরু হয়। অর্থাৎ বেত বনে বাবুই পাখি আসে। আর বাবুই পাখি বেত বনের পাশে ধানের জমির ধান খায়। ফলে জমির মালিকেরা বেত কেটে ফেলতে চায়। অথচ বেত বনের ওপর নির্ভর করে প্রচুর বেত শিল্পী বাঁচে। শেষে এসডিও, বিডিও বসে পিস কমিটি গঠন করে শিল্পীদের হয়ে প্রটেকশন দেন। তাতে শিল্পীরা বাঁচে। ফলস্বরূপ এপার বাংলায় কোচবিহারের শীতল পাটি আজ সারা ভারতে বিখ্যাত।
এ ছাড়া দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমান, উত্তর চব্বিশ পরগণার এই শীতল পাটির চাষ ও পাটিশিল্পী পাটিয়াল বা পাটিকরেরা শীতল পাটি বোনেন। কোচবিহার জেলায় ৩০ হাজারের ও বেশি শিল্পীর বাস। কোচবিহারের ঢোলুয়া বাড়িকে শীতল পাটির পীঠস্থান বলা হয়। এছাড়াও বাইশ ভোগী, ডায়ালের কোঠি, পুষাণ ডাঙা, নবাবগঞ্জ, ঘেঘরি ঘাট, বালাশি, ঘুঘুমারি, তুফানগঞ্জ প্রভৃতি জায়গায় প্রচুর শিল্পকর্ম হয়। কোচবিহারের ঘুঘুমারি, পাণিগ্রামের বাসিন্দা শীতল পাটি শিল্পী মাধাই লাল দত্ত জানালেন, ঘুঘুমারিতেই আজকাল সবচেয়ে বেশি শীতল পাটি তৈরি হয়। এখন পৃথিবী বিখ্যাত এখানকার শীতল পাটি। কোমল কোশ নামে খুব সুন্দর পাটি তৈরি হয়।
এতে খুব সুন্দর ময়ূর, প্রজাপতি বোনা হয়। এখানে ১৯৯০ সালে মাত্র তিরিশ বছর বয়সে রাস্ট্রপতি পুরস্কার পান শ্রী মতি টগর রানী দেবী। তাঁর নানান শিল্পের মধ্যে অপূর্ব চিত্র বোনা কমোল কোশ পাটির জন্য। হাতে না নিয়ে দেখলে মনে হবে কাপড়। শিল্পের সাথে ভালোবাসা সাধনার মতো জড়িয়ে থাকে বলেই এমন মিহি সুন্দর কাজ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বছর দশেক বয়স থেকেই এই শিল্পের সাথে যুক্ত। কিন্তু তার মনে সাধারণ পাটি ছাড়াও আরও কিছু করার ইচ্ছে জাগে। তিনি গরমে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হ্যাট তৈরী করেন, নানান ধরনের ঢাকনা দেওয়া ঝুড়ি বাক্স ইত্যাদি। এইটা টগরদেবীর হাতে বোনা নিপুণ কারুকাজের কমোল কোশ পাটি। যা তাকে রাস্ট্রপতি পুরস্কার এনে দিয়েছে। তাঁর কাছে অনেক ছাত্র ছাত্রীরা শেখেন পাটি তৈরি ও বুননের কাজ।
ঘুঘুমারির হরিণচড়া গ্রামের জয়শ্রী চন্দ ডিস্ট্রিক্ট ও স্টেট লেভেলে পুরস্কার অর্জন করেছেন। সরকারি ভাবে তিনি মাস্টার ট্রেনার হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেন। সরকারি ভাবে সারা ভারত জুড়ে সরকারি খরচে মেলায় তাঁর পাটি শিল্পের নানান সম্ভার নিয়ে যান। তার সম্ভারে সুন্দর শীতল পাটি ছাড়াও নানান ধরনের ও সাইজের ব্যাগ পাওয়া যায়, সপিং ব্যাগ, লাঞ্চ ব্যাগ, ট্যুর ব্যাগ ইত্যাদি । তাঁর তৈরি এক অভিনব শিল্প হল পাটি দিয়ে তৈরী মোদি জ্যাকেট। তিনি জানালেন তাঁর মা ১৯৯৪ এ শীতল পাটির সাথে জুট সেলাই করে প্রথম ব্যাগ তৈরি করে পুরস্কৃত হন। জয়শ্রী চন্দ সরকারি উদ্যোগে চীন, ইতালি, ইওরোপের কয়েক জায়গায়, ঢাকার মেলায় শীতল পাটির নানান সম্ভার নিয়ে ভারতের হস্তশিল্পের প্রদর্শনী করেছেন।
এখানের কারিগর পূর্ণবাবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে দুইবার পুরস্কার পেয়েছেন। কোচবিহারের বিরু দে ২০১৪-২০১৫ তে প্রথম পুরস্কার পান। ২০১৭-২০১৮ সালে কমলা সুন্দরী ধর প্রথম পুরস্কার পান। কোচবিহার জেলা ভিত্তিক কারু শিল্প প্রতিযোগিতায় বিশেষ পুরস্কার পান ধৌলাবাড়ি, ঘুঘুমারি কোচবিহার থেকে প্রদীপ ধর। ভারত বর্ষের সর্বত্র শীতলপাটির নানান সম্ভার পৌঁছয়। জাপানেও খুব সমাদৃত কোচবিহারের শীতল পাটি। বিছানার যেমন আকার সেইমত পাটি বোনা হয়। ডাবল বেড, সিঙ্গেল বেড ইত্যাদি। খুব সুন্দর ডিজাইনের চাদরের মতো শীতলপাটি যেমন আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব তেমনি সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আজকাল পাটির সাথে জুট সেলাই করে নানান প্রয়োজনীয় ব্যাগ,অফিসব্যাগ, ল্যপাটপ ব্যগ, টিফিন ব্যাগ, জলের বোতল রাখার ব্যাগ, ফাইল, চটি, মোবাইল কভার, ইত্যদি তৈরি হয়। চটি জলে ভিজলেও খারাপ হবে না। বরং নরম ও চকচকে হবে।
শীতল পাটির জন্য মুরতা বেত চাষ একবার হলে বংশ পরম্পরায় চলে আসে। এই গাছ কে মুরতা বেতগাছ বলে। দেখতে অনেকটা সরু বাঁশের মতো। জলাশয় বা স্যাতস্যাতে এলাকা জুড়ে প্রাকৃতিক ভাবেই মুরতা চাষ হোত। মুরতা গাছের বনকে পাটি বন ও বলা হয়। পাটি গাছের মরণ নেই। যুগ যুগ বেঁচে থাকে। তবে সোজা রাখার জন্য যত্ন করতে হয়। আগা কাটতে হয় যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। মাটি টা পরিষ্কার রাখতে হয়। প্রয়োজনে গোবর সার দেওয় যেতে পারে। এছাড়া অন্য কোন যত্নের প্রয়োজন হয় না। কাঁচামাল হিসেবে লম্বা সোজা মুরতা বেত কেটে নিতে হয়। তিন চার মাস পর পর বেত কাটা হয়। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত বেত কাটা হয়। ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাত লম্বা হলে বেত কেটে নেওয়া হয়। এই বেত থেকেই সারা বছর পাটি বোনা হয়। এক বিঘে জমিতে সঠিক ভাবে চাষ করলে পাঁচশো পিস শীতল পাটি তৈরি হতে পারে। আশিটা বেত দিয়ে একটা পাটি তৈরি হয়। কিন্তু ঢোলুয়া বাড়ি গ্রামের গোঁসাই দে জানালেন— তার এক বিঘে জমি থেকে প্রতি বছর দেড়শো পাটির বেত কাটতে পারেন। গাঙালের গুটি গ্রামের চন্দন কুমার দে জানান বংশ পরম্পরায় তাঁরা সবাই এই শিল্পের সাথে যুক্ত। অর্ডারের ওপর পাটি বোনেন। ভুশনাই, কমোল কোশ ,উন্নতমানের শীতল পাটি ইত্যাদি।
জমি থেকে তুলে প্রত্যেকটা বেতের ডালকে জলে ধুয়ে ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হয়। নোংরা যাতে না থাকে। একটু শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর খুব ধারালো বটির মতো দা দিয়ে চিরে চারদিকের ছাল বের করা হয়। আবারো এই ছালগুলো চেরা হয়। এবার ছালের হালকা সবুজ অংশ চেঁছে ভিতরের সাদা অংশ ফেলে দেওয়া হয়। এই সাদা অংশগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে বুকা বলে। খুব পাতলা ও সরু করে যখন কাটা হয় তাকে বেতি বলে। একটা বেতের দন্ড থেকে ছয় থেকে আঠার টা বেতি পাওয়া যায়। পাতলা সবুজ বেতিগুলো একটু শুকিয়ে আঁটি বেঁধে সাত আট দিন ভাতের মাড়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর ভাতের মাড়ের মধ্যে আমড়া গাছের পাতা, জারুল পাতা দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। এবার ধুয়ে শুকিয়ে নিলে বেতিগুলোতে সাদা চমক আসে। কুয়াশার মধ্যেও রাখতে হয় বেতি গুলোকে। এরপর আবার কিছু কিছু বেতি লাল, নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙে রাঙানো হয়, ডিজাইন তৈরির জন্য। আট দশদিন লাগে বেতি তৈরি করতে। এই বেতি নানান রঙ দিয়ে দক্ষ কারিগরেরা নিপুণ হাতে শীতল পাটি বোনেন। দুই হাত দ্রুতগতিতে সমান ভাবে অপূর্ব ভঙ্গিমায় চালনা করেন পাটি বোনার জন্য। প্রত্যেক বাড়িতে সবাই এই শিল্পে যুক্ত হলেও বাড়ির মেয়েরাই পাটি বোনার কাজ বেশি করেন। ঘরের কাজ সামলেও এই কাজ করেন। পাটিকর মাটিতে বসে কাপড় বোনার মতো করে দৈর্ঘ্য প্রস্থ বরাবর বেতি স্হাপন করে পাটি বোনা হয়। বোনার সময় বেতিগুলোকে ঘন আঁটসাঁট করে বোনা হয় যাতে ফাঁক ফোকর না থাকে। বোনার সময় জল হাতে নিয়ে বুনতে হয়। পাটি বোনা শেষ হলে মুড়ি টেনে কেটে দেওয়ার কাজ হয়। অর্থাৎ ফিনিশিং। রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। খুব মিহি বেতি হওয়ার কারণে শীতল পাটি বুনতে সময় লাগে ১৫ দিন থেকে ৩ মাস, ৬ মাস ও লাগে। মোটা পাটি ৬ ঘন্টা করে বুনলে ৩দিন লাগে। কারিগরেরা পাঁচ থেকে ছয় রকমের পাটি তৈরি করেন। যেমন টাঙ্গাইল অঞ্চলে শীতল পাটি, বুয়া পাটি , ডালার পাটি, লাল পাটি এই কয় প্রকারের পাটি বোনা হয়। কোচবিহার অঞ্চলে শীতল পাটি, মোটা পাটি, ডালার পাটি, কমল কোশ এই প্রকার পাটি বোনেন।
ডালার পাটি দিয়ে মূলত জুতো, ব্যাগ, মোবাইল কভার, নমাজ পড়ার জন্য পাটি বোনা হয়। উচ্চ গুণমান সম্পন্ন শীতল পাটি খুব নরম, টেকসই, সাদা(রঙীন কাজ করাও হয়) চমৎকার ফিনিশিংএর হয়। এর শৌখিনতা বা মূল্য দেখেই বোঝা যায়। এই পাটির সামনে পিছনে কোথাও জোড়া পাওয়া যাবে না। এক একটা গোটা বেতি দিয়ে সম্পূর্ণ পাটি বোনা হয়। চারিদিকে লাল কাপড়ে সরু করে মোড়া হয়। বিছানার মাপ অনুযায়ী পাঁচ বাই সাত ফিটের এই আভিজাত্য পূর্ণ আকর্ষণীয় শীতল পাটি বাংলাদেশের এক নাগরিক ইউ, এস সেনেটর কে উপহার দিলে তিনি হস্তশিল্পের এমন সুন্দর উপহার পেয়ে খুব সুন্দর ভাবে তার অনুভূতির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এই প্রতিক্রিয়া হস্তশিল্পের দুর্লভ রাজকীয় সম্মান যা বাংলার শীতল পাটি অর্জন করেছে, এইটি আমাদের গর্বের বিষয়। যুগে যুগে শীতল পাটি এমন রাজকীয় সম্মান পেয়ে এসেছে। শীতল পাটির ঐতিহ্য কে ধরে রাখা আমাদের হস্তশিল্পের এমন দুর্লভ রাজকীয় সম্মান, বাংলার শীতল পাটি অর্জন করেছে এইটি আমাদের গর্বের বিষয়। যুগে যুগে শীতল পাটি এমন রাজকীয় সম্মান পেয়ে এসেছে। শীতল পাটির ঐতিহ্য কে ধরে রাখা আমাদের কর্তব্য।
কোচবিহারের পানিশালা গ্রামে শীতল পাটির খুব বড় হাট বসে। ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয় এখানে। কলকাতার ঢাকুরিয়া ও চাঁদনিচক অঞ্চলে শীতল পাটির নানান সম্ভার পাওয়া যায়। ঘুঘুমারি অঞ্চলে এত শিল্পীদের বাস, তাদের কাজকর্ম অত্য ভালো। কিন্তু সবাই জানেনা বাইরের বাজারের চাহিদা কিরকম তাই বাঙলা নাটক সংস্হা থেকে ২০১৭ তে জানুয়ারি মাসে এক শীতললপাটি মেলার আয়োজন করে। সেখানে শীতল পাটির নানান সম্ভারের সাথে পুতুল নাচ, বাউল গান, ভাওয়াইয়া গান, রণপা এর খেলা, ছৌ নাচ, আরও নানান জিমনাস্টিক খেলা প্রদর্শিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উত্তর বঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের ভার প্রাপ্ত মন্ত্রী প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এর পর থেকে মেলার আকর্ষণ বাড়তে থাকে।
উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলাতেও শীতল পাটি চাষ হয়। এখানে হাটথোবা গ্রামের বাবলু মণ্ডল জানালেন তাদের নিজেদের জমিতে পাটি বন আছে। পূর্বপুরুষরাও এই শিল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন। বাবলু বাবু তাঁর বয়স সাতষট্টি। তিনি বাবার কাছ থেকে এই শিল্পের কাজ শিখেছেন। এই জেলায় অনেকেই অন্যের কাছ থেকে বেত কিনে নিয়ে শীতল পাটি বোনেন। এখানকার বাসিন্দা শিখা সমাদ্দার জানালেন ক্ষেতের মালিকের কাছ থেকে বেত কিনে শীতল পাটি বোনার কাজ করেন।
করোনা কালীন পরিস্থিতিতে সব জায়গার শীতল পাটি শিল্পীরা আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। তাদের তৈরি জিনিস বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। রোজগার বন্ধ। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার কৌশিক দত্ত রায় সাহায্যরে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোচবিহার ১নং ব্লকের কয়েক হাজার শীতলপাটি শিল্পীদের এই সংকটকালে দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কোচবিহার প্রগ্রেসিভ শীতলপাটি প্রডিউসার অর্গানাইজেশন ও জেড একাডেমী সোসাইটির পক্ষ থেকে ১০০টি পরিবারের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন ঘি, লবণ, মেরি বিস্কুট, রান্নার তেল, চিনি, মুসুরডাল, পাঁপড়, সয়াবিন, চা, টুথপেস্ট এবং সাবান ও মাস্ক তুলে দেওয়া হয়।
আজকাল প্লাস্টিক সুতার পাটিতে বাজার ছেয়ে গেছে। আসল যারা পাটি শিল্পী তাদের বাজার নষ্ট হচ্ছে, অথচ কম দাম হলেও প্লাস্টিক শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে পরিবেশ দূষণ ও শারিরীক ক্ষতির কথা চিন্তা করেই, প্লাস্টিক পাটি একেবারেই বর্জন করা উচিত। রোগ যাতে না ছড়ায়। নাগরিক দের শরীর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে সরকারের ও এগিয়ে আসা উচিত।

.jpeg)
No comments:
Post a Comment